উদ্দীপকের ছক-১ এ উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ, যেমন-ঈসা খান, মুসা খান, চাঁদ রায় প্রমুখ মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসে অবিসংবাদিত 'বারোভূঁইয়া' নামে সুপরিচিত।
ষোলো শতকের মাঝামাঝি থেকে সতেরো শতকের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলার যে সকল শক্তিশালী ও স্বাধীনচেতা জমিদার মুঘল আধিপত্য মেনে নেননি, তাদেরকেই বারোভূঁইয়া বলা হয়। নিজেদের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা বজায় রাখার জন্য এই দেশপ্রেমিক জমিদারদের নিজস্ব শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী এবং সুসজ্জিত নৌবহর ছিল।
উদ্দীপকে আমরা ঈসা খান, মুসা খানসহ বিখ্যাত জমিদারদের নাম দেখতে পাই, যারা বারোভূঁইয়াদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সম্রাট আকবর যখন আফগানদের হটিয়ে সমগ্র বাংলার ওপর মুঘল আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেন, তখন এই বারোভূঁইয়ারা একজোট হয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ঈসা খানের দূরদর্শী নেতৃত্বে তারা মানসিংহের মতো বিখ্যাত মুঘল সেনাপতিদের আক্রমণ বারবার প্রতিহত করেন। নিজ মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষায় তাদের এই ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ও বীরত্ব বাংলার ইতিহাসে অনন্য গৌরবময় অধ্যায়।
হ্যাঁ, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, উদ্দীপকের ছক-২ এ প্রদত্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ মধ্যযুগে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠাকারী বীর সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজিরই সুস্পষ্ট প্রতিনিধিত্ব করছে। বখতিয়ার খলজি ছিলেন জাতিতে তুর্কি এবং বৃত্তিতে একজন ভাগ্যান্বেষী সৈনিক। শারীরিক ত্রুটির কারণে রাজদরবারে চাকরি পেতে ব্যর্থ হলেও, অদম্য উচ্চাকাঙ্ক্ষার জোরে তিনি সৈন্য সংগ্রহ করে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে নদীয়া জয়ের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসনের ভিত রচনা করেন।
উদ্দীপকের ছক-২ তে উল্লিখিত 'ভাগ্যান্বেষী সৈনিক', 'তুর্কি বীর', 'উচ্চাভিলাষী' এবং 'বঙ্গ বিজেতা' বিশেষণগুলো বখতিয়ার খলজির জীবনের সাথে হুবহু মিলে যায়। জীবিকার সন্ধানে দেশ ছেড়ে আসা এই তুর্কি বীর নিজ উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রথমে বিহার ও পরবর্তীতে সামান্য সংখ্যক সৈন্য নিয়ে রাজা লক্ষণ সেনকে বিতাড়িত করে সফলভাবে বঙ্গ বিজয় সম্পন্ন করেছিলেন।
পরিশেষে বলা যায়, ছকের প্রতিটি শব্দই তার অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক পরিচয়কে নিখুঁতভাবে নির্দেশ করে। তার এই অভাবনীয় বঙ্গ বিজয়ের ফলেই এ দেশে দীর্ঘস্থায়ী মুসলিম শাসন এবং নতুন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের অবিস্মরণীয় সূচনা হয়েছিল। তাই বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিকোণ থেকে ছক-২ সম্পূর্ণভাবে বখতিয়ার খলজিকেই তুলে ধরেছে।
তথ্য-১ এ ইতিহাসের অলিখিত উপাদানকে ইঙ্গিত করে।
যেসব বস্তু বা উপদান থেকে আমরা বিশেষ সময়, স্থান বা ব্যক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক তথ্য পায়, সেই উপাদানই ইতিহাসের অলিখিত উপাদান। যেমন- লিপিমালা, মুদ্রা, স্থাপত্য ভাস্কর্য ও স্মৃতিসৌধ, মৃৎশিল্প, মৃৎপাত্র, তৈজসপত্র, মূর্তি, তলোয়ার ইত্যাদি। আমরা মুদ্রা থেকে বিভিন্ন রাজার রাজত্বের সময়কাল, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সমাজ ব্যবস্থা ও ধর্মবিশ্বাস প্রভৃতি সম্পর্কে জানতে পারি। মুদ্রায় রাজার নাম, সন-তারিখ, রাজার মূর্তি, নানা দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করা থাকে। শিলালিপি হলো পাথরের গায়ে লিখিত লিপি। যুদ্ধবিগ্রহ, ভূমিদান, রাজার আদেশ, রাজার নাম, রাজ্য জয়, রাজত্বকাল, ধর্ম, বিশ্বাস প্রভৃতি বিষয় গুলো আমরা শিলালিপি থেকে জানতে পারি। এছাড়াও স্থাপত্য নিদর্শন, স্মৃতিস্তম্ভ, সমাধি, শিল্পকীর্তি, মৃৎশিল্প, মৃৎপাত্র ও তৈজসপত্রাদিও অলিখিত উপাদানের অন্তর্ভুক্ত। উদ্দীপকের তথ্য-১ এর প্রাচীন সমাধি, রাজার আদেশ, কৃষি উপকরণ থেকে নানা তথ্য পাওয়া যায়। ইতিহাসের অলিখিত উপাদানকে নির্দেশ করে।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকের প্রাচীন সমাধি, রাজার আদেশ ও কৃষি উপকরণ ইতিহাসের অলিখিত তথা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে ইঙ্গিত করেছে।
হ্যাঁ, তথ্য-১ ও তথ্য-২-এর সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা সম্ভব।
তথ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এ কারণেই ইতিহাসের উপাদানকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা-লিখিত উপাদান ও অলিখিত উপাদান। ইতিহাস রচনার লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সাহিত্যকর্মেও তৎকালীন সময়ের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তাছাড়া বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ সবসময়ই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে, অলিখিত উপাদান যেমন- মুদ্রা, শিলালিপি, স্তম্ভলিপি, তাম্রলিপি, ইমারত ইত্যাদি। এসব নিদর্শন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশ্লেষণের ফলে সে সময়ের অধিবাসীদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অতএব বলা যায়, তথ্য-১ অলিখিত উপাদান এবং তথ্য-২ এ লিখিত উপাদানের মাধ্যমেই পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করা যায়। লিখিত উপাদান ও অলিখিত উপাদান জাতির সার্বিক ইতিহাস রচনায় সাহায্য করে।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকে তথ্য-১ এ বর্ণিত ইতিহাসের অলিখিত উপাদানের মাধ্যমে এবং তথ্য-২-এ উল্লিখিত লিখিত উপাদান দ্বারা একটি জাতির পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা সম্ভব।
দৃশ্য-২: রবিনের দেশে প্রচুর খাদ্যশস্য উৎপাদনের পাশাপাশি অর্থকরী ফসল উৎপাদিত হয়। সাধারণ পোশাক থেকে শুরু করে প্রচুর বিলাসী পোশাকও তৈরি হতো।
প্রাচীন বাংলার সমাজের যাতায়াত ব্যবস্থার দিকটি রাসেলের অভিভাবকদের পরিকল্পনায় ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপকের দৃশ্য-১ এ দেখা যায়, রাসেলের বিয়ে উপলক্ষ্যে তার অভিভাবকরা এক অভিনব পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পরিকল্পনানুসারে রাসেল ঘোড়ায় করে কনের বাড়িতে যাবে। আবার কনেকে পালকিতে চড়িয়ে নিজের বাড়ি নিয়ে আসবে। বাকি অতিথিরা নৌকাযোগে যাতায়াত করবে। যা প্রাচীন বাংলার যাতায়াত ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে।
প্রাচীন বাংলার মানুষের যাতায়াতের প্রধান বাহন ছিল গরুর গাড়ি ও নৌকা। খালবিলে চলাচলের জন্য মানুষেরা ভেলা ও ডোঙ্গা ব্যবহার করত। প্রাচীন বাংলার মানুষেরা ছোট ছোট খাল পার হতো সাঁকো ব্যবহার করে। সমাজের ধনী লোকেরা হাতি, ঘোড়া, ঘোড়ার গাড়ি প্রভৃতি যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করত। তাদের পরিজনেরা নৌকা ও পালকিতে এক স্থান হতে অন্য স্থানে যাতায়াত করত। বিবাহের পর নববধূকে গরুর গাড়িতে রা পালকিতে করে শ্বশুর বাড়ি আনা হতো।
সুতরাং উদ্দীপকের দৃশ্য-১ এর রাসেলের বিয়ের দিকটি প্রাচীন বাংলার যাতায়াত ব্যবস্থার প্রতি নির্দেশ করে।
দৃশ্য-২-এর রবিনের দেশের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকার কারণে অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্যে প্রাচীন বাংলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। – মন্তব্যটি যথার্থ।
প্রাচীন বাংলার অর্থনীতি কৃষি নির্ভর ছিল। এখানে ব্যাপক পরিমাণ কৃষিপণ্য উৎপাদিত হতো। প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় নানা প্রকার শিল্পজাত দ্রব্য তৈরি হতো। বস্ত্র শিল্পের জন্য বাংলা প্রাচীন কালেই বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। কার্পাস তুলা ও রেশমের জন্য তৈরি উন্নতমানের সূক্ষ্ম বস্ত্রের জন্যও বঙ্গ প্রসিদ্ধ ছিল। বস্ত্র শিল্পের জন্য বাংলা প্রাচীনকাল থেকেই বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। বিশ্বখ্যাত মসলিন কাপড় বাংলায় তৈরি করা হতো। এ কাপড় এতই সূক্ষ্ম ছিল যে, ২০ গজ মসলিন কাপড় একটি নস্যের কৌটায় ভরা যেত। তখনকার দিনের রাজারানিরা এ কাপড় পরিধান করত। কার্পাস তুলা ও শনের তৈরি মোটা কাপড়ও তখন প্রস্তুত হতো। বঙ্গদেশে সেসময় টিন পাওয়া যেত। বঙ্গে কৃষি ও শিল্পদ্রব্যের প্রাচুর্য ছিল। আবার এগুলোর খুব চাহিদাও ছিল ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। তাই বঙ্গের সাথে প্রাচীনকালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্যবসায় বাণিজ্য চলত। বঙ্গের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সুতি ও রেশমি কাপড়, চিনি, গুড়, লবণ, তেজপাতা ও অন্যান্য মসলা, চাল, নারকেল, সুপারি, ওষুধ তৈরির গাছপালা, নানা প্রকার হিরা, মুক্তা, পান্না ইত্যাদি। শিল্পের উন্নতির সাথে সাথে ব্যবসায় বাণিজ্যের যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছিল। জল ও স্থল উভয় পথেই বাণিজ্যের আদান-প্রদান চলত। বাংলায় বহু নদনদী থাকায় এক স্থান হতে অন্য স্থানে মালামাল আনানেওয়া সহজ ছিল। শিল্প-বাণিজ্য থেকে রাজার যথেষ্ট আয় হতো।
ছক-১-এর 'খ' অঞ্চলটির সাথে তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তানের মিল রয়েছে।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। এ সময় পূর্ব বাংলা পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ হয়। ১৯৫৬ সালে এর নাম পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানকে দাবিয়ে রাখতে এবং শোষণের অংশ হিসেবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বৈষম্য করে। পাকিস্তানের প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি ছিল সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তাগণ। ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের মন্ত্রণালয় গুলোতে শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার মধ্যে বাঙালি ছিল মাত্র ১১৯ জন। ১৯৫৬ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের ৪২,০০০ কর্মকর্তার মধ্যে বাঙালির সংখ্যা ছিল মাত্র ২৯০০। ১৯৪৭ সালে করাচিতে রাজধানী হওয়ায় সকল সরকারি অফিস আদালতে পশ্চিম পাকিস্তানিরা ব্যাপক হারে চাকরি লাভ করে।
সরকারের সব দপ্তরের সদর দপ্তর ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ১৯৫৬ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান গেজেটেড কর্মকর্তা ছিল যথাক্রমে ১৩৩৮ ও ৩৭০৮ জন এবং নন গেজেটেড কর্মকর্তা ছিল যথাক্রমে ২৬১১০ ও ৮২৯৪৪ জন।
অতএব বলা যায়, উদ্দীপকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি প্রশাসনিক বৈষম্য দেখানো হয়েছে। যার কারণ ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করা ও দাবিয়ে রাখা।
হ্যাঁ, আমি মনে করি পাকিস্তান আমলে ছক-১-এর চেয়ে ছক-২-এর তথ্যগুলো বাঙালিদের স্বাধিকার অর্জনের জন্য অধিক উদ্বুদ্ধ করে।
উদ্দীপকে ছক-১ হলো প্রশাসনিক বৈষম্য আর ছক-২ অর্থনৈতিক বৈষম্য ফুটে ওঠেছে। আর প্রশাসনিক বৈষম্যের চেয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাঙালিদের স্বাধীকার অর্জনে বেশি উদ্বুদ্ধ করে। পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার হয়। এ কারণে পূর্ব পাকিস্তান কখনো অর্থনৈতিক ভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সকল পরিকল্পনা প্রণীত হতো কেন্দ্রীয় সরকারের সদর দপ্তর পশ্চিম পাকিস্তানে। জন্মলগ্ন থেকে পাকিস্তানে তিনটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গৃহীত হয়। প্রথমটিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে ১১৩ কোটি ও ৫০০ কোটি রুপি, দ্বিতীয়টিতে বরাদ্দ ছিল ৯৫০ কোটি রুপি এবং ১৩৫০ কোটি রূপি। তৃতীয়টিতে পূর্ব ও পশ্চিমের জন্য বরাদ্দ যথাক্রমে ৩৬% ও ৬৩%। রাজধানী উন্নয়নের জন্য বরাদ্দের বেশির ভাগ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য। ১৯৫৬ সালে করাচির উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হয় ৫৭০ কোটি ঢাকা, যা ছিল মোট ব্যয়ের ৫৬.৪%। পূর্ব পাকিস্তানের কাঁচামাল সস্তা হলেও শিল্পকারখানা বেশির ভাগ গড়ে উঠেছিল পশ্চিম পাকিস্তানে।
উদ্দীপকের ছকে পাকিস্তান আমলের দুটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। অতএব বলা যায়, উদ্দীপকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অর্থনৈতিক বৈষম্য নির্দেশ করা হয়েছে। যা ছক-১ এর চেয়ে বাঙালিদের স্বাধীকার অর্জনের জন্য অধিক উদ্বুদ্ধ করে।
উদ্দীপকের মীরার অনুভূতির সাথে বাংলার ইতিহাসের স্বদেশি আন্দোলনের মূল ধারণার মিল রয়েছে।
উদ্দীপকে উল্লিখিত মীরা ও তার বোন কেনাকাটা করতে গিয়ে মীরা দেশীয় পণ্য কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করে আর তার বোন বিদেশি পণ্য কিনতে পছন্দ করে। দেশে তৈরি পণ্যের প্রতি মীরার এ আগ্রহ ভারতে ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা স্বদেশি আন্দোলন দ্বারা ও কেননা, স্বদেশি আন্দোলনেও ইংল্যান্ডের তৈরি পণ্য বর্জন করে দেশীয় পণ্য ব্যবহারের শপথ গ্রহণ করা হয়। ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন ব্যর্থ হলে কংগ্রেসের উগ্রপন্থি অংশের নেতৃত্বে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তাকে স্বদেশি আন্দোলন বলা হয়। এ আন্দোলনের মূল কর্মসূচি ছিল দুটি- বয়কট ও স্বদেশি। বয়কট আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিলেতি পণ্য বর্জন। ক্রমেই বয়কট শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহার হতে থাকে। বয়কট বলতে শুধু বিলেতি পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিলেতি শিক্ষা বর্জনও কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। সভাসমিতির মাধ্যমে স্থানে স্থানে বিলেতি পণ্য বর্জন ও দেশিও পণ্য ব্যবহারের শপথ নেওয়া হয়। ফলে বিলেতি পণ্যের চাহিদা কমতে থাকে এবং বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে এ সময় দেশি তাঁতবস্ত্র, সাবান, লবণ, চিনি ও চামড়ার দ্রব্য তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে।
অতএব বলা যায়, স্বদেশি আন্দোলনের অনুপ্রেরণাই মীরা দেশীয় পণ্য কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করে।
উদ্দীপকের মীরার দেশীয় পণ্য কেনার মানসিকতা আমাদের দেশের অর্থনীতির গতিকে ত্বরান্বিত করেছিল। – উক্তিটি যথার্থ।
বিদেশি পণ্য ব্যবহার করলে আমাদের দেশীয় শিল্প বিকাশ মন্থর হয়ে যাবে। আমাদের দেশের অধিকাংশ লোকের মানসিকতা বিদেশি পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট। এ ধরনের মানসিক দুর্বলতার কারণে আমাদের দেশের পণ্যের মান কমে যাচ্ছে। তাই আমাদের উচিত মীরার বোনের মতো মানসিকতা বর্জন করে দেশীয় পণ্যের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করা। আমাদের দেশে যদি দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়, তাহলে বিদেশি পণ্যের আমদানি কমে যাবে। আমাদের দেশে বিভিন্ন কলকারখানা বৃদ্ধি পেয়ে উৎপাদন বেড়ে যাবে। গড়ে উঠবে একটি উন্নত দেশ। সবাই যদি মীরার মতো দেশীয় পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয় তাহলে তা অবশ্যই দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করবে।
তাই বলা যায়, দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি করতে হলে শুধু মীরার নয়, সর্বস্তরের মানুষের উচিত দেশীয় পণ্যের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করা। তাহলেই আমাদের দেশে শিল্পের বিকাশ হবে।
সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ আরবদেশীয় সৈয়দ বংশের লোক ছিলেন। পিতা সৈয়দ আশরাফ আল হুসাইনি ও ভাই ইউসুফের সাথে তিনি মক্কা হতে বাংলায় আসেন এবং রাঢ়ের চাঁদপাড়া গ্রামে প্রথমে বসবাস শুরু করেন। তিনি মুজাফফর শাহের অধীনে চাকরি লাভকরেন। পরে তিনি উজির হন। আর এভাবেই তিনি বাংলার ক্ষমতা লাভকরেন। রাজ্যের শাসনভার গ্রহণের পর তিনি দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় গভীরভাবে আত্মনিয়োগ করেন। তার সময়ে বাংলার রাজ্যসীমা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়। তিনি কামরূপ ও কামতা জয় করেন। হাবসিদেরকে দমন ও রাজ্য থেকে বিতাড়িত করেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সৈয়দ, মোঙ্গল, আফগান, হিন্দুদেরকে নিয়োগদানের মাধ্যমে অতি অল্প সময়েই রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সৌহার্দ ও সম্প্রীতি স্থাপনের উদ্যোগ নেন। একটি সুন্দর ও কল্যাণমুখী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একজন গোঁড়া মুসলমান হয়েও তিনি বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে যোগ্যতা অনুসারে শাসনকার্যে নিয়োগ করেন। তার সময়ে বৈষ্ণব ধর্মের উত্থান ঘটে। তাঁর শাসনামলে সত্যপীরের আরাধনা হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি দীর্ঘ ২৬ বছর বাংলায় অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করেন।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকের তথ্যসমূহ হুসেন শাহি বংশের আলাউদ্দিন হুসেন শাহের শাসনকে নির্দেশ করে।
উক্ত শাসক তথা আলাউদ্দিন হুসেন শাহের উদারতা দেশে মঙ্গল বয়ে এনেছিল। – মন্তব্যটি যথার্থ ও যুক্তিযুক্ত।
হুসেন শাহি বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন আলাউদ্দিন হুসেন শাহ। তিনি দীর্ঘ ২৬ বছর (১৪৯৩-১৫১৯) রাজত্ব করেন। আলাউদ্দিন হুসেন শাহের পূর্বে সাম্রাজ্যে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা ছিল। তিনি এ বিশৃঙ্খলা দূর করে রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি দেহরক্ষী বাহিনীর ক্ষমতা বিনাশ করেন। তদস্থলে হিন্দু ও মুসলমানদের নিয়ে একটি নতুন বাহিনী গঠন করেন। শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং জনকল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে তিনি যথেষ্ট উদ্যম, নিষ্ঠা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। শাসনকার্য পরিচালনায় ও প্রজাপালনের ক্ষেত্রে তিনি জাতি-ধর্মের কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করেননি। হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ ও সম্প্রীতি স্থাপনের দ্বারা একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও কল্যাণমুখী শাসনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে যোগ্যতা অনুসারে শাসনকার্যে নিয়োগ করেছিলেন। হিন্দুদেরকে উৎসাহিত করার জন্য তিনি তাদেরকে বিভিন্ন উন্মধিও প্রদান করতেন। হুসেন শাহের এ ধর্মীয় উদারতা তার উত্তরাধিকারীদেরও উৎসাহিত করেছিল। হুসেন শাহের হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি স্থাপনের প্রচেষ্টা তৎকালীন সমাজজীবনকেও প্রভাবিত করেছিল। তার শাসনকালেই আবির্ভাব ঘটে বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক শ্রীচৈতন্যের। হুসেন শাহ তার প্রতি উদার মনোভাব পোষণ করেন।
পরিশেষে বলা যায়, উপরিউক্ত কর্মকান্ডের ফলে আলাউদ্দিন হুসেন - শাহের উদারতা দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে এনেছিল।
ইতিহাস হচ্ছে মানবসভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিক ও সত্যনিষ্ঠ বিবরণ। অপরদিকে জগৎ, জীবন, মানুষের সমাজ; তার চেতনা এবং জ্ঞানের প্রক্রিয়া প্রভৃতি মৌল বিধানের আলোচনা হচ্ছে দর্শন। মানুষ ইতিহাস পাঠ করে অতীত ঘটনাবলির দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নিতে পারে। ইতিহাসের শিক্ষা বর্তমানের প্রয়োজনে কাজে লাগানো যেতে পারে। আর এজন্যই ইতিহাসকে শিক্ষণীয় দর্শণ বলা হয়।
যেসব বস্তু বা উপাদান থেকে আমরা বিশেষ সময়, স্থান বা ব্যক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক তথ্য পাই সেই বস্তু বা উপাদানই প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন। প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনসমূহ বস্তুত ইতিহাসের অলিখিত উপাদান। ছক-১ এর বিষয় দুটি প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনের আওতাভুক্ত।
ছক-১ এ মুদ্রা ও শিলালিপির উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানসমূহে অনেক রকমের মুদ্রা পাওয়া গেছে। এগুলোতে রাজার নাম, সন-তারিখ, রাজার মূর্তি প্রভৃতি খোদাই করা রয়েছে। এ থেকে রাজার শাসনকাল, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সমাজব্যবস্থা, ধর্মবিশ্বাস প্রভৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এছাড়া লিপিমালা থেকে সরকারি লিপি, যুদ্ধবিগ্রহ, ভূমিদান, রাজার আদেশ, রাজার নাম, রাজ্যজয়, রাজত্বকাল, ধর্মবিশ্বাস প্রভৃতি জানা যায়। তাই এগুলো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। আর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ ইতিহাসের অলিখিত উপাদানের অন্তর্ভুক্ত।
