উদ্দীপকের ছকটি বাংলার মধ্যযুগের মুসলিম শাসনামলের শায়েস্তা খানের শাসনামলকে নির্দেশ করছে।
বাংলার মুঘল স্থাপত্যকলার বিস্তারের ক্ষেত্রে শায়েস্তা খানের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ১৬৬৩ সালে শায়েস্তা খান ছোট কাটরা নির্মাণ করেন। এটি বড় কাটরা থেকে ২০০ গজ দূরে অবস্থিত। লালবাগের কেল্লা আজও শায়েস্তা খানের শাসনকালকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তার শাসনকালের পূর্বেই এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তিনি এটি শেষ করার পদক্ষেপ নেন। ১৬৯০ সালে ইব্রাহিম খানের শাসনকালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। লালবাগ দুর্গের ভেতর রয়েছে শায়েস্তা খানের কন্যা 'বিবি পরির সমাধি সৌধ'। মার্বেল পাথরে নির্মিত এ সমাধি ভবনটি এখন পর্যন্ত এদেশে সর্বাধিক সুন্দর মুসলিম স্মৃতিসৌধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৬৭৬ সালে শায়েস্তা খান হোসেনী দালান নির্মাণ করেন। চকবাজারের মসজিদ, বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত শায়েস্তা খানের মসজিদ ও সাতগম্বুজ মসজিদের সাথে শায়েস্তা খানের নাম জড়িয়ে আছে।
অতএব, উদ্দীপকের ছকটি শায়েস্তাখানের শাসনামলকে নির্দেশ করে।
উক্ত আমল তথা মধ্যযুগের মুসলিম শাসনামলের শিল্পকীর্তি সমূহ বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে এক সুদূর প্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। মন্তব্যটি যথার্থ। -
মুসলমান শাসকগণ ইসলামের গৌরবকে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং নিজেদের শাসন কালকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলার বিভিন্ন স্থানকে স্থাপত্যের অলংকার শিল্পে সাজিয়েছেন। এসময়ে স্বাধীন বাংলার মুসলমান সুলতানদের রাজধানী প্রথমে ছিল গৌড়, পরে পান্ডুয়া। এ দু'শহরেই প্রথমে বাংলার স্থাপত্যশিল্প গড়ে উঠেছিল। ১৩৬৯ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান সিকান্দার শাহ 'আদিনা মসজিদ' নির্মাণ করেন। এ মসজিদের উত্তর পাশে সিকান্দার শাহের কবর নির্মিত হয়েছিল। বর্তমান সোনারগাঁয়ে গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের কবর আছে। এ কবরের অতি নিকটে পাঁচটি দরগাহ ও পাঁচটি মসজিদ আছে। বাগেরহাট জেলার 'ষাট গম্বুজ মসজিদ' বাংলার মুসলমানদের শাসনকালের গৌরব বৃদ্ধি করেছে। কদম রসুল গৌড়ে অবস্থিত। সরৎ শাহ এ ভবন নির্মাণ করেন। এছাড়া রুকনউদ্দিন বরবক শাহ নির্মিত গৌড়ের দাখিল দরওয়াজা ও আলাউদ্দিন হুসেন শাহের সমাধি তোরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গৌড়ের ফিরুজ মিনার স্থাপত্য শিল্পের এক উৎকৃষ্ট নিদর্শন। বাংলার স্থাপত্য শিল্পের ইতিহাসে এসব গুরুত্বপূর্ণ অবদান বা স্থাপত্যের জন্যই মধ্যযুগকে বাংলায় মুঘলদের স্বর্ণযুগ বলা হয়।
অতএব বলা যায়, মধ্যযুগের মুসলিম আমলের স্থাপত্যগুলো বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
উদ্দীপকে'?' চিহ্নিত স্থানটি ইংরেজ আমলের খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনকে নির্দেশ করছে।
উদ্দীপকের ছকে যে তথ্যগুলো রয়েছে তা খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের ইঙ্গিত দেয়। ১৯১৯ সালে মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলীর নেতৃত্বে খিলাফত এবং স্বরাজের দাবিতে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। হিন্দু ও মুসলমানের মিলিত সংগ্রাম হিসেবে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আন্দোলন দুটি ছিল ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম ব্যাপক ও জাতীয়ভিত্তিক গণআন্দোলন। হিন্দু-মুসলমানের এ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। তুরস্কের খলিফার মর্যাদা ও তুরস্কের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য ভারতীয় মুসলিম সমাজ এ আন্দোলন গড়ে তোলে। অপরদিকে, অসহযোগ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ভারতের জন্য স্বরাজ অর্জন। তবে ১৯২৩ সালে তুরস্কে খিলাফত ব্যবস্থার অবসান ঘটলে খিলাফত আন্দোলন তার আবেদন হারায় এবং ১৯২২ সালে গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেন।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
উক্ত আন্দোলন পরবর্তীতে সর্বভারতীয় গণআন্দোলনে রূপ নেয়। - উক্তিটি যথার্থ ও যুক্তিযুক্ত।
আপাত দৃষ্টিতে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন ব্যর্থ হয়। কিন্তু এ দুটি ছিল ভারতের প্রথম গণআন্দোলন। এর আগে পর্যন্ত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে পরিচালিত আন্দোলনগুলো ছিল মূলত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির দ্বারা পরিচালিত। খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনেই সর্বপ্রথম ভারতের সব শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষ ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। ফলে এ দুটি আন্দোলন গণসংগ্রামে পরিণত হয়। এ আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয়দের মধ্যে যে সংগ্রামের অভিজ্ঞতা অর্জিত হয় তা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করে স্বাধীনতা অর্জনকে ত্বরান্বিত করে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে নিঃসন্দেহে বলা যায়, ব্রিটিশ ভারতের স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের গুরুত্ব ও প্রভাব অপরিসীম। খিলাফত আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল তুরস্কের খিলাফত রক্ষা এবং অসহযোগ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল স্বরাজ অর্জন। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ভিন্নতা থাকলেও আন্দোলন দুটি যুগপৎ ও যৌথ নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। উভয় আন্দোলনই পরিচালিত হয় ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এ দুটি আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।
দৃশ্যপট-২ : রিমন টিভিতে 'রাজা রামমোহন' সিনেমা দেখে জানতে পারল যে, এ শিক্ষানুরাগী মনীষী সমাজে ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার ও বিভিন্ন কুসংস্কার দূর করার মহান ব্রত হাতে নিয়েছিলেন।
দৃশ্যপট-১-এ ইংরেজ আমলের মহীয়সী বেগম রোকেয়ার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠেছে।
উদ্দীপকে দৃশ্যপট-১ এ দেখা যায়, সেলিনার বাল্যবিবাহ হলেও পরবর্তীতে স্বামীর উৎসাহে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং নিজ গ্রামে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়। তার নিজ গ্রামে নারীদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠাও করেন। যার সাথে বেগম রোকেয়া সাদৃশ্যপূর্ণ। বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালে রংপুরের মিঠাপুকুরে এক রক্ষণশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবারের মেয়েরা ছিল খুবই পর্দানশিল। স্বভাবতই রোকেয়া বিদ্যালয়ে শিক্ষার সুযোগ পাননি। তিনি তার বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের এবং বড় বোন করিমুন্নেসার কাছে শিক্ষা লাভ করেন। তাকে পড়াশোনা করতে হতো গভীর রাতে যাতে বাড়ির লোক টের না পায়। বড় ভাইয়ের একান্ত চেষ্টায় তিনি উর্দু, আরবি, বাংলা, ফারসি ও ইংরেজি শিক্ষা লাভ করেন। কিশোর বয়স থেকেই তিনি সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। তার 'অবরোধবাসিনী', 'পদ্মরাগ', 'সুলতানা স্বপ্ন' প্রভৃতি গ্রন্থে নারী সমাজের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি তার প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাসের মধ্য দিয়ে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গ সমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। তার স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি স্বামীর নামে ভাগলপুরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৯১১ সালে তিনি কোলকাতায় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল উর্দু প্রাইমারি স্কুল স্থাপন করেন। ১৯৩১ সালে এটি উচ্চ ইংরেজি গার্লস স্কুলে উন্নীত হয়। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯১৬ সালে কোলকাতায় আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন।
পরিশেষে বলা যায়, দৃশ্যপট-১ এ ইংরেজ আমলের বেগম রোকেয়ার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠেছে।
আধুনিক ভারতের রূপকার রাজা রামমোহন তৎকালীন সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক গতিধারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। নিজের চিন্তাধারার আলোকে নতুন সমাজ গঠনে প্রয়াসী হন। তিনি হিন্দু সমাজের সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, কৌলীন্য প্রথা ও অন্যান্য কুসংস্কার দূর করতে প্রচেষ্টা চালান। তাছাড়া তিনি সব কুসংস্কার দূর করে আদি একেশ্বরবাদের ভিত্তিতে হিন্দুধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হন। হিন্দুধর্মের সংস্কার তথা নিজ ধর্মীয় মতবাদ প্রচারের উদ্দেশ্যে আত্মীয় সভা নামে একটি সমিতি গঠন করেন। ১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট তিন ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। এর পরে ব্রাহ্মসমাজের উপাসনালয় স্থাপন করেন। তার ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা উপমহাদেশের ধর্মীয় ইতিহাসে এক নবযুগের সূচনা করে। শুধু সামাজিক আর ধর্মীয় বিষয় নয়, শিক্ষা বিস্তারেও তার অবদান ছিল। রাজা রামমোহন ১৮২২ সালে কোলকাতায় 'অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল' প্রতিষ্ঠা করেন।
পরিশেষে বলা যায়, আধুনিক ভারতের রূপকার হিসেবে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান অনস্বীকার্য।
মানুষ কর্তৃক সম্পাদিত সকল বিষয়ই ইতিহাসের আওতাভুক্ত। মানুষের চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনা, কার্যক্রম যতো শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত, ইতিহাসের সীমাও ততদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন যা মানব সভ্যতার উন্নতি ও অগ্রগতিতে অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে তা সবই ইতিহাসভুক্ত বিষয়। এজন্যই বলা হয়, মানবসমাজের অনন্ত ঘটনাপ্রবাহই হলো ইতিহাস।
যেসব বস্তু বা উপাদান থেকে বিশেষ সময়, স্থান বা ব্যক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়, সেসব বস্তু বা উপাদানই প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন। আর প্রত্নতত্ত্ব নির্দশনসমূহকে ইতিহাসের অলিখিত উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেমন- লিপিমালা, মুদ্রা, স্থাপত্য-ভাস্কর্য ও স্মৃতিসৌধ প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ, পুঁথি ইত্যাদি। এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে কোনো বিশেষ সময় ও অঞ্চলের অধিবাসীদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
উদ্দীপকে প্রদত্ত চিত্রটি হলো নরসিংদীর উয়ারী বটেশ্বর নামক স্থানে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। কাজেই বলা যায়, উদ্দীপকে প্রদত্ত চিত্রগুলি হলো ইতিহাসের অলিখিত বা প্রত্নতত্ত্ব উপাদান।
ইতিহাসের উপাদানকে দুভাগে ভাগ করা হয়। যথা- লিখিত ও অলিখিত উপাদান। সঠিক ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে এ দু'ধরনের উপাদানই গুরুত্বপূর্ণ। লিখিত উপাদানের মাধ্যমে আমরা প্রাচীন সময়ের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিকসহ প্রায় সব বিষয়ের বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা পেয়ে থাকি, যা অলিখিত উপাদানের মাধ্যমে জানা যায় না। এছাড়া অলিখিত উপাদানের তুলনায় লিখিত উপাদান ইতিহাস রচনায় সব সময়ই বেশি নির্ভরযোগ্য। যেমন- মধ্যযুগের উপমহাদেশের ইতিহাস রচনায় সে সময়ের স্থাপত্যকর্মগুলো আমাদেরকে যতটুকু না সাহায্য করে তার চেয়ে সমকালীন ইতিহাসবিদদের রচনা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের আত্মজীবনী অনেকগুণ বেশি সহায়ক হয়।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে কোনো বিশেষ সময় ও অঞ্চলের মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে ধারণা করা যায় মাত্র, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস জানা সম্ভব হয় না। এসব উপাদান থেকে মানুষের অতীত সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে মৌলিক ও অকাট্য তথ্য পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব বাংলার সন্তান হয়ে ও ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ৫০ বছর ধরে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুপরিচিত নাম ছিল এ. কে ফজলুল হক। বাংলার মানুষের কাছে যার পরিচিতি ছিলো শেরে বাংলা হিসেবে। লাহোর প্রস্তাবই খ্যাতিমান করে তুলেছিলো এ. কে ফজলুল হককে।
লাহোর প্রস্তাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অঞ্চলগুলো নিয়ে রাষ্ট্রসমূহ গঠন করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৬ সালের ৯ই এপ্রিল দিল্লিতে মুসলিম লীগের দলীয় আইনসভার সদস্যদের এক কনভেনশনে নীতি-বহির্ভূতভাবে জিন্নাহ 'লাহোর প্রস্তাব' সংশোধনের নামে ভিন্ন একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলসমূহ নিয়ে একটি রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়। লাহোর প্রস্তাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অঞ্চলগুলো নিয়ে একাধিক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কাজেই বলা যায়, উদ্দীপকের ছবিটি ইংরেজ শাসন আমলের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অবস্থানগুলো নিয়ে রাষ্ট্রসমূহ গঠন করার কথা বলা হয়েছিল।
লাহোর প্রস্তাবের প্রতি কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এই প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা করেন। তবে ঐতিহাসিক সত্য এই যে, লাহোর প্রস্তাবের পর থেকে মুসলমান সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব আলাদা রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে থাকে। এ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের রাজনৈতিক-শাসনতান্ত্রিক আন্দোলনে এক নতুন ধারার জন্ম হয়। দ্বি-জাতি তত্ত্বের মাধ্যমে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলমানদের আলাদা জাতি হিসেবে চিহ্নিত করতে থাকেন। সে অনুযায়ী মুসলমানদের জন্য ভিন্ন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা শুধু সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এরপর থেকে মুসলিম লীগ এবং জিন্নাহর রাজনীতি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ার দিকে ধাবিত হতে থাকে; যার শেষ পরিণতি ছিল ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসের দেশ বিভাগ। দ্বি-জাতি তত্ত্বের বাস্তব পরিণতিতে ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ই আগস্ট ভারত নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
সুতরাং বলা যায়, ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের উপর নির্ভর করে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল।
উদ্দীপকের ছবিটি ব্রিটিশ বিরোধী মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীরের ধর্মীয় সংস্কার বা ওয়াহাবি আন্দোলনের তথা কৃষক বিদ্রোহের সাক্ষ্য বহন করে।
উদ্দীপকের ছবিটি ঐতিহাসিক বাঁশের কেল্লার, যা তিতুমীরের স্বাধীনতা সংগ্রামের নিদর্শন। উনিশ শতকে ভারতবর্ষে মুসলমান সমাজে এক ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। বাংলায় তার দুটি ধারা ছিল যার একটি হলো ওয়াহাবি আন্দোলন। তিতুমীর এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৮২৭ সালে হজব্রত পালন শেষে তিতুমীর দেশে ফিরে ধর্ম সংস্কার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তার এ ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনে বহু মুসলমান বিশেষ করে চব্বিশ পরগনা, নদীয়া জেলার বহু কৃষক, তাঁতি সাড়া দেয়। ফলে জমিদাররা মুসলমান প্রজাদের ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং তাদের প্রতি নানা নির্যাতনমূলক আচরণ শুরু করে। তিতুমীর এ অত্যাচারের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে সুবিচার চেয়ে ব্যর্থ হন। শেষপর্যন্ত তিনি ও তার অনুসারীরা সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ অবলম্বন করেন। ১৮৩১ সালে নারিকেলবাড়িয়া এসে তিতুমীর তার প্রধান ঘাঁটি স্থাপন করেন। নির্মাণ করেন শক্তিশালী এক বাঁশের কেল্লা।
অতএব উদ্দীপকের ছবিটি ইংরেজ শাসনামলের তিতুমীরের বিদ্রোহকে নির্দেশ করে।
১৮২৭ সালে তিতুমীর যে ধর্মীয় সংস্কার কাজে আত্মনিয়োগ করেন তার এ আন্দোলনে বহু মুসলমান, কৃষক, তাঁতি যোগদান করে। ইংরেজ, জমিদার, নীলকরদের দ্বারা নির্যাতিত কৃষকরা দলে দলে তিতুমীরের বাহিনীতে যোগ দিলে ধর্ম সংস্কারে রূপ নেয়। ফলে শাসক-শোষক জমিদার শ্রেণি কৃষকদের সংঘবদ্ধতা এবং তিতুমীরের শক্তি বৃদ্ধিতে শঙ্কিত হয়ে ওঠে। শেষপর্যন্ত ১৮৩১ সালে তিতুমীরের বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকার এক বিশাল সুশিক্ষিত সেনাবাহিনী প্রেরণ করে। মেজর স্কটের নেতৃত্বে এ বাহিনী তিতুমীরের নারিকেলবাড়িয়া বাঁশের কেল্লা আক্রমণ করে। ইংরেজদের কামান-বন্দুকের সামনে বীরের মতো লড়াই করে পরাজিত হয় তিতুমীরের বাহিনী। তিনি যুদ্ধে শহিদ হন। গোলার আঘাতে বাঁশের কেল্লা ভেঙে যায়। এভাবেই পরিসমাপ্তি ঘটে একটি সুসংগঠিত কৃষক আন্দোলনের। তিতুমীর ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ব্যাপক কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইংরেজদের গোলাবারুদ, নীলকর, জমিদারদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে তার বাঁশের কেল্লা ছিল দুঃসাহস আর দেশপ্রেমের প্রতীক, যা যুগে যুগে বাঙালিকে অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাহস যুগিয়েছে, প্রেরণা যুগিয়েছে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যেতে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী 'পোড়ামাটি নীতি' অনুযায়ী বাংলাদেশের সব সম্পদ ও প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিতে চেয়েছে। যে কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, ঘর-বাড়ি, হাসপাতাল, মসজিদ, মন্দির কোনো কিছুই তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। তাদের লক্ষ্য ছিল এই ভূখণ্ডের মানুষদের হত্যা করে কেবল ভূমির দখল নেওয়া।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করার জন্য ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান এবং যোগ্যতা অনুযায়ী তাদেরকে নিয়োগ দেন। কৃষির উন্নয়নের জন্য তিনি ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেন। ১০০ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিকানা নির্ধারণ করে দেন এবং ২২ লাখের অধিক কৃষক পরিবারকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন। শিক্ষার উন্নয়নের জন্য তিনি ১৯৭২ সালের ২৬শে জুলাই কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। এছাড়াও তিনি ৯০০ কলেজ ভবন ও ৪০০ হাই স্কুল ভবন পুননির্মাণ করেন। প্রায় ৩৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগের উন্নয়নের জন্য বঙ্গবন্ধু নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ঢাকা-আরিচা সড়কের বড়ো বড়ো সেতুসহ ৯৭টি সড়ক সেতু নির্মাণ করা হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত সকল সড়ক ও সেতুর সংস্কার এবং বিমান যোগাযোগের জন্য ১৯৭৩ সালের ১৮ই জুন ঢাকা-লন্ডন রুটে প্রথম ফ্লাইট চালু করেন। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য নবীন রাষ্ট্র হিসেবে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে পরিকল্পনা কমিশন গঠন করেন। এছাড়া সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রথম পাঁচসালা পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮) গ্রহণ করেন যা ১৯৭৩ সালের ১লা জুলাই থেকে কার্যকর হয়।
কাজেই বলা যায়, উদ্দীপকের ছক-১ স্বাধীনতা পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনঃর্গঠনকে নির্দেশ করছে।