ইতিহাস হলো অতীতের ঘটনাবলীর বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ধারাবাহিক বিবরণ। আর যেসব তথ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিক সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব, তাকেই ইতিহাসের উপাদান বলা হয়।
বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনায় ইতিহাসের লিখিত ও অলিখিত উভয় উপাদানই গুরুত্বপূর্ণ। কেবল লিখিত উপাদান বা অলিখিত উপাদান দ্বারা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়। কেননা একটিমাত্র উপাদান কোনো বিষয় সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য-উপাত্ত দিতে পারে না। এজন্য ইতিহাসবিদরা সম্ভাব্য সমস্ত উৎস থেকে তথ্য খোঁজেন এবং সেগুলো সমন্বয় করে সঠিক ইতিহাস রচনার চেষ্টা করে থাকেন। কারণ ইতিহাসে আবেগ, অনুমান বা অতিকথনের স্থান নেই। ইতিহাসকে হতে হবে যথার্থ ও বাস্তবধর্মী। আর এক্ষেত্রে ইতিহাসের লিখিত উপাদানের সাথে অলিখিত উপাদানের সমন্বয় সাধন করা প্রয়োজন।
অলিখিত উপাদান যেমন- মুদ্রা, শিলালিপি, তৈজসপত্র, সমরাস্ত্র, ইমারত প্রভৃতির বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি যুগের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। একই সাথে ঐ সময়ের বিভিন্ন লিখিত উপাদান প্রতিটি বিষয়ের লিখিত বিবরণ প্রদানের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
উপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তাই বলা যায়, কোনো বিষয়ের সঠিক ও সম্পূর্ণ ইতিহাস জানতে হলে ইতিহাসের লিখিত ও অলিখিত উভয় উপাদানই অত্যাবশ্যকীয়।
অন্যদিকে, শিবলী ছাত্রাবস্থায় বিভিন্ন জেলার ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ করেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী ও দিনাজপুর।
আবহাওয়া এবং ভৌগোলিক পরিবেশ মানুষের জীবনপ্রণালি, স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। যেমন- পাহাড়ি এলাকা এবং সমুদ্র উপকূলবর্তী মানুষকে প্রতিকূল আবহাওয়ার সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। এজন্য তারা কর্মঠ ও সংগ্রামী হয়। অন্যদিকে, সমতল বা নদী-বিধৌত অঞ্চলের আবহাওয়া স্নিগ্ধ, মনোরম হয় বলে এসব এলাকার মানুষ শান্ত ও আরামপ্রিয় হয়। বাংলাদেশের আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ, তাই এ অঞ্চলের মানুষ কোমল ও শান্ত স্বভাবের।
'বঙ্গ' অতি প্রাচীন জনপদ। বাংলার পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে 'বঙ্গ' জনপদটি গড়ে উঠেছিল। অনুমান করা হয়, এখানে 'বং' নামে একটি জাতি বাস করতো। তাই জনপদটি 'বঙ্গ' নামে পরিচিত হয়। প্রাচীন শিলালিপিতে বঙ্গের দুইটি অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়। একটি 'বিক্রমপুর' আর অন্যটি 'নাব্য'। বর্তমানে 'নাব্য' বলে কোনো জায়গার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয়, ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ ও পটুয়াখালীর নিচু জলাভূমি এ নাব্য অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
উদ্দীপকের তুর্যের বসবাসকৃত অঞ্চলটি ফরিদপুর। উপরের আলোচনা থেকে দেখা যায় যে, ফরিদপুর অঞ্চলটি বঙ্গ জনপদে অবস্থিত। সুতরাং বলা যায়, তুর্যের বসবাসকৃত অঞ্চলটি বঙ্গ জনপদের অন্তর্ভুক্ত।
পুণ্ড্র শব্দের অর্থ আখ বা ইক্ষু। প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পুণ্ড্র। খুব সম্বত পুণ্ড্র বলে একটি জনগোষ্ঠী এ জনপদ গড়ে তুলেছিল। বর্তমান বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী ও দিনাজপুর এলাকা নিয়ে এ পুণ্ড্র জনপদটির সৃষ্টি হয়েছিল। রাজধানীর নাম ছিল পুণ্ড্রনগর। পরবর্তীকালে এর নাম হয় মহাস্থানগড়। মহাস্থানগড় প্রাচীন পুণ্ড্র নগরীর ধ্বংসাবশেষ বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনের দিক দিয়ে পুণ্ড্রই ছিল প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরসভ্যতা।
পাথরের চাকতিতে খোদাই করা বাংলাদেশের প্রাচীনতম শিলালিপি এখানে পাওয়া গেছে। করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত পুন্ড্রনগরের সাথে জল ও স্থলপথে বাংলার অন্যান্য অংশের বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং প্রাচীন যুগে জনপদটি ব্যবসায়-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত ছিল।
সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের শিবলীর ভ্রমণকৃত স্থানটি অর্থাৎ পুন্ড্র প্রাচীণ বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ জনপদ।
পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার বঙ্গ জনপদের প্রতিবেশী জনপদ হলো সমতট। গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্বতীর থেকে শুরু করে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত সমুদ্রকূলবর্তী অঞ্চলকেই বলা হতো সমতট। কেউ কেউ মনে করেন বর্তমান কুমিল্লার প্রাচীন নাম সমতট। আর এই কুমিল্লার ময়নামতিতে যে কয়েকটি প্রাচীন নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া গেছে তার মধ্যে শালবন বিহার অন্যতম।
উদ্দীপকের ১নং চিত্রটি শালবন বিহারের, যা বর্তমান কুমিল্লায় অবস্থিত। আর বর্তমান কুমিল্লা যেহেতু সমতটের অংশ ছিল। তাই বলা যায়, এই শালবন বিহারটি সমতট জনপদের অন্তর্ভুক্ত।
প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে পুণ্ড্র ছিল অন্যতম। পুণ্ড্র নামে একটি জাতি এই জনপদটি গড়ে তুলেছিল। পুড্রদের রাজধানীর নাম ছিল পুণ্ড্রনগর। পরবর্তীতে এর নাম হয় মহাস্থানগড়। মহাস্থানগড় কয়েক শতাব্দীকাল ধরে পরাক্রমশালী মৌর্য ও গুপ্তদের প্রাদেশিক রাজধানী ছিল। বর্তমান বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহী জেলা জুড়ে এ জনপদ বিস্তৃত ছিল।
সভ্যতার নিদর্শনের দিক থেকে অপরাপর জনপদ অপেক্ষা পুণ্ড্রই ছিল প্রাচীন জনপদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ। বগুড়া থেকে সাত মাইল দূরে অবস্থিত মহাস্থানগড় প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের ধ্বংসাবশেষ। পাথরের চাকতিতে খোদাই করা বাংলাদেশের প্রাচীনতম শিলালিপি এখানে পাওয়া গেছে। মহাস্থানগরের ধ্বংসাবশেষগুলোর মধ্যে বৈরাগীর ভিটা, গোবিন্দভিটা, খোদাই পাথর ভিটা, পরশুরামের প্রাসাদ, শীলাদেবীর ঘাট প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। পাহাড়পুরে অবস্থিত বৌদ্ধ সংস্কৃতির আকর্ষণীয় নিদর্শন সোমপুর বিহার পুড্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সোমপুর বিহারটি তৎকালীন বাংলার বৌদ্ধধর্মের বিখ্যাত শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয়। করতোয়া নদীর তীরে অবস্থিত পুণ্ড্রনগরের সাথে জল ও স্থলপথে বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ ছিল। প্রাচীন বাংলার এ জনপদটি ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
পুণ্ড্র জনপদের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে বলা যায়, প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে পুণ্ড্রই ছিল সবচেয়ে উন্নত জনপদ।
দৃশ্য-২ : 'খ' নামক একজন ব্যক্তি ছিলেন সুদক্ষ সেনাপতি, দূরদর্শী শাসক এবং তার সময় দ্রব্যমূল্য খুবই সস্তা ছিল। এত সস্তা ছিল যে, টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত।
উদ্দীপকে বর্ণিত 'ক' নামক একজন ব্যক্তি ক্ষমতা দখলের পর দুর্গ। নির্মাণ করেন, নৌবাহিনী' গঠন করেন এবং তিনিই প্রথম নৌবাহিনীর গোড়াপত্তন করেন। যা তুর্কি শাসক সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওজ খলজির শাসনকাল নির্দেশ করে।
বখতিয়ার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাংলার মুসলমান রাজ্যকে শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করতে তিনি সচেষ্ট হয়েছিলেন। শাসনকার্যের সুবিধার জন্য তিনি রাজধানী দেবকোট থেকে গৌড় বা লখনৌতিতে স্থানান্তর করেন। রাজধানীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার জন্য বসনকোট নামক স্থানে একটি দুর্গ নির্মাণ করা হয়। লখনৌতি নদীতীরে অবস্থিত হওয়ায় ব্যবসায় বাণিজ্যের সুবিধা ছিল। তাছাড়া ইওজ খলজি বুঝতে পেরেছিলেন যে শক্তিশালী নৌবাহিনী ছাড়া শুধু অশ্বারোহী বাহিনীর পক্ষে নদীমাতৃক বাংলায় রাজ্য সম্প্রসারণ সম্ভব হবে না। বাংলার শাসন বজায় রাখতে হলেও নৌবাহিনীর প্রয়োজন ছিল। তাই বলা যায় যে, বাংলায় মুসলমান শাসকদের মধ্যে ইওজ খলজিই নৌবাহিনীর গোড়াপত্তন করেছিলেন। রাজধানীর নিরাপত্তার জন্য এর তিন পাশে গভীর ও প্রশস্ত পরিখা নির্মাণ করা হয়। বার্ষিক বন্যার হাত থেকে লখনৌতি ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলকে রক্ষা করার জন্য তিনি বহু খাল খনন ও সেতু নির্মাণ করেন। তিনি রাস্তা নির্মাণ করে সৈন্য ও পণ্য চলাচলের সুবন্দোবস্ত করেন। এ রাজপথ নির্মাণের ফলে রাজ্য শাসন ও ব্যবসায় বাণিজ্যেরই শুধু সুবিধা হয়নি, বরং দেশের লোকের নিকট আশীর্বাদস্বরূপও ছিল। কারণ তা বার্ষিক বন্যার কবল থেকে তাদের গৃহ ও শস্যক্ষেত্র রক্ষা করত।
অতএব বলা যায়, উদ্দীপকের দৃশ্য-ক গিয়াসউদ্দিন ইওজ খলজি সময়কে নির্দেশ করে।..
স্থাপত্য শিল্পের বিকাশের জন্য শায়েস্তা খানের শাসন আমলকে মুঘল আমলের স্বর্ণযুগ বলা হয়। কারণ শায়েস্তা খানের সময়ে সাম্রাজ্যের সর্বোত্র অসংখ্য সরাইখানা, রাস্তাঘাট ও সেতু নির্মিত হয়েছিল। দেশের অর্থনীতি ও কৃষি ক্ষেত্রে তিনি অভাবিত সমৃদ্ধি আনয়ন করেছিলেন। জনকল্যাণকর শাসনকাজের জন্য শুধু বাংলায় নয়, সমগ্র ভারতবর্ষেও তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। শায়েস্তা খানের শাসনকাল বাংলার স্থাপত্য শিল্পের জন্য সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। বিচিত্র সৌধমালা, মনোরম সাজে সজ্জিত তৎকালীন ঢাকা নগরীর স্থাপত্য শিল্পের প্রতি তার গভীর অনুরাগের সাক্ষ্য বহন করে। শায়েস্তা খানের শাসনামলে নির্মাণ করা স্থাপত্য কাজের মধ্যে ছোট কাটরা, লালবাগ কেল্লা, বিবি পরির সমাধি সৌধ, হোসেনী দালান, সফি খানের মসজিদ, বুড়িগঙ্গায় মসজিদ, চকবাজার মসজিদ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। মোটকথা অন্য কোনো সুবাদার ও শাসনকর্তা ঢাকায় শায়েস্তা খানের ন্যায় নিজের স্মৃতিকে এক বেশি জ্বলত্ব রেখে যেতে পারেন নি। বস্তুত ঢাকা ছিল শায়েস্তা খানের নগরী।
তাই বলা যায়, নানা কৃতিত্বের জন্য শায়েস্তা খানের সময়কালকে বাংলায় মুঘলদের 'স্বর্ণযুগ' হিসেবে অভিহিত করা হয়।
দৃশ্যপট-২: জনাব শাহরিয়ার বিভিন্ন শর্তানুযায়ী ম্যানেজার শোভনকে একটা কোম্পানির পরিচালক হিসেবে মনোনীত করেন। পরবর্তীতে শোভনকে নামমাত্র দায়িত্ব দেওয়া হয়। অপরদিকে, শাহরিয়ার লাভকরেন অন্যান্য সকল ক্ষমতা।
উদ্দীপকে বর্ণিত ঘটনায় দেখা যায়, রিপন 'ক' নামক রাষ্ট্রের রাজক্ষমতায় আরোহণ করেই নিকট স্বজনদের ষড়যন্ত্রের শিকার হন এবং সংঘটিত যুদ্ধে অদূরদর্শিতা ও নিকটতমদের অসহযোগিতার কারণে তার পরাজয় হয়। যার সাথে পলাশীর যুদ্ধের মিল রয়েছে। ইংরেজরা এদেশে বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমতি নিয়ে ১৬১২ সালে সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। পরবর্তীতে ইংরেজ বণিকরা তাদের শক্তিসামর্থ্য বৃদ্ধি করতে থাকে এবং এতদাঞ্চলে সাম্রাজ্যবিস্তারের ফন্দি আঁটে। ১৭৪০-১৭৫৬ সাল পর্যন্ত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব ছিলেন আলীবর্দী খান। তিনি ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণে রাখলেও তার মৃত্যুর পর ইংরেজরা আবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এসময় বাংলার নবাব হিসেবে সিংহাসনে বসেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। সিংহাসনে বসার পর থেকেই তাকে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়। তার প্রথম সমস্যা ছিল পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের ষড়যন্ত্র। এদিকে ইংরেজরা নবাবের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ফলে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে নবাবের বাহিনী যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে ঠিক তখনই নবাবের সেনাপতি মীরজাফর বিশ্বাসঘাতকতা করে যুদ্ধ থামিয়ে দেয়।
মীর জাফরের ইঙ্গিতে ইংরেজরা এ সুযোগে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যার অনিবার্য পরিণতি নবাবের পরাজয়।
তাই বলা যায়, উদ্দীপকে উল্লিখিত রিপনের পরাজয়ের সাথে পলাশী যুদ্ধের মিল পাওয়া যায়।
হ্যাঁ, আমি মনে করি যে, উদ্দীপকে দৃশ্যপট-১ এর পরিণতিতেই দৃশ্যপট-২ তথা দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার সৃষ্টি।
উদ্দীপকে বর্ণিত ঘটনা-১ এর ঐতিহাসিক রূপ হলো পলাশীর যুদ্ধ এবং ঘটনা-২ এর সারমর্ম হলো বক্সারের যুদ্ধ পরাজয় পরবর্তীকালে বাংলায় প্রবর্তিত দ্বৈত শাসনব্যবস্থা। সেখানে কোম্পানি পেয়েছিল দায়িত্বহীন ক্ষমতা আর বাংলা থেকে নামেমাত্র নবাব নির্বাচন করে তাকে দিয়েছিল ক্ষমতাহীন দায়িত্ব। যার ফলে বাংলার প্রশাসন ও অর্থনীতিতে সৃষ্টি হয় এক অভূতপূর্ব জটিল অবস্থা। যার মাসুল দিতে হয়েছিল এদেশীয় সাধারণ জনগোষ্ঠীকে ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষে অংশ নিয়ে। আর এ সামগ্রিক ঘটনাটিই ছিল ১৭৫৭ সালে সংঘটিত পলাশীর যুদ্ধের ফলাফলের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
রবার্ট ক্লাইভ দেওয়ানি সনদের নামে বাংলার সম্পদ লুণ্ঠনের একচেটিয়া ক্ষমতা লাভ করে। দিল্লি কর্তৃক বিদেশি বণিক কোম্পানিকে এই অভাবিত ক্ষমতা প্রদানে সৃষ্টি হয় দ্বৈতশাসনের। অর্থাৎ কোম্পানি লাভ করে দায়িত্বহীন ক্ষমতা আর নবাব পরিণত হন ক্ষমতাহীন শাসকে। পক্ষান্তরে, নবাবের ওপর থাকে বাংলা পরিচালনার ষোল আনা দায়িত্ব কিন্তু ক্লাইভ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দিত না। ফলে সারাদেশে শুরু হয় বিশৃঙ্খলা।
অতএব উদ্দীপকে দৃশ-১ এর পলাশীর যুদ্ধের পরবর্তী ফল হিসেবে দৃশ্য-২ তথা ক্ষমতা ভাগাভাগি অর্থাৎ দ্বৈতশাসনের মিল রয়েছে।
উদ্দীপকে বর্ণিত ঘটনায় দেখা যায়, সুলতান শাকিল খান সেনাপতি জনিকে খুব বিশ্বাস করতেন। জনি ক্ষমতা লাভের আশায় সুলতানের শত্রুদের সাথে হাত মেলায়। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি হওয়া সত্ত্বেও নীরব দর্শক হিসেবে কাজ করে। ফলে সুলতান শাকিল খান পরাজিত ও নিহত হন এবং ক্ষমতাও হারান। যা পলাশীর যুদ্ধের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। ইংরেজরা এদেশে বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমতি নিয়ে ১৬১২ সালে সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। পরবর্তীতে ইংরেজ বণিকরা তাদের শক্তিসামর্থ্য বৃদ্ধি করতে থাকে এবং এতদাঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তারের ফন্দি আঁটে। এ সময় বাংলার নবাব হিসেবে সিংহাসনে বসেন নবাব সিবাজউদ্দৌলা। সিংহাসনে বসার পর থেকেই তাকে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়। তার প্রথম সমস্যা ছিল পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের ষড়যন্ত্র। এদিকে ইংরেজরা নবাবের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ফলে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে নবাবের বাহিনী যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে ঠিক তখনই নবাবের সেনাপতি মীরজাফর বিশ্বাসঘাতকতা করে যুদ্ধ থামিয়ে দেয়। মীর জাফরের ইঙ্গিতে ইংরেজরা এ সুযোগে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যার অনিবার্য পরিণতি নবাবের পরাজয়।
তাই বলা যায়, উদ্দীপকের সাথে পলাশী যুদ্ধের মিল পাওয়া যায়।
পলাশি যুদ্ধ বাংলা তথা এ উপমহাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা। ইংরেজরা শুরু থেকেই বাণিজ্য করার পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব পোষণ করতে থাকে যার পরিণতি হয় পলাশির যুদ্ধ এবং বাংলার নবাবের পরাজয়। ১৭৪০-১৭৫৬ সাল পর্যন্ত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব আলীবর্দী খান সুকৌশলে ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৭৫৬ সালে নবাবের মৃত্যুর পর তার প্রিয় দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা মাত্র ২২ বছর বয়সে বাংলার সিংহাসনে বসেন। কিন্তু সিংহাসনে বসেই তাকে নানামুখী ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করতে হয়। যার শেষ পরিণতি হয় ১৭৫৭ সালের পলাশির যুদ্ধ। নবাবের সেনাপতি মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় ইংরেজরা এ যুদ্ধে জয়লাভ করে এবং বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনের পথ সুগম হয়। এ যুদ্ধে নবাবের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। মীরজাফর বাংলার নবাব হলেও তিনি ছিলেন নামে মাত্র নবাব, প্রকৃত ক্ষমতা ছিল রবার্ট ক্লাইভের হাতে। এ যুদ্ধের ফলে ইংরেজরা বাংলায় একচেটিয়া ব্যবসায় বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে। এ যুদ্ধের পর ইংরেজ শক্তির স্বার্থে এদেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক পরিবর্তন সংঘটিত হতে থাকে। পলাশী যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী পরিণতি ছিল সমগ্র উপমহাদেশে কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠা। এভাবেই এ যুদ্ধের ফলে বাংলা তথা ভারতের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হয়।
তাই বলা যায়, পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সর্য অস্তমিত হয়।
ইতিহাসের লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ও দেশি-বিদেশি উল্লেখযোগ্য অতীত ঘটনার বিবরণ। বিশ্বের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থও জাতীয় গণগ্রন্থাগারে রক্ষিত আছে যেমন- অর্থশাস্ত্র, তবকাত ই-নাসিরী, আইন-ই-আকবরী ইত্যাদি। এছাড়া সভ্যতার বিভিন্ন প্রকৃতি সম্পর্কে বিবরণের ওপর রচিত পুস্তকও জাতীয় গণগ্রন্থাগারে রয়েছে। এসব লিখিত উপাদানের মাধ্যমে আমরা সমকালীন অনেক তথ্য পেয়ে থাকি।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ওপর লিখিত বিভিন্ন পুস্তক ও ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের বিবরণের ওপর লিখিত বিভিন্ন বইও ইতিহাসের লিখিত উপাদান।
উদ্দীপকের ছক 'ক' এ দেশীয় সাহিত্য, বিদেশিদের বিবরণী এবং প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের উল্লেখ করা হয়েছে। যা ইতিহাসের লিখিত উপাদানকে নির্দেশ করে।
ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ রূপ জানার ক্ষেত্রে লিখিত উপাদান ও অলিখিত উপাদান দুটিই খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি নথি, চিঠিপত্র ইত্যাদি থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। লিখিত উপাদানের পাশাপাশি অলিখিত উপাদান যেমন মুদ্রা, পুরনো ইমারত, অস্ত্র, দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী, গহনা, শিলালিপি, তাম্রলিপি ইত্যাদি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিচার বিশ্লেষণের ফলে ঐতিহাসিক সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। যেমন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দলিল, সরকারি নথি, চিঠিপত্র, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থ যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র-শস্ত্র, যানবাহন, আলোকচিত্র, যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন, স্থান ইত্যাদি অলিখিত উপাদানও সমান গুরুত্ব বহন করে।
সুতরাং বলা যায়, কোনো বিষয়ের সঠিক ও সম্পূর্ণ ইতিহাস জানতে হলে ইতিহাসের লিখিত ও অলিখিত উভয় উপাদানই অত্যাবশ্যকীয়।
দৃশ্যপট-২: যমুনা বহুমুখী সেতু চালু হওয়ায় বৃহত্তর রাজশাহী, বগুড়া ও রংপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। এক সময় এই অঞ্চলগুলো ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধ জনপদ।
উদ্দীপকের দৃশ্যপট-১ আমাদের বঙ্গ জনপদের ধারণা দেয়।
বঙ্গ একটি অতি প্রাচীন জনপদ। বর্তমান বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বঙ্গ জনপদ নামে একটি অঞ্চল গড়ে উঠেছিল। অনুমান করা হয়, এখানে বঙ্গ বলে একটি জাতি বাস করতো। তাই জনপদটি পরিচিত হয় বঙ্গ নামে। প্রাচীন শিলালিপিতে বঙ্গের দুইটি অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়- একটি 'বিক্রমপুর', আর অন্যটি 'নাব্য'। বর্তমানে নাব্য বলে কোনো জায়গার অস্তিত্ব নেই। ধারণা করা হয়, ফরিদপুর, বাখেরগঞ্জ ও পটুয়াখালীর নিচু জলাভূমি এ নাব্য অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রাচীন বঙ্গ জনপদ ছিল খুব শক্তিশালী অঞ্চল। 'বঙ্গ' থেকে 'বাঙালি' জাতির উৎপত্তি ঘটেছিল।