দীর্ঘ ২৪ বছর পাকিস্তানের অধীনে শোষিত ও নির্যাতিত হওয়ার পর বাঙালি জাতি যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল তার প্রতিফলন ঘটেছে যুদ্ধ পরবর্তীকালে প্রণীত হওয়া ১৯৭২ সালের সংবিধানে। বাঙালিরা দীর্ঘকাল লড়াই করেছে একটি শোষণহীন, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য। ১৯৭২ সালের সংবিধান বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই সংবিধানে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার কথাও বলা হয়েছে সংবিধানে। ১৯৭২ সালের সংবিধান সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মন্ত্রি পরিষদ শাষিত সবরকার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতিও নিষিদ্ধ করে রাষ্ট্রের এ সর্বোচ্চ আইন। এ সংবিধান ছিল একটি লিখিত দলিল। এছাড়া বাংলাদেশ
১৯৭২ সালের সংবিধানের নীতিমালার আলোকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং উন্নয়নে অবদান রাখছে।
সুতরাং বলা যায়, ছক-২ এ নির্দেশিত বিষয়টি অর্থাৎ ১৯৭২ সালের সংবিধানের নীতিমালার মাধ্যমেই আমাদের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে।
যেসব বস্তু বা উপাদান থেকে আমরা বিশেষ সময়, স্থান বা ব্যক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক তথ্য পাই সে বস্তু বা উপাদানই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ মূলত অলিখিত উপাদান। যেমন- লিপিমালা, তাম্রমুদ্রা, স্থাপত্য-ভাস্কর্য ও স্মৃতিসৌধ প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ, পুঁথি প্রভৃতি। এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশ্লেষণের ফলে সে সময়ের আধিবাসীদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ধারণা করা যায় প্রাচীন অধিবাসীদের সভ্যতা, ধর্ম, জীবনযাত্রা, নগরায়ণ, নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র, ব্যবসায় বাণিজ্যের অবস্থা, কৃষি উপকরণ ইত্যাদি সম্পর্কে।
উদ্দীপকে লক্ষ করা যায়, তাহরিমা কুমিল্লার ময়নামতি যাদুঘর পরিদর্শনে গিয়ে মুদ্রা, শিলালিপি, তাম্রলিপি, পুরনো অলংকার, ইমারত ইত্যাদি দেখতে পায়। তাহরিমার দেখা এ জিনিসগুলো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। যেহেতু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ইতিহাসের অলিখিত উপাদানের অন্তর্ভুক্ত, সেহেতু বলা যায়, তাহরিমার জাদুঘরে দেখা উপাদানগুলোর সাথে ইতিহাসের অলিখিত উপাদানের মিল রয়েছে।
লিখিত ও অলিখিত উপাদানের ওপর ভিত্তি করেই ইতিহাস রচিত হয়ে থাকে। লিখিত উপাদানের মধ্যে সাহিত্য, নথিপত্র, জীবনী, দলিলপত্র, চিঠিপত্র প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, অলিখিত উপাদান মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। মূর্তি, স্মৃতিস্তম্ভ, মুদ্রা, লিপি, ইমারত ইত্যাদি প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান। এসব উপাদানের মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষ ও সমাজের ইতিহাস জানা সম্ভব। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান মানবজীবনের অতীত অগ্রগতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য দিতে পারে না। সেক্ষেত্রে অবশ্যই লিখিত উপাদানের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই ইতিহাস রচনায় ইতিহাসের উভয় উপাদানই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু লিখিত উপাদান কিংবা অলিখিত উপাদান দ্বারা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়। কেননা একটিমাত্র উপাদান ইতিহাস সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য দিতে পারে না। একজন ঐতিহাসিকের দায়িত্ব সমস্ত উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সমন্বয়সাধন করে সঠিক ইতিহাস রচনা করা। ইতিহাস কল্পনাবিলাসী কোনো ভাবের বস্তু নয়। এতে আবেগ প্রাধান্য পায় না। তাই ইতিহাসের উৎস হতে হবে যথার্থ ও বাস্তবধর্মী। আর এক্ষেত্রে ইতিহাসের লিখিত ও অলিখিত উপাদানের সমন্বয়সাধন আবশ্যক।
সুতরাং উপরের আলোচনার শেষে বলা যায়, শুধু অলিখিত উপাদানের মাধ্যমে প্রাচীন ইতিহাস জানা সম্ভব নয়। পূর্ণাঙ্গ প্রাচীন ইতিহাস জানার জন্য অলিখিত উপাদানের পাশাপাশি লিখিত উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ।
দৃশ্য-১: বখতিয়ার খলজি নদীয়া বিজয়ের মাধ্যমে একটি যুগের সূচনা করেন এবং একটি যুগের অবসান ঘটিয়েছেন। এটি করার জন্য তিনি কৌশল প্রয়োগ করেন।
দৃশ্য-২: 'ক' নামক একজন শাসকের মৃত্যুর পর ঐ রাজ্যে দীর্ঘদিন অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা চলেছিল। এরপর বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি রাজবংশের সূচনা হয়। যা বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে - দীর্ঘস্থায়ী রাজবংশ।
দৃশ্য-১ এর ব্যক্তি বখতিয়ার খলজি দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে বাংলায় 'সেন বংশের' শাসনকাল বিদ্যমান ছিল এবং সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও শাসকের বার্ধক্যজনিত দুর্বলতাই ছিল এই বংশের পতনের মূল কারণ। সেন বংশের শেষ প্রতাপশালী রাজা ছিলেন লক্ষণ সেন। তিনি তাঁর রাজত্বকালের প্রথমদিকে একজন দক্ষ যোদ্ধা হিসেবে রাজ্য বিস্তার করলেও শেষ বয়সে এসে তিনি শাসনকার্যে দুর্বল হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিগ্রহ, রাজার বার্ধক্য এবং রাজসভার অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ও অন্তর্বিরোধের ফলে গৌড় সাম্রাজ্য ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে।
উদ্দীপকের দৃশ্য-১ এ বখতিয়ার খলজি নদীয়া বিজয়ের মাধ্যমে কৌশলে পূর্ববর্তী যুগের অবসান ঘটানোর কথা বলা হয়েছে। যা সেন বংশের অবসানের ঘটনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তেরো শতকের শুরুতে বয়োবৃদ্ধ লক্ষণ সেনের দুর্বলতার সুযোগে ১১৯৬ সালে ডোম্মন পাল নামে এক সামন্ত রাজা সুন্দরবন এলাকায় স্বাধীন রাজ্য গড়ে তোলেন, যা সেন সাম্রাজ্যের ভাঙনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। অবশেষে ১২০৪ সালে তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খলজির অতর্কিত নদীয়া আক্রমণের মুখে প্রতিরোধ গড়তে না পেরে রাজা লক্ষণ সেন রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যান। এভাবেই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও দূরদর্শিতার অভাবে - বাংলায় সেন বংশের পতন ঘটে।
দৃশ্য-২ এর রাজবংশ অর্থাৎ পাল বংশের সূচনার পূর্বে বাংলায় 'মাৎস্যন্যায়' নামক চরম অরাজক অবস্থা বিরাজ করছিল এবং স্থানীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের দ্বারা গোপালকে রাজা হিসেবে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই অবস্থার অবসান ঘটেছিল। ! রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় প্রায় একশো বছর কোনো কেন্দ্রীয় শাসক ছিলেন না। ফলে রাজ্যের শক্তিশালী ভূস্বামীরা ছোট ছোট অঞ্চলগুলো গ্রাস করে নিজেদের মধ্যে সংঘাতে মেতে ওঠে। পুকুরে বড় মাছ যেমন ছোট মাছকে গিলে খায়, সমাজেও ঠিক তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, যাকে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে 'মাৎস্যন্যায়' বলা হয়েছে।
'উদ্দীপকের দৃশ্য-২ এ 'ক' নামক এক শাসকের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিনের অরাজকতার পর বাংলার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজবংশের সূচনার কথা বলা হয়েছে। যা পাল বংশকে নির্দেশ করে, এই দীর্ঘস্থায়ী রাজবংশ একটানা চারশো বছর শাসন করা পাল বংশ। পাল রাজত্বের পূর্বে - রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় যে চরম বিশৃঙ্খলা ও অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে মুক্তির জন্যই এই বংশের সূত্রপাত ঘটে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক এই অস্থিতিশীলতা বাংলার সাধারণ জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য বাংলার মানুষ নিজেদের মধ্যকার বিবাদ ভুলে একটি ঐকমত্যে পৌঁছান। তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, স্বেচ্ছায় একজনকে রাজপদে মনোনীত করে তার নেতৃত্ব মেনে নেবেন। এই প্রক্রিয়ায় তারা সাধারণ কিন্তু যোগ্য ব্যক্তি গোপালকে রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেন। গোপালের সিংহাসন আরোহণের মাধ্যমেই বাংলায় 'মাৎস্যন্যায়'-এর মতো এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির চূড়ান্ত অবসান ঘটে এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার যুগ শুরু হয়।
দৃশ্য-১ : 'ক' নামক একজন শাসক তার ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো নৌবাহিনীর গোড়াপত্তন করেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সেতু নির্মাণ ও খাল খনন করেন।
দৃশ্য-২: 'খ' নামক এক ব্যক্তিকে প্রথমে বাংলার দেওয়ান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি তার বিচক্ষণতার দ্বারা বাংলার ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছিলেন। তিনি রাজস্ব ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার করেন।
দৃশ্য-১ এ মধ্যযুগের বাংলার অন্যতম বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সুশাসক সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওজ খলজিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
উদ্দীপকের দৃশ্য-১ এ উল্লিখিত নৌবাহিনীর গোড়াপত্তন, সেতু নির্মাণ ও খাল খননের বিষয়টি ইওজ খলজির শাসনকালের সাথেই হুবহু মিলে যায়। বখতিয়ার খলজি প্রতিষ্ঠিত বাংলার মুসলিম রাজ্যকে শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করতে ইওজ খলজি নানামুখী বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। রাজধানী স্থানান্তর থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মজবুত করা, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং প্রজা কল্যাণে তিনি বেশ কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, নদীমাতৃক বাংলায় রাজ্য বিস্তার ও সুরক্ষার জন্য অশ্বারোহী বাহিনীর পাশাপাশি শক্তিশালী নৌবাহিনী অপরিহার্য। তাই তিনি প্রথম নৌবাহিনীর গোড়াপত্তন করেন। তাছাড়া বার্ষিক 'বন্যার কবল থেকে জনপদ ও শস্যক্ষেত্র রক্ষার্থে তিনি অসংখ্য খাল খনন ও সেতু নির্মাণ করেছিলেন। তার এসব জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপের প্রতিচ্ছবিই উদ্দীপকে ফুটে উঠেছে।
দৃশ্য-২ এর বিচক্ষণ শাসক হলেন নবাব মুর্শিদ কুলি খান, যিনি দেওয়ান থেকে সুবাদার হয়ে নিজ যোগ্যতায় বাংলার রাজস্ব ও শাসন ব্যবস্থায় অতুলনীয় দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন। আঠারো শতকের শুরুতে মুঘল সম্রাটদের দুর্বলতার সুবাদে বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা যখন শোচনীয়, তখন তিনি দৃঢ়তার সাথে শাসন পুনরুদ্ধার করেন। রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করে তিনি কার্যত স্বাধীন নবাবি আমলের সূচনা করেন।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে, শাসক দেওয়ান হিসেবে নিয়োগ পেয়ে বিচক্ষণতার সাথে বাংলার গতিপথ বদলে দেন এবং রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার করেন। ইতিহাসের মুর্শিদ কুলি খানের ক্ষেত্রেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই। তিনি ভূমি জরিপ করে রায়তদের সামর্থ্য অনুযায়ী রাজস্ব নির্ধারণ করেন এবং ১৭২২ খ্রিষ্টাব্দে 'মালজামিনি' প্রথা নামে এক নতুন ভূমি বন্দোবস্ত চালু করেন, যা তার সর্বাধিক আলোচিত কীর্তি। মুর্শিদ কুলি খান মধ্যস্থতাকারীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে প্রজাদের হয়রানি থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তিনি বিদেশি বণিকদের উৎসাহ প্রদান করে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটান। তার এই সুনিপুণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও দৃঢ় নেতৃত্বের ফলেই বিপর্যস্ত বাংলা অর্থনীতি ফিরে পেয়েছিল এক নতুন সমৃদ্ধি। তাই শাসক হিসেবে তার অসামান্য দক্ষতার বিষয়টি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ যথার্থ।
উদ্দীপকের 'ক' ছকের তথ্যগুলো ১৭৫৭ সালের ঐতিহাসিক 'পলাশীর যুদ্ধ'-এর সাথে সম্পৃক্ত।
ছকে উল্লিখিত মীর মদন, মোহন লাল ও ফরাসি সেনাপতি সিনফ্রে ছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিশ্বস্ত সেনাপতি যারা পলাশীর যুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করেছিলেন। অন্যদিকে, মীর জাফর ছিলেন নবাবের প্রধান সেনাপতি, যিনি এই যুদ্ধে ইংরেজদের সাথে আঁতাত করে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। এই চরিত্রগুলো সরাসরি পলাশীর যুদ্ধের সাথে জড়িত।
পলাশী যুদ্ধের পেছনে ইংরেজদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণই প্রধান কারণ ছিল। নবাব সিরাজউদ্দৌলা সিংহাসনে বসার পর ইংরেজরা তাঁকে কোনো উপঢৌকন পাঠায়নি এবং সৌজন্য সাক্ষাৎ করেনি। তারা নবাবের নিষেধ অমান্য করে কলকাতায় দুর্গ নির্মাণ অব্যাহত রাখে এবং বাণিজ্যের ছাড়পত্র 'দস্তক'-এর চরম অপব্যবহার করে। এছাড়া রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাসকে কলকাতায় আশ্রয় দেওয়া এবং তাকে ফেরত আনতে যাওয়া নবাবের দূতকে অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়ার কারণেই নবাব ক্ষুব্ধ হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হন।
উদ্দীপকের 'খ' ছকের ব্যক্তিবর্গ ১৭৬৪ সালের ঐতিহাসিক 'বক্সারের যুদ্ধ'-এর সাথে সম্পৃক্ত। এই যুদ্ধের ফলাফল বাংলা তথা পুরো উপমহাদেশের ইতিহাসে সত্যিই অপরিসীম ছিল।
ছকে উল্লিখিত বাংলার নবাব মীর কাসিম, অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা (উদ্দীপকে সুজাউদ্দীন) এবং দিল্লির সম্রাট শাহ আলম একত্রিত হয়ে ইংরেজ সেনাপতি মেজর মনরোর বাহিনীর বিরুদ্ধে বক্সার নামক স্থানে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সম্মিলিত বাহিনী ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়। বক্সার যুদ্ধের ফলে মীর কাসিমের স্বাধীনতা রক্ষার শেষ চেষ্টাও সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়ে যায়। এ যুদ্ধে শুধু বাংলার নবাবই পরাজিত হননি, বরং ভারতবর্ষের সম্রাট এবং অযোধ্যার নবাবও পরাজিত হয়েছিলেন। ভারতবর্ষের তিন বৃহৎ শক্তির এই যৌথ পরাজয়ের ফলে ইংরেজদের ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সামরিক মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তারা বিনা বাধায় এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের একচেটিয়া সুযোগ লাভ করে। বক্সারের যুদ্ধের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী ও অপরিসীম ফলাফল ছিল দেওয়ানি লাভ। এই যুদ্ধের পরপরই ১৭৬৫ সালে রবার্ট ক্লাইভ দিল্লির সম্রাটের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের পূর্ণ ক্ষমতা লাভকরেন। এর ফলে ইংরেজদের অধিকার যেমন আইনগত স্বীকৃতি পায়, তেমনি তারা অর্থনৈতিকভাবেও অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে। স্বাধীন নবাব পরিণত হন ক্ষমতাহীন পুতুলে। মূলত বক্সারের যুদ্ধের মাধ্যমেই বাংলায় প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের শক্ত ভিত রচিত হয়েছিল। তাই প্রশ্নোক্ত উক্তিটি সম্পূর্ণ যথার্থ।
উদ্দীপকে অয়ন বিশ্বাস কর্তৃক কৃষকদের জমি স্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকের লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' বা স্থায়ী ভূমি ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত।
উদ্দীপকের অয়ন বিশ্বাস ১০০০ বিঘা জমির মালিক হিসেবে কৃষকদের দীর্ঘমেয়াদি দাবির প্রেক্ষিতে জমি স্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেন। পাঠ্যবইয়ে উল্লিখিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তেও ব্রিটিশ সরকার জমিদারদের একইভাবে জমির স্থায়ী মালিকানা দিয়েছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারদের জমির স্থায়ী মালিকে পরিণত করে এরবং জমিদাররা জমির মালিকানা স্বত্ব লাভ করে। রাজস্বের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেওয়ার ফলে নিয়মিত রাজস্ব প্রদানের বিনিময়ে জমিদার জমিদারি ভোগের চিরস্থায়ী অধিকার লাভ করে। এ প্রথা চালু হওয়ার ফলে। জমিদারদের প্রশাসনিক ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়। সরকার স্বয়ং শান্তি রক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করে। খাজনা বাকি পড়লে জমিদারদের ভূমির কিছু অংশ বিক্রি করে রাজস্ব আদায় করার ব্যবস্থা ছিল। নতুন এক জমিদার শ্রেণি গড়ে ওঠে। যাদের সাথে প্রজাদের প্রায় সম্পর্ক ছিল না। এই জমিদার শ্রেণির অধিকাংশই ছিল উঠতি পুঁজিপতি। তারাই ব্রিটিশ শাসনের অন্যতম প্রধান সমর্থক শ্রেণি ও ভিত্তি ছিলো।
উদ্দীপকে ইঙ্গিতকৃত 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' তখনকার দিনে ব্রিটিশ সরকারের আয় নিশ্চিত করে বাজেটের ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালুর আগে রাজস্ব আদায়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু এই ব্যবস্থায় রাজস্বের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেওয়ায় সরকারের আয়ের পরিমাণ সুনির্দিষ্ট হয়। ফলে ব্রিটিশ সরকারের জন্য বাজেট প্রণয়ন, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বিভিন্ন কাজ বাস্তবায়ন করা সহজতর হয়।
উদ্দীপকে অয়ন বিশ্বাস ছোট চাষিদের জমি স্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেন, যা তাকে বারবার জমি লিজ দেওয়ার ঝামেলা থেকে মুক্তি দেয় এবং একটি স্থিতিশীল ব্যবস্থা তৈরি করে। একইভাবে, ব্রিটিশ সরকারও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিদারদের জমির মালিকানা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট ও 'নিয়মিত আয়ের উৎস নিশ্চিত করেছিল। এটি প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার ভিত্তি মজবুত করেছিল। কৃষকদের জন্য এই প্রথা ক্ষতিকর হলেও, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এটি সরকারের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করেছিল। নির্দিষ্ট রাজস্ব ব্যবস্থার কারণে প্রশাসনিক কাঠামো সুসংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। তাই আয় নিশ্চিতকরণ ও পরিকল্পিত অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা নির্মাণে চিরস্থায়ী বন্দোবস সত্যিই সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল।
উদ্দীপকের চিত্র-১ এ প্রদর্শিত ব্যক্তি হলেন বাংলার নবজাগরণের স্রষ্টা রাজা রামমোহন রায়, যিনি ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষাবিস্তারে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন। তিনি হিন্দু সমাজের সতীদাহ প্রথা, বাল্যবিবাহ ও কৌলীন্য প্রথার মতো অমানবিক কুসংস্কার দূর করতে তীব্র সংগ্রাম করেন। আদি একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি 'আত্মীয় সভা' ও 'ব্রাহ্মসমাজ' গড়ে তোলেন এবং আধুনিক চিন্তা প্রসারে 'সম্বাদ কৌমুদী'র মতো পত্রিকা প্রকাশ করেন।
সমাজ সংস্কারের পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষায় তাঁর কর্মকান্ড ছিল অসামান্য। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, প্রকৃত উন্নতির জন্য সংস্কৃত শিক্ষার চেয়ে পাশ্চাত্য ও বিজ্ঞান শিক্ষা বেশি জরুরি। তাই তিনি 'অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল' প্রতিষ্ঠা করেন এবং সরকারের কাছে সংস্কৃতের বদলে ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিক্ষায় অর্থ ব্যয়ের জোরালো দাবি জানান।। তাঁর এই বহুমুখী কর্মকাই বাঙালিকে কুসংস্কারমুক্ত করে আধুনিকতার পথ দেখিয়েছিল।
উদ্দীপকের চিত্র-২ এর ব্যক্তি হলেন প্রখ্যাত মুসলিম নেতা সৈয়দ আমির আলি, যাঁর রাজনৈতিক সংগঠন ও শিক্ষামূলক উদ্যোগ বাংলার পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল।