উদ্দীপকের দৃশ্যপট-১ এ বলা হয়েছে, পদ্মা সেতুর নির্মাণের ফলে
ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ, পটুয়াখালীসহ অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়েছে। পূর্বোক্ত আলোচনায় সুস্পষ্ট, এ তিনটি অঞ্চল প্রাচীন বঙ্গ জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুতরাং বলা যায়, দৃশ্যপট-১ আমাদেরকে বঙ্গ জনপদ সম্পর্কে ধারণা প্রদান করেছে।
দৃশ্যপট-২ দ্বারা প্রাচীন পুন্ড্র জনপদকে নির্দেশ করা হয়েছে। পুণ্ড্র ছিল প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ জনপদ।
পুণ্ড্র শব্দের অর্থ আখ বা ইক্ষু। প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পুণ্ড্র। খুব সম্বত: পুণ্ড্র বলে একটি জনগোষ্ঠী এ জনপদ গড়ে তুলেছিল। বর্তমান বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী ও দিনাজপুর এলাকা নিয়ে এ পুণ্ড্র জনপদটির সৃষ্টি হয়েছিল। রাজধানীর নাম ছিল পুণ্ড্রনগর। পরবর্তীকালে এর নাম হয় মহাস্থানগড়। মহাস্থানগড় প্রাচীন পুণ্ড্র নগরীর ধ্বংসাবশেষ বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনের দিক দিয়ে পুণ্ড্রই ছিল প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরসভ্যতা।
পাথরের চাকতিতে খোদাই করা বাংলাদেশের প্রাচীনতম শিলালিপি এখানে পাওয়া গেছে। করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত পুণ্ড্রনগরের সাথে জল ও স্থলপথে বাংলার অন্যান্য অংশের বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং প্রাচীন যুগে জনপদটি ব্যবসায়-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত ছিল।
উপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, প্রাচীনত্ব, সভ্যতার নিদর্শন প্রভৃতি বিবেচনায় প্রাচীন বাংলায় পুন্ড্র ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধ জনপদ।
তিনি এ নীতি প্রয়োগ করে সাতারা, ঝাঁসি, নাগপুর, সম্বলপুর, ভগৎ, উদয়পুর ও করাউলী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। স্বত্ববিলোপ নীতি অনুযায়ী দত্তক পুত্র সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারবে না। ব্রিটিশদের অনুগত মিত্র অযোধ্যার নবাবও এ আগ্রাসন থেকে রক্ষা পাননি।
উদ্দীপকটি বাংলার ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা বঙ্গভঙ্গ এবং এ সম্পর্কিত পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের প্রতিচ্ছবি।
ভারতের বড়লাট লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালের ১৬ই অকেটাবর বাংলা ভাগ করেন। এ বিভক্তি ইতিহাসে 'বঙ্গভঙ্গ' নামে পরিচিত। বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে বাংলা প্রেসিডেন্সিকে বিভক্ত করে দুটি আলাদা প্রদেশ গঠন করা হয়। পূর্ব বাংলার মুসলমান সম্প্রদায় বঙ্গভঙ্গকে সাধুবাদ জানায়। অপরদিকে অভিজাত হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়। বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়ে যায়। হিন্দু সম্প্রদায় তীব্র ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ক্রমে স্বদেশী আন্দোলনে রূপ নেয়। ব্রিটিশ সরকার আন্দোলনকারীদের দমন করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করেন।
উদ্দীপকের ছকে যথাক্রমে ১৯০৫ (লর্ড কার্জন), হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি নষ্ট এবং ১৯১১ সালে রদের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়গুলো বঙ্গভঙ্গের সাথে সম্পর্কিত। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপক দ্বারা বঙ্গভঙ্গ এবং এ সম্পর্কিত ঘটনাপ্রবাহকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
উদ্দীপকটি বাংলার ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা বঙ্গভঙ্গ এবং এ সম্পর্কিত পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের প্রতিচ্ছবি।
ভারতের বড়লাট লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালের ১৬ই অকেটাবর বাংলা ভাগ করেন। এ বিভক্তি ইতিহাসে 'বঙ্গভঙ্গ' নামে পরিচিত। বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে বাংলা প্রেসিডেন্সিকে বিভক্ত করে দুটি আলাদা প্রদেশ গঠন করা হয়। পূর্ব বাংলার মুসলমান সম্প্রদায় বঙ্গভঙ্গকে সাধুবাদ জানায়। অপরদিকে অভিজাত হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়। বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়ে যায়। হিন্দু সম্প্রদায় তীব্র ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ক্রমে স্বদেশী আন্দোলনে রূপ নেয়। ব্রিটিশ সরকার আন্দোলনকারীদের দমন করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করেন।
উদ্দীপকের ছকে যথাক্রমে ১৯০৫ (লর্ড কার্জন), হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি নষ্ট এবং ১৯১১ সালে রদের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়গুলো বঙ্গভঙ্গের সাথে সম্পর্কিত। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপক দ্বারা বঙ্গভঙ্গ এবং এ সম্পর্কিত ঘটনাপ্রবাহকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সমস্যা দূর করার জন্য বাংলা চুক্তি করা হয়।
উপমহাদেশের রাজনীতিতে হিন্দু-মুসলিম সমস্যা গভীরভাবে উপলব্ধি করে স্বরাজ দলের নেতা চিত্তরঞ্জন দাস এই চুক্তি সম্পাদন করেন। উক্ত চুক্তিতে মুসলমানদের বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করার শর্তই ছিল মূল বিষয়। এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পথ প্রশস্ত করেছিল।
উদ্দীপকে উল্লিখিত চিত্রটি ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম বা সিপাহি বিদ্রোহকে নির্দেশ করে।
পলাশি যুদ্ধের পর থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজ্যবিস্তার, একের পর এক দেশীয় রাজ্যগুলো দখল দেশীয় রাজন্যবর্গের মধ্যে ভীতি, অসন্তোষ ও তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। কোম্পানি শাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় চরম অর্থনৈতিক শোষণ বঞ্চনা। কোম্পানি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের আগেই এদেশের শিল্প ধ্বংস করেছিল এবং ভূমিরাজস্ব নীতির নামে ধ্বংস করা হয় দরিদ্র কৃষকের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড। কোম্পানি সমাজসংস্কারমূলক কার্যাবলি সম্পাদন যেমন- ইংরেজি শিক্ষা, সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ, হিন্দু বিধবাদের পুনরায় বিবাহ ইত্যাদি সমাজে গোঁড়াপন্থিরা মেনে নিতে পারেনি। হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের সিপাহিদেরকে ব্যবহারের জন্য এনফিল্ড রাইফেলের প্রচলন করা হয়, যার টোটা দাঁত দিয়ে কেটে বন্দুকে প্রবেশ করাতে হতো। সৈন্যদের মধ্যে এ গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, টোটায় গরু ও শূকরের চর্বি মিশ্রিত আছে। ফলে উভয় সম্প্রদায় ধর্মনাশের কথা ভেবে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং ১৮৫৭ সালের ২৯শে মার্চ বন্দুকের গুলি ছুড়ে বিদ্রোহের সূচনা করেন মঙ্গল পাণ্ডে নামে এক সিপাহি। শুরু হয় ব্রিটিশবিরোধী প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম।
উদ্দীপকে বাহাদুর শাহ পার্কের চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। উপরের আলোচনার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি, পার্কটি সিপাহি বিদ্রোহের শহিদদের স্মৃতি বিজড়িত। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকে উপস্থাপিত বাহাদুর শাহ পার্কের চিত্র সিপাহি বিদ্রোহের ঘটনাকে নির্দেশ করে।
"উক্ত বিদ্রোহ অর্থাৎ সিপাহি বিদ্রোহ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম।"- উক্তিটি যথার্থ।
মঙ্গল পাণ্ডে নামক একজন সিপাহির গুলি ছোড়ার মধ্য দিয়ে ১৮৫৭সালের ২৯শে মার্চ এ বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়। এ বিদ্রোহ পরবর্তীতে দেশটির স্বাধীনতা ও জাতীয়তার মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। এ বিদ্রোহে যুদ্ধরত বিদ্রোহী নেতারা প্রাণপণ লড়াই করে পরাজিত হন। অনেক বিদ্রোহীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। বিদ্রোহীরা দিল্লি দখল করে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ভারতবর্ষের সম্রাট বলে ঘোষণা করেন। এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, নানা সাহেব, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, অযোধ্যার বেগম হযরত মহল, মৌলভি আহমদ উল্লাহসহ ক্ষুব্ধ বঞ্চিত দেশীয় রাজন্যবর্গের অনেকে। এ সংগ্রামের সাথে জড়িতদের বেশিরভাগই সিপাহি যুদ্ধে শহিদ হন, বাকিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়। এ যুদ্ধ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে। ইউরোপীয় ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, এ বিদ্রোহ শুধু সিপাহিদের বিদ্রোহ ছিল। কোনো কোনো ভারতীয় ঐতিহাসিকের মতে, এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম।
উপরিউক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, এ বিদ্রোহ শুধু সিপাহি বিদ্রোহ ছিল না, এটি ছিল ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম।
উদ্দীপকের চিত্রগুলো ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাতের ঘটনাকে ইঙ্গিত বহন করে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে ঢাকায় যে গণহত্যা শুরু করে, তার প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ এদেশের ছাত্রসমাজ, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তারা অধ্যাপক ড. গোবিন্দ চন্দ্রদেব, ড. মুনীরুজ্জামানসহ শত শত ছাত্রকে হত্যা করে। বিশেষ করে ঢাকার শাখারি বাজার, তাঁতি বাজারের হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকার অবস্থা ছিল ভয়াবহ। কেবল রাজধানী ঢাকা নয়, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে নির্যাতন, গণহত্যা আর ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে পাকিস্তানি বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে তারা ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে। আড়াই লাখের অধিক নারী তাদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়। পরিকল্পিতভাবে এদেশকে মেধাশূন্য করার জন্য তারা বরণ্যে সাহিত্যিক, শিল্পী, কবি, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদেরকেও নির্মামভাবে হত্যা করে। এমনকি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী 'পোড়ামাটি নীতি' অনুযায়ী বাংলাদেশের সব সম্পদ ও প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল। যে কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দোকানপাট, ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, মসজিদ, মন্দির কোনো কিছুই তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। তাদের লক্ষ্য ছিল এ ভূখণ্ডের মানুষদের হত্যা করে কেবল ভূমির দখল নেওয়া।
আলোচনার পরিশেষে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বাংলাদেশ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যা, ধর্ষণ এবং অত্যাচারের ফলে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল, যা উদ্দীপকের চিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে।
উদ্দীপকে নির্দেশিত ২৫শে মার্চের গণহত্যার ঘটনা আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথকে সুগম করেছিল- উক্তিটি যথার্থ।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সে রাতেই ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
ফলে ২৬শে মার্চ থেকেই সর্বাত্মক প্রতিরোধ শুরু হয়ে যায়।
২৫শে মার্চ রাতে পাকবাহিনী যে ভয়াবহ তাণ্ডবলীলা শুরু করে, তা পরবর্তী ৩৬ ঘণ্টা ধরে অব্যাহত রাখে। এ বীভৎস হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় গোটা জাতি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে। এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে বাঙালি জাতি শুরু করে মুক্তির সংগ্রাম। ২৫শে মার্চের গণহত্যার সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে বিভিন্ন স্থানে কর্মরত ইপিআর, সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর যুবকরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কোনো রকমম পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই ছাত্র-জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। মার্চ মাসের বাকি সময় এবং এপ্রিলের শুরুর দিকে বিভিন্ন সরকারি অস্ত্রাগার, পুলিশ ফাঁড়ি, ট্রেজারি প্রভৃতি স্থান হতে অস্ত্র সংগ্রহ করে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এক পর্যায়ে গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। যার মাধ্যমে স্বাধীনতার যুদ্ধ সংগঠিত রূপ লাভ করে।
উপরের আলোচনা থেকে বলা যায়, ২৫শে মার্চের ঘটনার পর বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম থেমে যায়নি। বরং এ ঘটনার পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে জনগণ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ প্রতিরোধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালি অর্জন করে কাঙ্ক্ষিত বিজয়।
উদ্দীপকের চিত্রটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা মনে করিয়ে দেয়।
১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫ বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কময় একটি দিন। এদিন আনুমানিক ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭নম্বর বাড়িটি ঘেরাও করে সেনাবাহিনীর কিছু বিপদগামী সদস্য। সেখানে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। পূর্বপরিকল্পিত নীলনকশা অনুযায়ী খুনিচক্র ঝাঁপিয়ে পড়ে জাতির পিতার পরিবারের ওপর। ৮ বছরের শিশু রাসেলও রেহাই পায়নি ঘাতকদের হাত থেকে। বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতকদল। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।
উদ্দীপকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গুলিবিদ্ধ অবস্থার একটি ছবি চিত্রিত হয়েছে। পূর্বোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, চিত্রটি ১৫ই আগস্টে সংঘটিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভয়াবহ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কময় একটি অধ্যায়। যাকে বিপদগামী কিছু সেনাসদস্যের গুলিতে প্রাণ দিয়ে হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের জাতির পিতা। আজকের বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন তিনি। তার অবদান, আত্মত্যাগ এবং দেশপ্রেম চিরদিন বাঙালি জাতির মাঝে তাকে অমর করে রাখবে। বাংলাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সারা জীবনের কর্মকাণ্ড আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছে বাঙালি জাতির মুক্তির লক্ষ্যে। ১৯৪৮ ও ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে, ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের অধিকার আদায়ে, ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক আইন বিরোধী আন্দোলনে, ১৯৬৬ সালে ছয়দফা কর্মসূচি পেশ, ১৯৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নেতৃত্ব প্রদান, ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানে একচ্ছত্র ভূমিকা পালন করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানের ২৪ বছরের মধ্যে তিনি ১২ বছরই কাটিয়েছেন কারাগারে। তার বলিষ্ঠ আপসহীন নেতৃত্বের কারণেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। বাঙালি জাতির মুক্তির এই অগ্রদূতকে নির্মমভাবে হত্যা করে কিছু বঙালি সেনা সদস্য।
উপরের আলোচনা থেকে তাই বলা যায়, স্বাধীনতা অর্জনের কয়েক বছরের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায় রচনা করেছে। তাঁর হত্যাকাণ্ড বাঙালি জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলকাতা দখলের পর ইংরেজ কর্মকর্তা হলওয়েল কর্তৃক প্রচারিত একটি মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত কাহিনী বাংলার ইতিহাসে 'অন্ধকূপ হত্যা' নামে পরিচিত।
হলওয়েল প্রচার করেন যে, নবাবের নির্দেশে ১৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৪.১০ ফুট প্রস্থের একটি ছোট ঘরে ১৪৬ জন ইংরেজকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। এর ফলে প্রচণ্ড গরমে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ১২৩ জনের মৃত্যু হয়। ইংরেজদের উত্তেজিত করে যুদ্ধের উসকানি দেওয়াই ছিল এই কাল্পনিক প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য।
উদ্দীপকের চিত্র-১ এ নির্দেশিত ব্যক্তি হলেন নবাব মুর্শিদকুলী খান তিনি রাজস্ব সংস্কারের জন্য বিখ্যাত।
১৭০০ সালে বাংলার ক্ষমতায় আসেন মুর্শিদকুলি খান। তিনি ১৭২৭সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। প্রথমে তাকে বাংলার দেওয়ান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সম্রাট ফররুখ শিয়ারের রাজত্বকালে মুর্শিদকুলি খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন। রাজস্ব সংস্কার মুর্শিদকুলি খানের সর্বাধিক আলোচিত কীর্তি। তিনি ভূমি জরিপ করে রায়তদের সামর্থ্য অনুযায়ী রাজস্ব নির্ধারণ করেছিলেন। রাজস্ব আদায়কে নিশ্চিত ও নিয়মিত করার জন্য তিনি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কর্মচারীদের সাহায্যে ভূমির প্রকৃত উৎপাদিকা শক্তি ও বাণিজ্য করের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতেন। এ পদ্ধতিতে মধ্যস্থ ব্যক্তিদের দ্বারা প্রজাদের হয়রানির কোনো সুযোগ ছিল না। তার রাজস্ব সংস্কারের ব্যবস্থাকে মালজামিনি ব্যবস্থা বলা হয়। এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ে মুর্শিদকুলি খান নির্দিষ্ট ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। মুর্শিদকুলি খান দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য ব্যবসা বাণিজ্যে প্রসারের গুরুত্ব বিশেষভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। ব্যবসায়ীরা যাতে নির্দিষ্ট হারে প্রচলিত কর প্রদান করে এবং তাদের প্রতি যাতে কোনো অবিচার করা না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন।
উদ্দীপকের চিত্র-২ এ নির্দেশিত ব্যক্তি হলেন ব্রিটিশ কর্মকর্তা রবার্ট ক্লাইভ। তাঁর প্রবর্তিত অভিনব শাসন ব্যবস্থা 'দ্বৈত শাসন' সত্যিকার অর্থেই বাংলার জনগণের জন্য চরম অভিশাপ ছিল।
১৭৬৫ সালে রবার্ট ক্লাইভ দিল্লির সম্রাটের নিকট থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা লাভ করেন। এরপর তিনি যে নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেন, ইতিহাসে তা দ্বৈত শাসন নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থায় কোম্পানি লাভ করে দায়িত্বহীন ক্ষমতা আর নবাব পান ক্ষমতাহীন দায়িত্ব। এই অদ্ভুত শাসনব্যবস্থার ফলে বাংলার মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে আসে। কোম্পানির হাতে শুধু রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা থাকায় তারা জনকল্যাণের কোনো তোয়াক্কা করেনি। অন্যদিকে নবাবের কাঁধে রাজ্য পরিচালনার ভার থাকলেও অর্থ না থাকায় তিনিও ব্যর্থ হন। কোম্পানির কর্মচারীরা বিনাশুল্কে অবাধ বাণিজ্য শুরু করলে দেশীয় বণিকরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাংলার বিপুল সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার হতে থাকে।
দ্বৈত শাসনের এই চরম দায়িত্বহীনতা এবং কোম্পানির শোষণের চূড়ান্ত মাসুল দিতে হয় এদেশের সাধারণ কৃষক ও জনগণকে। শোষণের ফলে অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে এবং ১৭৭০ সালে বাংলায় 'ছিয়াত্তরের মন্বন্তর' নামক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এতে জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় ক্লাইভের এই ব্যবস্থা ছিল বাংলার জন্য এক ভয়ংকর অভিশাপ।
উদ্দীপকের 'ক' তথ্য ছকে উল্লিখিত ১০৯৮ থেকে ১১৬০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালটি প্রাচীন বাংলার সেন রাজবংশের অন্যতম শক্তি শালী শাসক রাজা বিজয় সেনের শাসনকালকে নির্দেশ করে।
রাজা বিজয় সেন ছিলেন অত্যন্ত সুনিপুণ ও রণকুশলী শাসক, যার সুদীর্ঘ রাজত্বকালেই সেন বংশের শাসন এক স্বাধীন ও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি নানাবিধ যুদ্ধ কৌশল ও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে বাংলার বিচ্ছিন্ন অঞ্চল গুলোকে একত্রিত করে একটি বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।