উনিশ শতকের শেষার্ধে বাংলার মুসলিম সমাজ শিক্ষা ও রাজনীতিতে অনেকটা পিছিয়ে ছিল। সৈয়দ আমির আলি বিশ্বাস করতেন, মুসলমানদের দাবি-দাওয়া আদায় এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য নিজেদের একটি পৃথক ও শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম থাকা একান্ত প্রয়োজন। মুসলমানদের এই অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তিনি ১৮৭৭ সালে কোলকাতায় 'সেন্ট্রাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন' প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল মুসলমানদের স্বার্থরক্ষার প্রথম নিজস্ব রাজনৈতিক সংগঠন। এর পাশাপাশি তিনি পত্র-পত্রিকায় মুসলমানদের পিছিয়ে পড়ার কারণগুলো তুলে ধরে জনমত গঠন করেন, যার ফলে ব্রিটিশ সরকার মুসলমানদের শিক্ষায় এগিয়ে নিতে বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। পরিশেষে বলা যায়, তিনি কেবল রাজনৈতিক সংগঠকই ছিলেন। শিক্ষাবিস্তারেও ছিলেন দূরদর্শী। তিনি কোলকাতা ও করাচি আধুনিক কলেজ প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ দেন এবং আধুনিক ভারতের উন্নতি জন্য হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ওপর জোর দেন। তাঁর প্রতিষ্ঠি রাজনৈতিক ভিত এবং শিক্ষাবিস্তারের নিরলস প্রচেষ্টাই বাঙাি মুসলমানদের পশ্চাৎপদতা দূর করে তাদের অধিকার সুরক্ষায় সবচে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল।
উদ্দীপকের চিত্র-১ এ প্রদর্শিত সাভারের 'জাতীয় স্মৃতিসৌধ' মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মদানকারী বীর শহিদদের অসামান্য ত্যাগ এবং বাঙালির অহংকার ও মর্যাদার প্রতীক।
স্থপতি মঈনুল হোসেনের নকশায় নির্মিত এই স্মৃতিসৌধের সাত জোড়া ত্রিভুজাকার দেয়াল মূলত আমাদের স্বাধিকার আদায়ের সাতটি গৌরবময় ঐতিহাসিক আন্দোলনের স্মৃতি বহন করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ধারাবাহিক দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়েই বাঙালি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা অর্জন করে।
উদ্দীপকের চিত্র-১ এ আমরা সেই স্মৃতিসৌধটি দেখতে পাচ্ছি, যা এই দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের এক অমর নিদর্শন। এর বেদিতে পৌঁছানোর উঁচু-নিচু পথ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের কণ্টকাকীর্ণ পথকে নির্দেশ করে, আর পাশেই রয়েছে লাখো শহিদের রক্তে ভেজা গণকবর। স্বাধীনতায় এই বিশাল স্থাপনাটি দাঁড়িয়ে আছে আমাদের চূড়ান্ত বিজয়ের এক চিরন্তন স্মারক হিসেবে। তাই এটি নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় অহংকার, অপরিমেয় গৌরব এবং মাথা উঁচু করে বাঁচার পরম মর্যাদার প্রতীক।
উদ্দীপকের চিত্র-২ এ নির্দেশিত স্বাধীন বাংলাদেশের 'জাতীয় পতাকা' সত্যিই একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের আপামর জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং জাতীয় চেতনার মূর্ত প্রতীক।
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় বহন করে তার নিজস্ব পতাকা। বাংলাদেশের পতাকার সবুজ রং এদেশের শস্য-শ্যামল প্রকৃতি ও তারুণ্যের অদম্য প্রাণশক্তির কথা বলে, আর মাঝের উজ্জ্বল লাল বৃত্তটি মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মদানকারী লাখো শহিদের পবিত্র রক্তের কথা।
উদ্দীপকের চিত্র-২ এ আমরা সেই ঐতিহাসিক পতাকারই একটি কাঠামোগত রূপ দেখতে পাচ্ছি। ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো এই পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে পটুয়া কামরুল হাসান বর্তমান পতাকার নকশা চূড়ান্ত করেন। এই লাল-সবুজ পতাকাই মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিকামী বাঙালির মনে অসীম সাহস ও উদ্দীপনা জুগিয়েছিল এবং একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রেরণা জুগিয়েছিল। পরিশেষে বলা যায়, দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই পতাকা কেবল একখণ্ড রঙিন কাপড় নয়, বরং এটি বাঙালির হাজার বছরের পরাধীনতা ঘোচানোর দলিল। এর নিচেই সমগ্র জাতি তাদের ভবিষ্যৎ আশা-আকাঙ্ক্ষা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে একতাবদ্ধ হয়। তাই স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নিঃসন্দেহে আমাদের সকল আশা ও পরম আকাঙ্ক্ষার এক অনন্য ও উজ্জ্বল প্রতীক।
উদ্দীপকে ইতিহাসের লিখিত উপাদানকে নির্দেশ করে।
উদ্দীপকে উল্লিখিত তথ্যগুলো তথা সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত 'রামরচিত', কালিদাসের 'মেঘদূত', হিউয়েন সাং-এর 'সি ইউ কি' ও মহাভারত ইতিহাস রচনার লিখিত উপাদান। ইতিহাস রচনায় লিখিত উপাদান অতীব গুরুত্বপূর্ণ। লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সাহিত্যকর্মেও তৎকালীন সময়ের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। যেমন- বেদ, কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র', কলহনের 'রাজতরঙ্গিনী', আবুল ফজলের 'আইন-ই-আকবরী' সন্ধ্যাকর নন্দীর 'রামচরিত', বানভট্টের 'হর্ষচরিত', চর্যাপদ, মঙ্গল কাব্য ইত্যাদি। তাছাড়া বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ সবসময়ই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে বিবেচিত হয়েছে। যেমন- সপ্তম শতকের বাংলার ইতিহাস জানার জন্য হিউয়েন সাং-এর সি-ইউ-কি, ফা-হিয়েনের 'ফো-কুয়ো-কিং' ইবনে বতুতার 'রিহালা' অন্যতম। সাহিত্য উপাদানের মধ্যে আরও রয়েছে রূপকথা, কিংবদন্তি, গল্পকাহিনি। তবে অনেক সময় কাহিনির আড়ালে সত্য ঘটনা থেকে যায় যা ঐতিহাসিকগণ বিচার-বিশ্লেষণ করে আবিষ্কার করেন। তাছাড়া সরকারি নথি, চিঠিপত্র ইত্যাদি থেকেও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব।
ঘটনা উদ্দীপকের উপাদান দ্বারা অর্থাৎ লিখিত উপাদান দ্বারা সম্পূর্ণ ইতিহাস রচনা করা সম্ভব না। কেননা, উদ্দীপকে শুধু ইতিহাসের লিখিত উপাদান তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সম্পূর্ণ ইতিহাস রচনায় লিখিত ও অলিখিত উভয় উপাদান প্রয়োজন।
তথ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এ কারণেই ইতিহাসের উপাদানকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা-লিখিত উপাদান ও অলিখিত উপাদান। ইতিহাস রচনার লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সাহিত্যকর্মেও তৎকালীন সময়ের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তাছাড়া বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ সবসময়ই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে, অলিখিত উপাদান হলো মুদ্রা, শিলালিপি, স্তম্ভলিপি, তাম্রলিপি, ইমারত ইত্যাদি। এসব নিদর্শন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশ্লেষণের ফলে সে সময়ের অধিবাসীদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অতএব উদ্দীপকে উল্লিখিত লিখিত উপাদান এবং অলিখিত উপাদানের মাধ্যমেই সম্পূর্ণ ইতিহাস জানা যায়। লিখিত উপাদান ও অলিখিত পড়লে জাতির সার্বিক ইতিহাস রচনা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকে বর্ণিত ইতিহাসের লিখিত উপাদানের মাধ্যমে একটি জাতির ইতিহাস সম্পূর্ণ রচনা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে অলিখিত উপাদানেরও প্রয়োজন রয়েছে।
উদ্দীপকে উল্লিখিত তথ্যসমূহ তথা জাতিতে তুর্কি, ভাগ্যান্বেষী সৈনিক, মুসলিম শাসনের সূচনাকারী এবং ছদ্মবেশি বণিক ও বংশে খলজি বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠাতা বখতিয়ার খলজিকে নির্দেশ করে। কেননা তিনি জাতিতে তুর্কি, বংশে খলজি ও বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনাকারী ছিলেন। বখতিয়ার খলজি উত্তর আফগানিস্তানের গরমশির-এর বাসিন্দা ছিলেন। তিনি জাতিতে তুর্কি, বংশে খলজি এবং বৃত্তিতে ভাগ্যান্বেষী সৈনিক ছিলেন। ১১৯৫ সালে তিনি নিজ জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে জীবিকার অন্বেষণে গজনিতে আসেন। সেখানে তিনি শিহাবউদ্দিন ঘোরির সৈন্য বিভাগে চাকরি প্রার্থী হয়ে ব্যর্থ হন। খাটো, লম্বা হাত ও কুৎসিত চেহারার জন্য বখতিয়ার সেনাধ্যক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হন। বারবার চাকরি পেতে ব্যর্থ হয়ে তিনি বদাউনের শাসনকর্তা মালিক হিজবরউদ্দিনের নিকট মাসিক বেতনে সৈন্য বিভাগে নিযুক্ত হন। উচ্চাভিলাষী বখতিয়ার এ ধরনের সামান্য বেতনভোগী পদে সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি। অল্পকাল পর তিনি বদাউন ত্যাগ করে অযোধ্যা যান। সেখানে তিনি নিজ যোগ্যতা গুণে ভগবত ও ভিউলি নামক দুটি পরগনার জায়গির লাভ করেন। বখতিয়ার অল্প সংখ্যক সৈন্য সংগ্রহ করে পার্শ্ববর্তী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিন্দু রাজ্য আক্রমণ ও লুণ্ঠন শুরু করেন। অবশেষে ছদ্মবেশে বণিক সেজে মাত্র ১৭/১৮ জন সৈন্য নিয়ে নদীয়া জয় করেন, যার মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, উদ্দীপকের তথ্যসমূহ মধ্যযুগের বাংলার শাসক বখতিয়ার খলজির বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছে।
বাংলায় মুসলমান শাসনের সূচনা করেন বখতিয়ার খলজি। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে নদীয়া জয়ের মধ্য দিয়ে বখতিয়ার খলজি বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা করেন। এ শাসন প্রায় সাড়ে পাঁচ শত বছরের অধিককাল স্থায়ী হয়েছিল। রাজ্যজয় করেই বখতিয়ার খলজি ক্ষান্ত ছিলেন না। বিজিত অঞ্চলে তার শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। তার নিজ ধর্ম ইসলামের বিকাশের জন্য তিনি বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার শাসনকালে বহু মাদ্রাসা, মক্তব, মসজিদ ইত্যাদি নির্মিত হয়েছিল। মুসলমানরা যাতে তাদের ধর্ম পালনে কোনো বাধার সম্মুখীন না হয় সেদিকে তিনি লক্ষ রাখতেন। বখতিয়ার খলজি ইসলাম ধর্ম প্রসারে কাজ করেছিলেন। মুসলমানেরা অন্য ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হলে তিনি প্রতিহত করতেন। সর্বোপরি বখতিয়ার খলজির বাংলা জয়ের মধ্য দিয়ে মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পায় এবং ইসলাম ধর্মের প্রসার হয়।
পরিশেষে বলা যায়, ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খলজি বাংলা বিজয় করে মুসলিম শাসনের সূচনা করেন এবং সেই মুসলিম শাসনের শুরু করেন। তাই এ যুগকে বলা হয় 'পরবর্তী ইলিয়াস শাহি যুগ'।
উদ্দীপকের ছকের নামগুলো তথা বাংলার নবাব মীর কাশিম, দিল্লির সম্রাট শাহ আলম ও অয্যোধ্যার সুজাউদ্দৌলা কর্তৃক ত্রিশক্তির জোটের সাথে ইংল্যান্ড কর্তৃক নিযুক্ত মেজর মনরোর ১৬৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
মূলত বক্সারের যুদ্ধ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে সম্মিলিতভাবে মীর কাশিমের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। মীর কাশিম একজন সুদক্ষ শাসক, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ ও স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন। তিনি তার প্রজাদের কল্যাণের প্রতি সচেতন ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ইংরেজদের সাথে সম্মানজনক উপায়ে বাংলার স্বার্থ রক্ষা করে আর্থিক ও সামরিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে। মীর কাশিমকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে তিনি অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা এবং মুঘল সম্রাট শাহ আলমের সাথে একত্রিত হয়ে ১৯৬৪ সালে বিহারের বক্সার নামক স্থানে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এ যুদ্ধে ইংরেজদের নেতৃত্ব দেন মেজর মনরো। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এ সম্মিলিত বাহিনী ইংরেজদের নিকট পরাজিত হয়। মীর কাশিমের পরাজয়ের কারণে বাংলার সার্বভৌমত্ব উদ্ধারের শেষ চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়।
সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের ব্যক্তিবর্গ ঐতিহাসিক বক্সারের যুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।
বক্সার যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে বাংলার মাটিতে দ্রুতগতিতে ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে ইংরেজদের আত্মপ্রকাশ ঘটতে থাকে। এ যুদ্ধের ফলে, বাংলার মাটিতে মীর কাশিমের স্বাধীনতা রক্ষার শেষ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং উপমহাদেশে ইংরেজদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এ যুদ্ধের ফলে অযোধ্যার নবাব রোহিলাখণ্ডে পালিয়ে যান। দিল্লির সম্রাট শাহ আলম ইংরেজদের পক্ষে যোগ দেন। ইংরেজরা অযোধ্যার নবাব থেকে কারা ও এলাহাবাদ দখল ও ক্ষমতার সম্প্রসারণ করে। এ যুদ্ধে ভারতবর্ষে একসঙ্গে তিন শক্তির পরাজয়ের ফলে ইংরেজদের আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এ যুদ্ধের ফলে রবার্ট ক্লাইভ দিল্লির সম্রাটের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করেন। এছাড়া বক্সারের যুদ্ধের পরাজয়ের ফলে শুধু নবাবি আমলেরই পরিসমাপ্তি ঘটেনি, মুঘল সম্রাটদের দুর্বলতাও ইংরেজদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। ফলে ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে দ্রুতগতিতে ইংরেজদের আত্মপ্রকাশ ঘটতে থাকে।
পরিশেষে বলা যায়, বক্সার যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে বাংলার প্রকৃত ক্ষমতা ইংরেজদের হাতে চলে যায় এবং তারা আধিপত্য বিস্তার করে।
প্রশ্নে উল্লিখিত '?' দ্বারা যে ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে তিনি হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষাক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান ছিল। তিনি বাংলা ভাষায় উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তকের অভাব দেখে গদ্যসাহিত্য রচনা শুরু করেন। তিনি বাংলা গদ্যসাহিত্যকে নবজীবন দান করেন। এজন্য তাকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয়। শিশুদের লেখাপড়া সহজ করার জন্য তিনি রচনা করেন বর্ণ পরিচয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ। সংস্কৃত ভাষা শিক্ষাকে সহজ করার জন্য তিনি ব্যাকরণের উপক্রমণিকা রচনা করেন। তাছাড়া তিনি অনেক গ্রন্থের অনুবাদও করেছেন। শুধু সাহিত্য নয়, শিক্ষা বিস্তারে তার কৃতিত্ব অসাধারণ। সংস্কৃত শিক্ষার সংস্কার, বাংলা শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন এবং নারীশিক্ষা প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা তার অক্ষয় কীর্তি। তাছাড়া স্কুল পরিদর্শক থাকাকালে গ্রামে-গঞ্জে ২০টি মডেল স্কুল, ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন। এখন এটি বিদ্যাসাগর কলেজ নামে খ্যাত।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একজন সফল সমাজ সংস্কারক ছিলেন। দেশে প্রচলিত নানা ধরনের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়ান। তিনি কন্যাশিশু হত্যা, বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। তিনি হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহের পক্ষে কঠোর অবস্থান নেন। তার নিরলস প্রচেষ্টার কারণে ১৮৫৬ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসির সম্মতিক্রমে বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়। এছাড়া তিনি দান-দাক্ষিণ্যের জন্য খ্যাত ছিলেন। এ কারণে তাকে দয়ার সাগরও বলা হয়। যথেষ্ট সচ্ছল না হলেও বহু অনাথ ছাত্র তার বাসায় থেকে লেখাপড়া করতো। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের চরম অর্থকষ্টের সময়ে বিদ্যাসাগর তাকে প্রচুর অর্থ সাহায্য করেছেন। কবি নবীনচন্দ্র সেন তরুণ বয়সে বিদ্যাসাগরের অর্থে লেখাপড়া করেছেন। G
পরিশেষে বলা যায়, সমাজ সংস্কারের জন্য বিদ্যাসাগরের অবদান অপরিসীম।
উদ্দীপকের ছক-ক-এ উল্লিখিত তথ্য সমূহ ইতিহাসের লিখিত উপাদানের ইঙ্গিত প্রদান করে।
ইতিহাসের উপাদানকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা: লিখিত উপাদান ও অলিখিত উপাদান। ইতিহাস রচনার লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সাহিত্যকর্ম যেমন- বেদ, কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র', কলহনের 'রাজতরঙ্গিনী' মিনহাজ-উস-সিরাজের 'তবকাত-ই-নাসিরী ইত্যাদি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ লিখিত উপাদান হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ সব সময়ই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ লিখিত উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। যেমন- পঞ্চম থেকে সপ্তম শতকে বাংলায় আগত বিখ্যাত পরিব্রাজক ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাং, ইৎসিং ও ইবনে বতুতার বর্ণনা। এসব বর্ণনা থেকে তৎকালীন সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা
যায়।
ছক-ক এ উল্লিখিত অর্থ শাস্ত্র, তবকাত-ই-নাসিরী ও আইন-ই-আকবরী প্রভৃতি ঐতিহাসিক গ্রন্থ। সুতরাং বলা যায়, ছক ক-এ উল্লিখিত তথ্যসমূহ ইতিহাসের লিখিত উপাদান।
ছক খ এর উপাদানগুলো হলো ইতিহাসের অলিখিত ও প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান, যা প্রকৃত ইতিহাস রচনায় যথেষ্ট নয়।
ইতিহাসের উপাদানকে দুভাগে ভাগ করা হয়। যথা- লিখিত ও অলিখিত উপাদান। সঠিক ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে এ দু'ধরনের উপাদানই গুরুত্বপূর্ণ। লিখিত উপাদানের মাধ্যমে আমরা প্রাচীন সময়ের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিকসহ প্রায় সব বিষয়ের বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা পেয়ে থাকি, যা অলিখিত উপাদানের মাধ্যমে জানা যায় না। এছাড়া অলিখিত উপাদানের তুলনায় লিখিত উপাদান ইতিহাস রচনায় সব সময়ই বেশি নির্ভরযোগ্য। যেমন- মধ্যযুগের উপমহাদেশের ইতিহাস রচনায় সে সময়ের স্থাপত্যকর্মগুলো আমাদেরকে যতটুকু না সাহায্য করে তার চেয়ে সমকালীন ইতিহাসবিদদের রচনা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের আত্মজীবনী অনেকগুণ বেশি সহায়ক হয়।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে কোনো বিশেষ সময় ও অঞ্চলের মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে ধারণা করা যায় মাত্র, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস জানা সম্ভব হয় না। এসব উপাদান থেকে মানুষের অতীত সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে মৌলিক ও অকাট্য তথ্য পাওয়া যায়।
সুতরাং বলা যায়, ছক খ এর উপাদানগুলো যথা- মুদ্রা, শিলালিপি, তাম্রলিপি প্রভৃতি ইতিহাসের অলিখিত বা প্রত্নতত্ত্ব উপাদান। আর কেবল অলিখিত উপাদানই প্রকৃত ইতিহাস রচনার জন্য যথেষ্ট নয়।
লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য তিনি অখণ্ড বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন।
১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে এ প্রস্তাবটি গৃহীত হয় বলে এটি ইতিহাসে লাহোর প্রস্তাব নামে খ্যাত। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে লাহোর প্রস্তাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। লাহোর প্রস্তাবে বলা হয়, কোনো শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনা এদেশে কার্যকর হবে না, যদি এটি লাহোর প্রস্তাবে উত্থাপিত মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়। এ প্রস্তাবে আরও বলা যায়, ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব ভূ-ভাগের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে নিয়ে একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ গঠন করতে হবে। এসব স্বাধীন রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট অঙ্গ রাষ্ট্রগুলো স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম হবে।
লাহোর প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হওয়ায় অখণ্ড বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে লাহোর প্রস্তাবের গুরুত্ব অপরিসীম। আর এ প্রস্তাব উত্থাপনের জন্যই শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক বিখ্যাত হয়ে আছেন।
ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের জন্য তিনি দীর্ঘদিন কাজ করে গেছেন। ১৯৪০ সালের তার উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতেই ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
লাহোর প্রস্তাবের প্রতি কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু এ প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা করেন। তবে ঐতিহাসিক সত্য এই যে, লাহোর প্রস্তাবের পর থেকে মুসলমান সম্প্রদায় নিজস্ব আলাদা রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে থাকে। এই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের রাজনৈতিক-শাসনতান্ত্রিক আন্দোলনের এক নতুন ধারার জন্ম হয়। দ্বি-জাতি তত্ত্বের মাধ্যমে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলমানদের আলাদা জাতি হিসেবে চিহ্নিত করতে থাকেন। সে অনুযায়ী মুসলমানদের জন্য ভিন্ন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা শুধু সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এরপর থেকে মুসলিম লীগ এবং জিন্নাহর রাজনীতি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ার দিকে ধাবিত হতে থাকে; যার শেষ পরিণতি ছিল ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসের দেশ বিভাগ। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত নামে দুইটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
উপরের আলোচনার উপর ভিত্তি করে বলা যায়, ১৯৪০ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের অধিবেশনে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কর্তৃক ভারতীয় মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র বাসভূমির যে প্রস্তাব গৃহীত হয় তাতেই দেশ বিভাগের ভিত তৈরি হয়। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৪৭সালে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
সুতরাং বলা যায়, ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মে উক্ত মনীষীর অবদান ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
বারো ভূঁইয়া নামে খ্যাত বাংলার জমিদারগণ তাদের নিজ নিজ জমিদারিতে স্বাধীন ছিলেন। তাদের শক্তিশালী সৈন্য বাহিনী ও নৌবহর ছিল। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তারা একজোট হয়ে মুঘল সেনাপতির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। বাংলার ইতিহাসে এ জমিদারগণ 'বারো ভূঁইয়া' নামে পরিচিত। এ 'বারো' বলতে বারোজনের সংখ্যা বোঝায় না। ধারণা করা হয় অনির্দিষ্ট সংখ্যক জমিদারদের বোঝাতেই 'বারো' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। বারো ভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন ঈসা খান। ঈসা খানের মৃত্যুর পর বারো ভূঁইয়াদের নেতা হন মুসা খান। তাদের বলিষ্ঠ উদ্যম দীর্ঘদিন বাংলাকে ভিনদেশি শাসকদের শাসন থেকে হেফাজত রেখেছিল। বাংলা ভূখণ্ড ও তার রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বীয় শাসনকার্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তাই তারা বাংলার বীর হিসেবে বিশেষ মর্যাদায় সমাদৃত।
বারো ভূঁইয়াদের দমনের কৃতিত্বের দাবিদার সুবাদার ইসলাম খান (১৬০৮-১৬১৩ খ্রিষ্টাব্দে)। শাসনভার গ্রহণ করেই তিনি বুঝতে পারেন যে, বারো ভূঁইয়াদের নেতা মুসা খানকে দমন করতে পারলেই তার পক্ষে অন্যান্য জমিদারকে বশীভূত করা সহজ হবে। সেজন্য তিনি রাজমহল থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কারণ মুসা খানের ঘাঁটি সোনারগাঁ ঢাকার অদূরে ছিল। বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় আসার পথে ইসলাম খান কয়েকজন জমিদারের আনুগত্য লাভ করেছিলেন।
বারো ভূঁইয়াদের মোকাবিলা করার জন্য ইসলাম খান শক্তিশালী নৌবহর গড়ে তোলেন। মুসা খানের সাথে প্রথম সংঘর্ষ বাধে ১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দে করতোয়া নদীর পূর্বতীরে যাত্রাপুরে। সেখানে মুসা খানের দুর্গ ছিল। যুদ্ধে মুসা খান ও অন্যান্য জমিদার শেষপর্যন্ত পিছু হটেন। ইসলাম খান ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় প্রবেশ করেন। এ সময় থেকে 'ঢাকা হয় বাংলার রাজধানী। সম্রাটের নাম অনুসারে ঢাকার নাম করা হয় 'জাহাঙ্গীরনগর'। আর এভাবেই মুঘল আক্রমণে উদ্দীপকে উল্লিখিত বারো ভূঁইয়াদের শাসনের অবসান ঘটে।
১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ নাম না জানা শহিদ ও মা-বোনের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই বাংলাদেশ। সকল শহিদদের স্মৃতি ধরে রাখতে ঢাকা শহর থেকে ৩৫ কি.মি. উত্তর-পশ্চিমে সাভারে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিসৌধ। এ স্মৃতিসৌধের নকশা করেছিলেন স্থপতি মইনুল হোসেন। সাতটি জোড়া ত্রিভুজাকার দেয়ালের মাধ্যমে ছোট থেকে বড় হয়ে ধাপে ধাপে সৌধটি ১৫০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছেছে। সমগ্র স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণের সৌন্দর্য ও গাম্ভীর্য বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। এসব কিছুই আমাদের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের প্রতীক। পাশেই রয়েছে গণকবর, যাদের অমূল্য জীবনের বিনিময়ে এদেশ শত্রুমুক্ত হয়েছে। মূল স্মৃতিসৌধের সাত জোড়া দেয়াল মূলত বাঙালির গৌরবময় সংগ্রামের প্রতীক। এ রাজনৈতিক ঘটনাগুলো হলো ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৫৬, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯ এবং ১৯৭১। এ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সালের মধ্যেই আমাদের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস নিহিত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ঘটনার ফলেই পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি স্বাধীনতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।
অতএব বলা যায়, বাঙালির অহংকার, গৌরব আর মর্যাদার প্রতীক এ স্মৃতিসৌধ।
উদ্দীপকের ছবিটি জাতীয় স্মৃতিসৌধের, যা মূলত বাঙালির গৌরবময় সংগ্রামের প্রতীক জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিক ঘটনাগুলোকে সাত জোড়া দেয়ালের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনি বিজয়, ১৯৫৬ সালের সংবিধান, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ-এসব ঘটনাই বাঙালি জাতির জন্য গৌরবের। বাঙালি জাতি তাদের অমূল্য জীবনের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছেন। '৫২ থেকে '৭১ সালের মহান এই মুক্তি সংগ্রামের ফলেই পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি স্বাধীনতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। স্থপতি মইনুল হোসেনের নকশায় নির্মিত লক্ষ লক্ষ নাম না জানা শহিদের মহান মুক্তিসংগ্রামে আত্মোৎসর্গের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের প্রতীক স্মৃতিসৌধ বাঙালি জাতির অহংকার ও গৌরবের প্রতীক।
তাই বলা যায়, বাঙালি জাতির অহংকার ও গৌরবের প্রতীক মহান মুক্তিসংগ্রামের স্মৃতিধারণকারী জাতীয় স্মৃতিসৌধ।
ইতিহাস হচ্ছে মানবসভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিক ও সত্যনিষ্ঠ বিবরণ। ফলে ইতিহাস পাঠের মাধ্যমে মানবগোষ্ঠীর উত্থান-পতন, সভ্যতার বিকাশ ও পতনের কারণগুলো জানার মাধ্যমে মানুষ ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য সহজেই অনুধাবন করতে পারে এবং নিজের কর্মের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকে। এ কারণেই সকলের ইতিহাস পাঠ করা প্রয়োজন।
ইতিহাসের লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ও দেশি-বিদেশি উল্লেখযোগ্য অতীত ঘটনার বিবরণ। বিশ্বের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থও জাতীয় গণগ্রন্থাগারে রক্ষিত আছে যেমন- অর্থশাস্ত্র, তবকাত ই-নাসিরী, আইন-ই-আকবরী ইত্যাদি। এছাড়া সভ্যতার বিভিন্ন প্রকৃতি সম্পর্কে বিবরণের ওপর রচিত পুস্তকও জাতীয় গণগ্রন্থাগারে রয়েছে। এসব লিখিত উপাদানের মাধ্যমে আমরা সমকালীন অনেক তথ্য পেয়ে থাকি।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ওপর লিখিত বিভিন্ন পুস্তক ও ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের বিবরণের ওপর লিখিত বিভিন্ন বইও ইতিহাসের লিখিত উপাদান।
উদ্দীপকের শিলা সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী। তার সংগ্রহে জোসনা ও জননীর গল্প, অলাতচক্র, পদ্মা নদীর মাঝি ও অ্যানা ফ্রাঙ্কের ডায়রির মতো বইগুলো রয়েছে। এসকল সাহিত্য ও বই ইতিহাসের লিখিত উপাদানের অন্তর্ভুক্ত। কারণ দেশি-বিদেশি সাহিত্যকর্মে সমকালীন নানা তথ্য পাওয়া যায়, যা সঠিক ইতিহাস রচনায় ভূমিকা রাখে।
এছাড়া নানা বইপত্র, বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ সব সময়ই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ লিখিত উপাদান হিসেবে বিবেচিত। যেমন- পঞ্চম থেকে সপ্তম শতকে বাংলায় আগত বিখ্যাত পরিব্রাজক ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাং, ইৎসিং-এর লেখায় তখনকার সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। তাই বলা যায়, শিলার সংগৃহীত বস্তুগুলো ইতিহাসের লিখিত উপাদানের পর্যায়ভুক্ত।
যেসব বস্তু বা উপাদান থেকে আমরা বিশেষ সময়, স্থান বা ব্যক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক তথ্য পাই সে বস্তু বা উপাদানই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ মূলত অলিখিত উপাদান। যেমন- লিপিমালা, তাম্রমুদ্রা, স্থাপত্য-ভাস্কর্য ও স্মৃতিসৌধ প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ, পুঁথি প্রভৃতি। এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশ্লেষণের ফলে সে সময়ের আধিবাসীদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ধারণা করা যায় প্রাচীন অধিবাসীদের সভ্যতা, ধর্ম, জীবনযাত্রা, নগরায়ণ, নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র, ব্যবসায় বাণিজ্যের অবস্থা, কৃষি উপকরণ ইত্যাদি সম্পর্কে।
নতুন নতুন প্রত্নতত্ত্ব আবিষ্কার বদলে দিতে পারে একটি জাতির ইতিহাস। যেমন: সম্প্রতি নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতত্ত্ব আবিষ্কার। ঐ অঞ্চলের প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনে প্রমাণ হয়েছে যে, বাংলাদেশে আড়াই হাজার বছর পূর্বেও নগর সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল। এই আবিষ্কারের ফলে বাংলার প্রাচীন সভ্যতার নবদিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে বাংলার প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে অনেক ধারণা। অদূর ভবিষ্যতে নতুন ভাবে লিখতে হবে বাংলার প্রাচীন ইতিহাস।
আলোচনা শেষে তাই বলা যায়, ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তথা অলিখিত উপাদানের ভূমিকা অপরিসীম।
বঙ্গ একটি অতি প্রাচীন জনপদ। বর্তমান বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বঙ্গ জনপদ নামে একটি অঞ্চল গড়ে উঠেছিল। অনুমান করা হয়, এখানে বঙ্গ বলে একটি জাতি বাস করতো। তাই জনপদটি পরিচিত হয় বঙ্গ নামে। প্রাচীন শিলালিপিতে বঙ্গের দুইটি অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়- একটি 'বিক্রমপুর', আর অন্যটি 'নাব্য'। বর্তমানে নাব্য বলে কোনো জায়গার অস্তিত্ব নেই। ধারণা করা হয়, ফরিদপুর, বাখেরগঞ্জ ও পটুয়াখালীর নিচু জলাভূমি এ নাব্য অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রাচীন বঙ্গ জনপদ ছিল খুব শক্তিশালী অঞ্চল। 'বঙ্গ' থেকে 'বাঙালি' জাতির উৎপত্তি ঘটেছিল।
মানচিত্রের 'ক' অংশে পটুয়াখালী উল্লেখ রয়েছে। বঙ্গ জনপদের অন্তর্ভুক্ত ফরিদপুর, বাখেরগঞ্জ, পটুয়াখালী ছিল জলাভূমি। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের 'ক' চিহ্নিত অংশ প্রাচীন বঙ্গ জনপদকে নির্দেশ করছে।
পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় বঙ্গের পাশাপাশি জনপদ হিসেবে সমতটের অবস্থান ছিল। কেউ কেউ মনে করেন, সমতট বর্তমান কুমিল্লার প্রাচীন নাম। সাত শতক থেকে বারো শতক পর্যন্ত বর্তমান ত্রিপুরা জেলা ছিল সমতটের অন্যতম অংশ। এক সময় এ জনপদের পশ্চিম সীমা চব্বিশ পরগনার খাড়ি পরগনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্ব তীর থেকে শুরু করে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত সমুদ্রকূলবর্তী এলাকা এবং বর্তমান ভারতের ত্রিপুরার প্রাচীন অংশই সমতট। এ জনপদের অন্তর্ভুক্ত ময়নামতি ছিল তৎকালীন সময়ে বৌদ্ধ সংস্কৃতির অন্যতম চর্চাকেন্দ্র। এর নিদর্শনস্বরূপ অনেক বৌদ্ধ বিহার রয়েছে; যেমন-আনন্দ বিহার বা শালবন বিহার, ভোজ বিহার ইত্যাদি। এ সময়ে শালবন বিহার এশিয়ার জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। সে সময়ে একে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দেওয়া হতো। বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং আনন্দ বিহারে এসেছিলেন। তখন বিহারে চার হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষু ছিল। তাছাড়া এ জনপদ নদী বিধৌত হওয়ায় নৌবাণিজ্যে খুবই প্রসার লাভ করেছিল। যার কারণে এ জনপদের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ছিল সমৃদ্ধিশালী। সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও এ জনপদের মানুষ অন্যান্য জনপদ থেকে বেশি সমৃদ্ধিশালী ছিল।
সুতরাং আলোচনা থেকে বলা যায়, সমতট জনপদটি ছিল প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে উন্নত জনপদ এবং এ জনপদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
দ্বিতীয় দৃশ্য: শিক্ষা-দীক্ষা, অধিকার সচেতনতা ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের প্রাণকেন্দ্র ছিল খিজিরপুর অঞ্চলের সুজানগর। ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় খিজিরপুরকে উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়। ফলে সচেতনতামূলক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে এদেশীয়দের ওপর শুরু হয় চরম অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও শোষণ। ক্ষমতা দখলের আগেই তারা এদেশের শিল্পকে ধ্বংস করেছিল। আর ক্ষমতা গ্রহণের পর ভূমি রাজস্ব নীতি প্রবর্তন করে কৃষকদের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙে ফেলে। অতিরিক্ত অর্থ আদায়ে এখানে ছিয়াত্তর-এর মন্বন্তরের মতো ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়। এ অবস্থার শিকার হয়ে সাধারণ মানুষ কোম্পানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
উদ্দীপকের প্রথম দৃশ্যে দেখা যায়, বিদেশী শাসক মি. এডাম 'ক' অঞ্চল দখল করে ঐ অঞ্চলের কৃষকদের চাষের জমি ধনী ব্যক্তিদের মালিকানায় প্রদান করেন। এছাড়া তিনি শুধু নিজ দেশের ব্যবসায়ীদের ঐ অঞ্চলে বহির্বাণিজ্য করার সুযোগ দিতেন এবং কঠোরভাবে রাজস্ব আদায় করতেন। উদ্দীপকে মি. এডামের এরূপ কর্মকাণ্ড ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক এদেশের ওপর অর্থনৈতিক শোষণের বিষয়টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের প্রথম দৃশ্যটি ১৮৫৭সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের অর্থনৈতিক কারণটিকে নির্দেশ করে।
লর্ড কার্জন শুধু শাসন সুবিধার জন্য বা পূর্ব বাংলার জনগণের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে বঙ্গভঙ্গ করেননি। এর পেছনে ব্রিটিশ প্রশাসনের এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক স্বার্থও জড়িত ছিল। লর্ড কার্জন বাংলার রাজনৈতিক সচেতনতা সম্পর্কে সতর্ক ছিলেন। বাঙালি মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ক্রমশ জাতীয়তাবাদ ও রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠছিল। বিষয়টি তার দৃষ্টি এড়ায়নি। কংগ্রেস নেতারা কোলকাতা থেকেই সারা ভারতের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতেন। সুতরাং কোলকাতাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থামিয়ে দেওয়া ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। হিন্দু ও মুসলমান সম্মিলিত শক্তি, ঐক্যবদ্ধ বাংলা ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের জন্য বিপজ্জনক। ফলে বাংলা ভাগ করে একদিকে বাঙালির শক্তিকে দুর্বল করা হয়, অপরদিকে পূর্ব বাংলার উন্নয়নের নামে মুসলমান সম্প্রদায়কে খুশি করা হয়। যা ইংরেজ শাসনের ভাগ কর ও শাসন কর নীতির প্রয়োগ মাত্র। এভাবেই লর্ড কার্জন বিভেদ ও শাসন নীতি প্রয়োগ করে যতটা না পূর্ব বাংলার কল্যাণে, তার চেয়ে বেশি ব্রিটিশ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে বাংলা ভাগ করেন। এটি ছিল কৌশলে ভারতীয় জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র।
উপরিউক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, বঙ্গভঙ্গের পিছনে প্রশাসনিক ও আর্থসামাজিক কারণ থাকলেও রাজনৈতিক কারণটিই ছিল মুখ্য।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী পোড়ামাটি নীতি' অনুযায়ী বাংলার সব সম্পদ ধ্বংস করে দিতে চেয়েছে। যে কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, মসজিদ মন্দির, ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান কিছুই তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। পোড়ামাটি নীতি অনুযায়ী তাদের লক্ষ্য ছিল এই ভূখণ্ডের সকল সম্পদ ও মানুষকে ধ্বংস করে কেবল ভূমির দখল নেওয়া।
১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫ বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কময় একটি দিন। এদিন আনুমানিক ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭নম্বর বাড়িটি ঘেরাও করে সেনাবাহিনীর কিছু বিপদগামী সদস্য। সেখানে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। পূর্বপরিকল্পিত নীলনকশা অনুযায়ী খুনিচক্র ঝাঁপিয়ে পড়ে জাতির পিতার পরিবারের ওপর। ৮ বছরের শিশু রাসেলও রেহাই পায়নি ঘাতকদের হাত থেকে। বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতকদল। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।
উপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, এই হত্যাকাণ্ডটি মূলত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
তৃতীয় বিশ্বের সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্রনীতির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি দেশে ফিরে আসার পূর্বে ভুটান ও ভারত ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায়নি বাংলাদেশ। পাকিস্তান ও তার মিত্রদের বাংলাদেশ-বিরোধী প্রচারণায় বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র তখনও বিভ্রান্ত। অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য-সহযোগিতা লাভ জরুরি হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও মেধা দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের এই শূন্যতা পূরণে সক্ষম হয়েছিলেন।
বাংলাদেশের জন্য স্বীকৃতি আদায়ের কাজটি খুব সহজসাধ্য ছিল না। বঙ্গবন্ধুর সফল নেতৃত্বে ১৯৭৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র ও জাতিসংঘসহ প্রায় সব আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি লাভ করে। এই একই চেষ্টাটি করা হয়েছে উদ্দীপকে বর্ণিত দৃশ্যপট-২ এ।
পরিশেষে বলা যায়, বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সদ্য স্বাধীন হওয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্য একটি রাষ্ট্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে তাঁর বৈদেশিক কূটনীতি ও সম্পর্ক স্থাপন প্রক্রিয়া বিশ্ববাসীর কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