উদ্দীপকের 'ক' ছকে ১০৯৮-১১৬০ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালটি দেওয়া হয়েছে। পঠিত ইতিহাস অনুযায়ী, বিজয় সেন শূর বংশের রাজকন্যাকে বিয়ে করে দক্ষিণ রাঢ় অধিকার করেন এবং বর্ম রাজাকে পরাজিত করে পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলা নিজ কর্তৃত্বে আনেন। পরবর্তীতে তিনি শেষ পাল রাজা মদনপালকে পরাজিত করে উত্তর বাংলা থেকে পালদের চিরতরে বিতাড়িত করেন। এছাড়া তিনি কামরূপ, কলিঙ্গ ও মিথিলাতেও সফল আক্রমণ পরিচালনা করেন। তাঁর এই পরাক্রমশালী শাসন কার্য্যের ফলেই প্রথমবারের মতো সমগ্র বাংলা একক সেন রাজার অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।
উদ্দীপকের 'খ' তথ্য ছকে উল্লিখিত ১১৭৮-১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ। সময়কালটি সেন বংশের শেষ প্রতাপশালী শাসক রাজা লক্ষণ সেনের রাজত্বকালকে নির্দেশ করে, যার পরাজয়ের মধ্য দিয়েই বাংলায় তুর্কিদের মুসলিম শাসনের সূচনা ঘটে।
লক্ষণ সেন তাঁর রাজত্বকালের প্রথমদিকে একজন দক্ষ যোদ্ধা ও যোগ্য শাসক ছিলেন এবং গৌড়, কলিঙ্গ ও মগধ জয় করেছিলেন। কিন্তু শেষ বয়সে এসে বার্ধক্যজনিত শারীরিক দুর্বলতা এবং রাজসভার অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ষড়যন্ত্রের কারণে তাঁর কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।
উদ্দীপকের 'খ' ছকে ১১৭৮-১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালের কথা বলা। হয়েছে, যা ইতিহাস অনুযায়ী লক্ষণ সেনের রাজত্বকাল। দীর্ঘস্থায়ী। যুদ্ধবিগ্রহ ও শাসকের বার্ধক্যের সুযোগে সাম্রাজ্যে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এ সময়ে সুন্দরবন এলাকায় ডোম্মন পাল স্বাধীন রাজ্য। প্রতিষ্ঠা করে বসেন, যা মূলত সেন সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত ভাঙনেরই সুস্পষ্ট। ইঙ্গিত ছিল। এই চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে বহিরাগত শক্তি। ঠিক এমন এক নাজুক মুহূর্তে, ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি অতর্কিতে নদীয়া আক্রমণ করেন। বৃদ্ধ ও দুর্বল লক্ষণ সেন কোনো প্রকার প্রতিরোধ। গড়ে তুলতে না পেরে বিনা যুদ্ধেই নদীপথে বিক্রমপুরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। তাঁর এই পরাজয়ের ফলেই বাংলায় দীর্ঘস্থায়ী সেন শাসনের অবসান ঘটে এবং লক্ষণাবতীকে কেন্দ্র করে তুর্কিদের মাধ্যমে মুসলিম শাসনের শক্ত ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
তাই প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ যথার্থ।
দৃশ্য-২: মিম ময়মনসিংহের একটি জমিদারবাড়ি পরিদর্শন করতে গিয়ে সেখানে বিভিন্ন ধরনের প্রাচীন আসবাবপত্র ও মুদ্রা দেখতে পায় এবং সেগুলো দেখে খুব খুশি হয়।
দৃশ্য-১ এ ফারহানার দেখা উপাদান গুলো ইতিহাসের লিখিত উপাদান।
উদ্দীপকের ফারহানা তার মামার সাথে একটি প্রাচীন দ্রব্যাদির সংগ্রহ শালায় গিয়ে চিঠিপত্র, দলিল ও বই ইত্যাদি দেখে খুব আনন্দিত হয়েছিল। যা ইতিহাসের লিখিত উপাদানকে নির্দেশ করে। ইতিহাসকে জানা ও ঐতিহাসিক সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমাদেরকে যেসব - তথ্যপ্রমাণের ওপর নির্ভর করতে হয়, তার মধ্যে লিখিত উপাদান অন্যতম। লিখিত উপাদানের মধ্যে আছে সাহিত্য গ্রন্থ, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। দেশি-বিদেশি সাহিত্যকর্মের মধ্যে আছে কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র', কলহনের 'রাজতরঙ্গিণী', মিনহাজ-উস-সিরাজের 'তবকাত-ই-নাসিরী, আবুল ফজলের 'আইন-ই-আকবরী' ইত্যাদি। বিদেশি পর্যটকদের বিবরণের মধ্যে মেগাস্থিনিসের 'ইন্ডিকা, ফা-হিয়েনের 'ফো-কুয়ো-কি', হিউয়েন সাং এর 'সি-ইউ-কি' ইত্যাদি। জীবনী গ্রন্থের মধ্যে আছে সন্ধ্যাকর নন্দীর 'রামচরিত'। এছাড়া প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ রামায়ণ, মহাভারত, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, সন্ধি চুক্তি ইত্যাদিও লিখিত উপাদানের অন্তর্গত।
অতএব, উদ্দীপকে দৃশ্য-১ এ ফারহানার দেখা উপাদান গুলো ইতিহাসের লিখিত উপাদানকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
হ্যাঁ, আমি মনে করি, দৃশ্য-২-এ মিমের দেখা উপাদান গুলো হলো ইতিহাসের, অলিখিত উপাদান। এটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উদ্দীপকের দৃশ্য-২-এ ময়মনসিংহের জমিদার বাড়িতে গিয়ে মিমের দেখা প্রাচীন আসবাবপত্র ইতিহাসের অলিখিত তথা প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান। অলিখিত উপাদান পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। যেসব বস্তু বা উপাদান থেকে আমরা বিশেষ সময়, স্থান বা ব্যক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক তথ্য পাই সেগুলোই ইতিহাসের অলিখিত উপাদান। ইতিহাসের অলিখিত উপাদান থেকে সরকারি লিপি, যুদ্ধবিগ্রহ, ভূমিদান, রাজার নাম, মুদ্রা, রাজার সময়কাল, ধর্ম, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান, প্রাচীন সমাধি, স্তম্ভ, দেবদেবীর মূর্তি প্রভৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এগুলো থেকে সভ্যতার উৎকর্ষ যেমন বোঝা যায়, তেমনি এতে নাগরিক জ্ঞানের সৌন্দর্যভাব ও সাংস্কৃতিক মনোভাবও ফুটে ওঠে। এসমস্ত অলিখিত উপাদান বা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বিশ্লেষণের ফলে সে সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। লিপিমালা থেকে যুদ্ধবিগ্রহ, ভূমিদান, রাজার নাম, রাজ্যজয়, রাজত্বকাল, ধর্মবিশ্বাস প্রভৃতি জানা যায়। আর মুদ্রা থেকে রাজার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সমাজ ব্যবস্থা ও ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে জানা যায়।
তাই বলা যায়, ইতিহাসের অলিখিত উপাদান পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
চিত্র-১-এর ব্যক্তি হলেন মাস্টার দা সূর্য সেন। তিনি বাংলার সশস্ত্র আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন। বাংলার ইতিহাসে এ আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম।
স্বদেশি আন্দোলনের ব্যর্থতা বাংলায় স্বাধীনতা কামী যুবসমাজকে সশস্ত্র বিপ্লবের দিকে উদ্বুদ্ধ করে। বিভিন্ন অঞ্চল বোমা হামলা, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী হত্যা, গেরিলা পদ্ধতিতে খণ্ডযুদ্ধ ইত্যাদি ঘটনার মধ্য, দিয়ে সশস্ত্র আন্দোলন প্রকাশ্যে আসতে থাকে। এ আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়ে ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন মাস্টারদা সূর্যসেন। বাংলার সশস্ত্র বিপ্লীরা যেমন মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দারসহ অনেক বিপ্লবী ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশদের বিতাড়নের যে সংগ্রাম শুরু করেন তা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে। তাদের আত্মত্যাগ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে এবং তরুণ সমাজের মধ্যে স্বাধীনতার স্পৃহা বাড়িয়ে তোলে। ১৯১১ সাল থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত এ সংগ্রাম জোরদার হলেও এর আগেই সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। ১৯০৮ সালে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য ক্ষুদিরামের বোমা হামলার মধ্য দিয়ে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন আত্মপ্রকাশ করে। এই আন্দোলন মূলত শেষ হয় ১৯৩০ সালে। প্রথম পর্যায়ের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের মধ্যে ছিলেন অরবিন্দ্র ঘোষ, বারীন্দ্র ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ। পুলিন বিহারী দাস ছিলেন ঢাকার অনুশীলন সমিতির প্রধান সংগঠক। এরা বোমা তৈরি থেকে শুরু করে সব ধরনের অস্ত্র সংগ্রহসহ বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সশস্ত্র আক্রমণ, গুপ্ত হত্যা ইত্যাদি কর্ম সূচির মাধ্যমে এরা সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখেন।
অতএব বলা যায়, সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন ভারতবাসীকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়েছিল।
চিত্র-২ এ চিহ্নিত ব্যক্তি হলেন শেরে বাংলা এ. কে ফজলুল হক।
যিনি অখণ্ড বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি অখণ্ড বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। তার সমগ্র জীবনের অধিকাংশ সময় বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ব্যয় করেন। শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক ১৯২৪ সালে প্রথমবারের মতো বাংলার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯২৯ সালে প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচনের পর 'নিখিল বঙ্গপ্রজা সমিতি' নামে এটি দল গঠন করেন। এ সমিতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলার কৃষকের অবস্থার উন্নতি সাধন করা। ফলে কৃষক আন্দোলন ও রাজনীতিতে নতুন ধারা প্রবর্তিত হয়। ১৯৩৫ সালে এ. কে ফজলুল হক নিখিল বঙ্গপ্রজা সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তী বছর দলের নাম পরিবর্তন করে 'কৃষক-প্রজা পার্টি' নামকরণ করা হয়। এটি ছিল সম্পূর্ণ পৃথক এবং প্রদেশ পর্যায়ে গঠিত বাংলার রাজনৈতিক সংগঠন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে তার দলের বিপরীতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল 'মুসলিম লীগ'। নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে না পারলেও ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন।
তার উল্লিখিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বাংলার রাজনীতি নিয়ে পৃথক চিন্তাভাবনা ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল গঠন ইত্যাদি বিবেচনায় ঐতিহাসিকগণ তাকে অখণ্ড বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে অভিহিত করেন।
দৃশ্য-২: জনাব করিম চেয়ারম্যান জনগণের কল্যাণে ইউনিয়নের উন্নতিকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের মতামত অনুসারে কাজ করেন। এজন্য প্রভাবশালীদের সাথে তিনি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন।
উদ্দীপকের দৃশ্য-১ এ জনাব রহিম তার নানার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব পান। এজন্য তার নিকটতম আত্মীয়রা অসন্তুষ্ট হন। প্রতিষ্ঠানের কর্মচারিদের একটি অংশও গোপনে বিরোধিতা করে। উদ্দীপকের এ ঘটনাটি পলাশীর যুদ্ধের প্রাক্কালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে তার আত্মীয়স্বজন ও কর্মচারীদের ষড়যন্ত্রের সংকটকে মনে করিয়ে দেয়। ১৭৫৬ সালে আলীবর্দী খানের মৃত্যু হলে তাঁর দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা মাত্র ২২ বছর বয়সে নবাবের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। সিংহাসনে বসার পর থেকে তাকে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়। তার প্রথম সমস্যা ছিল পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের ষড়যন্ত্র। বড় খালা ঘসেটি বেগম তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। এ ষড়যন্ত্রে যোগ দেন রাজা রাজবল্লভ। পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা সিরাজের খালাতো ভাই শওকত জঙ্গ। এর সঙ্গে জড়িত হয় দেশি-বিদেশি বণিক শ্রেণি, নবাবের দরবারের প্রভাবশালী রাজন্যবর্গ ও অভিজাত শ্রেণি, নবাবের সেনাপতি মীর জাফরসহ আরো অনেকে। এসব ষড়যন্ত্রকারীরা পলাশী যুদ্ধের পটভূমি তৈরি করতে থাকে। এরই ফলশ্রুতিতে ১৭৫৭সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে নবাব পরাজয় বরণ করেন এবং বাংলার শাসনভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যায়।
অতএব বলা যায়, উদ্দীপকের দৃশ্য-১ এর ঘটনা নবাব সিরাউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়।
উদ্দীপকে দৃশ্য-২ এ দেখা যায়, জনাব করিম চেয়ারম্যান জনগণের কল্যাণে ইউনিয়নের উন্নতিকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের মতামত অনুসারে কাজ করেন। এজন্য প্রভাবশালীদের সাথে তিনি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। উদ্দীপকের করিম সাহেবের সাথে মীর কাশিমের মিল রয়েছে। মীর
কাশিমের স্বাধীনচেতা মনোভাব বক্সারের যুদ্ধ অনিবার্য করে তোলে। কেননা ইংরেজ কোম্পানি তার মনোভাব মানতে পারেনি। ইংরেজরা মীরজাফরকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে মীর কাশিমকে সিংহাসনে বসায়। মীর কাশিম ছিলেন সুদক্ষ শাসক এবং স্বাধীনচেতা। তিনি প্রজাদের কল্যাণের প্রতি সচেতন ছিলেন। ইংরেজদের সঙ্গে সম্মানজনক উপায়ে বাংলার স্বার্থ রক্ষা করার জন্য মীর কাশিম বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যা ইংরেজদের বিরুদ্ধে যায়। তাছাড়া মীর কাশিম একজন স্বাধীন নবাব হিসেবে টিকে থাকতে চেয়েছিলেন। এ কারণে বক্সারের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মীর কাশিম প্রথমে ইংরেজদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং প্রশাসনকে প্রভাবমুক্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে স্থানান্তর করেন। নিরাপত্তার জন্য দুর্গ নির্মাণ ও রাজধানীর চারদিকে পরিখা খনন করেন। ইংরেজদের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করা এবং সৈনিকদের ইউরোপীয় সামরিক পদ্ধতি শিক্ষাদানের জন্য দুইজন ইউরোপীয় সৈনিককে প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দান করেন।
অতএব বলা যায়, উদ্দীপকের করিম চেয়ারম্যানের মতো স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণে মীর কাসিমের সাথে বক্সারের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তিনি যদি ইংরেজদের আনুগত্য মেনে নিতেন তাহলে বক্সার যুদ্ধ হতো না।
দৃশ্য-২: নারীদের শিক্ষিত করে তুলতে ফাইমিনা বানু একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সবাইকে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে তিনি অনেক বই ও প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।
ইতিহাসে জনহিতকর কার্য সম্পাদনের জন্য মহসীন ফান্ড গঠন করা হয়।
হাজী মুহম্মদ মহসীন মৃত্যুর ছয় বছর পূর্বে ১৮০৬ সালে মহসীন ফান্ড গঠন করে জনহিতকর কার্যে সম্পত্তি দান করেন। মহসীন ফান্ডের অর্থে ১৮৩৬ সালে হুগলি মহসীন ফান্ড, হুগলি দাতব্য চিকিৎসালয় এবং ১৮৪৮ সালে হুগলিতে ইমামবাড়া প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া হুগলি, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীতে মাদ্রাসা ও ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠা করা হয়। মহসীন ফান্ডের বৃদ্ধির অর্থে হাজার হাজার মুসলমান তরুণ উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়।
দৃশ্য-১ এর ব্যক্তির সাথে আমার পাঠ্যবইয়ের ঈশ্বরচন্দ্র 'বিদ্যাসাগরের মিল রয়েছে।
উদ্দীপকের দৃশ্য-১ এ উনিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলায় 'ক' নামক এমন একজন ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে যিনি গরিব হলেও তার প্রজ্ঞা, তেজস্বিতা, মমত্ববোধ, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। যা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নির্দেশ করে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একজন সফল সমাজ-সংস্কারক হিসেবে পরিচিতি লাভকরেন। দেশে প্রচলিত নানা ধরনের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়ান। তিনি কন্যা শিশু হত্যা, বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হন। তিনি হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহের পক্ষে কঠোর অবস্থান নেন। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টার কারণে ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়। শিক্ষা বিস্তারে তিনি অসাধারণ কৃতিত্ব স্থাপন করেন। সংস্কৃত শিক্ষার সংস্কার, বাংলা শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন ও নারী শিক্ষা প্রসারে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি গ্রামে-গঞ্জে ২০টি মডেল স্কুল, ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এছাড়াও তিনি মেট্টোপলিটন ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে 'বিদ্যাসাগর কলেজ' নামে পরিচিত। বিদ্যাসাগর দান-দাক্ষিণ্যে বিখ্যাত ছিলেন। তিনি যথেষ্ট সচ্ছল না হলেও তার বাসায় বহু অনাথ ছাত্র লেখাপড়া করত। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কবি নবীনচন্দ্র সেন বিদ্যাসাগরের অর্থে লেখাপড়া করেছেন। এ কারণে তাকে দয়ার সাগরও বলা হতো।
তাই বলা যায়, উদ্দীপকের দৃশ্য-১ এর 'ক' নামক সংস্কারকের কর্মকাণ্ডের সাথে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কর্মকাণ্ডের সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়।
দৃশ্য-২-এর ফাইমিনা বানুর সাথে আমার পাঠ্যবইয়ের বেগম রোকেয়ার মিল রয়েছে। নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে তার অবদান অনস্বীকার্য।
উদ্দীপকের দৃশ্য-২ এ নারীদের শিক্ষিত করে তুলতে ফাইমিনা বানু একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সবাইকে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে তিনি অনেক বই ও প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। যা বেগম রোকেয়ার কর্মকাণ্ডের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বেগম রোকেয়া সমাজের অবহেলিত নারীদের পক্ষে তখনই কলম ধরেছিলেন যখন নারীরা শিক্ষা অর্জনের অধিকার পেত না, তাদেরকে পর্দার অন্তরালে থাকতে হতো, পুরুষরা ছিল পরিবারের কর্তা আর নারীদেরকে পুরুষের সমকক্ষ ভাবা হতো না। বেগম রোকেয়া তার 'মতিচুর' গ্রন্থে নারী পুরুষের সমকক্ষতার যুক্তি দিয়ে নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তার প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাসের মধ্য দিয়ে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গ সমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। তার স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি স্বামীর নামে ভাগলপুরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৯১১ সালে তিনি কোলকাতায় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল উর্দু প্রাইমারি স্কুল স্থাপন করেন। ১৯৩১ সালে এটি উচ্চ ইংরেজি গার্লস স্কুলে উন্নীত হয়। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯১৬ সালে কোলকাতায় আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকের ফাইমিনা বানুর সাথে বেগম রোকেয়ার কাজের মিল রয়েছে।
ছক-১ সিপাহি আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট।
সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কারণে উপমহাদেশে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ তথা মহাবিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল সিপাহি বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে।
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম যা পলাশী যুদ্ধের প্রায় একশত বছর পর সিপাহিদের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল। এ বিদ্রোহ জনগণকে সচেতন করে তোলে। ব্রিটিশদের সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি ছাড়াও বৈষম্যমূলক নীতিই মহাবিদ্রোহের সূচনা করে। রাজ্যবিস্তারের লক্ষ্যে স্বত্ববিলোপ নীতি প্রয়োগ করে ব্রিটিশরা একের পর এক রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করতে থাকে। কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক শোষণবঞ্চনা শুরু হয়। জনগণ অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। সামরিক বাহিনীতে ইংরেজ ও ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যকার বৈষম্য মহাবিদ্রোহের অন্যতম কারণ। ইংরেজ সৈন্য ও ভারতীয় সিপাহিদের মধ্যে পদবি এবং বেতন-ভাতার মধ্যে বিরাট বৈষম্য ছিল। ভারতীয়দের সুযোগ সুবিধাও কম ছিল। তাছাড়া পদোন্নতির সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত ছিল। তার ওপর ব্রিটিশ অফিসারদের পক্ষপাতিত্ব, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ সিপাহিদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এছাড়া ভারতীয় হিন্দু সৈনিকদের সমুদ্র পাড়ি দিয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য করেছিল ইংরেজরা। আর ভারতীয় হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের সৈন্যদের জন্য গরু ও শূকরের চর্বিমিশ্রিত 'এনফিল্ড' রাইফেলের প্রচলন করা হলে ধর্মনাশ হওয়ার কথা ভেবে ভারতীয় সেনারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। যেটি ইতিহাসে সিপাহি বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহ নামে পরিচিত।
"ছক-২ এ উল্লিখিত বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে।"- উক্তিটি যথার্থ।
মাস্টারদা সূর্য সেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অম্বিকা চক্রবর্তী, অনুরূপ সেন, নগেন সেনের সহায়তায় একটি বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলেন। তাঁর সংগঠন এবং তিনি নিজে একের পর এক সশস্ত্র কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বারবার গ্রেফতার হলেও প্রমাণের অভাবে মুক্তি পেয়ে যান। চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করার জন্য গঠন করেন চট্টগ্রাম বিপ্লবী বাহিনী। পরে এই আত্মঘাতী বাহিনীর নাম হয় 'চিটাগাং রিপাবলিকান আর্মি'। এই বাহিনী একের পর এক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সরকারি অস্ত্রগার লুণ্ঠন করে। 'স্বাধীন চিটাগাং সরকার'-এর ঘোষণা দেওয়া হয় এবং একই সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এই যুদ্ধ ছিল অসম শক্তির যুদ্ধ। সূর্য সেনের বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকার বিশাল বাহিনী নিয়োগ করে। চূড়ান্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয় জালালাবাদ পাহাড়ে। গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেলে বিপ্লবীরা পিছু হটতে বাধ্য হন। অনেক তরুণ বিপ্লবী এই খণ্ডযুদ্ধ এবং অন্যান্য অভিযানে নিহত হন। বিপ্লবীরা গ্রামের কৃষকদের বাড়িতে বাড়িতে আশ্রয় নেন। ১৯৩৩ সালে সূর্য সেন গ্রেফতার হন। ১৯৩৪ সালে সংক্ষিপ্ত ট্রাইব্যুনালের বিচারে তাঁকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। চরম নির্যাতনের পর ১২ই জানুয়ারি তাঁকে ফাঁসি দিয়ে তাঁর মৃতদেহ বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের একজন দুঃসাহসী বিপ্লবী ছিলেন চট্টগ্রামের মাস্টারদা, তার আসল নাম সূর্য সেন। চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করার জন্য তিনি গঠন করেন চট্টগ্রাম বিপ্লবী বাহিনী। সূর্য সেনের এই বিপ্লবী বাহিনীতে নারী যোদ্ধাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।
তিনি বিপ্লবী কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং সূর্য সেনের দলের সঙ্গে যুক্ত হন। সাহসী নারী প্রীতিলতাকে চট্টগ্রামের 'পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব' আক্রমণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সফল অভিযান শেষে তিনি তার সঙ্গী বিপ্লবীদের নিরাপদে স্থান ত্যাগ করতে সহায়তা করেন। কিন্তু ধরা পড়ার আগে বিষপানে তিনি আত্মহত্যা করেন।
সুতরাং বলা যায়, ছক ২ এর মাস্টারদা সূর্যসেন ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মত্যাগ ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে।
উদ্দীপকে বর্ণিত ঘটনায় দেখা যায়, সম্পদে পরিপূর্ণ অঞ্চল সুবর্ণপুরের উপর লোলুপদৃষ্টি পড়ে বহিরাগত শাসক জন এর। সুবর্ণপুরের শাসক বোরহান জনকে প্রতিরোধ করার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। জন কৌশলে বোরহানের প্রধান সেনাপতি, নিকটাত্মীয়দের সাথে যুক্ত হয়ে ষড়যন্ত্র করে বোরহানকে হারান এবং সুবর্ণপুরের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন।
অনুরূপভাবে, ইংরেজরা এদেশে বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমতি নিয়ে ১৬১২ সালে সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। পরবর্তীতে ইংরেজ বণিকরা তাদের শক্তিসামর্থ্য বৃদ্ধি করতে থাকে এবং এতদাঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তারের ফন্দি আঁটে। এসময় বাংলার নবাব হিসেবে সিংহাসনে বসেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। সিংহাসনে বসার পর থেকেই তাকে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়। তার প্রথম সমস্যা ছিল পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের ষড়যন্ত্র। এদিকে ইংরেজরা নবাবের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ফলে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশির আম্রকাননে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে নবাবের বাহিনী যখন বিজয়ের - দ্বারপ্রান্তে ঠিক তখনই নবাবের সেনাপতি মীরজাফর বিশ্বাসঘাতকতা করে যুদ্ধ থামিয়ে দেয়। মীর জাফরের ইঙ্গিতে ইংরেজরা এ সুযোগে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যার অনিবার্য পরিণতি নবাবের পরাজয়।
তাই বলা যায়, উদ্দীপকে উল্লিখিত যুদ্ধের মাধ্যমে পলাশি যুদ্ধের চিত্র ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপকের মিস্টার ক্লার্কের সাথে লর্ড কর্নওয়ালিসের মিল রয়েছে। লর্ড কর্নওয়ালিস জমিদার ছিলেন। তিনি ইংল্যান্ডের মতো এদেশেও একটি জমিদার শ্রেণি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপ আর উপমহাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামো ও তার বিকাশের ধরন এক ছিল না। ফলে বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া এ ব্যবস্থায় সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই অধিক পরিলক্ষিত হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে কৃষকরা সরাসরি জমিদার কর্তৃক শোষিত হতে থাকে। আবার এ জমিদার শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে গ্রামীণ সমাজে একটি শিক্ষিত শ্রেণি গড়ে উঠেছিল, যারা পরবর্তী সময়ে দেশ-জাতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে ব্রিটিশ কর্তৃক সৃষ্ট জমিদার শ্রেণি যারা প্রথমদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শক্ত ভিত ছিল, তাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ব্রিটিশরাজ উৎখাতের জন্য স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
তাই বলা যায়, ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলার আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল।
অতীতের সত্যনিষ্ঠ বর্ণনা মানুষের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। আর এ বিবরণ যদি হয় নিজ দেশ-জাতির সফল সংগ্রাম ও গৌরবময় ঐতিহ্যের, তাহলে তা মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। একই সঙ্গে আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে। সে ক্ষেত্রে জাতীয়তাবোধ, জাতীয় সংহতি সুদৃঢ়করণে ইতিহাস পাঠের বিকল্প নেই।
উদ্দীপকের চিত্র-১ এ ইতিহাসের লিখিত উপাদান প্রদর্শিত হয়েছে।
ইতিহাসের উপাদানকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা: লিখিত উপাদান ও অলিখিত উপাদান। ইতিহাস রচনার লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সাহিত্যকর্ম যেমন- বেদ, কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র', কলহনের 'রাজতরঙ্গিনী' মিনহাজ-উস-সিরাজের 'তবকাত-ই-নাসিরী ইত্যাদি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ লিখিত উপাদান হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ সব সময়ই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ লিখিত উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। যেমন- পঞ্চম থেকে সপ্তম শতকে বাংলায় আগত বিখ্যাত পরিব্রাজক ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাং, ইৎসিং ও ইবনে বতুতার বর্ণনা। এসব বর্ণনা থেকে তৎকালীন সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা যায়।
উদ্দীপকের চিত্র-১ এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের "কারাগারের রোজনামচা” বইয়ের ছবি তুলে ধরা হয়েছে। যা ইতিহাসের লিখিত উপাদানকে নির্দেশ করে। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের চিত্র-১ এ ইতিহাসের লিখিত উপাদান প্রদর্শিত হয়েছে।
চিত্র-১ এ ইতিহাসের লিখিত উপাদান এবং চিত্র-২ এ ইতিহাসের অলিখিত উপাদানকে নির্দেশ করে। এ দুই উপাদানের সমন্বয়ে ইতিহাস পূর্ণতা পায়।
ইতিহাস রচনায় লিখিত ও অলিখিত উভয় উপাদানই তাৎপর্যপূর্ণ। শুধু লিখিত উপাদান বা অলিখিত উপাদান দ্বারা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়। কেননা একটিমাত্র উপাদান ইতিহাস সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য-উপাত্ত দিতে পারে না। একজন ঐতিহাসিকের দায়িত্ব হলো সমস্ত উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সমন্বয়ে সঠিক ইতিহাস রচনা করা। যা হতে হবে যথার্থ ও বাস্তবধর্মী। আর এক্ষেত্রে ইতিহাসের লিখিত উপাদানের সাথে অলিখিত উপাদানের সমন্বয় অতি আবশ্যক।
অলিখিত উপাদান যেমন- মুদ্রা, শিলালিপি, স্তম্ভলিপি, তাম্রলিপি, ইমারত, সমরাস্ত্র প্রভৃতির বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে তৎকালীন সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। অপরদিকে লিখিত উপাদানগুলোতে কোনো বিষয় সম্পর্কে সমকালীন বা পরবর্তী সময়ের ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক, পর্যটকদের লিখিত বিবরণ পাওয়া যায়। এসব লিখিত বিবরণ ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনার জন্য লিখিত ও অলিখিত উভয় ধরনের উপাদানের প্রয়োজন।
অতএব বলা যায়, চিত্র-১ ও চিত্র-২ এ প্রদর্শিত উপাদানের সমন্বয়ে ইতিহাস পূর্ণতা পায়।
ইতিহাসের লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ও দেশি-বিদেশি উল্লেখযোগ্য অতীত ঘটনার বিবরণ। বিশ্বের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থও জাতীয় গণগ্রন্থাগারে রক্ষিত আছে যেমন- অর্থশাস্ত্র, তবকাত ই-নাসিরী, আইন-ই-আকবরী ইত্যাদি। এছাড়া সভ্যতার বিভিন্ন প্রকৃতি সম্পর্কে বিবরণের ওপর রচিত পুস্তকও জাতীয় গণগ্রন্থাগারে রয়েছে। এসব লিখিত উপাদানের মাধ্যমে আমরা সমকালীন অনেক তথ্য পেয়ে থাকি।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ওপর লিখিত বিভিন্ন পুস্তক ও ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের বিবরণের ওপর লিখিত বিভিন্ন বইও ইতিহাসের লিখিত উপাদান।
উদ্দীপকের ছক 'ক' এ দেশীয় সাহিত্য, বিদেশিদের বিবরণী এবং প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের উল্লেখ করা হয়েছে। যা ইতিহাসের লিখিত উপাদানকে নির্দেশ করে।
ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ রূপ জানার ক্ষেত্রে লিখিত উপাদান ও অলিখিত উপাদান দুটিই খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি নথি, চিঠিপত্র ইত্যাদি থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। লিখিত উপাদানের পাশাপাশি অলিখিত উপাদান যেমন মুদ্রা, পুরনো ইমারত, অস্ত্র, দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী, গহনা, শিলালিপি, তাম্রলিপি ইত্যাদি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিচার বিশ্লেষণের ফলে ঐতিহাসিক সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। যেমন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দলিল, সরকারি নথি, চিঠিপত্র, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থ যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র-শস্ত্র, যানবাহন, আলোকচিত্র, যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন, স্থান ইত্যাদি অলিখিত উপাদানও সমান গুরুত্ব বহন করে।
সুতরাং বলা যায়, কোনো বিষয়ের সঠিক ও সম্পূর্ণ ইতিহাস জানতে হলে ইতিহাসের লিখিত ও অলিখিত উভয় উপাদানই অত্যাবশ্যকীয়।
উদ্দীপকের চিত্রগুলো ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাতের ঘটনাকে ইঙ্গিত বহন করে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে ঢাকায় যে গণহত্যা শুরু করে, তার প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ এদেশের ছাত্রসমাজ, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। তারা অধ্যাপক ড. গোবিন্দ চন্দ্রদেব, ড. মুনীরুজ্জামানসহ শত শত ছাত্রকে হত্যা করে। বিশেষ করে ঢাকার শাখারি বাজার, তাঁতি বাজারের হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকার অবস্থা ছিল ভয়াবহ। কেবল রাজধানী ঢাকা নয়, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে নির্যাতন, গণহত্যা আর ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে পাকিস্তানি বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে তারা ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে। আড়াই লাখের অধিক নারী তাদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়। পরিকল্পিতভাবে এদেশকে মেধাশূন্য করার জন্য তারা বরণ্যে সাহিত্যিক, শিল্পী, কবি, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক প্রকৌশলীদেরকেও নির্মামভাবে হত্যা করে। এমনকি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী 'পোড়ামাটি নীতি' অনুযায়ী বাংলাদেশের সব সম্পদ ও প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল। যে কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দোকানপাট, ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, মসজিদ, মন্দির কোনো কিছুই তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। তাদের লক্ষ্য ছিল এ ভূখণ্ডের মানুষদের হত্যা করে কেবল ভূমির দখল নেওয়া।
আলোচনার পরিশেষে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বাংলাদেশ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যা, ধর্ষণ এবং অত্যাচারের ফলে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল, যা উদ্দীপকের চিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সে রাতেই ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
ফলে ২৬শে মার্চ থেকেই সর্বাত্মক প্রতিরোধ শুরু হয়ে যায়।
২৫শে মার্চ রাতে পাকবাহিনী যে ভয়াবহ তাণ্ডবলীলা শুরু করে, তা পরবর্তী ৩৬ ঘণ্টা ধরে অব্যাহত রাখে। এ বীভৎস হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় গোটা জাতি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে। এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে বাঙালি জাতি শুরু করে মুক্তির সংগ্রাম। ২৫শে মার্চের গণহত্যার সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে বিভিন্ন স্থানে কর্মরত ইপিআর, সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর যুবকরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কোনো রকমম পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই ছাত্র-জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। মার্চ মাসের বাকি সময় এবং এপ্রিলের শুরুর দিকে বিভিন্ন সরকারি অস্ত্রাগার, পুলিশ ফাঁড়ি, ট্রেজারি প্রভৃতি স্থান হতে অস্ত্র সংগ্রহ করে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এক পর্যায়ে গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। যার মাধ্যমে স্বাধীনতার যুদ্ধ সংগঠিত রূপ লাভ করে।
উপরের আলোচনা থেকে বলা যায়, ২৫শে মার্চের ঘটনার পর বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম থেমে যায়নি। বরং এ ঘটনার পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে জনগণ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ প্রতিরোধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালি অর্জন করে কাঙ্ক্ষিত বিজয়।
বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সমস্যা দূর করার জন্য বাংলা চুক্তি করা হয়। উপমহাদেশের রাজনীতিতে হিন্দু-মুসলিম সমস্যা গভীরভাবে উপলব্ধি করে স্বরাজ দলের নেতা চিত্তরঞ্জন দাস এই চুক্তি সম্পাদন করেন। উক্ত চুক্তিতে মুসলমানদের বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করার শর্তই ছিল মূল বিষয়। এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পথ প্রশস্ত করেছিল।
ব্রিটিশ সরকারের অঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর বিপ্লবী তৎপরতার মাধ্যমে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তাকেই স্বাদেশী আন্দোলন বলা হয়। স্বদেশী আন্দোলনের মুল বিষয় ছিল বিলেতি পণ্য বর্জন করে দেশীয় পণ্য ব্যবহার করা। রাবেয়ার মধ্যেও দেশীয় পণ্যের প্রতি অধিক আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে।
রাবেয়া তার বিয়ে উপলক্ষ্যে কেনাকাটা করতে গিয়ে সব দেশীয় পণ্য কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করে। তার এরূপ অনুভূতি স্বদেশী আন্দোলনের মূল ধারণার সাথে মিলে যায়। স্বদেশী আন্দোলনের মূল কর্মসূচি ছিল দুটি- বয়কট ও স্বদেশী। ক্রমে ক্রমে বয়কট শুধু বিলেতি পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বিলেতি শিক্ষা বর্জনও কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। বিলেতি শিক্ষা বর্জনের মতো পণ্য বর্জনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। স্থানে স্থানে সমিতির মাধ্যমে বিলেতি পণ্য বর্জন এবং দেশীয় পণ্য ব্যবহারের শপথ নেওয়া হয়। কংগ্রেস নেতারা গ্রামে-গঞ্জে-শহরে প্রকাশ্য সভায় বিলেতি পণ্য পুড়িয়ে ফেলা এবং দেশীয় পণ্য ব্যবহারের জন্য জনগণকে উৎসাহিত করতে থাকেন। ফলে বিলেতি পণ্যের চাহিদা কমে যেতে থাকে। একই সঙ্গে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে এ সময়ে দেশি তাঁতবস্ত্র, সাবান, লবণ, চিনি ও চামড়াজাত দ্রব্য তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে।
সুতরাং বলা যায়, রাবেয়া স্বদেশী আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়েছিল।
উদ্দীপকের তপুর মানসিকতায় বিদেশি দ্রব্যের প্রতি আসক্তি ফুটে উঠেছে। এ ধরনের মানসিকতা আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে অন্তরায় বলে আমি মনে করি।
বিদেশি পণ্য ব্যবহার করলে দেশীয় অর্থনীতি মন্থর হয়। কারণ বিদেশি পণ্য ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়। পাশাপাশি বিদেশি পণ্য ব্যবহারের ফলে দেশি পণ্যের চাহিদা কমে যায়। এতে দেশের উৎপাদক শ্রেণি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর তার প্রভাব পড়ে দেশীয় অর্থনীতির ওপর। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরে তেমন কোনো শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে না। ফলে দেশে ব্যাপকহারে বেকারত্ব ও অন্যান্য সমস্যা দেখা দেয়।
বিদেশি পণ্য ব্যবহারে দেশীয় পণ্যকে অবহেলা করা হয়। এতে দেশীয় পণ্যের উৎপাদনেও বিরূপ প্রভাব পড়ে। কৃষক বা অন্যান্য উৎপাদনকারীরা উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ফলে দেশের মোট জাতীয় উৎপাদন (Gross Domestic Product)-এর হার ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। ফলে দেশে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। এতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি স্থবির হয়ে পড়ে।
সুতরাং বলা যায়, তপুর মতো মানসিকতা আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে অন্তরায়।
উদ্দীপকে উল্লিখিত নাজমুলের যুদ্ধটি বাংলার ইতিহাসের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ 'পলাশীর যুদ্ধকে' (১৭৫৭) স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ত্রিমুখী ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে পরাজিত হয়েছিলেন।
পলাশীর যুদ্ধের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রতি ইংরেজদের চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও অবাধ্যতা। নবাব সিংহাসনে বসার পর নিয়ম অনুযায়ী ইংরেজরা তাকে কোনো উপঢৌকন পাঠায়নি এবং বাণিজ্যের ছাড়পত্র 'দস্তক'-এর চরম অপব্যবহার করতে থাকে। এছাড়া নবাবের নিষেধ অমান্য করে কলকাতায় দুর্গ নির্মাণ অব্যাহত রাখা এবং নবাবের অবাধ্য প্রজাদের আশ্রয় দেওয়াই ছিল যুদ্ধের প্রধান কারণ।
উদ্দীপকের নাজমুল খুব অল্প বয়সে সিংহাসনে বসে পারিবারিক ও বণিকদের ষড়যন্ত্রের কারণে যুদ্ধে পরাজিত হন। একইভাবে, নবাব সিরাজউদ্দৌলাও মাত্র ২২ বছর বয়সে সিংহাসনে বসে বড় খালা ঘসেটি বেগম ও সেনাপতি মীরজাফরসহ আপনজনদের বিশ্বাস ঘাকতার সম্মুখীন হন। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল উমিচাঁদ, জগৎ শেঠের মতো বণিকশ্রেণি এবং ধূর্ত ইংরেজদের চক্রান্ত। ইংরেজদের এই অবাধ্যতা এবং প্রাসাদ ষড়যন্ত্রই মূলত পলাশীর যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।
উদ্দীপকে উল্লিখিত স্বাধীনচেতা মিনহাজের ব্যথতা বলতে মূলত ১৭৬৪ সালের ঐতিহাসিক বক্সারের যুদ্ধে বাংলার নবাব মীর কাশিমের পরাজয়কে বোঝানো হয়েছে, যা বাংলায় ইংরেজ বণিকদের আধিপত্য সম্পূর্ণ পাকাপোক্ত করে।