নবীন রাষ্ট্র হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার পরিকল্পনা কমিশন গঠন করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, দারিদ্র্য হ্রাস, প্রবৃদ্ধির হার ৩% থেকে ৫.৫% এ উন্নীতকরণ, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাসসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে পাঁচসালা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই থেকে এ পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পটভূমি ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশে সরকার ১৯৭২ সালের ২৩শে মার্চ 'গণপরিষদ আদেশ' জারি করে। এই আদেশটি ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকর করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের নিয়ে গণপরিষদ গঠন করা হয়। বাংলাদেশের জন্য সংবিধান প্রণয়নই ছিল গণপরিষদের একমাত্র কাজ। এই আদেশ জারির মধ্য দিয়ে সংবিধান প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হয়। গণপরিষদে ড. কামাল হোসেনকে আহ্বায়ক করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠিত হয়। কমিটি ১৯৭২ সালের ১১ই অক্টোবরের মধ্যে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কাজ শেষ করে। ১৯শে অক্টোবর থেকে সংবিধান বিল সম্পর্কে গণপরিষদে সাধারণ আলোচনা শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে আলাপ-আলোচনার পর ১৯৭২ সালের ৪ঠা নভেম্বর সংবিধান বিল গণপরিষদে পাস হয়। ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর প্রথম বিজয় দিবসে সংবিধান কার্যকর হয়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন হলো সংবিধান। বাংলাদেশের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে চারটি মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া এটি নাগরিকের সকল ধরনের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। এছাড়া এই সংবিধানে বাংলাদেশকে একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র এবং এখানে এককক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার কথা বলা হয়েছে, যা উদ্দীপকের 'ক' অংশের বিষয়গুলোর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। সুতরাং বলা যায়, এটি বাংলাদেশের সংবিধানকেই নির্দেশ করে। বাংলাদেশের এ সংবিধান রচনায় একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি রয়েছে।
স্বাধীনতা পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠিত করার জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার যে সব উদ্যোগ গ্রহণ করেন এর মধ্যে শিক্ষাখাত ব্যাপক গুরুত্ব পায়। এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষাক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি ৯০০ কলেজ ভবন ও ৪০০ হাইস্কুল পুনঃনির্মাণ করেন। প্রথমবারের মতো প্রায় ৩৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। এর ফলে এসব স্কুলে কর্মরত ১ লক্ষ ৬৫ হাজার শিক্ষকের চাকরিও সরকারি করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শিক্ষকদের ৯ মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করেন। স্বাধীন দেশের উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের ২৬শে জুলাই শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূ হকে স্বায়ত্বশাসন প্রদানের জন্য জাতীয় সংসদে ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস করেন।
উদ্দীপকের অনুরূপ সংস্কারমূলক কার্যক্রম দেখা যায় উপরে আলোচিত স্বাধীনতা পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের 'খ' অংশে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে শিক্ষার উন্নয়নে গৃহীত কার্যক্রমকে নির্দেশ করে।
উদ্দীপকটিতে সীমার দেখা কেল্লাটি ঐতিহাসিক তিতুমিরের 'বাঁশের কেল্লা' কেন্দ্রিক প্রতিরোধ সংগ্রামকে নির্দেশ করছে।
মীর নিসার আলী বা তিতুমির ১৮৩১ সালে নারিকেল বাড়িয়া গ্রামে একটি-শক্তিশালী বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেছিলেন। মূলত ব্রিটিশ জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচার থেকে বাংলার শোষিত কৃষক সমাজকে রক্ষা করার জন্যই তিনি এই দুর্গটি তৈরি করেন এবং একটি সুদক্ষ লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তোলেন।
উদ্দীপকে উল্লিখিত মুন্সীগঞ্জের ইন্দ্রাকপুর কেল্লা জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার জন্য ব্যবহৃত হতো। একই ভাবে তিতুমিরের বাঁশের কেল্লাও নির্মিত হয়েছিল শোষক জমিদার, নীলকর এবং ইংরেজ বাহিনীর আক্রমণ থেকে বাংলার অসহায় কৃষক ও তাঁতিদের রক্ষা করার জন্য। কেল্লা বা দুর্গ নির্মাণের এই ঐতিহাসিক সাদৃশ্যের কারণেই সীমার মনে তিতুমিরের সেই বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের কথা ভেসে উঠেছে।
তিতুমিরের বাঁশের কেল্লার সংগ্রামটি সত্যিই ছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধে অসীম দুঃসাহস এবং প্রগাঢ় দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
১৮২৭ সালে তিতুমীর যে ধর্মীয় সংস্কার কাজে আত্মনিয়োগ করেন তার এ আন্দোলনে বহু মুসলমান, কৃষক, তাঁতি যোগদান করে। ইংরেজ, জমিদার, নীলকরদের দ্বারা নির্যাতিত কৃষকরা দলে দলে তিতুমীরের বাহিনীতে যোগ দিলে ধর্ম সংস্কারে রূপ নেয়। ফলে শাসক-শোষক জমিদার শ্রেণি কৃষকদের সংঘবদ্ধতা এবং তিতুমীরের শক্তি বৃদ্ধিতে শঙ্কিত হয়ে ওঠে। শেষপর্যন্ত ১৮৩১ সালে তিতুমীরের বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকার এক বিশাল সুশিক্ষিত সেনাবাহিনী প্রেরণ করে। মেজর স্কটের নেতৃত্বে এ বাহিনী তিতুমীরের নারিকেলবাড়িয়া বাঁশের কেল্লা আক্রমণ করে। ইংরেজদের কামান-বন্দুকের সামনে বীরের মতো লড়াই করে পরাজিত হয় তিতুমীরের বাহিনী। তিনি যুদ্ধে শহিদ হন। গোলার আঘাতে বাঁশের কেল্লা ভেঙে যায়। এভাবেই পরিসমাপ্তি ঘটে একটি সুসংগঠিত কৃষক আন্দোলনের। তিতুমীর ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ব্যাপক কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইংরেজদের গোলাবারুদ, নীলকর, জমিদারদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে তার বাঁশের কেল্লা ছিল দুঃসাহস আর দেশপ্রেমের প্রতীক, যা যুগে যুগে বাঙালিকে অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাহস যুগিয়েছে, প্রেরণা যুগিয়েছে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যেতে।
উদ্দীপকের ছক-২ বাংলার নবজাগরণের অন্যতম প্রবর্তক এবং 'ইয়াং বেঙ্গল' বা তরুণ বাংলা আন্দোলনের প্রবক্তা হেনরি লুই ডিরোজিও-র কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
ডিরোজিও ছিলেন একজন তরুণ, যুক্তিবাদী ও প্রতিভাবান শিক্ষক, যিনি ইতিহাস, সাহিত্য ও দর্শনে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তৎকালীন তরুণ সমাজকে তিনি অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের উর্ধ্বে উঠে যুক্তিবাদী হতে শিখিয়েছিলেন। তরুণদের পুরোনো ধ্যান-ধারণা পাল্টে দিতে এবং আধুনিক চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করতে তিনি বিভিন্ন সংগঠন ও পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন।
উদ্দীপকের ছক-২ এ উল্লিখিত 'একাডেমি অ্যাসোসিয়েশন'; 'পার্থেনন'
এবং 'হিসপাবাস'-এই সবকটিই ডিরোজিওর প্রতিষ্ঠিত বা অনুপ্রাণিত সংগঠন ও পত্রিকা। ১৮২৮ সালে তিনি তরুণদের নিয়ে 'একাডেমি অ্যাসোসিয়েশন' গড়ে তোলেন। তাঁরই অনুপ্রেরণায় ১৮৩০ সালে ছাত্ররা 'পার্থেনন' নামক পত্রিকা প্রকাশ করে এবং ১৮৩১ সালে তিনি নিজে 'হিসপাবাস' পত্রিকা সম্পাদনা করেন। সুতরাং, ছক-২ এর তথ্যগুলো স্পষ্টভাবে ডিরোজিওর আধুনিক চিন্তা প্রসারের ঐতিহাসিক পদক্ষেপগুলোকেই নির্দেশ করছে।
উদ্দীপকের ছক-১ এ নির্দেশিত ব্যক্তি হলেন বাংলার নবজাগরণের স্রষ্টা রাজা রামমোহন রায়, যিনি সমাজ ও ধর্ম সংস্কারের পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষাবিস্তারে যুগান্তকারী অবদান রেখেছিলেন।
রাজা রামমোহন রায় বহুভাষাবিদ ও পণ্ডিত ছিলেন। সমাজ থেকে সতীদাহের মতো কুসংস্কার দূর করতে তিনি 'আত্মীয় সভা' ও 'ব্রাহ্মসমাজ' গঠন করেন এবং 'মিরাতুল আখবার' প্রকাশ করেন। তবে, দেশবাসীর প্রকৃত উন্নতির জন্য তিনি পাশ্চাত্য ও আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।
ছক-১ এর শব্দগুলো রাজা রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কারমূলক কাজের প্রতিচ্ছবি। এই সংস্কারের পাশাপাশি তিনি শিক্ষাক্ষেত্রেও বিপ্লব এনেছিলেন। ১৮২২ সালে তিনি কোলকাতায় 'অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল' প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ইংরেজি, দর্শন ও আধুনিক বিজ্ঞান পড়ানো হতো। সংস্কৃত পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি ১৮২৩ সালে সরকারি সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে আধুনিক শিক্ষার দাবি জানান। রামমোহন রায় ছিলেন আধুনিক ভারতীয় শিক্ষার রূপকার। সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ সংস্কৃত শিক্ষার বদলে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে ব্যয় করার জন্য তিনি লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি লেখেন। তাঁর এই নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই ১৮৩৫ সালে ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তাই আধুনিক শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
উদ্দীপকে ইমাকে দেওয়া উপহারগুলো ইতিহাসের লিখিত উপাদানকে নির্দেশ করে।
উদ্দীপকে স্থায়ীয় বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী ইমাকে বিদ্যালয়ের। বিশেষ অনুষ্ঠানে ঐতিহাসিক নিদর্শন সংগ্রাহক হিসেবে বই ও পাণ্ডুলিপি। উপহার দেওয়া হয়। যা ইতিহাসের লিখিত উপাদান। ইতিহাস রচনায় লিখিত উপাদান অতীব গুরুত্বপূর্ণ। লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি। সাহিত্যকর্মেও তৎকালীন সময়ের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। যেমন- বেদ, কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র', কলহনের 'রাজতরঙ্গিনী', আবুল ফজলের 'আইন-ই-আকবরী' সন্ধ্যাকর নন্দীর 'রামচরিত', বানভট্টের 'হর্ষচরিত', চর্যাপদ, মঙ্গল কাব্য ইত্যাদি। তাছাড়া বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ। সবসময়ই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে বিবেচিত হয়েছে। যেমন-সপ্তম শতকের বাংলার ইতিহাস জানার জন্য হিউয়েন সাং-এর সি-ইউ-কি, ফা-হিয়েনের 'ফো-কুয়ো-কিং' 'ইবনে বতুতার রিহালা অন্যতম। সাহিত্য উপাদানের মধ্যে আরও রয়েছে রূপকথা, কিংবদন্তি, গল্পকাহিনি। তবে অনেক সময় কাহিনির আড়ালে সত্য ঘটনা থেকে যায় যা ঐতিহাসিকগণ বিচার-বিশ্লেষণ করে আবিষ্কার করেন। তাছাড়া সরকারি নথি, চিঠিপত্র ইত্যাদি থেকেও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব।
অতএব, উদ্দীপকের ইমাকে দেওয়া উপহার বই ও পান্ডুলিপি ইতিহাসের লিখিত উপাদানকে নির্দেশ করে।
পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় উদ্দীপকে ইরার উপাদানগুলোই যথেষ্ট নয়।
কেননা ইরাকে পুরাতন একটি সীল ও মুদ্রা উপহার দেওয়া হয়েছে যা ইতিহাসের অলিখিত উপাদান। আর শুধু অলিখিত উপাদান দ্বারা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়। পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় অলিখিত উপাদানের সাথে লিখিত উপাদানও প্রয়োজন। তথ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এ কারণেই ইতিহাসের উপাদানকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- লিখিত উপাদান ও অলিখিত উপাদান। ইতিহাস রচনার লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সাহিত্যকর্মেও তৎকালীন সময়ের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তাছাড়া বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ সবসময়ই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে, অলিখিত উপাদান যেমন- মুদ্রা, শিলালিপি, স্তম্ভলিপি, তাম্রলিপি, ইমারত ইত্যাদি। নিদর্শন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশ্লেষণের ফলে সে সময়ের অধিবাসীদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
অতএব শুধু লিখিত উপাদান পড়লেই পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করা যায় না। বরং লিখিত ও অলিখিত উপাদানের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা সম্ভব। তাছাড়া ইতিহাসের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে না।
দৃশ্যপট-২, অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায় গ্রামের লোকদের দরকারি জিনিসপত্র গ্রামেই তৈরি করত। এমনকি বিশ্ববিখ্যাত মসলিন এই বাংলাতেই তৈরি হতো।
দৃশ্যপট-১-এর ঘটনাটি প্রাচীন বাংলার সামাজিক অবস্থার কথা বলা হয়েছে।
উদ্দীপকে দৃশ্যপট-১-এ রহিম সাহেব একটি ভিডিও ক্লিপে তাঁর শিক্ষার্থীদের দেখান যে, একজন বিধবা মহিলাকে নিরামিষ আহার করে বিলাসিতা ত্যাগ করতে হতো, এমন কি মৃত চিতায় সহমরণে যেতে হতো। যা প্রাচীন বাংলার সামাজিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরে। প্রাচীন বাংলায় হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা প্রচলন ছিল। বিভিন্ন পেশাকে ভিত্তি করেই বর্ণের সৃষ্টি। ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈশ্য ও শূদ্র এ চারটি উল্লেখযোগ্য বর্ণ ছিল সমাজে। এ চারটি বর্ণের মধ্যে সামাজিক মেলামেশা ছিল না। বর্ণপ্রথা কঠোরভাবে পালিত হতো। প্রাচীন বাংলার মেয়েদের সুখ্যাতি ছিল। বাৎসায়ন তাদেরকে মৃদুভাষিনী, কোমলাঙ্গি ও অনুরাগবর্তী বলে বর্ণনা করেছেন। মেয়েরা লেখাপড়াও শিখত। শিক্ষিত সমাজে মাতা ও পত্নীর সম্মান ও মর্যাদা বেশ উচ্চ ছিল। সে যুগে অবরোধ বা পর্দাপ্রথা ছিল না। তবে বাংলার হিন্দু মেয়েদের কোনো স্বাতন্ত্র্য বা স্বাধীনতা ছিল না। একটি মাত্র স্বামী গ্রহণই ছিল সাধারণ নিয়ম। তবে পুরুষদের মধ্যে বহুবিবাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। অনেক স্ত্রীকেই সতীনের সাথে একত্রে জীবনযাপন করতে হতো। বিধবা নারী জীবনের চরম অভিশাপ বলে বিবেচিত হতো। মুছে যেত কপালের সিঁদুর ও সেই সাথে তার সমস্ত প্রসাধন ও অলঙ্কার। বিধবাকে নিরামিষ আহার করে সব ধরনের বিলাস বর্জন ও কৃচ্ছ সাধন করতে হতো। সমাজে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। এখানে মৃত স্বামীর সাথে জীবন্ত স্ত্রীকে পুড়িয়ে মারার মতো অমানবিক প্রথার চালু ছিল। প্রাচীন বাংলায় ধনসম্পত্তিতে নারীদের কোনো বিধিবিধানগত অধিকারও ছিল না।
হ্যাঁ, দৃশ্যপট-২-এর অবস্থা দেখে বোঝা যায় যে, একসময় প্রাচীন বাংলা শিল্পে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল।
প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় নানা প্রকার শিল্পজাত দ্রব্য তৈরি হতো। বস্ত্র শিল্পের জন্য বাংলা প্রাচীনকালেই বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। কার্পাস তুলা ও রেশমের জন্য তৈরি উন্নতমানের সূক্ষ্ম বস্ত্রের জন্যও বঙ্গ প্রসিদ্ধ ছিল। বস্ত্র শিল্পের জন্য বাংলা প্রাচীনকাল থেকেই বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। বিশ্বখ্যাত মসলিন কাপড় বাংলায় তৈরি করা হতো। এ কাপড় এতই সূক্ষ্ম ছিল যে, ২০ গজ মসলিন কাপড় একটি নস্যের কৌটায় ভরা যেত। তখনকার দিনের রাজারানিরা এ কাপড় পরিধান করত। কার্পাস তুলা ও শনের তৈরি মোটা কাপড়ও তখন প্রস্তুত হতো। বঙ্গদেশে সেসময় টিন পাওয়া যেত। বঙ্গে কৃষি ও শিল্পদ্রব্যের প্রাচুর্য ছিল। আবার এগুলোর খুব চাহিদাও ছিল ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। তাই বঙ্গের সাথে প্রাচীনকালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্যবসায় বাণিজ্য চলত। বঙ্গের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সুতি ও রেশমি কাপড়, চিনি, গুড়, লবণ, তেজপাতা ও অন্যান্য মসলা, চাল, নারকেল, সুপারি, ওষুধ তৈরির গাছপালা, নানা প্রকার হিরা, মুক্তা, পান্না ইত্যাদি। শিল্পের উন্নতির সাথে সাথে ব্যবসায় বাণিজ্যের যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছিল। জল ও স্থল উভয় পথেই বাণিজ্যের আদান-প্রদান চলত। বাংলায় বহু নদনদী থাকায় এক স্থান হতে অন্য স্থানে মালামাল আনানেওয়া সহজ ছিল। শিল্প-বাণিজ্য থেকে রাজার যথেষ্ট আয় হতো।
অতএব, উদ্দীপকে দৃশ্যপট-২ এর স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম ও বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম পাচীন বাংলার শিল্পের সমম্পির সাক্ষ্য বহন করে।
উদ্দীপকে কিছু ব্যক্তিবর্গের নাম যেমন- ঈসা খান, মুসা খান, চাঁদ রায়, কেদার রায়, বাহাদুর গাজী এবং তাদের শাসিত অঞ্চল যেমন-ভাওয়াল, ভূষণা, ভুলুয়া ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। যা বারো ভূঁইয়াদের নির্দেশ করে। বারো ভূঁইয়া নামে খ্যাত বাংলার জমিদারগণ তাদের নিজ নিজ জমিদারিতে স্বাধীন ছিলেন। তাদের শক্তিশালী সৈন্য বাহিনী ও নৌবহর ছিল। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তারা একজোট হয়ে মুঘল সেনাপতির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। বাংলার ইতিহাসে এ জমিদারগণ 'বারো ভূঁইয়া' নামে পরিচিত। এ 'বারো' বলতে। বারোজনের সংখ্যা বোঝায় না। ধারণা করা হয় অনির্দিষ্ট সংখ্যক জমিদারদের বোঝাতেই 'বারো' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে ঈসা খান ও মুসা খান ঢাকা জেলার অর্ধাংশ, প্রায় সমগ্র ময়মনসিংহ জেলা এবং পাবনা, বগুড়া ও রংপুর জেলার কিছু অংশ শাসন করতেন। চাঁদ রায় ও কেদার রায় শ্রীপুর, বাহাদুর গাজী ভাওয়াল, সোনাগাজী সরাইল, লক্ষণ মানিক্য ভুলুয়া, মুকুন্দরাম, সত্রজিৎ ভূষণা (ফরিদপুর) শাসন করতেন। বারো ভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন ঈসা খান। ঈসা খানের মৃত্যুর পর বারো ভূঁইয়াদের নেতা হন মুসা খান। তাদের বলিষ্ঠ উদ্যম দীর্ঘদিন বাংলাকে ভিনদেশি শাসকদের শাসন থেকে হেফাজত রেখেছিল। বাংলা ভূখণ্ড ও তার রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বীয় শাসনকার্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তাই তারা বাংলার বীর হিসেবে বিশেষ মর্যাদায় সমাদৃত। | পড়তেন।
অতএব উদ্দীপকে উল্লিখিত শাসকগণ বারো ভূঁইয়া নামে পরিচিত।
হ্যাঁ, উদ্দীপকে উল্লিখিত শাসকগণকে তথা বারো ভূঁইয়াদের পরাজিত করে বাংলায় মুঘল রাজত্ব কায়েম করা হয়। আমি-এর সাথে একমত।
সম্রাট আকবরের সময়ে সমগ্র বাংলায় মুঘল শাসন বিস্তৃতি হয় নি বারো ভূঁইয়াদের বাধার মুখে। সম্রাট আকবর শাহবাজ খান, সাদিক খান ও রাজা মানসিংহের মাধ্যমে তাদের দমনের চেষ্টা করেও চূড়ান্ত সাফল্য পান নি। বারো ভূঁইয়াদের পরাজিত করার কৃতিত্ব সম্রাট জাহাঙ্গীরের। বারো ভূঁইয়াদের দমনের কৃতিত্বের দাবিদার সুবাদার ইসলাম খান (১৬০৮-১৬১৩ খ্রিষ্টাব্দ)। শাসনভার গ্রহণ করেই তিনি বুঝতে পারেন যে, বারো ভূঁইয়াদের নেতা মুসা খানকে দমন করতে পারলেই তার পক্ষে অন্যান্য জমিদারকে বশীভূত করা সহজ হবে। সেজন্য তিনি রাজমহল থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কারণ মুসা খানের ঘাঁটি সোনারগাঁ ঢাকার অদূরে ছিল। বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় আসার পথে ইসলাম খান কয়েকজন জমিদারের আনুগত্য লাভ করেছিলেন। বারো ভূঁইয়াদের মোকাবিলা করার জন্য ইসলাম খান শক্তিশালী নৌবহর গড়ে তোলেন। মুসা খানের সাথে প্রথম সংঘর্ষ বাধে ১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দে করতোয়া নদীর পূর্বতীরে যাত্রাপুরে। সেখানে মুসা খানের দুর্গ ছিল। যুদ্ধে মুসা খান ও অন্যান্য জমিদার শেষপর্যন্ত পিছু হটেন। ইসলাম খান ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় প্রবেশ করেন। এ সময় থেকে ঢাকা হয় বাংলার রাজধানী। সম্রাটের নাম অনুসারে ঢাকার নাম করা হয় 'জাহাঙ্গীরনগর'। আর এভাবেই মুঘল আক্রমণে উদ্দীপকে উল্লিখিত বারো ভূঁইয়াদের শাসনের অবসান ঘটে।
তাই বলা যায়, বারো ভূঁইয়াদের পরাজিত করে সুবাদার ইসলাম খান বাংলার মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
এই আইনের মাধ্যমে খুনিচক্রকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি বাংলাদেশকে এর মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে হেয় করা হয়েছে। অবশ্য গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এলে আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালের ১২ই নভেম্বর জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ আইন প্রণয়ন বাতিল করে।
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ থানা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। উপজেলায় জনপ্রতিনিধির অধীনে সরকারি আমলাদের মাধ্যমে প্রশাসন পরিচালনার ব্যবস্থা হয়। ১৯৮২ সালের ৭ই নভেম্বর ৪৫টি থানাকে উপজেলা করার মধ্যদিয়ে এই ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে ৪৫০টি থানা উপজেলায় পরিণত হয়। ১৯৮৩ সালের ১৪ই মার্চ থানার পরিবর্তে উপজেলা নামকরণ করা হয়। প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণের জন্য মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ মোট ৬৪টি জেলায় ভাগ করা হয়। বিচারব্যবস্থায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। উপজেলায় পৃথক ম্যাজিস্ট্রেট ও সুন্সেফ আদালত প্রতিষ্টা করা হয়। এছাড়া রংপুর, যশোর, বরিশাল, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম এবং সিলেটে হাইকোর্টের স্থায়ীবেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কারণে ঢাকার বাইরের বেঞ্চগুলো বাতিল করা হয়। এছাড়াও এরশাদ শিক্ষা, কৃষি, ভূমি, ঔষধনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। উদ্দীপকের ডায়াগ্রাম-'ক' এর সময়কাল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনকালকে নির্দেশ করছে। তিনি ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখল করে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসন করেন। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক আর ১৯৮৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর থেকে ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিলেন রাষ্ট্রপতি।