মীর কাশিম ছিলেন একজন দূরদর্শী শাসক, যিনি চেয়েছিলেন ইংরেজদের অন্যায্য বাণিজ্যিক সুবিধা ও দস্তকের অপব্যবহার বন্ধ করে বাংলার অর্থনীতি ও প্রশাসনকে প্রভাবমুক্ত রাখতে। কিন্তু ইংরেজরা ক্ষুব্ধ হয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করলে তিনি দিল্লির সম্রাট শাহ আলম ও অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার সাথে সম্মিলিত বাহিনী গঠন করেও মেজর মনরোর কাছে পরাজিত হন।
উদ্দীপকের মিনহাজ স্বাধীনচেতা শাসক হিসেবে বিদেশি বণিকদের বিরুদ্ধে শক্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে যেমন ব্যর্থ হন, ইতিহাসেও মীর কাশিম একইভাবে বাংলার সার্বভৌমত্ব রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে বক্সারের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাঁর এই পরাজয়ের মাধ্যমেই বাংলার স্বাধীনতা উদ্ধারের সর্বশেষ সম্ভাবনাটুকু চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
মীর কাশিমের এই ব্যর্থতার ফলে ইংরেজরা সমগ্র উপমহাদেশে অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হয়। এর পরপরই ১৭৬৫ সালে রবার্ট ক্লাইভ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভকরেন, যার ফলে কোম্পানি আইনগত ভাবে অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়। এভাবেই বক্সারের যুদ্ধে মীর কাশিমের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলায় সরাসরি বিদেশি ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় হয় ও তাদের আধিপত্য বিস্তারের চূড়ান্ত সুযোগ তৈরি হয়।
বাঙালি মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তাদের সার্বিক কল্যাণের উদ্দেশ্যে নওয়াব আবদুল লতিফ মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার মুসলমান সমাজ আধুনিক ও পাশ্চাত্য শিক্ষা থেকে অনেক পিছিয়ে ছিল। তাই মুসলমান সম্প্রদায়ের উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, ইংরেজি শিক্ষায় তাদের আগ্রহী করে তোলা এবং ইংরেজ সরকারের সাথে মুসলমানদের বিদ্বেষ দূর করে সুসম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যেই ১৮৬৩ সালে কোলকাতায় তিনি এই সোসাইটি বা মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।
উদ্দীপকের জনাব 'ক'-এর কর্মকাণ্ডের সাথে বাংলার নবজাগরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের হুবহু মিল রয়েছে।
বিদ্যাসাগর ছিলেন উনিশ শতকের বাংলার একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সফল সমাজ-সংস্কারক। হিন্দু সমাজে প্রচলিত নানা অমানবিক প্রথা ও কুসংস্কার দূর করে একটি সুস্থ সমাজ গঠনে তিনি আজীবন নিরলস সংগ্রাম করে গেছেন।
উদ্দীপকে দেখা যায়, জনাব 'ক' সমাজের অনাচার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে নারীদের দ্বিতীয় বিবাহ বা বিধবা বিবাহ চালুর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পাঠ্যবইয়ের ইতিহাসেও আমরা দেখি, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হিন্দু সমাজের চরম রক্ষণশীলতাকে উপেক্ষা করে কন্যাশিশু হত্যা ও বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলেন। বিশেষ করে, বাল্যবিধবাদের করুণ দুর্দশা মোচনের জন্য তিনি হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহের পক্ষে তীব্র জনমত তৈরি করেন। তাঁরই একক ও নিরলস প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ সরকার বিধবা বিবাহ আইন পাস করতে বাধ্য হয়। সুতরাং, সমাজ সংস্কারে বিদ্যাসাগরের এই যুগান্তকারী অবদানই উদ্দীপকের জনাব 'ক'-এর মাঝে প্রতিফলিত হয়েছে।
উদ্দীপকের জনাব 'খ'-এর দানশীলতা ও পরোপকারের সাথে বাংলার প্রখ্যাত শিক্ষানুরাগী ও দানবীর হাজী মুহম্মদ মহসীনের মিল রয়েছে।
হাজী মুহম্মদ মহসীন ছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী, পরোপকারী এবং মানবপ্রেমিক এক মহাপুরুষ। তিনি তাঁর বিপুল উত্তরাধিকারলব্ধ সম্পত্তি নিজের ভোগের জন্য নয়, বরং বাংলার পিছিয়ে পড়া মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা ও জনহিতকর কাজে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
উদ্দীপকের জনাব 'খ' যেমন মানবপ্রেম ও দানশীলতার জন্য সবার কাছে শ্রদ্ধার পাত্র, হাজী মহসীনও ঠিক তেমনি ছিলেন। তিনি বোনের বিশাল সম্পত্তির মালিক হয়েও অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করতেন। ঐ সময়ে বাংলার মুসলমানদের চরম আর্থিক সংকটের কারণে লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না। এই দুর্দিনে তিনি শিক্ষা বিস্তারের জন্য হুগলীতে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং ঢাকা চট্টগ্রাম ও যশোরের বিভিন্ন মাদ্রাসার উন্নয়নে প্রচুর অর্থ দান করেন
১৮০৬ সালে তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি নিয়ে 'মহসীন ফান্ড' গঠন করেন। এই ফান্ডের অর্থায়নে পরবর্তীতে হুগলী মহসীন ফান্ড, দাতব্য চিকিৎসালয় এবং বিভিন্ন স্থানে মাদ্রাসা ও ছাত্রাবাস স্থাপিত হয়। মহসীন ফান্ডের বৃত্তির অর্থেই সৈয়দ আমির আলির মতো হাজার হাজার মুসলমান তরুণ উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পেয়েছিল। বস্তুত, তাঁর এই নিঃস্বার্থ দানশীলতা এবং শিক্ষা বিস্তারে যুগান্তকারী উদ্যোগই বাঙালি মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষার পথ সুগম করেছিল, যা চিরস্মরণীয়।
মীর কাসিম স্বাধীনভাবে শাসন পরিচালনা ও রাজস্বব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নিলে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে তাঁর বিরোধ সৃষ্টি হয়। কোম্পানির কর্মচারীরা দস্তকের অপব্যবহার করে শুল্কমুক্ত ব্যক্তিগত ব্যবসা করত। বৈষম্য দূর করতে মীর কাসিম সব ব্যবসায়ীর অভ্যন্তরীণ শুল্ক তুলে দিলে ইংরেজরা ক্ষুব্ধ হয় এবং ১৭৬৩ সালে সংঘর্ষ শুরু হয়।
পরাজিত মীর কাসিম অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা ও মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সঙ্গে জোট গঠন করেন। এই সম্মিলিত বাহিনীর সঙ্গে ইংরেজ সেনাপতি হেক্টর মনরোর বাহিনীর সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধের পটভূমি তৈরি হয়।
তথ্যছক-১ ১৭৬৫ সালে লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত বাংলার দ্বৈত শাসনকে নির্দেশ করে।
বক্সারের যুদ্ধে জয়ের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা ও বিচারসহ নিজামতের দায়িত্ব নামমাত্র নবাবের হাতে রাখা হয়। বাস্তবে কোম্পানি ক্ষমতা ভোগ করলেও প্রশাসনিক দায় নবাবের ওপর চাপায়। একই অঞ্চলে কোম্পানি ও নবাবের এই দুই ধরনের কর্তৃত্বই দ্বৈত শাসন নামে পরিচিত।
তথ্যছক-২ ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে নির্দেশ করে। এ ব্যবস্থায় জমিদারদের জমির স্থায়ী মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব চিরদিনের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়।
এর সুবিধা ছিল—সরকার নির্দিষ্ট সময়ে স্থির রাজস্ব পাওয়ার নিশ্চয়তা লাভ করে, একটি অনুগত জমিদার শ্রেণি গড়ে ওঠে এবং জমিদারদের কৃষির উন্নয়নে বিনিয়োগের প্রেরণা সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু বাস্তবে অসুবিধাই ছিল বেশি। জমিদাররা কৃষকের কাছ থেকে ইচ্ছামতো খাজনা আদায় ও অত্যাচার করত; কৃষকের জমির অধিকার স্বীকৃত হয়নি। বহু জমিদার শহরে বসবাস করায় মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি তৈরি হয়। নির্ধারিত সময়ে রাজস্ব দিতে না পারলে জমিদারি নিলামে উঠত। উৎপাদন ও মূল্যের বৃদ্ধি থেকেও সরকার বাড়তি রাজস্ব পেত না।
অতএব চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত রাজস্ব আদায়ে সাময়িক স্থিতি আনলেও কৃষকশোষণ, অনুপস্থিত জমিদারি ও গ্রামীণ দারিদ্র্য বাড়িয়ে বাংলার সমাজ ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে।
ঘটনা-২: বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এশা নভোপদার্থবিদ্যার প্রতি তার প্রবল ঝোঁক। এ বিষয়ে দেশে ভালো বই না পাওয়ায় সে অনলাইনে আমেরিকার লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের কয়েকটি বই পড়ে।
ঘটনা-১ এ এমপি মহোদয় কর্তৃক উন্মোচিত ফলক ইতিহাসের অলিখিত উপাদানকে নির্দেশ করে। ইতিহাসে অলিখিত উপাদানের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক।
উদ্দীপকের ঘটনা-১ এ তমাল দেখতে পায় এলাকার এমপি লাল কাপড়ে ঢাকা একটি ফলক উন্মোচন করেন যা ইতিহাসের অলিখিত উপাদান। ইতিহাস রচনায় 'অলিখিত উপাদানের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। যেসব তথ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিক সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব, তাকেই ইতিহাসের উপাদান বলা হয়। এ উপাদানকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- ক. লিখিত উপাদান ও খ. অলিখিত উপাদান। রয়েছে। যেসব বস্তু বা উপাদান থেকে আমরা বিশেষ সময়, স্থান বা ব্যক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক তথ্য পাই, সেই বস্তু বা উপাদানই প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন। মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহই হলো ইতিহাসের অলিখিত উপাদান। প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে- লিপিমালা, মুদ্রা, স্থাপত্য-ভাস্কর্য ও স্মৃতিসৌধ, প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ। এগুলো থেকে রাজার রাজ্য, রাজত্বকাল, ধর্ম বিশ্বাস জানা যায় এবং মুদ্রা থেকে রাজার সময়কাল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সমাজ ব্যবস্থা, ধর্মবিশ্বাস জানা যায়। পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় যা অতীব প্রয়োজনীয়। এছাড়া প্রচলিত বিশ্বাস বা প্রথা যেমন- অতিকথন, রূপকথা, গান, কাহিনিমালা ইত্যাদি এবং পুঁথি মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত রূপকথা ইতিহাসের অলিখিত উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নির।ক্ষা এবং বিশ্লেষণের ফলে সে সময়ের অধিবাসীদের রাজনৈতিক সামাজিক, অর্থনৈতিক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
ঘটনা-২ লিখিত উপাদানের সাহায্য নিয়ে নভোপদার্থ বিজ্ঞান সম্পর্কে জেনেছে। অতীত জানার জন্য লিখিত উপাদান একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
মানব সমাজের ইতিহাস জানতে আমাদেরকে ঐতিহাসিক উপাদানের ওপর নির্ভর করতে হয়। ঐতিহাসিক উপাদানের অন্যতম হলো গ্রন্থ বা বই, যা ইতিহাসের লিখিত উপাদান হিসেবে পরিচিত। এটি যেমন সাহিত্য গ্রন্থ হতে পারে, তেমনি জীবনী গ্রন্থ, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদিও হতে পারে। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সাহিত্য গ্রন্থে তৎকালীন সময়ের ইতিহাস ফুটে ওঠে। যেমন- কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র,' কলহনের 'রাজতরঙ্গিনী', মিনহাজ-উস-সিরাজের 'তবকাত-ই-নাসিরী,' আবুল ফজলের 'আইন-ই-আকবরী' ইত্যাদি। বলে বিবেচিত হয়েছে। যেমন- মেগাস্থিনিসের 'ইন্ডিকা', ফা-হিয়েনের 'ফো-কুয়ো-কি', হিউয়েন সাং-এর 'সি-ইউ-কি' ইত্যাদি। এছাড়াও জীবনীগ্রন্থ, প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ, দেশীয় সাহিত্য ও প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ইত্যাদি ইতিহাসের উৎসমূল হিসেবে পরিগণিত হয়। যেমন- সন্ধ্যাকর নন্দীর-'রামচরিত', কলহনের 'রাজতরঙ্গিনী', কালিদাসের মেঘদূত; বেদ, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ ইত্যাদিও ইতিহাস জানার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ইতিহাসের সর্বাঙ্গিক তথ্য জানার জন্য এসব গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা বর্ণনাতীত। তাই মানব সমাজের ইতিহাস জানার জন্য আমাদেরকে অন্যান্য উপাদানের সাথে লিখিত উপাদান তথা গ্রন্থের ওপর নির্ভর করতে হবে।
উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ঘটনা-২ এশা লিখিত উপাদানের সাহায্য নিয়ে নভোপদার্থবিদ্যা সম্পর্কে জেনেছে যা অতীত জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
উদ্দীপকের সাথে আমার পাঠ্যবইয়ের প্রাচীন যুগের সাদৃশ্য রয়েছে।
উদ্দীপকের বর্ণনায় দেখতে পাওয়া যায়, শীলা নববর্ষের দিন খুব সুন্দর করে লাল পাড় সাদা সুতি শাড়ি পরল। মাথায় খোঁপা বাঁধল, পায়ে আলতা লাগাল, তার বান্ধবী সবিতাও সিঁদুর, আলতা ও কুমকুম ব্যবহার করল। শঙ্খের বালা ও চুড়ি পরল। তারা বিভিন্ন জায়গায় ঘোরার পর শীলাদের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করল। শীলার মা ভাত, মাছ, মাংস, দধি ও ক্ষীরের ব্যবস্থা করলেন। নববর্ষের দিনটি শীলা ও তার বান্ধবীর খুব ভালো কাটল। বর্ণিত চিত্রের সাথে প্রাচীন বাংলার মানুষের জীবনের সাদৃশ্য বিদ্যমান। কারণ, প্রাচীন বাংলার মানুষ অনাড়ম্বর পোশাক ব্যবহার করতেন। তবে বিয়ে বা বিশেষ উৎসব অনুষ্ঠানে বিশেষ পোশাকের ব্যবস্থা ছিল। নারীরা কানে কুন্দন, গলায় হার, আঙুলে আংটি প্রভৃতি অলংকার পরত। কপূর, চন্দন প্রভৃতির প্রসাধনসামগ্রীর সঙ্গে বিভিন্ন সুগন্ধীর ব্যবহারের প্রচলন ছিল। প্রাচীন বাংলার মানুষের খাদ্য তালিকায় স্থান পেত ভাত, মাছ, মাংস, শাকসবজি, দধি, ঘৃত, ক্ষীর, বিভিন্ন রকমের পিঠা, আম, কাঁঠাল, কলাসহ নানান ফল এবং খাওয়া-দাওয়া শেষে মসলাযুক্ত পান খাওয়ার রীতি প্রচলিত ছিল।
সুতরাং উদ্দীপকে যে প্রাচীন বাংলার চিত্রই ফুটে উঠেছে তা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়।
উক্ত যুগের অর্থাৎ প্রাচীন যুগের খাওয়া-দাওয়ায় আভিজাত্যের ছাপ মিল-উক্তিটি যথার্থ।
প্রাচীনকালে খাদ্য বর্তমান সময়ের মতো ভাত; মাছ, মাংস, শাকসবজি, দুধ, দধি, ঘৃত, ক্ষীর ইত্যাদি প্রধান খাদ্য ছিল। চাল থেকে প্রস্তুত নানা প্রকার পিঠাও জনপ্রিয় মুখরোচক খাবার ছিল। বাঙালি ব্রাহ্মণেরা আমিষ খেত। তখন সকল প্রকার মাছ পাওয়া যেত। পূর্ববঙ্গের ইলিশ ও শুঁটকি মাছ খুব জনপ্রিয় খাবার ছিল। বাঙালির প্রধান খাদ্য ছিল ভাত ও মাছ। তরকারির মধ্যে বেগুন, লাউ, কুমড়া, ঝিঙ্গা, কাকঁরোল, কুব উৎপন্ন হতো। ফলের মধ্যে আম, কাঁঠাল, কলা, তাল, পেঁপে, নারকেল, ইক্ষু পাওয়া যেত। দুধ, নারকেলের পানি, ইক্ষুরস তালরস গাঁজাইয়া নানা প্রকার মদ তৈরি হতো। খাদ্য তালিকায় ছিল বিভিন্ন মাছ মাংসের সাথে আচারের নাম পাওয়া যেত। তবে 'ডালের কথা কোথাও বলা নেই। এসব খাবারের পাশাপাশি কাবাব, রেজালা কোর্মা ও ঘিয়ে রান্না করা যাবতীয় মুখরোচক খাবার জায়গা করে নেয়। খাবারের শেষে মসলাযুক্ত পানও পরিবেশন করা হতো।
পরিশেষে বলা যায় যে, প্রাচীন আমলের খাওয়া-দাওয়ায় আভিজাত্যের ছাপ ছিল।
উদ্দীপকের 'X' অঞ্চলের শাসক কমল সরকার নিজে সুপণ্ডিত ও জ্ঞানী শাসক ছিলেন এবং তিনি রাজ্যের রাজ্যের জ্ঞানী-গুণিদের সমাদর করতেন। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও বার্ধক্যজনিত দুর্বলতার সুযোগে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের শাকিল কোরেশী নামক একজন মুসলমান যোদ্ধা তার রাজ্য আক্রমণ করে এবং খুব সহজেই দখল করে নেয়। যা লক্ষ্মণ সেনের কর্মকাণ্ডকে নির্দেশ করে। সেন বংশের শাসক বল্লাল সেনের মৃত্যুর পর তার পুত্র লক্ষণ সেন সিংহাসনে বসেন। পিতার ন্যায় তিনিও সুদক্ষ যোদ্ধা ছিলেন এবং রণক্ষেত্রে নৈপুণ্যের পরিচয় দেন। তিনি প্রাগ-জ্যোতিষ, গৌড়, কলিঙ্গ, কাশী, মগধ প্রভৃতি অঞ্চল সেন সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। লক্ষণ সেন নিজে সুপণ্ডিত ও বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। তার রাজসভায় বহু পণ্ডিত ও জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের সমাবেশ ঘটেছিল। ধোয়ী, শরণ, জয়দেব, গোবর্ধন প্রমুখ প্রসিদ্ধ কবিগণ তার সভা অলংকৃত করতেন। ভারত প্রসিদ্ধ পণ্ডিত হলায়ুধ তার প্রধানমন্ত্রী ও ধর্মীয় প্রধান ছিলেন। লক্ষণ সেন নিজে পিতার অসমাপ্ত গ্রন্থ 'অদ্ভুতসাগর' সমাপ্ত করেছিলেন। তিনি ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে নদীয়াতে অবস্থানকালে বখতিয়ার খলজির আক্রমণে ক্ষমতা হারান।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকের কমল সরকারের মাধ্যমে লক্ষণ সেনের চরিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
উদ্দীপকে শাকিল কোরেশীর ক্ষমতা দখল প্রাচীন বাংলায় মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তনের চিত্র – উক্তিটি যথার্থ। -
বখতিয়ার খলজি উত্তর আফগানিস্তানের গরমসির (আধুনিক দাসত-ই মার্গ) এর বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ১১৯৫ সালে নিজ জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে জীবিকার অন্বেষণে গজনিতে আসেন। সেখানে তিনি শিহাবউদ্দিন ঘোরীর সৈন্য বিভাগে চাকরিপ্রার্থী হয়ে ব্যর্থ হন। কারণ তিনি ছিলেন খাটো, লম্বা হাত ও কুৎসিত চেহারার অধিকারী। গজনিতে ব্যর্থ হয়ে বখতিয়ার দিল্লিতে সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেকের দরবারে উপস্থিত হন। এখানেও তিনি ব্যর্থ হন। এরপর তিনি বদাউনে যান। অল্পকাল পর তিনি বদাউন ত্যাগ করে অযোধ্যা যান। সেখানকার শাসনকর্তা হুসামউদ্দিনের অধীনে তিনি পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে নিযুক্ত হন। বখতিয়ারের সাহস ও বুদ্ধিমত্তায় সন্তুষ্ট হয়ে হুসামউদ্দিন তাকে
ভাগবত ও ভিউলি নামক দুটি পরগনার জায়গির দান করেন। তিনিপার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আক্রমণ চালিয়ে দক্ষিণ বিহারের এক প্রাচীর ঘেরাওদন্তপুর দুর্গ দখল করেন। যা বর্তমানে বিহার নামে পরিচিত। এসময়তার বীরত্বের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে অনেক ভাগ্যান্বেষী মুসলমানতার দলে যোগদান করে। একসময় তিনি নদীয়া আক্রমণ করারপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। মাত্র ১৭/১৮ জন সৈন্য নিয়ে বখতিয়ার খলজি'মধ্যাহ্নভোজে ব্যস্ত রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে নদীয়া বিজয়করেন। যার ফলে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এ শাসন প্রায়সাড়ে পাঁচ শত বছরের অধিককাল স্থায়ী হয়েছিল।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকের শাকিল কোরেশীর ক্ষমতা দখল বখতিয়ার খলজির বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার ঘটনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া নামের বণিক সংঘটি ১৬০০ সালে রানি, এলিজাবেথের কাছ থেকে ১৫ বছর মেয়াদি প্রাচ্যে একচেটিয়া বাণিজ্য করার সনদপত্র লাভ করে। এ সনদপত্র নিয়ে কোম্পানির প্রতিনিধি বাণিজ্যিক সুবিধা লাভের আশায় সম্রাট আকবরের দরবারে হাজির হন। ১৬০৮ সালে ক্যাপ্টেন হকিন্স এবং ১৬১৫ সালে স্যার টমাস রো ব্রিটিশ রাজ্যের দূত হিসেবে ভারতে আসেন এবং ভারতীয় সম্রাটদের কাছ থেকে তারা ইংরেজদের জন্য বাণিজ্যিক সুবিধা আদায় করে নেন। বাংলার সুবেদার শাহ সুজার অনুমতি নিয়ে তারা ১৬৫৮ সালে হুগলিতে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। এভাবে তারা সুরাট, আগ্রা, আহমদাবাদ, কাশিমবাজার, হুগলি ও ঢাকাতে বাণিজ্য কুঠি নির্মাণ করে। তারা এদেশীয় কিছু ষড়যন্ত্রকারী, ক্ষমতা লোভী এবং অর্থ লোভী রাজকর্মচারীদের সাথে হাত মেলায়ও এবং ষড়যন্ত্র করতে থাকে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো পলাশি যুদ্ধ। এ যুদ্ধের মাধ্যমে তারা এদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ শুরু করে। বক্সার যুদ্ধে মীর কাশিমকে পরাজয়ের মাধ্যমে তারা দেওয়ানি লাভ করে এবং এদেশের একচেটিয়া ক্ষমতা ইংরেজদের হাতে চলে যায়। ফলে ১৭৫৭ সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ১৮৫৮ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ রাজ বা রানি কর্তৃক এ ভারতীয় উপমহাদেশ শাসিত হয়।
অতএব উদ্দীপকে ভারতীয় উপমহাদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকে বোঝানো হয়েছে।
ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বশেষে আগত ইউরোপীয় বণিকদের কোম্পানি হচ্ছে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৬৬৪ সালে এই বাণিজ্যিক কোম্পানি গঠিত হয়। ১৬৬৮ সালে কোম্পানি সর্বপ্রথম সুরাট এবং পরের বছর মুসলিপট্টমে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। ১৬৭৩ সালে পন্ডিচেরিতে ফরাসি উপনিবেশ গড়ে ওঠে। ১৬৯০ থেকে ১৬৯২ সালের মধ্যে চন্দননগর একটি শক্তিশালী সুরক্ষিত ফরাসি বাণিজ্য কুঠিতে পরিণত হয়। ১৬৯৬ সালে কোম্পানি এখানে একটি শক্তিশালী দুর্গ স্থাপন করতে সক্ষম হয়। ১৬৯৩ সালে ফরাসিরা বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করে। পরবর্তীকালে তারা কাশিমবাজার বালাসোরে কুঠি স্থাপন করতে সক্ষম হয়। ইংরেজ বণিকরা যখন ব্যবসা বাণিজ্যের দৃঢ় অবস্থানে, তখন ফরাসিরা এদেশে আসে। এ অবস্থায় ইংরেজদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তির মতো ফরাসিরাও এদেশে সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখতে থাকে। ফলে দুই ইউরোপীয় শক্তি- ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। তবে ইংরেজদের ষড়যন্ত্র, কুটকৌশল, উন্নত রণকৌশলের কাছে ফরাসিরা পরাজিত হয়। ফলে বাংলার ফরাসি বাণিজ্য কুঠিগুলো ইংরেজদের দখলে চলে যায়। দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটকের যুদ্ধসমূহে ফরাসি কোম্পানি পরাজিত হলে তারা এদেশ ত্যাগ করে। ফলে ইংরেজরা ভারতবর্ষে অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হয়।
গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসকে ইতিহাসের জনক বলা হয়। তিনিই সর্বপ্রথম তাঁর গবেষণাকর্মের নামকরণের জন্য 'Historia' শব্দটি ব্যবহার করেন, যা থেকে History শব্দটির উৎপত্তি। তিনি তাঁর গবেষণায় গ্রিস ও পারস্যের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের বিভিন্ন বিষয় অনুসন্ধান করেছেন। যাতে পরবর্তী প্রজন্ম এ ঘটনা ভুলে না যায়। এ বিবরণ যেন তাদের উৎসাহিত করে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে।
ইতিহাস রচনার লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সাহিত্যকর্মেও তৎকালীন সময়ের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। যেমন- বেদ, কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র', কলহনের 'রাজতরঙ্গিনী', মিনহাজ-উস-সিরাজের' তবকাত-ই-নাসিরী' বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' ইত্যাদি। বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ সব সময়ই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে বিবেচিত হয়েছে। যেমন- পঞ্চম থেকে সপ্তম শতকে বাংলায় আগত চৈনিক পরিব্রাজক যথাক্রমে ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাং ও ইৎসিং-এর বর্ণনা। পরবর্তী সময়ে আফ্রিকান পরিব্রাজক ইবনে বতুতাসহ অন্যদের লেখাতেও এ অঞ্চল সম্পর্কে বিবরণ পাওয়া গিয়েছে। এসব বর্ণনা থেকে তৎকালীন সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা যায়।
উদ্দীপকে এই বইপুস্তক ইতিহাসের লিখিত উপাদানকে নির্দেশ করে।
তাই বলা যায়, উদ্দীপকের তোয়ার প্রাপ্ত উপহার ইতিহাসের লিখিত উপাদান।
জ্ঞানচর্চার শাখা হিসেবে ইতিহাস পাঠের গুরুত্ব অত্যধিক। ইতিহাস পাঠ মানুষকে অতীতের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান অবস্থা বুঝতে এবং ভবিষ্যৎ অনুধাবন করতে সাহায্য করে। ইতিহাস পাঠের মাধ্যমে আমরা মানবসমাজের ক্রমবিকাশ ও সভ্যতার বিবর্তনের ধারা সম্পর্কে জানতে পারি। আবার অতীতের সত্যনিষ্ঠ বর্ণনা মানুষের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। আর এ বিবরণ যদি হয় নিজ দেশ, জাতির সফল সংগ্রাম, গৌরবময় ঐতিহ্যের তাহলে তা মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। একই সঙ্গে আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে। এ জন্যই উদ্দীপকের তপন স্যার তার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি করেন। ইতিহাস জ্ঞান মানুষকে সচেতন করে তোলে। বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর উত্থান-পতন এবং সভ্যতার বিকাশ ও পতনের কারণগুলো জানতে পারলে মানুষ ভালোমন্দের পার্থক্যটা সহজেই বুঝতে পারে। ফলে ব্যক্তি তার কর্মের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকে।
সুতরাং উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বলা যায়, দেশ ও জাতির অগ্রগতির জন্য ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
ইংরেজদেরকে এদেশ থেকে বিতাড়িত করতে মাস্টারদা সূর্যসেন মৃত্যু ভয়কে তুচ্ছ করে বারবার সশস্ত্র আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
মাস্টারদা সূর্য সেন ছিলেন একজন দুঃসাহসী বিপ্লবী। তিনি কলেজ জীবনে বিপ্লবীদের সংস্পর্শে আসেন। এ সময় তিনি অনুরূপ সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, নগেন সেনের সহায়তায় একটি বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করতে গঠন করেন চট্টগ্রাম বিপ্লবী বাহিনী। এ আত্মঘাতী বাহিনী পরে 'চিটাগাং রিপাবলিকান আর্মি' নামধারণ করে। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু এ অসম যুদ্ধে বিপ্লবীরা পরাজিত হন এবং ১৯৩৩ সালে মাস্টারদা সূর্যসেন গ্রেফতার হন। অবশেষে ১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারি তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। মাস্টারদা সূর্যসেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও পিছপা হননি। আর এসব কারণেই তাকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নায়ক বলা হয়।
স্বদেশী আন্দোলনের ব্যর্থতা বাংলার স্বাধীনতাকামী যুব সমাজকে সশস্ত্র বিপ্লবের পথে ঠেলে দেয়। এই আন্দোলন ধীরে ধীরে বিভিন্ন এলাকায় অতর্কিত বোমা হামলা, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হত্যা, গেরিলা পদ্ধতিতে খণ্ডযুদ্ধ ইত্যাদি ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ্যে আসতে থাকে। সশস্ত্র বিপ্লবী এ আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য নামগুলো হলো ক্ষুদিরাম, অরবিন্দ ঘোষ, পুলিন বিহারী দাস, প্রফুল্ল চাকী, রাসবিহারী বসু, বাঘা যতীন প্রমুখ। মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, নির্মম অত্যাচারও এসব বিপ্লবীদের পথভ্রষ্ট করতে পারেনি।
বিপ্লবীদের আন্দোলন বাংলায় বেশি শক্তিশালী ছিল এবং বাঙালিরা ইংরেজ প্রশাসনকে ব্যতিব্যস্ত রেখেছিল। বাঙালি তরুণরা মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে বারবার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এদের মধ্যে অন্যতম দুঃসাহসী বিপ্লবী ছিলেন চট্টগ্রামের মাস্টারদা সূর্য সেন। স্বাধীন চিটাগাং সরকারের ঘোষণা দিয়ে তিনি ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ করেন এবং পরবর্তীতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সূর্য সেনের বিপ্লবী বাহিনীর নারী যোদ্ধা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারও আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে গণবিচ্ছিন্নতা ও একক নেতৃত্বের অভাবে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল।
সশস্ত্র বিপ্লব সফল না হলেও বিপ্লবীদের আত্মাহুতি, দেশপ্রেম, সাহস পরাধীন বাংলা তথা ভারতবাসীকে স্বাধীনতার পথ দেখিয়েছিল। এ আন্দোলন প্রত্যক্ষভাবে সফল না হলেও বিপ্লবীদের আদর্শ পরবর্তী আন্দোলনসমূহে প্রেরণা যুগিয়েছিল।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকে উল্লিখিত বিষয়টির সাথে দ্বৈতশাসনের সাদৃশ্য রয়েছে।
ব্রিটিশ সরকার মনে করত যে, ভূমি ব্যবস্থা স্থায়িত্ব হলে জমিদারগণ ভূমিতে পুঁজি বিনিয়োগ করবে এবং উন্নয়নে তৎপর হবে। ফলে কৃষিতে যেমন উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে তেমনি দেশের অর্থনীতিও সমৃদ্ধিশালী হবে। এতে জমিদারগণ সুবিধা ভোগ করবে। বিনিময়ে তারা সরকারের প্রতি অনুগত থাকবে। অনুগত জমিদারগণ হবে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ভিত্তি। আমরা জানি, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারদের অবস্থার উন্নতি হলেও প্রজাদের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। জমিদাররা তাদের ইচ্ছামতো খাজনা বাড়াত। জমিদারদের নায়েব-গোমস্তা এবং পাইক-পেয়াদারা প্রজাদের ওপর নানা প্রকার অত্যাচার উৎপীড়ন করত। জমিতে প্রজাদের কোনো অধিকার না থাকায় প্রজারা কৃষি উন্নয়নের জন্য বিশেষ চেষ্টা করেনি। এ ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি জমিদারদের হাতে বন্দি হয়। ফলে এ ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশ অবনতির দিকে ধাবিত হয়।
সুতরাং চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারদের' সাথে না হয়ে কৃষকদের সাথে হলে কৃষকদের অর্থনৈতিক মুক্তি হতো এবং এদেশের অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরে আসত। প্রতিষ্ঠিত হতো একটি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিশালী দেশ।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাও ফরমান আলী ও জেনারেল টিক্কা খানের পরিকল্পনায় ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশে নৃশংস হত্যাযজ্ঞা শুরু করে। ফলে হাজার হাজার নরনারী নিজ ভূমি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে, যাদের শরণার্থী বলা হয়। শরণার্থী বা উদ্বাস্তু (Refugee) বলতে বোঝায় যারা জাতিগত সহিংসতা, ধর্মীয় উগ্রতা, গৃহযুদ্ধ, বিদেশি আক্রমণসহ নানা কারণে নিজভূমি ত্যাগ করে অন্য দেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতাই এর প্রধান কারণ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষা অঞ্চলগুলোতে শরণার্থী ক্যাম্প গড়ে ওঠে। সবচেয়ে বেশি শরণার্থী আশ্রয় নেয় পশ্চিমবঙ্গে। এখানে প্রায় ৭৫ লাখ শরণার্থী আশ্রয় গ্রহণ করে এবং সমগ্র ভারতে ১ কোটি শরণার্থী আশ্রয় গ্রহণ করে। বহু মাইল পায়ে হেঁটে ভারতে আসা এসব শরণার্থীদের না ছিল খাবার, না ছিল পান করার মতো পানি, চিকিৎসাতো অনেক দূরের ব্যাপার। মূলত তাদের অবস্থা খুবই দুর্দশাগ্রস্ত ছিল। অনেক দীর্ঘশ্বাস, অনেক অভুক্ত শিশুর কান্না, অসহায় মানুষের নীরব চাহনি, একটু আশ্রয়ের জন্য ছোটাছুটি, একটু পরে লাশের খাতায় একটি নতুন সংখ্যা এসবই ছিল শরণার্থী ক্যাম্পগুলোর দৃশ্য। ক্ষুধা আর তৃষ্ণার সাথে যোগ হয় মহামারি কলেরা। যার ফলে প্রতিদিন শত শত মানুষ মৃত্যুর কবলে পতিত হয়।
অতএব পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচার নৃশংসতায় ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাঙালি শরণার্থীদের বিষয়টি উদ্দীপকের চিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে শরণার্থীরা ভারতে আশ্রয় নিলে বিশ্বের কাছে পাকিস্তানের নৃশংস হত্যাকাণ্ড প্রকাশ হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে। বিভিন্ন দেশের মানুষের সহানুভূতি জন্ম নেয় বাংলাদেশের প্রতি। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৬ মে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ত্রিপুরায় বেশকিছু শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। ১৮ মে রানীক্ষেত্রে এক জনসভায় ভাষণদানকালে ইন্দিরা গান্ধী শরণার্থী সমস্যার ব্যাপকতা অনুধাবনের জন্য বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। ভারত শরণার্থীদের নিজে যেমন সাহায্য করেছে, তেমন বহির্বিশ্বকেও সাহায্য করতে আহ্বান জানিয়েছিল। জুন ১৯৭১ পর্যন্ত জাতিসংঘ ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত ও প্রতিশ্রুত সাহায্যের পরিমাণ ছিল ২৬ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার জাতিসংঘের ইতিহাসে এটি ছিল আকাশপথে সবচেয়ে বৃহৎ সাহায্য।. এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম জার্মানি, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোও সাহায্য পাঠায়। ভারত তার নিজস্ব কোষাগার থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ শরণার্থীদের জন্য ব্যয় করে।
অতএব বলা যায়, শরণার্থীদের করুণ অবস্থা বাংলাদেশের প্রতি বিশ্ববাসীর সহানুভূতির জন্ম দিয়েছিল।
বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারী ও শিশুদের ও অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় হার তিনি ২০১১ সালে 'জাতীয় শিশু নীতি-২০১১' প্রণয়ন করেন। দুঃস্থ, এতিম, অসহায় পথ-শিশুদের সার্বিক বিকাশের জন্য স্থাপন করা হয়েছে ১৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র।
উদ্দীপকের তথ্যগুলো স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭২ সালের সংবিধানের সাথে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সরকার ১৯৭২ সালের ২৩শে মার্চ 'গণপরিষদ আদেশ' জারি করে। এই আদেশটি ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকর করা হয়।
এই আদেশ জারির মধ্য দিয়ে সংবিধান প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হয়। আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টি বঙ্গবন্ধুকে গণপরিষদের সংসদীয় দলীয় নেতা নির্বাচন করে। গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে ১৯৭২ সালের ১০ই এপ্রিল। বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় গণপরিষদের প্রথম স্পিকার নির্বাচিত হন শাহ আবদুল হামিদ এবং ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচিত হন মোহাম্মদ উল্লাহ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংবিধানের খসড়া প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। ড. কামাল হোসেন এই কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৪। কমিটি ১৯৭২ সালের ১১ই অক্টোবরের মধ্যে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কাজ শেষ করে। ১৯শে অক্টোবর থেকে সংবিধান বিল সম্পর্কে গণপরিষদে সাধারণ আলোচনা শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে আলাপ-আলোচনার পর ১৯৭২ সালের ৪ঠা নভেম্বর সংবিধান বিল গণপরিষদে পাস হয়। ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর প্রথম বিজয় দিবসে সংবিধান কার্যকর হয়।
হ্যাঁ, উক্ত বিষয় তথা সংবিধান বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাক্ষার প্রতিফলনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
গণপরিষদের সংবিধানের ওপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, 'এই সংবিধান শহিদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।'
দীর্ঘ ২৪ বছর পাকিস্তানের অধীনে শোষিত ও নির্যাতিত হওয়ার পর বাঙালি জাতি যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল তার প্রতিফলন ঘটেছে যুদ্ধ পরবর্তীকালে প্রণীত হওয়া ১৯৭২ সালের সংবিধানে। বাঙালিরা দীর্ঘকাল লড়াই করেছে একটি শোষণহীন, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য। ১৯৭২ সালের সংবিধান বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই সংবিধানে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার কথাও বলা হয়েছে সংবিধানে। ১৯৭২ সালের সংবিধান সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করেছে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতিও নিষিদ্ধ করে রাষ্ট্রের এ সর্বোচ্চ আইন।
সুতরাং বলা যায়, ১৯৭২ সালের সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।
পুণ্ড্র শব্দের অর্থ আখ বা ইক্ষু। প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পুণ্ড্র। খুব সম্ভবত: পুণ্ড্র বলে একটি জনগোষ্ঠী এ জনপদ গড়ে তুলেছিল। বর্তমান বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী ও দিনাজপুর এলাকা নিয়ে এ পুণ্ড্র জনপদটির সৃষ্টি হয়েছিল। রাজধানীর নাম ছিল পুন্ড্রনগর। পরবর্তীকালে এর নাম হয় মহাস্থানগড়। মহাস্থানগড় প্রাচীন পুণ্ড্র নগরীর ধ্বংসাবশেষ বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনের দিক দিয়ে পুণ্ড্রই ছিল প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরসভ্যতা।
উদ্দীপকে উল্লেখিত ছবিটি হলো বাংলাদেশের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মহাস্থানগড়, যা বগুড়ায় অবস্থিত। পণ্ডিতরা যেহেতু মহাস্থানগড়কে পুণ্ড্র নগরীর ধ্বংসাবশেষ বলে আখ্যায়িত করেছেন সেহেতু বলা যায়, উদ্দীপকের ছবিটি পুণ্ড্র জনপদের পরিচয় বহন করছে।
বরেন্দ্র বা বরেন্দ্রভূমি নামে প্রাচীন বাংলায় একটি জনপদের কথা জানা যায়। এটি বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের একটি জনপদ। অনুমান করা হয়, পুন্ড্রের একটি অংশ জুড়ে এ জনপদের অবস্থান ছিল। বগুড়া, দিনাজপুর ও রাজশাহী জেলার অনেক এলাকা এবং সম্বত পাবনা জেলাজুড়ে বরেন্দ্র বিস্তৃত ছিল বলে জানা যায়।
প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ সভ্যতা বলা হয় 'পুণ্ড্র'কে। বর্তমান বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী ও দিনাজপুর এলাকা নিয়ে এ জনপদটির সৃষ্টি হয়েছিল। বরেন্দ্র জনপদের ভৌগোলিক অবস্থানের সাথে পুদ্রের ভৌগোলিক অবস্থান তুলনা করলে বোঝা যায়, উভয় জনপদ বগুড়া, রাজশাহী ও দিনাজপুর জেলায় বিস্তৃত ছিল।
উপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, প্রাচীন বাংলার বরেন্দ্র জনপদটি পুণ্ড্র জনপদের ভৌগোলিক সীমানার কিছু অংশ জুড়ে অবস্থিত ছিল। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত উক্তিটি যথার্থ।
পাল শাসন ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ের বিভিন্ন উৎস ছিল। এর মধ্যে নানা প্রকার কর ছিল প্রধান। উৎপন্ন শস্যের ওপর বিভিন্ন ধরনের কর ধার্য হতো। যেমন- ভাগ, ভোগ, হিরণ্য, উপরি কর ইত্যাদি। কতকগুলো উঃপন্ন দ্রব্যের এক ষষ্ঠমাংশ রাজস্ব হিসেবে আদায় করা হতো। দস্যু ও তস্করের ভয় থেকে রক্ষার জন্য দেয় কর, ব্যবসায়-বাণিজ্য শুল্ক, খেয়াঘাট থেকে আদায়কৃত মাশুল ইত্যাদি ছিল সরকারের আয়ের কয়েকটি উৎস। বনজঙ্গল ছিল রাষ্ট্রের সম্পদ। সুতরাং এটিও রাষ্ট্রীয় আয়ের একটি অন্যতম উৎস ছিল। বিভিন্ন রকমের রাজস্ব আদায়ের জন্য বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারী নিযুক্ত ছিল। রাজস্ব আয়-ব্যয়ের হিসাব ও দলিল বিভাগ দেখাশুনা করার ব্যবস্থা ছিল। ভূমি রাজস্বের পরিমাণ ঠিক করার জন্য জমি জরিপের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। মুদ্রা এবং শস্যের আকারে রাজস্ব আদায় হতো। পাল রাজাদের সময়ে শান্তি রক্ষার জন্য সুন্দর বিচার ও পুলিশ বিভাগ ছিল। এ সময়ে গোপন সংবাদ সংগ্রহের জন্য গুপ্তচর বাহিনী ছিল। পদাতিক, অশ্বারোহী, হস্তী ও রণতরী- এ চারটি বিভাগে সামরিক বাহিনী বিভক্ত ছিল।
উদ্দীপকের ছকে উল্লিখিত প্রতিরক্ষা ও রাজস্ব ব্যবস্থার প্রকারভেদের সাথে উপরের আলোচনার তুলনা করলে বোঝা যায়, ছকটি প্রাচীন বাংলার পাল শাসনামলের শাসন ব্যবস্থার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
শশাংকের মৃত্যুর পর বাংলার ইতিহাসে এক অন্ধকার যুগের সূচনা হয়। দীর্ঘদিন বাংলায় কোনো যোগ্য শাসক ছিল না। ফলে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দেয়। একদিকে হর্ষবর্ধন ও ভাস্কর বর্মণের হাতে গৌড় রাজ্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, অন্যদিকে ভূস্বামীরা প্রত্যেকেই বাংলার রাজা হওয়ার কল্পনায় একে অন্যের সাথে সংঘাতে মেতে ওঠে। কেন্দ্রীয়শাসন শক্ত হাতে ধরার মতো তখন কেউ ছিল না। এ অরাজকতার সময়কালকে ধর্মপালের 'খালিমপুর' তাম্রশাসনে আখ্যায়িত করা হয়েছে মাৎস্যন্যায় বলে। পুকুরে বড় মাছ ছোট মাছকে ধরে গিলে ফেলার মতো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে বলে 'মাৎস্যন্যায়'। বাংলার সব অধিপতিরা এমন করে ছোট অঞ্চলগুলোকে গ্রাস করছিলেন। এ অরাজকতার যুগ চলে একশ বছরব্যাপী। এ চরম দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্তিলাভের জন্য দেশের প্রবীণ নেতাগণ স্থির করলেন যে তারা পরস্পর বিবাদ বিসংবাদ ভুলে একজনকে রাজপদে নির্বাচিত করবেন এবং সকলেই স্বেচ্ছায় তার প্রভুত্ব স্বীকার করবেন। দেশের জনসাধারণও এ মত সানন্দে গ্রহণ করবে। এর ফলে গোপাল রাজপদে নির্বাচিত হন। গোপালের নেতৃত্বে জনপদে শান্তি নেমে আসে। উল্লিখিত আলোচনা উদ্দীপকের ঘনশ্যাম বাবুর নেতা নির্বাচিত হওয়ার ঘটনারই অনুরূপ।
সুতরাং বলা যায়, বাংলার দীর্ঘদিনের অরাজকতা তথা মাৎস্যন্যায়ের অবসানের মধ্য দিয়েই পাল বংশের শাসনের সূচনা হয়েছিল।
পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার হয় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে।
জন্মলগ্ন থেকে পাকিস্তানে তিনটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গৃহীত হয়। প্রথমটি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে ১১৩ কোটি ও ৫০০ কোটি রুপি, দ্বিতীয়টি বরাদ্ধ ছিল ৯৫০ কোটি রুপি এবং ১৩৫০ কোটি রুপি। তৃতীয়টিতে পূর্ব ও পশ্চিমের জন্য বরাদ্দ যথাক্রমে ৩৬% ও ৬৩%। রাজধানী উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ বেশিরভাগ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য। প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও বৈষম্যের এই চিত্র ছিল অপরিবর্তিত। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ৪২০০০ কর্মকর্তার মধ্যে বাঙালি ছিল মাত্র ২৯০০ জন। পূর্ব পাকিস্তানিদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের এ ধারা সামরিক ক্ষেত্রেও অব্যহত ছিল। ১৯৬৬ সালে সামরিক বাহিনীর মোট ১৭ জন শীর্ষ কর্মকর্তার মাত্র একজন ছিলেন বাঙালি। যেমনটি উদ্দীপকের পোস্টারেও প্রতিফলিত হয়েছে।