১৯৮২ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে ১৯৯০ সালে ক্ষমতা ত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ নয় বছরের প্রায় পুরোটা সময় জনগণ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। এ সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট, ২২টি ছাত্র সংগঠন মিলে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ প্রভৃতি সংগঠন এরশাদবিরোধী চেতনাকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়। হরতাল, অবরোধে প্রশাসনে দেখা দেয় স্থবিরতা।
আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর পুলিশের গুলিতে নূর হোসেন নিহত হলে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ১৯৮৭ সালের ১২ নভেম্বর শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। ২৭নভেম্বর জারি করা হয় জরুরি অবস্থা। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার সমাবেশে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। এতে সমগ্র দেশ প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর ডা. শামসুল আলম খান মিলন নিহত হলে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা সম্মিলিতভাবে কারফিউ ও জরুরি আইন অমান্য করে মিছিল বের করে। ঢাকা পরিণত হয় মিছিলের নগরীতে। অবশেষে এ গণঅভ্যুত্থানের মুখে টিকতে না পেরে ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে এরশাদ ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এভাবে অবসান ঘটে এরশাদের দীর্ঘ স্বৈরশাসনের।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শুধু নূর হোসেন নয়, তার পাশাপাশি আরও অনেকেই ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
ইতিহাস হচ্ছে মানবসভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিক ও সত্যনিষ্ঠ বিবরণ। ফলে ইতিহাস পাঠের মাধ্যমে মানবগোষ্ঠীর উত্থান-পতন, সভ্যতার বিকাশ ও পতনের কারণগুলো জানার মাধ্যমে মানুষ ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য সহজেই অনুধাবন করতে পারে এবং নিজের কর্মের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকে। এভাবেই ইতিহাস পাঠ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করে।
যেসব বস্তু বা উপাদান থেকে বিশেষ সময়, স্থান বা ব্যক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়, সেসব বস্তু বা উপাদান হচ্ছে ইতিহাসের প্রত্নতাত্ত্বিক বা অলিখিত উপাদান। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো থেকে আমরা সে সময়ের শাসকদের রাজত্বকাল, শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, ধর্ম বিশ্বাস প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে জানতে পারি। এসব নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে- মুদ্রা, লিপিমালা, শিলালিপি, স্থাপত্য-ভাস্কর্য, স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি।
উদ্দীপকের আনজারা তার বাবার সাথে মহাস্থানগড়ে বেড়াতে যায়।
সেখানে পাথরের চাকতিতে খোদাই করা লিপিসহ বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখতে পায়। আনজারার বাবা বলেন, ধারণা করা হয়, বাংলাদেশের মধ্যে প্রাপ্ত এটিই প্রাচীনতম শিলালিপি। পূর্বোক্ত আলোচনা অনুযায়ী শিলালিপি ইতিহাসের অলিখিত উপাদানের অন্তর্ভুক্ত। তাই বলা যায়, আনজারার দেখা উপাদানগুলো হলো অলিখিত উপাদান।
ইতিহাস রচনায় লিখিত ও অলিখিত উভয় উপাদানই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু লিখিত উপাদান কিংবা অলিখিত উপাদান দ্বারা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়। কারণ একটি মাত্র উপাদান ইতিহাস সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য-উপাত্ত দিতে পারে না। একজন ঐতিহাসিকের দায়িত্ব হলো সমস্ত উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সমন্বয়ে সঠিক ইতিহাস রচনা করা। আর এক্ষেত্রে ইতিহাসের লিখিত উপাদানের সাথে অলিখিত উপাদানের সমন্বয় সাধন করা প্রয়োজন।
অলিখিত উপাদান যেমন- মুদ্রা, শিলালিপি, স্তম্ভলিপি, তাম্রলিপি, ইমারত, সমরাস্ত্র প্রভৃতির বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেই সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। অপরদিকে লিখিত উপাদানগুলোতে কোনো বিষয় সম্পর্কে সমকালীন বা পরবর্তী সময়ের ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক, পর্যটকদের লিখিত বিবরণ পাওয়া যায়। এসব লিখিত বিবরণ ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনার জন্য লিখিত ও অলিখিত উভয় ধরনের উপাদানের আবশ্যকতা রয়েছে।
উপরের আলোচনার পরিশেষে বলা যায়, শুধু অলিখিত উপাদানের - মাধ্যমে কোনো একটি জাতির পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস জানা সম্ভব নয়। পূ র্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার জন্য অলিখিত উপাদানের পাশাপাশি লিখিত উপাদানও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ছয় দফা কর্মসূচিতে বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের অধিকার চাওয়া হয়। ছয় দফা প্রস্তাবে উজ্জীবিত হয়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাংলার জনগণ অকুণ্ঠচিত্তে আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা আসে ছয় দফার ঐক্য থেকেই। তাই ছয় দফাকে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ বলা হয়।
আগরতলা মামলাটি করা হয়েছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে পূর্ব বাংলার গণমানুষের মুক্তির জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতির অভিযোগে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জনমানুষের সাথে অধিক সম্পৃক্ততা তাকে পূর্ব পাকিস্তানের জননেতায় পরিণত করেছিল। বিভিন্ন সময় বঙ্গবন্ধুর সাথে নানা পেশার, বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর তরুণ বাঙালি সদস্যদের যোগাযোগ হয়। একসময় তিনি সশস্ত্র বিপ্লবের দিকে আকৃষ্ট হন। এদিকে সামরিক বাহিনীতে বিদ্যমান বৈষম্যের কারণে কয়েকজন বাঙালি অফিসার ও সেনাসদস্য গোপনে সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য সংগঠিত হতে থাকেন। কিন্তু পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়ে। এ ষড়যন্ত্রের জন্য বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। এ মামলাটি দায়ের করা হয় ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে। এ মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন ৩৫ জন এবং সাক্ষীর সংখ্যা ছিল সরকার পক্ষের ১১ জন রাজসাক্ষীসহ মোট ২২৭ জন।
উদ্দীপকে দেখা যায়, একটি রাষ্ট্রের দুটি অংশ 'ক' ও 'খ'। 'ক' অংশের জনগণকে 'খ' অংশের শাসকবৃন্দ বৈষম্যের চোখে দেখতো। বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছিল। বৈষম্য থেকে মুক্ত করতে একজন নেতার আবির্ভাব হয়। তার কর্মকাণ্ড তাকে জননেতায় পরিণত করে। পরবর্তীতে তাঁকে প্রধান আসামী করে মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে শাসক গোষ্ঠী একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। পূর্বোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, উদ্দীপক দ্বারা ঐতিহাসিক আগরতলা মামলাকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
বাঙালিদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার স্ফুরণে এই মামলা গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। যে উদ্দেশ্যে আইয়ুব সরকার আগরতলা মামলা দায়ের করেছিল তা আদৌ সফল হয়নি; বরং এটি আইয়ুব সরকারের জন্য বুমেরাং হয়ে দেখা দেয়।
ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির পর উনসত্তরের গণআন্দোলন নতুন রূপ লাভ করে। ২৩শে ফেব্রুয়ারি সংবর্ধনা সভায় বঙ্গবন্ধু ১১ দফা দাবির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং ৬ দফা ও ১১ দফা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতি দেন। এই সময় তাকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ২৬শে ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খানের সাথে বঙ্গবন্ধু গোলটেবিল বৈঠকে ৬ দফা ও ১১ দফার প্রশ্নে অটল থাকেন। এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানেও আইয়ুববিরোধী আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে। গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনা বারবার ব্যর্থ হতে থাকে। পুরো দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। মার্চ মাসে সেনাবাহিনীর গুলিতে ৯০ জন নিহত হয়। অবশেষে ১০ই মার্চের বৈঠকে আইয়ুব খান সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তন ও প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচনের কথা ঘোষণা করেন। ২২ শে মার্চ আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানকে অপসারণ করেন। তাতেও গণআন্দোলন থামানো যায়নি। ২৫ শে মার্চ আইয়ুব খান সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এভাবে পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুববিরোধী গণঅভ্যুত্থান সফলতা অর্জন করে। আন্দোলনের এ সাফল্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও বাড়িয়ে দেয় এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার প্রকাশ তুঙ্গে ওঠে।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ভাষণে এ স্থান থেকেই মুক্তির সংগ্রাম ও স্বাধীনতার সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তান দখলদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল এ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিখা চিরন্তন স্থাপন করা হয়। শিখা চিরন্তন মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের আত্মত্যাগকে চির অম্লান করে রেখেছে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক সরকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে। ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর প্ররোচনায় ১ মার্চ স্থগিত ঘোষণা করেন। এ সময় পূর্ব পাকিস্তানে সরকারি কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতেই বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল জনসভায় বাঙালি জাতির প্রতি দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু এ সমাবেশে যে ভাষণ দেন তা বিশ্বের ইতিহাসে খ্যাত হয়ে গেছে। ২৫ মার্চ আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে চারটি দাবি উপস্থান করেন। এগুলো হলো:
১. চলমান সামরিক আইন প্রত্যাহার;
২. সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া;
৩. গণহত্যার তদন্ত করা এবং
৪. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।
উদ্দীপকে প্রদর্শিত চিত্রটিতে দেখা যায়, বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশাল এক জনসভায় ভাষণ প্রদান করছেন। লক্ষ লক্ষ জনতার সামনে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর উক্ত ভাষণটি বাঙালিল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ৭ই মার্চের ভাষণকেই নির্দেশ করে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করে। ফলে পূর্ব বাংলার জনগণ আন্দোলনে ফেটে পড়ে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ লোক জমায়েত হতে থাকে। বঙ্গবন্ধু এ সমাবেশে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এ ভাষণে তিনি বাঙালি জাতির শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার আহ্বান জানান। তিনি পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন-"এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।" তার এ ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলার আপামর জনসাধারণ স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুসারে দেশের স্কুল-কলেজ, অফিস, আদালত, কল-কারখানা সব বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষুদ্ধ জনতা পাকিস্তানবাহিনীর সদস্যদের বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ করতে থাকে। ১০ই মার্চ সরকার এক সামরিক আইন জারি করে সকল কর্মকর্তা কর্মচারীকে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু এর পরও পূর্ব পাকিস্তানের সর্বস্তরের জনগণ অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখে। অবস্থা বেগতিক দেখে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার জন্য। কিন্তু আলোচনা ফলপ্রসূ না হলে পাক-বাহিনী ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর আক্রমণ চালায়। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালিরা পাকিস্তানিদের প্রতিহত শুরু করে। ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, মজুর, শিক্ষকসহ সকল স্তরের জনগণ যুদ্ধে অংশ নেয়। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।
পরিশেষে বলা যায়, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণই এদেশবাসীকে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণে উদ্বদ্ধ করেছিল।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অনেক মানুষ শহিদ হন। তাদের জীবনের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তাই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন লাভ করে। সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ আওয়ামী লীগ মোট ১৬৭টি আসন লাভ করে জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আবার পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ ৩১০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ মোট ২৯৮টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় এ দলের নেতৃত্বে সরকার গঠন হওয়া ছিল আইনসম্মত। কিন্তু, পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি আরম্ভ করেন। তিনি ৩রা মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন জুলফিকার আলী ভুট্টোর প্ররোচনায় ১লা মার্চ স্থগিত ঘোষণা করেন। আর এসব কারণেই বিজয়ী হয়েও পূর্ব পাকিস্তান ক্ষমতায় বসতে পারেনি।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়ের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং বাঙালি জাতি উক্ত নির্বাচনের জয়কে তাদের নেতৃত্বের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন আছে বলে ধরে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ আওয়ামী লীগ মোট ১৬৭টি আসন লাভ করে জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং প্রাদেশিক পরিষদে ৩১০টি আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ জয় পায়। প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদে বিজয়ের ফলে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত ঠিক সে সময় উদ্দীপকের 'ক' রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীর মতো ক্ষমতা ছেড়ে দিতে টালবাহানা শুরু করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। সর্বোপরি ইয়াহিয়া খানের ঘোষণা অনুযায়ী নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় আসলে তিনি তা না করে নিরীহ বাঙালির ওপর সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দেন। এ ঘটনা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে উজ্জীবিত করে। ফলে শুরু হয় বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম। যার পরিণতিতে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্ম নেয়।
পরিশেষে বলা যায়, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফলে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথ তৈরি হয় এবং তা স্বাধীনতা যুদ্ধে এদেশের মানুষকে অনুপ্রেরণা যোগায়। তাই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনে উক্ত নির্বাচনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ আওয়ামী লীগ মোট ১৬৭টি আসন লাভকরে জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আবার পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ মোট ২৯৮টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
১৯৭২ সালের সংবিধান ছিল একটি লিখিত দলিল। এ সংবিধানের মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে তাদের কষ্ট দূর করা। এই সংবিধানে ছিল একটি প্রস্তাবনা, ১১টি ভাগ, ১৫৩টি অনুচ্ছেদ এবং ৪টি তফসিল। অনুরূপভাবে উদ্দীপকের নীতিমালায়ও ১১টি ভাগ, ১৫৩টি অনুচ্ছেদ ও ৪টি তফসিল ছিল। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথমভাগে প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য, দ্বিতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারসমূহ, চতুর্থভাগে নির্বাহী বিভাগ, পঞ্চম ভাগে জাতীয় পরিষদ, ষষ্ঠ বিভাগে বিচার বিভাগ, সপ্তম ভাগে, নির্বাচন, অষ্টম ভাগে মহাহিসাব নিরীক্ষণ ও নিয়ন্ত্রক, নবম ভাগে কর্ম কমিশন, দশম ভাগে সংবিধান সংশোধন এবং একাদশ ভাগে বিবিধ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সংবিধান হচ্ছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি।
সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের ছকে উল্লিখিত ১১টি ভাগ, ১৫৩টি অনুচ্ছেদ, সর্বোচ্চ আইন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি দ্বারা ১৯৭২ সালের সংবিধানকেই নির্দেশ করা হয়েছে।
সংবিধান একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দলিল। দীর্ঘ ত্যাগ, সংগ্রাম আর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশের মানুষ এ সংবিধান লাভ করে। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে দেশের তিরিশ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশ পরিচালনার জন্য প্রণীত সংবিধানে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।
১৯৭২ সালের সংবিধানে ঘোষণা করা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। কেবল সংবিধানের অধীনে থেকে জনগণের পক্ষে সে ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে। আবার রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে যে চারটি বিষয়কে ধরা হয়েছে তার সবই ছিল জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এ সংবিধানে জনগণের মৌলিক অধিকারের নিশ্চিয়তা দেওয়ার পাশাপাশি এগুলোকে অলঙ্ঘনীয় এবং পবিত্র বলে ঘোষণা করা হয়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ সংবিধানে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করা হয়। এ লক্ষ্যে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়, যাতে সবার সম্মিলিত প্রয়াসে একটি অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গড়ে তোলা যায়। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রতিটি বিধান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর কেন্দ্রবিন্দু জনগণ। স্বল্পতম সময়ে এ সংবিধান প্রণীত হলেও এতে এদেশের জনগণের চাহিদা, আশা-আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উপরের আলোচনার পরিসমাপ্তিতে তাই বলা যায়, ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছিল।
'দস্তক' হলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিদের ব্যবহৃত এক ধরনের বাণিজ্যিক ছাড়পত্র বা অনুমতিপত্র।