উদ্দীপকের পোস্টারে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বিভিন্ন বৈষম্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, উন্নয়ন খাতে পূর্ব ও পাকিস্তানের ব্যয় যথাক্রমে ৩০০০ ও ৬০০০ কোটি টাকা। পূর্ব পাকিস্তানে চাউল, আটা, সরিষার তৈল ও স্বর্ণের মূল্য পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বিগুণ। এসব তথ্য উপরে আলোচিত অর্থনৈতিক বৈষম্যের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। পোস্টারে আরো দেখা যায়, কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ১৫ জন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের শতকরা ৮৫ জন নিয়োগ পায়। যা প্রশাসনিক বৈষম্যেকে নির্দেশ করে। আবার সামরিক বিভাগের চাকরিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের যথাক্রমে শতকরা ১০ জন ও শতকরা ৯০ জনের নিয়োগ পূর্ব পাকিস্তানের যথাক্রমে শতকরা ১০ জন ও শতকরা ৯০ জনের নিয়োগ পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বৈষম্যকে উঙ্গিত করে।
দুই পাকিস্তানের মধ্যে যেসব বৈষম্য ছিল তার মধ্যে রাজনৈতিক বৈষম্য অন্যতম। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মের পর থেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানকে রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করে পশ্চিম পাকিস্তানের মুখাপেক্ষী করে রাখা হয়। বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ওপর নির্যাতন চালিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশ অচল করে রাখা হয়। পাকিস্তানের প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি ছিল সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তাগণ। ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের মন্ত্রণালয়গুলোতে শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার ৯৫৪ জনের মধ্যে বাঙালি ছিল ১১৯ জন। ১৯৪৭ সালে করাচিতে রাজধানী হওয়ায় সকল সরকারি অফিস-আদালতে পশ্চিম পাকিস্তানিরা ব্যাপক হারে চাকরি লাভ করে। সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব ছিল অতি নগণ্য।
শিক্ষাক্ষেত্রেও পূর্ব পাকিস্তানিরা বেশি বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদের নিরক্ষর রাখার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। পশ্চিম পাকিস্তানে শিক্ষা বিস্তারের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষাবিস্তারের জন্য কোনো চেষ্টা করা হয়নি। সামাজিক বৈষম্যের ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, হাসপাতাল, ডাকঘর, টেলিফোন প্রভৃতির ক্ষেত্রে বাঙালিদের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তান বেশি সুবিধা ভোগ করত।
সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বাঙালিরা পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। দুই অঞ্চলের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাংলা ভাষাকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করে এবং বাংলা ভাষাকে আরবি বর্ণে লেখার ষড়যন্ত্র শুরু করে।
পরিশেষে বলা যায়, উল্লিখিত প্রত্যেকটি বৈষম্য বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলন সংঘটনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা পালন করেছিল। যেমন- সাংস্কৃতিক বৈষম্যের প্রথম প্রতিবাদ ছিল ভাষা আন্দোলন, যার সফলতার সূত্র ধরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে। আর এ চেতনাই পরবর্তীকালে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের পথকে সুগম করে তোলে।
স্বদেশী আন্দোলনের ব্যর্থতা বাংলার স্বাধীনতাকামী দেশপ্রেমী যুব সমাজকে সশস্ত্র বিপ্লবের পথে ঠেলে দেয়। এ সংগ্রামের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করার গোপন তৎপরতার সূত্রপাত ঘটে। ফলে এ আন্দোলন ধীরে ধীরে বিভিন্ন অঞ্চলে অতর্কিত বোমা হামলা, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী হত্যা, গেরিলা পদ্ধতিতে খণ্ডযুদ্ধ ইত্যাদি ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ্যে চলে আসতে থাকে।
স্বদেশী আন্দোলনের মূল কর্মসূচি ছিল দুটি- 'বয়কট' ও 'স্বদেশী'। 'বয়কট' আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিলেতি পণ্য বর্জন। ক্রমেই 'বয়কট' শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহার হতে থাকে। 'বয়কট' বলতে শুধু বিলেতি পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিলেতি শিক্ষা বর্জনও কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। ফলে স্বদেশী আন্দোলন শিক্ষাক্ষেত্রেও জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনে রূপ নেয়। এর ফলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বেশকিছু জাতীয় বিদ্যালয় স্থাপিত হয় এবং কয়েকটি কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্রও গড়ে ওঠে। সভা-সমিতির মাধ্যমে স্থানে স্থানে বিলেতি পণ্য বর্জন ও দেশিও পণ্য ব্যবহারের শপথ নেওয়া হয়। ফলে বিলেতি পণ্যের চাহিদা কমতে থাকে এবং বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে এ সময় দেশি তাঁতবস্ত্র, সাবান, লবণ, চিনি ও চামড়াজাত দ্রব্য তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে। উদ্দীপকে দেখা যায়, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় 'ক' গ্রামের কৃষকগণ নিজ উদ্যোগে মাঠে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিক ফসল উৎপাদন করে এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়। এটি ছিল তার স্বদেশী আন্দোলন ভাবনার বহিঃপ্রকাশ।
উদ্দীপকের ছকে যে চারটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে তা স্বদেশী আন্দোলনের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন ব্যর্থ হবার পর বিপ্লবী তৎপরতার মাধ্যমে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তাকেই স্বদেশী আন্দোলন বলা হয়। অনেক জাতীয় বিদ্যালয় স্থাপন ও আমাদের জাতীয় সঙ্গীত রচনা ছিল এ আন্দোলনের ফলাফলের বহিঃপ্রকাশ। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের ছকটি স্বদেশী আন্দোলনকেই নির্দেশ করছে।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ১৯০৫ সালের ১৭ জুলাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে 'বয়কট' প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে বিলেতি পণ্য বয়কট, বিলেতি পণ্যে অগ্নিসংযোগ ও ছাত্রদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্জন প্রভৃতি কর্মসূচি গৃহীত হয়। স্বদেশী আন্দোলনের পেছনে একটি সূক্ষ্ম অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। তা হলো দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং দেশকে স্বনির্ভর করে তোলা। এ সময় কিছু আধুনিক শিল্প প্রতিষ্ঠান তাদের কারখানা স্থাপন করে।
বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন সত্ত্বেও মুসলিম সমাজ দূরে থাকার কারণে স্বদেশী আন্দোলন জাতীয় রূপ লাভে ব্যর্থ হয়। গোপনে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে অগ্রসর হলে এ আন্দোলন জনসম্পৃক্ততা হারায়। এছাড়া দরিদ্র সমাজ, নিম্নবর্ণের হিন্দুরা এ আন্দোলনের মর্ম উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। এর ওপর ইংরেজ সরকারের চরম দমননীতি ও পুলিশি অত্যাচারের ফলে আন্দোলন সর্বজনীন এবং জাতীয় রূপ লাভে ব্যর্থ হয়, শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
পরিশেষে বলা যায়, স্বদেশী আন্দোলন নানা সীমাবদ্ধতার ফলে পুরোপুরি সফল না হলেও এ আন্দোলনের এভাবেই দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা স্থাপনের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। ফলে এদেশের অর্থনীতি অনেকটা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
নবীন রাষ্ট্র হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার পরিকল্পনা কমিশন গঠন করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, দারিদ্র্য হ্রাস, প্রবৃদ্ধির হার ৩% থেকে ৫.৫% এ উন্নীতকরণ, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাসসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে পাঁচসালা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই থেকে এ পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়।
উদ্দীপকের '?' চিহ্নিত স্থানটি আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ দলিল 'বাংলাদেশ সংবিধান' কে নির্দেশ করছে।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ গণপরিষদে আদেশ জারি করেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে গণপরিষদ গঠন করা হয়। গণপরিষদে এই আদেশ জারির মধ্য দিয়ে সংবিধান প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হয়। আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টি বঙ্গবন্ধুকে গণপরিষদের নেতা নির্বাচন করেন। গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে দ্রুততার সাথে | সংবিধান খসড়া প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট এই খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি ১৯৭২ সালের ১১ অক্টোবর তাদের কাজ সম্পন্ন করেন। এই খসড়া সংবিধান দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর সংবিধান বিল গণপরিষদে পাস হয়। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রথম বিজয় দিবসে সংবিধান গৃহীত হয়। মাত্র ৯ মাসে প্রণীত হয় এই সংবিধান। সংবিধান বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় রচিত হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় উন্নতমানের এবং সুলিখিত দলিল এই সংবিধান। বর্তমানে এই সংবিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালিত হচ্ছে। উদ্দীপকে দেখা যায়, একটি সংস্থা তাদের প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠু এবং সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য কিছু নীতিমালা নির্ধারণ করে তারা মাত্র ৯ মাসে এ নীতিমালা প্রণয়ন করেছিল। নীতিমালাগুলো লিখিত আকারে বাংলায় এবং ইংরেজিতে প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি স্বাভাবিকভাবে তাদের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করে।
উদ্দীপকে উল্লেখিত সালগুলোর ধারাক্রম পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, এগুলো বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকালীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাথে সম্পর্কিত, যা উপরের আলোচনায় প্রতিফলিত হয়েছে। অতএব এটি স্পষ্ট যে, '?' চিহ্নিত স্থানটি বাংলাদেশ সংবিধানের প্রতিনিধিত্ব করছে।
উক্ত বিষয়টি অর্থাৎ ১৯৭২ সালের সংবিধানের নীতিমালার মাধ্যমেই জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে- উক্তিটি যথার্থ।
দীর্ঘ ২৪ বছর পাকিস্তানের অধীনে শোষিত ও নির্যাতিত হওয়ার পর বাঙালি জাতি যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল তার প্রতিফলন ঘটেছে যুদ্ধ পরবর্তীকালে প্রণীত হওয়া ১৯৭২ সালের সংবিধানে। বাঙালিরা দীর্ঘকাল লড়াই করেছে একটি শোষণহীন, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য। ১৯৭২ সালের সংবিধান বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই সংবিধানে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার কথাও বলা হয়েছে সংবিধানে। ১৯৭২ সালের সংবিধান সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করেছে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতিও নিষিদ্ধ করে রাষ্ট্রের এ সর্বোচ্চ আইন। এ সংবিধান ছিল একটি লিখিত দলিল। এছাড়া বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের সংবিধানের নীতিমালার আলোকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং উন্নয়নে অবদান রাখছে।
সুতরাং বলা যায়, ১৯৭২ সালের সংবিধানের নীতিমালার মাধ্যমেই জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে।
উদ্দীপকের 'ক' ছকের তথ্যগুলো ১৭৫৭ সালের ঐতিহাসিক 'পলাশীর যুদ্ধ'-এর সাথে সম্পৃক্ত।
ছকে উল্লিখিত মীর মদন, মোহন লাল ও ফরাসি সেনাপতি সিনফ্রে ছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিশ্বস্ত সেনাপতি যারা পলাশীর যুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করেছিলেন। অন্যদিকে, মীর জাফর ছিলেন নবাবের প্রধান সেনাপতি, যিনি এই যুদ্ধে ইংরেজদের সাথে আঁতাত করে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। এই চরিত্রগুলো সরাসরি পলাশীর যুদ্ধের সাথে জড়িত।
পলাশী যুদ্ধের পেছনে ইংরেজদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণই প্রধান কারণ ছিল। নবাব সিরাজউদ্দৌলা সিংহাসনে বসার পর ইংরেজরা তাঁকে কোনো উপঢৌকন পাঠায়নি এবং সৌজন্য সাক্ষাৎ করেনি। তারা নবাবের নিষেধ অমান্য করে কলকাতায় দুর্গ নির্মাণ অব্যাহত রাখে এবং বাণিজ্যের ছাড়পত্র 'দস্তক'-এর চরম অপব্যবহার করে। এছাড়া রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাসকে কলকাতায় আশ্রয় দেওয়া এবং তাকে ফেরত আনতে যাওয়া নবাবের দূতকে অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়ার কারণেই নবাব ক্ষুব্ধ হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হন।
উদ্দীপকের 'খ' ছকের ব্যক্তিবর্গ ১৭৬৪ সালের ঐতিহাসিক 'বক্সারের যুদ্ধ'-এর সাথে সম্পৃক্ত। এই যুদ্ধের ফলাফল বাংলা তথা পুরো উপমহাদেশের ইতিহাসে সত্যিই অপরিসীম ছিল।
ছকে উল্লিখিত বাংলার নবাব মীর কাসিম, অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা (উদ্দীপকে সুজাউদ্দীন) এবং দিল্লির সম্রাট শাহ আলম একত্রিত হয়ে ইংরেজ সেনাপতি মেজর মনরোর বাহিনীর বিরুদ্ধে বক্সার নামক স্থানে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সম্মিলিত বাহিনী ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়। বক্সার যুদ্ধের ফলে মীর কাসিমের স্বাধীনতা রক্ষার শেষ চেষ্টাও সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়ে যায়। এ যুদ্ধে শুধু বাংলার নবাবই পরাজিত হননি, বরং ভারতবর্ষের সম্রাট এবং অযোধ্যার নবাবও পরাজিত হয়েছিলেন। ভারতবর্ষের তিন বৃহৎ শক্তির এই যৌথ পরাজয়ের ফলে ইংরেজদের ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সামরিক মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তারা বিনা বাধায় এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের একচেটিয়া সুযোগ লাভ করে। বক্সারের যুদ্ধের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী ও অপরিসীম ফলাফল ছিল দেওয়ানি লাভ। এই যুদ্ধের পরপরই ১৭৬৫ সালে রবার্ট ক্লাইভ দিল্লির সম্রাটের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের পূর্ণ ক্ষমতা লাভকরেন। এর ফলে ইংরেজদের অধিকার যেমন আইনগত স্বীকৃতি পায়, তেমনি তারা অর্থনৈতিকভাবেও অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে। স্বাধীন নবাব পরিণত হন ক্ষমতাহীন পুতুলে। মূলত বক্সারের যুদ্ধের মাধ্যমেই বাংলায় প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের শক্ত ভিত রচিত হয়েছিল। তাই প্রশ্নোক্ত উক্তিটি সম্পূর্ণ যথার্থ।
উদ্দীপকের 'তথ্য-১' ছকটি পাকিস্তানের ইতিহাসে অনুষ্ঠিত ১৯৭০ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ইঙ্গিত বহন করে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের আসন নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য জাতীয় পরিষদে 'সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ মোট ১৬৯টি এবং প্রাদেশিক পরিষদে ৩১০টি আসন নির্ধারিত ছিল। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য জাতীয় পরিষদে ১৪৪টি এবং প্রাদেশিক পরিষদে ৩১১টি আসন ছিল। এ নির্বাচনের ফলাফল পূর্ব পাকিস্তানকে একটি পৃথক অঞ্চল হিসেবে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছিল।
উদ্দীপকের তথ্য-১ এ 'ক' ও 'খ' অঞ্চলের আসন সংখ্যা পাঠ্যবইয়ে বর্ণিত ১৯৭০ সালের পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের আসন সংখ্যার সাথে হুবহু মিলে যায়। উক্ত নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ অভাবনীয় সাফল্য লাভ করে। আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। একইভাবে, প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টি আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসন পেয়ে বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করে। এ বিজয় স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথ প্রশস্ত করেছিল।
উদ্দীপকের 'তথ্য-২' এ উল্লিখিত সরকারটি হলো ১০ই এপ্রিল গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার, যা ইতিহাসে 'মুজিবনগর সরকার' নামে পরিচিত।
মুক্তিযুদ্ধ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠন করার লক্ষ্যে এই সরকার গঠিত হয়েছিল। ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলায় এ সরকার শপথ গ্রহণ করে। শেখ মুজিবুর রহমানকে এই সরকারের রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়।
উদ্দীপকের তথ্য-২ এ দেখা যায়, একটি সরকার গঠিত হয়েছে ১০ই এপ্রিল এবং শপথ নিয়েছে ১৭ই এপ্রিল, যার সদর দপ্তর ছিল কলকাতায়। এই তথ্যগুলো মুজিবনগর সরকারের গঠন ও কার্যক্রমের সাথে সম্পূর্ণ মিলে যায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন এদেশের নিরীহ মানুষের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন মুজিবনগর সরকার ভারতে বসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছে। এই সরকারের বলিষ্ঠ কূটনৈতিক তৎপরতার ফলেই ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়। তারা বিদেশি গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার চিত্র
প্রদত্ত চিত্রে ইতিহাসের অলিখিত বা প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান প্রদর্শিত হয়েছে।
যেসব বস্তু বা উপদান থেকে আমরা বিশেষ সময়, স্থান বা ব্যক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক তথ্য পায়, সেই উপাদানই ইতিহাসের অলিখিত উপাদান। যেমন- লিপিমালা, মুদ্রা, স্থাপত্য ভাস্কর্য ও স্মৃতিসৌধ, মৃৎশিল্প, মৃৎপাত্র, তৈজসপত্র, মূর্তি, তলোয়ার ইত্যাদি। আমরা মুদ্রা থেকে বিভিন্ন রাজার রাজত্বের সময়কাল, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সমাজব্যবস্থা ও ধর্মবিশ্বাস প্রভৃতি সম্পর্কে জানতে পারি। মুদ্রায় রাজার নাম, সন-তারিখ, রাজার মূর্তি, নানা দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করা থাকে। শিলালিপি হলো পাথরের গায়ে লিখিত লিপি। যুদ্ধবিগ্রহ, ভূমিদান, রাজার আদেশ, রাজার নাম, রাজ্য জয়, রাজত্বকাল, ধর্ম, বিশ্বাস প্রভৃতি বিষয়গুলো আমরা শিলালিপি থেকে জানতে পারি। এছাড়াও স্থাপত্য নিদর্শন, স্মৃতিস্তম্ভ, সমাধি, শিল্পকীর্তি, মৃৎশিল্প, মৃৎপাত্র ও তৈজসপত্রাদিও অলিখিত উপাদানের অন্তর্ভুক্ত। উদ্দীপকের পোড়ামাটির পাত্র ও প্রত্নবস্তুগুলো প্রাচীন নিদর্শন ইতিহাসের অলিখিত উপাদানকে নির্দেশ করে।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকের প্রত্নবস্তু গুলো মাটির পাত্র ও প্রত্নবস্তু ইতিহাসের অলিখিত তথা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে ইঙ্গিত করেছে।
না। আমি মনে করি শুধুমাত্র উক্ত উপাদান তথা অলিখিত উপাদানের ইতিহাস সাহায্যে ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়।
উদ্দীপকে ইতিহাসের অলিখিত উপাদান চিত্রায়িত করা হয়েছে। কিন্তু অলিখিত উপাদানই প্রাচীন ইতিহাস জানার একমাত্র উপায় নয়। পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় অলিখিত উপাদানের পাশাপাশি লিখিত উপাদানও প্রয়োজন। তথ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এ কারণেই ইতিহাসের উপাদানকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- লিখিত উপাদান ও অলিখিত উপাদান। ইতিহাস রচনার লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সাহিত্যকর্মেও তৎকালীন সময়ের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তাছাড়া বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ সবসময়ই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে, অলিখিত উপাদান যেমন- মুদ্রা, শিলালিপি, স্তম্ভলিপি, তাম্রলিপি, ইমারত ইত্যাদি। এসব নিদর্শন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশ্লেষণের ফলে সে সময়ের অধিবাসীদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অতএব বলা যায়, শুধু অলিখিত উপাদান দ্বারাই প্রাচীন ইতিহাস রচনা করা যায় না। তাই লিখিত উপাদান ও অলিখিত উভয় দ্বারা একটি জাতির সার্বিক ইতিহাস রচনা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, উক্ত উপাদান তথা ইতিহাসের অলিখিত উপাদান বা প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনের মাধ্যমে একটি জাতির পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে লিখিত উপাদানেরও প্রয়োজন রয়েছে।