দিল্লির সম্রাটের ফরমান অনুযায়ী ইংরেজরা এই দস্তক দেখিয়ে বিনাশুল্কে বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করেছিল। তবে এই দস্তকের অপব্যবহার কোম্পানি ও দেশীয় বণিকদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করে। কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যবসায় দস্তক ব্যবহার শুরু করলে দেশীয় বণিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নবাবের রাজস্ব আয়ও কমে যায়। এটি মূলত ইংরেজদের সাথে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও মীর কাশিমের বিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।
উদ্দীপকের ঘটনার সাথে পাঠ্যবইয়ের ১৭৫৭ সালের ঐতিহাসিক 'পলাশীর যুদ্ধের' ঘটনার গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। জনাব 'X'-এর রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পরাজয় মূলত নবাব সিরাজউদ্দৌলার জীবনের শেষ অধ্যায়কে নির্দেশ করে।
উদ্দীপকে দেখা যায়, জনাব 'X' একজন স্বাধীন শাসক ছিলেন যার বিরুদ্ধে তাঁর আত্মীয়রা ষড়যন্ত্র শুরু করে। সিরাজউদ্দৌলার ক্ষেত্রেও তাঁর বড় খালা ঘসেটি বেগম ও খালাতো ভাই শওকতজঙ্গ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। উদ্দীপকের 'P' নামক যুদ্ধে জনাব 'X'-এর প্রধান সেনাপতির বিশ্বাসঘাতকতার কথা বলা হয়েছে। এটি সরাসরি পলাশীর যুদ্ধে নবাবের প্রধান সেনাপতি মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতাকে মনে করিয়ে দেয়। পলাশীর প্রান্তরে মীরজাফর তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করেন, যার ফলে নবাবের বিজয় আসন্ন হওয়া সত্ত্বেও পরাজয় ঘটে।
উদ্দীপকের জনাব 'X'-এর পরাজয় ও শাসনের অবসান যেমন বিশ্বাস ঘাতকতার ফল, সিরাজউদ্দৌলার ক্ষেত্রেও তা ধ্রুব সত্য। তাই সার্বিক বিচারে উদ্দীপকের এই ঘটনাটি পলাশীর যুদ্ধেরই একটি প্রতিচ্ছবি।
পলাশীর যুদ্ধে সংঘটিত বিশ্বাস ঘাতকতাই মূলত বাংলার স্বাধীনতার সূর্যকে অস্তমিত করেছিল। মন্তব্যটি যথার্থ।
কেননা এই বিশ্বাস ঘাতকতার ফলে বাংলার রাজনৈতিক ও সার্বভৌমত্বের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল তা দীর্ঘ ২০০ বছরের পরাধীনতা বয়ে আনে। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় কোনো সামরিক দুর্বলতার কারণে হয়নি। নবাবের পক্ষে মীর মদন ও মোহনলালের মতো দেশপ্রেমিক যোদ্ধারা প্রাণপণ লড়েছিলেন। কিন্তু প্রধান সেনাপতি মীরজাফর যখন কোরআন স্পর্শ করে শপথ করার পরও যুদ্ধের ময়দানে বিশ্বাস ঘাতকতা করেন, তখন নবাবের পরাজয় অনিবার্য হয়ে পড়ে। এই একটি ঘটনাই বাংলার শাসনের নিয়ন্ত্রণ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার পথ সুগম করে দেয়। মীরজাফরের এই বিশ্বাস ঘাতকতার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল ভয়াবহ। এর ফলে ইংরেজরা মীরজাফরকে পুতুল নবাব বানিয়ে প্রকৃত ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নেয়। বাংলার ধন-সম্পদ অবাধে লুণ্ঠন শুরু হয় এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাংলার শাসকদের হাত থেকে ইংরেজদের কাছে চলে যায়। ১৭৫৭ সালের সেই বিশ্বাস ঘাতকতার কারণেই বাংলার দীর্ঘ কালীন স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয় এবং ঔপনিবেশিক শাসনের কালো ছায়া নেমে আসে।
পরিশেষে বলা যায়, মীরজাফর ও তাঁর সহযোগীদের ব্যক্তিগত লোভও বিশ্বাস ঘাতকতা না থাকলে ইংরেজরা পলাশীর যুদ্ধে জয়ী হতে পারত না। ফলে বাংলার স্বাধীনতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারত। তাই উক্তিটি যথার্থ যে, এই বিশ্বাস ঘাতকতাই বাংলার স্বাধীনতার চিরস্থায়ী অবসান ঘটিয়েছিল।
সমগ্র খন্ডিত বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি বৃহত্তর ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের অনন্য রাজনৈতিক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহকে 'শাহ-ই-বাঙ্গালা' বলা হয়।
লখনৌতির ক্ষমতা দখলের পর ইলিয়াস শাহ সাতগাঁও এবং সোনারগাঁ জয় করে সমগ্র বাংলার ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। তার এই যুগান্তকারী বিজয়ের ফলেই বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল প্রথমবারের মতো একটি একক রাজনৈতিক পরিচয়ে একত্রিত হয়। এই বৃহত্তর বাংলা সৃষ্টির জন্যই তিনি 'শাহ-ই-বাঙ্গালা' উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।
উদ্দীপকে উল্লিখিত রাজবংশ 'ক' হলো বাংলার ইতিহাসে সুপরিচিত 'ইলিয়াস শাহি বংশ', যা শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের নেতৃত্বে খণ্ডিত বাংলাকে একত্রিত করে স্বাধীনভাবে শাসন করেছিল।
১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় স্বাধীন সুলতানি যুগের সূচনা হলেও তা বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। ইলিয়াস শাহ ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে লখনৌতির ক্ষমতা দখল করেন। পরবর্তীতে তিনি সাতগাঁও এবং ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁ জয় করে সমগ্র বাংলাকে একটি স্বাধীন একক রাষ্ট্রে পরিণত করেন। তিনি দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের আক্রমণ দৃঢ়তার সাথে প্রতিহত করে বাংলার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখেন।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে, 'ক' বংশের শক্তিশালী শাসক 'খ' স্থানে (বাংলায়) সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এই শক্তিশালী শাসক হলেন ইলিয়াস শাহ, যিনি নিজ নামে খুতবা পাঠ ও মুদ্রা জারি করে দিল্লির বশ্যতা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। একডালা দুর্গের যুদ্ধে তিনি দিল্লির আক্রমণ রুখে দিয়ে বাংলার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করেছিলেন। তার বিচক্ষণ সামরিক নীতি এবং সফল প্রজাপালনের মাধ্যমেই এই রাজবংশ বাংলায় স্বাধীনভাবে শাসন করেছিল।
ইলিয়াস শাহি রাজবংশের 'ক' পরবর্তী দিকের সুলতানদের অদূরদর্শিতা, রাজদরবারে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র এবং হাবসি ক্রীতদাসদের মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতা ও প্রশ্রয়ের কারণেই শেষ পর্যন্ত দাসরা তাদের পরাজিত করে ক্ষমতা দখল করেছিল।
সুলতান রুকনউদ্দিন বরবক শাহ রাজ্যে নিজের একটি অনুগত দল গঠনের উদ্দেশ্যে আবিসিনিয়া থেকে প্রায় আট হাজার হাবসি ক্রীতদাস সংগ্রহ করে সেনাবাহিনী ও প্রাসাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তার সময়ে এই ব্যবস্থা কাজ করলেও, পরবর্তী দুর্বল সুলতানদের আমলে এই উচ্চা ভিলাষী ক্রীতদাসরাই সাম্রাজ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
উদ্দীপকে উল্লেখ আছে যে, 'ক' রাজবংশের শাসনামল মাঝে মাঝে তাদের দাসদের দ্বারা বিঘ্নিত হয়েছিল। ইতিহাসে দেখা যায়, ইলিয়াস শাহি বংশের শেষ সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহ যখন দেখলেন হাবসি ক্রীতদাসরা চরম ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছে, তখন তিনি তাদের প্রতিপত্তি কমানোর চেষ্টা করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সমস্ত হাবসি ক্রীতদাস একজোট হয়ে সুলতানের বিরুদ্ধে ভয়ংকর ষড়যন্ত্র শুরু করে।
অবশেষে প্রাসাদরক্ষী দলের প্রধান সুলতান শাহজাদা অন্যান্য দাসদের প্রলোভন দেখিয়ে ফতেহ শাহকে প্রাসাদের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে বিশ্বস্ততার পরিবর্তে দাসদের ওপর অন্ধ বিশ্বাস, অতিরিক্ত ক্রীতদাস-নির্ভরতা এবং পরবর্তী শাসকদের সামরিক অযোগ্যতার ফলেই বাংলার এই গৌরবময় স্বাধীন রাজবংশটিকে তাদেরই নিযুক্ত দাসদের হাতে পতন ও পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল।
না, রুহির মামার মতো লিখিত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ দেশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়।
উদ্দীপকের রুহির মামা বিভিন্ন সেমিনারে ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে মতামত তুলে ধরেন। তার রচিত গ্রন্থ 'বাংলার ইতিহাস' পাঠক মহলে সমাদৃত। তবে তার ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ দ্বারা কোনো দেশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়। পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় এর সাথে নথি, দলিলপত্র, বিদেশিদের বিবরণসহ অলিখিত উপাদানেরও প্রয়োজন রয়েছে। তথ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এ কারণেই ইতিহাসের উপাদানকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- লিখিত উপাদান ও অলিখিত উপাদান। ইতিহাস রচনার লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সাহিত্যকর্মেও তৎকালীন সময়ের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তাছাড়া বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ সব সময়ই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে, অলিখিত উপাদান যেমন- মুদ্রা, শিলালিপি, স্তম্ভলিপি, তাম্রলিপি, ইমারত ইত্যাদি। এসব নিদর্শন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশ্লেষণের ফলে সে সময়ের অধিবাসীদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অতএব বলা যায়, শুধু লিখিত উপাদান ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ দ্বারা একটি দেশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়। এর সাথে নথি, দলিলপত্র, জীবনী গ্রন্থ ইত্যাদির পাশাপাশি অলিখিত উপাদানের মাধ্যমে দেশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা সম্ভব।
অতএব, রুহির মামার লিখিত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ দ্বারা কোনো দেশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়।
উদ্দীপকে উল্লিখিত রুহির মতামতটি জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের পথে অন্তরায়। মন্তব্যটি যথার্থ।
উদ্দীপকের রুহি ইতিহাস জানতে আগ্রহী নয়। তার মতে অতীত মৃতপ্রায়। যা কোনো কাজে আসে না। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এটি অচল। রুহির এ মতামতটি জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের পথে অন্তরায়। কারণ মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধ তৈরি, মেধা ও মননশীলতা বিকাশের জন্য ইতিহাস পাঠের প্রয়োজন আছে। রুহি যে মতামত দিয়েছে, তাতে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে উদাসীনতা লক্ষ করা যায়। কিন্তু তার ধারণা ঠিক নয়। কারণ অতীতের সত্যনিষ্ঠ বর্ণনা মানুষের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। আর এ বিবরণ যদি হয় নিজ দেশ-জাতির সফল সংগ্রাম ও গৌরবময় ঐতিহ্যের তাহলে তা মানুষকে জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। ইতিহাসে মানুষের অতীত সত্য ঘটনাবলি উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। ফলে ঐতিহাসিক কোনো ভালো নিদর্শন থেকে ভালো কিছু করার শিক্ষা পাওয়া যায়। ইতিহাস অতীত, সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতা, আচার-অনুষ্ঠান ও পারিবারিক জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা করে থাকে। একইসঙ্গে ইতিহাস মানুষকে আত্মপ্রত্যয়ী ও আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে। ইতিহাস পাঠ করে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর উত্থান-পতন এবং সভ্যতা বিকাশের কারণগুলো জানতে পারলে মানুষ ভালোমন্দের পার্থক্য সহজেই বুঝতে পারে।
অতএব একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, একটি জাতির জাতীয়বাদী চেতনার বিকাশের ক্ষেত্রে ইতিহাসের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম বিধায় রুহির মতামত জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের অন্তরায়।
মাসুমের দেখা শাসকশ্রেণির সাথে বাংলার মধ্যযুগের মিল রয়েছে।
উদ্দীপকের মামুন প্রামাণ্য চিত্রে একটি যুগের মুসলমান অভিজাতদের দেখে যারা জমকালো প্রাসাদে বাস করত। তাদের, রাজধানী ছিল মনোমুগ্ধকর অট্টালিকায় সুসজ্জিত। এখানে মাসুম মধ্যযুগের মুসলিম অভিজাতদের কথা জেনেছে। মধ্যযুগে বাংলার সমাজ ব্যবস্থায় বাংলা ভাষা-ভাষীসহ আরো কিছু ভাষা অনুসারী মানুষের অস্তিত্ব ছিল। একই সঙ্গে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধসহ অন্যান্য লোক ধর্মানুসারী মানুষেরা বসবাস করতেন। কিন্তু মূলত ইসলাম ও সনাতন ধর্মকে কেন্দ্র করেই মধ্যযুগে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি-নীতি গড়ে উঠেছিল। মধ্যযুগে বাংলায় মুসলমান শাসনকালে সুলতান ছিলেন সমাজ জীবনে সর্বোচ্চ আসনের অধিকারী। মুসলমান শাসকরা অভিজাত সম্প্রদায়ভুক্ত এবং জমকালো প্রাসাদে বাস করতেন। তাঁদের রাজধানীও নানারকম মনোমুগ্ধকর অট্টালিকায় সুসজ্জিত থাকত। ঐশ্বর্য ও আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াও রাজদরবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিদের সমাবেশ। শাসকগণ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সংস্কৃতির উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। মধ্যযুগে বাংলা মানুষের দৈনন্দিন জীবনধারার রীতিনীতি ও প্রথা-পদ্ধতি ছিল সংমিশ্রণ ও সমন্বয় ধর্মী।
১৩-১৯ শতকের দিকে হিন্দু-বৌদ্ধ ও লোকজ ধর্মাবলম্বীগণ সংখ্যায় ছিলেন বেশি। এই বৈচিত্র্যময় সমাজের মূল নীতিগুলো এবং সাধারণ সমাজ ব্যবস্থায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। এ যুগেও সমাজে হিন্দুদের মধ্যে জাতিভেদ প্রথা প্রচলিত ছিল।
উক্ত যুগে তথা মধ্যযুগে বাংলার শাসকগণ কেবল রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেই নয়, শিক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। মন্তব্যটি যথার্থ ও যুক্তিযুক্ত।
মধ্যযুগে বাংলার শাসকগণ কেবল রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেই নয়, শিক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। এ সময় শিক্ষার দ্বার হিন্দু-মুসলমান সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল। শেখদের খানকাহ্ ও উলেমাদের গৃহ শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। মুসলমান শাসনের সময় বাংলার বিভিন্ন স্থানে মসজিদের সঙ্গেই সক্তব ও মাদ্রাসা ছিল। মক্তব ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করত। বালক-বালিকারা একত্রে মক্তব ও পাঠশালায় লেখাপড়া করত। শাসকবর্গের ভাষা ছিল ফার্সি। তাই এ ভাষা প্রায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভ করেছিল। সরকারি চাকরি লাভের আশায় অনেক হিন্দু ফার্সি ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করতেন। এ যুগে বাংলা ভাষা বিশেষ সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। মধ্যযুগের পূর্বে বাংলার সমাজে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণদের একচেটিয়া অধিকার ছিল। মধ্যযুগে সমাজের সকল শ্রেণির জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হয়। পাঠশালায় হিন্দু বালক-বালিকারা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করত। গুরুর আবাসস্থল কিংবা বিত্তবানদের গৃহে পাঠশালা বসতো। কখনও কখনও একই ঘরের চালার নিচে মক্তব ও পাঠশালা বসত। সকালে মুনশি মক্তবের শিক্ষার্থীদের এবং বিকালে গুরু তার ছাত্রদের পাঠশালায় শিক্ষা দান করতেন। বিত্তবান লোকেরা পাঠশালার ব্যয়ভার বহন করতেন। বালক-বালিকারা একত্রে পাঠশালায় শিক্ষা গ্রহণ করতো। ছয় বছর বয়স পর্যন্ত পাঠশালায় শিক্ষা গ্রহণ করতে হতো। উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য 'টোল' ছিল। সংস্কৃত ভাষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে হতো। অনেক নারী এ যুগে শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে নিজেদের কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন।
উদ্দীপকে ছক 'ক'-এ প্রদর্শিত তথ্যগুলোর সাথে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের লাহোর প্রস্তাব সম্পর্কযুক্ত।
বেঙ্গল প্যাক্ট অকার্যকর হলে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সম্ভাবনা ব্যাহত হয়। এ পরিস্থিতিতে ১৯২৮ সালের আগস্ট মাসে মতিলাল নেহেরুর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি নেহেরু রিপোর্ট ও ১৯৩০ সালে প্রকাশিত সাইমন কমিশনের রিপোর্ট সব রাজনৈতিক দল প্রত্যাখ্যান করে।
এসময় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ এ সমস্যা সমাধানের জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপ দেয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামজে ম্যাকডোনাল্ড সমস্যা সমাধানের জন্য সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ ঘোষণা করেন। ১৯৩৫ সালে পার্লামেন্টে ভারত শাসন আইন গৃহীত হয়। জিন্নাহ এ আইনে প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সমালোচনা করায় যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার প্রবর্তন করা সম্ভব হয়নি। দলগুলোর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও ১৯৩৭সালে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৩৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সিন্ধুতে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভায় হিন্দু ও মুসলমান দুটি ভিন্ন জাতি বলে অনুধাবন করে দ্বিজাতি ঘোষণা করেন। এভাবেই লাহোর প্রস্তাবের আগেই হিন্দু-মুসলমান আলাদা জাতি- এই চিন্তা করার ফলে তাদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের চিন্তারও প্রকাশ ঘটতে থাকে। এই প্রকাশের বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে ১৯৪০ সালে শেরে বাংলা কর্তৃক উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাব। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে এই প্রস্তাবটি গৃহীত হয় বলে এটি ইতিহাসে লাহোর প্রস্তাব নামে পরিচিত। এর প্রস্তাবের ফলেই ১৪ আগস্ট 'পাকিস্তান' এবং ১৫ আগস্ট ১৯৪৭সাল 'ভারত' নামে দুটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়।
উদ্দীপকে ছক 'খ'-এর সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। তাদের আন্দোলন আপাতত ব্যর্থ হলেও এর ফলাফল ছিল সুদূর প্রসারী।
বাংলার সশস্ত্র বিপ্লীরা যেমন মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দারসহ অনেক বিপ্লবী ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশদের বিতাড়নের যে সংগ্রাম শুরু করেন তা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে। তাদের আত্মত্যাগ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে এবং তরুণ সমাজের মধ্যে স্বাধীনতার স্পৃহা বাড়িয়ে তোলে। ১৯১১ সাল থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত এ সংগ্রাম জোরদার হলেও এর আগেই সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। ১৯০৮ সালে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য ক্ষুদিরামের বোমা হামলার মধ্য দিয়ে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন আত্মপ্রকাশ করে। এই আন্দোলন মূলত শেষ হয় ১৯৩০ সালে। তবে এর পরেও বিচ্ছিন্নভাবে সশস্ত্র আক্রমণের ঘটনা ঘটে। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের আগেই বাংলার প্রথম পর্যায়ের সশস্ত্র আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। প্রথম পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে ছিলেন অরবিন্দ্র ঘোষ, বারীন্দ্র ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ। পুলিন বিহারী দাস ছিলেন ঢাকার অনুশীলন সমিতির প্রধান সংগঠক। এরা বোমা তৈরি থেকে শুরু করে সব ধরনের অস্ত্র সংগ্রহসহ বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সশস্ত্র আক্রমণ, গুপ্ত হত্যা ইত্যাদি কর্মসূচির মাধ্যমে এরা সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখেন।
অতএব নেতৃত্বের অভাব, জনবিচ্ছিন্নতা ও জনগণের সচেতনতার অভাবে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন ব্যর্থ হলেও তাদের আত্মত্যাগ ও। দেশপ্রেম ভারত বাসীকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়েছিল।
ঘটনা-১ দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা। বলা হয়েছে।
পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার হয়। এ কারণে পূর্ব পাকিস্তান কখনো অর্থনৈতিক ভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সকল পরিকল্পনা প্রণীত হতো কেন্দ্রীয় সরকারের সদর দপ্তর পশ্চিম পাকিস্তানে। জন্মলগ্ন থেকে পাকিস্তানে তিনটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গৃহীত হয়। প্রথমটিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে ১১৩ কোটি ও ৫০০ কোটি রুপি, দ্বিতীয়টিতে বরাদ্দ ছিল ৯৫০ কোটি রুপি এবং ১৩৫০ কোটি রূপি। তৃতীয়টিতে পূর্ব ও পশ্চিমের জন্য বরাদ্দ যথাক্রমে ৩৬% ও ৬৩%। রাজধানী উন্নয়নের জন্য বরাদ্দের বেশির ভাগ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য। ১৯৫৬ সালে করাচির উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হয় ৫৭০ কোটি ঢাকা, যা ছিল মোট ব্যয়ের ৫৬.৪%। পূর্ব পাকিস্তানের কাঁচামাল সস্তা হলেও শিল্পকারখানা বেশিরভাগ গড়ে উঠেছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ব্যাংক-বিমা, বাণিজ্যিক সকল প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। যা পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের পথে বড় বাধা ছিল।
উদ্দীপকের ছকে দেখানো হয়েছে পাকিস্তান আমলের ব্যাংক, বিমা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে, তাছাড়া পাকিস্তানে মোট সরকারি ব্যয়ের ৫-১০ হার উল্লেখ করা হয়েছে যা পূর্ব অর্থনৈতিক বৈষম্য তুলে ধরে। অতএব বলা যায়, উদ্দীপকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অর্থনৈতিক বৈষম্য নির্দেশ করা হয়েছে।
উদ্দীপকের ঘটনা-২ এ ১৯৬৬ সালের ছয় দফার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ছয় দফার মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করা।
পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন শোষণ থেকে মুক্ত করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তার দাবিগুলো, ছিল সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ। এতে বলা হয় উভয় পাকিস্তানের জন্য ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রা থাকবে, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে এবং আঞ্চলিক বাহিনি থাকবে। ফলে ছয় দফার পক্ষে ব্যাপক জনমত গড়ে ওঠে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থা সহজে বিনিময়যোগ্য দুটি মুদ্রা, স্বতন্ত্র ব্যাংক প্রভৃতি বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। ছয় দফার দাবিগুলো বাঙালি জাতির সর্বাঙ্গীন মুক্তির দাবি। ছয় দফার পক্ষে জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করেন। ফলে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু হয়। পুলিশের গুলিতে অনেক লোক প্রাণ হারায়। এ ছয় দফা দাবি ছিল পরবর্তীতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মূল ইশতেহার। যা তাদের বিজয় এনে দেয় এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে ছয়দফার চূড়ান্ত প্রকাশ বাঙালির মুক্তি ঘটে।
তাই বলা যায়, ছয়দফা দাবি ছিল দাবিসমূহ আদায়ের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের হাত থেকে মুক্ত করা। যার কারণে এটিকে বাঙালির মুক্তির সনদ বলা হয়।
জাতীয় স্মৃতিসৌধের সাতটি ত্রিভুজাকার দেয়াল বাঙালির স্বাধীনতার পথে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামপর্বের প্রতীক। এগুলো হলো ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ।
ক্রমে উঁচু হয়ে ওঠা দেয়ালগুলো দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও চূড়ান্ত বিজয়ের ধারাবাহিকতা প্রকাশ করে। তাই এগুলো বাঙালির গৌরবময় জাতীয় আন্দোলনের প্রতীক।
উদ্দীপকের প্রশ্নবোধক স্থানে ‘বাংলাদেশের সংবিধান’ বসবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র নতুন রাষ্ট্রের আইনগত ভিত্তি দেয়। স্বাধীনতার পর জনগণের অধিকার, রাষ্ট্রের কাঠামো ও সরকার পরিচালনার নিয়ম নির্ধারণে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান প্রয়োজন হয়।
১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ গণপরিষদ আদেশ জারির পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গণপরিষদ গঠিত হয়। ১১ এপ্রিল ড. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে ৩৪ সদস্যের সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি খসড়া প্রস্তুত করলে গণপরিষদে আলোচনা ও সংশোধনের পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর তা গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হয়। এটাই বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পটভূমি।
উক্ত বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধান। এটি কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার আইনি দলিল নয়; মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ।
সংবিধানে জনগণকে রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি করা হয়েছে এবং নাগরিকের সাম্য, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংসদীয় সরকার পরিচালনা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা ও জবাবদিহিও এতে নির্ধারিত।
সংবিধানের নীতি ও অধিকার বাস্তবায়িত হলে শোষণমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ সুদৃঢ় হয়। তাই এটি বাংলাদেশের জনগণের মুক্তিযুদ্ধলব্ধ আশা-আকাঙ্ক্ষার স্থায়ী প্রতীক হিসেবে বেঁচে থাকবে—মন্তব্যটি যথার্থ।
গ্রিক শব্দ 'হিস্টরিয়া;' (Historia) থেকে ইংরেজি হিস্টরি (History) শব্দটির উৎপত্তি, যার বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে ইতিহাস। হেরোডোটাস বিশ্বাস করতেন, ইতিহাস হলো- যা সত্যিকার অর্থে ছিল বা সংঘটিত হয়েছিল তা অনুসন্ধান করা ও লেখা। তিনি তাঁর গবেষণায় গ্রিস ও পারস্যের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের বিভিন্ন বিষয় অনুসন্ধান করেছেন। হেরোডোটাসই প্রথম ইতিহাস ও অনুসন্ধান- এ দুটি ধারণাকে সংযুক্ত করেন। ফলে ইতিহাস পরিণত হয় বিজ্ঞানে, পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে তথ্যনির্ভরতায় এবং গবেষণার বিষয়ে।
ইতিহাস রচনার লিখিত উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য, বৈদেশিক বিবরণ, দলিলপত্র ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সাহিত্যকর্মেও তৎকালীন সময়ের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। যেমন- বেদ, কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র', কলহনের 'রাজতরঙ্গিনী', মিনহাজ-উস-সিরাজের' তবকাত-ই-নাসিরী' বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' ইত্যাদি। বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ সব সময়ই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে বিবেচিত হয়েছে। যেমন- পঞ্চম থেকে সপ্তম শতকে বাংলায় আগত চৈনিক পরিব্রাজক যথাক্রমে ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাং ও ইৎসিং-এর বর্ণনা। পরবর্তী সময়ে আফ্রিকান পরিব্রাজক ইবনে বতুতাসহ অন্যদের লেখাতেও এ অঞ্চল সম্পর্কে বিবরণ পাওয়া গিয়েছে। এসব বর্ণনা থেকে তৎকালীন সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা যায়।
উদ্দীপকের ছক-ক এর বিষয়গুলো ইতিহাসের লিখিত উপাদানের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের ছক- 'ক' দ্বারা ইতিহাসের লিখিত উপাদানকে নির্দেশ করে।
ছক-খ তথা অলিখিত উপাদান পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস জানতে আংশিক ভূমিকা রাখবে। কেননা কেবল অলিখিত উপাদানের মাধ্যমে একটি জাতির পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস জানা সম্ভব নয়।
লিখিত ও অলিখিত উপাদানের ওপর ভিত্তি করেই ইতিহাস রচিত হয়ে থাকে। লিখিত উপাদানের মধ্যে সাহিত্য, নথিপত্র, জীবনী, দলিলপত্র, চিঠিপত্র প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, অলিখিত উপাদান মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। মূর্তি, স্মৃতিস্তম্ভ, মুদ্রা, লিপি, ইমারত ইত্যাদি প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান। এসব উপাদানের মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষ ও সমাজের ইতিহাস জানা সম্ভব। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান মানবজীবনের অতীত অগ্রগতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য দিতে পারে না। সেক্ষেত্রে অবশ্যই লিখিত উপাদানের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই ইতিহাস রচনায় ইতিহাসের উভয় উপাদানই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু লিখিত উপাদান কিংবা অলিখিত উপাদান দ্বারা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়। কেননা একটিমাত্র উপাদান ইতিহাস সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য দিতে পারে না। একজন ঐতিহাসিকের দায়িত্ব সমস্ত উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সমন্বয়সাধন করে সঠিক ইতিহাস রচনা করা। ইতিহাস কল্পনাবিলাসী কোনো ভাবের বস্তু নয়। এতে আবেগ প্রাধান্য পায় না। তাই ইতিহাসের উৎস হতে হবে যথার্থ ও বাস্তবধর্মী। আর এক্ষেত্রে ইতিহাসের লিখিত ও অলিখিত উপাদানের সমন্বয়সাধন আবশ্যক।
সুতরাং উপরের আলোচনার শেষে বলা যায়, শুধু অলিখিত উপাদানের মাধ্যমে কোনো একটি জাতির সার্বিক ইতিহাস জানা সম্ভব নয়।
সার্বিক ইতিহাস রচনার জন্য অলিখিত উপাদানের পাশাপাশি লিখিত উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ।
আবহাওয়া, জলবায়ু বা ঋতুবৈচিত্র্যের কারণেই ঝড়-জলোচ্ছ্বাস অথবা প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করতে গিয়েই মানুষ হয়ে ওঠে সংগ্রামী। জলবায়ুর তারতম্যের কারণেই গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের মানুষেরা সুতি ও পাতলা কাপড় পরিধান করে। আবার শীতপ্রধান অঞ্চলের মানুষেরা মোটা কাপড় পরিধান করে। তাই একটি অঞ্চলের জলবায়ু উক্ত অঞ্চলের জনগণের জীবনাচরণে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে।
চিত্র-১ পুন্ড্র জনপদের প্রতিনিধিত্ব করছে।
পুণ্ড্র শব্দের অর্থ আখ বা ইক্ষু। প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পুণ্ড্র। খুব সম্বত: পুণ্ড্র বলে একটি জনগোষ্ঠী এ জনপদ গড়ে তুলেছিল। বর্তমান বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী ও দিনাজপুর এলাকা নিয়ে এ পুণ্ড্র জনপদটির সৃষ্টি হয়েছিল। রাজধানীর নাম ছিল পুণ্ড্রনগর। পরবর্তীকালে এর নাম হয় মহাস্থানগড়। মহাস্থানগড় প্রাচীন পুণ্ড্র নগরীর ধ্বংসাবশেষ বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনের দিক দিয়ে পুণ্ড্রই ছিল প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরসভ্যতা।
উদ্দীপকে চিত্র-১ এ উল্লিখিত নির্দশনটি হলো মহাস্থানগড় যা পূর্বে পুন্ড্র নামে পরিচিত ছিল।
চিত্র-১ 'পুন্ড' জনপদ এবং চিত্র-২ প্রাচীন 'সমতট' জনপদকে নির্দেশ করে। 'পুণ্ড্র' এবং 'সমতট' জনপদ থেকে প্রাচীন বাংলার সম্পূর্ণ সীমারেখা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়।
প্রাচীনযুগে বাংলা (বর্তমানের বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ) এখনকার বাংলাদেশের মতো কোনো একক ও অখণ্ড রাষ্ট্র বা রাজ্য ছিল না।
বাংলার বিভিন্ন অংশ তখন ছোটো ছোটো অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। আর প্রতিটি অঞ্চলের শাসক যার যার মতো শাসন করতেন। বাংলার এ অঞ্চলগুলোকে তখন সমষ্টিগতভাবে নাম দেওয়া হয় 'জনপদ'। উৎকীর্ণ শিলালিপি ও বিভিন্ন সাহিত্যগ্রন্থে প্রায় ষোলোটি জনপদের কথা জানা যায়। তবে প্রতিটি অঞ্চলের সীমা সব সময় একই রকম থাকেনি। কখনো কোনো জনপদের সীমা বেড়েছে, আবার কখনো কমেছে। প্রাচীন বাংলার উল্লেখযোগ্য কিছু জনপদ হলো- গৌড়, বঙ্গ, পুণ্ড্র, হরিকেল, সমতট, বরেন্দ্র, তাম্রলিপ্ত, রাঢ়, চন্দ্রদ্বীপ প্রভৃতি।
প্রাচীন বাংলার এ জনপদগুলো থেকে তখনকার বাংলার ভৌগোলিক অবয়ব, সীমারেখা, রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা লাভ করা যায়। প্রাচীন বাংলায় তখন কোনো রাজনৈতিক ঐক্য ছিল না। শক্তিশালী শাসকগণ তাদের আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে একাধিক জনপদের শাসন ক্ষমতা লাভ করতেন। ফলে সম্পূর্ণ প্রাচীন বাংলার সীমারেখা সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে সবগুলো জনপদই অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। দুই একটি জনপদ থেকেই সম্পূর্ণ প্রাচীন বাংলার সীমারেখা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা সম্ভব নয়।
প্রাচীন বাংলার অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল কৃষির ওপর নির্ভর করে। ধান ছিল বাংলার প্রধান ফসল। এছাড়া পাট, ইক্ষু, তুলা, নীল, সরিষা ও পান চাষের জন্য বাংলার খ্যাতি ছিল। ফলবান বৃক্ষের মধ্যে ছিল আম, কাঁঠাল, নারিকেল, সুপারি, ডালিম, কলা, লেবু, ডুমুর, খেজুর ইত্যাদি। কুটির শিল্পে প্রাচীন বাংলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। লোহার তৈরি জিনিসপত্রের মধ্যে ছিল দা, কুড়াল, কোদাল, খন্তা, খুরপি, লাঙ্গল ইত্যাদি। এছাড়াও জলের পাত্র, তীর, বর্শা, তলোয়ার প্রভৃতি যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র তৈরি হতো। কাঠের শিল্পও সেসময় অত্যন্ত উন্নত ছিল। সংসারের আসবাবপত্র, ঘর-বাড়ি, মন্দির, পালকি, গোরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, রথ প্রভৃতি কাঠের দ্বারাই তৈরি হতো। বস্ত্র শিল্পের জন্য বাংলা প্রাচীনকালেই বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। বিশ্ববিখ্যাত মসলিন কাপড় প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় তৈরি হতো। এ বস্তু এত সূক্ষ্ম যে, ২০ গজ মসলিন একটি নস্যির কৌটায় ভরা যেত। কার্পাস তুলা ও রেশমের তৈরি উন্নতমানের সূক্ষ্ম বস্ত্রের জন্যও বঙ্গ প্রসিদ্ধ ছিল।
উদ্দীপকে সীমা গ্রীষ্মের ছুটিতে মামাবাড়ি বেড়াতে যাওয়ার সময় ধান, পাট, সরিষা, ইক্ষুসহ অনেক ফলগাছ দেখতে পায়। মামা বাড়ির পাশেই একজন কামারকে লোহার প্রয়োজনীয় দ্রব্য তৈরি করতে দেখে। এছাড়াও পুরোনো কাঠের আসবাবপত্র, তাঁতে তৈরি কাপড় প্রভৃতির পাশাপাশি মসলিন শাড়িও দেখতে পায়। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, উদ্দীপকের চিত্রটি প্রাচীন বাংলারই প্রতিচ্ছবি।
প্রাচীন বাংলার সামাজিক প্রথা ও আচার-আচরণের মধ্যে ছিল অতিথিদের পান-সুপারি খেতে দেওয়া, শিবের গীত গাওয়া, বিয়েতে গায়ে হলুদ দেওয়া, ধুতি-শাড়ি পরা এবং মেয়েদের কপালে সিঁদুর দেয়া প্রভৃতি। এগুলো ছাড়াও তখন সমাজে জাতিভেদ প্রথা অত্যন্ত ব্যাপক ছিল। হিন্দুদের মধ্যে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র চারটি বর্ণের বিভাজন ছিল। বাংলার মেয়েদের গুণাবলির সুখ্যাতি ছিল ও তারা লেখাপড়া শিখত। তবে হিন্দু সমাজে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। খাদ্যাভ্যাসের ভেতর ছিল ভাত, মাছ, মাংস, শাক-সবজি, দুধ, দধি, ঘৃত, ক্ষীর ইত্যাদি। পূর্ববঙ্গে ইলিশ ও শুঁটকি মাছ প্রিয় খাবার ছিল। খাওয়া-দাওয়ার শেষে মসলাযুক্ত পান খাওয়ার রীতি ছিল।
বাংলার নর-নারীরা যথাক্রমে ধুতি ও শাড়ি পরত। উৎসব-অনুষ্ঠানে বিশেষ পোশাক ও অলঙ্কার ব্যবহারের রীতি প্রচলিত ছিল। খেলাধুলার ভেতর পাশা ও দাবা খেলার প্রচলন ছিল। আমোদ-প্রমোদের জন্য বীণা, বাঁশি, মৃদঙ্গ, ঢাক, ঢোল, খোল, করতাল ইত্যাদি ছিল। কুস্তি, নৌকাবাইচ, শিকার ও বাজিকরের খেলা পুরুষদের খুব পছন্দ ছিল। নারীদের মধ্যে উদ্যান রচনার প্রচলন ছিল। আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল অন্নপ্রাশন, বিয়ে, শ্রাদ্ধ, রথযাত্রা, নবান্ন, ভ্রাতৃদ্বিতীয়া, হোলি, গঙ্গাস্নান প্রভৃতি। যাতায়াতের প্রধান বাহন ছিল গোরুর গাড়ি ও নৌকা, ভেলা, ডোঙ্গা ও ছোটো ছোটো সাঁকো। ধনীরা হাতি, ঘোড়া, নৌকা, পালকি ব্যবহার করত যাতায়াতের জন্য।
উপরের আলোচনা থেকে দেখা যায়, প্রাচীন বাংলার সমাজব্যবস্থায় সামাজিক প্রথা ও আচার-আচরণের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, খেলাধুলা, আমোদ-প্রমোদ, উৎসব, যাতায়াতব্যবস্থা প্রভৃতি সামাজিক জীবনের যে বিষয়গুলো বিদ্যমান ছিল বর্তমানের সামাজিক জীবনে সেগুলো আর তেমন লক্ষ করা যায় না। এ কারণে বলা যায়, প্রাচীন আমলের সামাজিক জীবন বর্তমানের সামাজিক জীবন থেকে ভিন্ন- উক্তিটি যথার্থ।
মঙ্গল পাণ্ডে নামক একজন সিপাহির গুলি ছোড়ার মধ্য দিয়ে ১৮৫৭সালের ২৯শে মার্চ এ বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়। এ বিদ্রোহ পরবর্তীতে দেশটির স্বাধীনতা ও জাতীয়তার মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। এ বিদ্রোহে যুদ্ধরত বিদ্রোহী নেতারা প্রাণপণ লড়াই করে পরাজিত হন। অনেক বিদ্রোহীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। বিদ্রোহীরা দিল্লি দখল করে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ভারতবর্ষের সম্রাট বলে ঘোষণা করেন। এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, নানা সাহেব, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, অযোধ্যার বেগম হযরত মহল, মৌলভি আহমদ উল্লাহসহ ক্ষুব্ধ বঞ্চিত দেশীয় রাজন্যবর্গের অনেকে। এ সংগ্রামের সাথে জড়িতদের বেশিরভাগই সিপাহি যুদ্ধে শহিদ হন, বাকিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়। এ যুদ্ধ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে। ইউরোপীয় ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, এ বিদ্রোহ শুধু সিপাহিদের বিদ্রোহ ছিল। কোনো কোনো ভারতীয় ঐতিহাসিকের মতে, এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম।
তাই বলা যায়, উল্লিখিত চিত্রটি সিপাহি বিদ্রোহের সাথে সম্পৃক্ত।
পলাশির যুদ্ধের একশ বছর পর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় এবং সামরিক প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষম্যের কারণে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম সংঘটিত হয়। এটি ছিল মূলত সিপাহিদের বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহের তাৎক্ষণিক গুরুত্বও ছিল অনেক। এর ফলে ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটে এবং ব্রিটিশ সরকার ভারতের শাসনভার নিজ হাতে গ্রহণ করে।
১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের পর ব্রিটিশ সরকার কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৮৫৭ সালের ১ নভেম্বর মহারানি ভিক্টোরিয়া একটি ঘোষণাপত্র জারি করেন। এতে স্বত্ববিলোপ নীতি এবং এর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য নিয়ম বাতিল করা হয়। এছাড়া ভারতীয়দের চাকরি প্রদান এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তাসহ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। এই বিদ্রোহের সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব হচ্ছে এই বিদ্রোহের ক্ষোভ থেমে যায়নি। এই সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে জনগণ সচেতন হয়ে ওঠে এবং আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালে ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটায়।
উপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রভাব অনস্বীকার্য। এর তাৎক্ষণিক ফলাফল হচ্ছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান, যা ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সূচনা।
উদ্দীপক অনুসারে একটি প্রদেশের শাসক তরুণ বয়সে রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর ঘনিষ্ঠজন এবং দেশি-বিদেশি বণিক শ্রেণি ও সেনাপতিসহ অনেকেই নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে শাসকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে শাসক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন এবং পরাজিত ও নিহত হন। অনুরূপ ঘটনা দেখা যায়, নবাব সিরাউদ্দৌলার সময়কালে। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি ছিলেন মীর জাফর আলী খান। নবাব মীর জাফরকে অনেক বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধা করতেন। কিন্তু মীর জাফর ক্ষমতা লাভের আশায় গোপনে নবাবের শত্রু ইংরেজদের সাথে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। এ ষড়যন্ত্রে লউ ক্লাইভের সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসায়ী ধনকুবের জগৎ শেঠ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ, রাজা রাজবল্লভ ও প্রধান সেনাপতি মীর জাফর ও নবাবের ঘনিষ্ঠজন। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশির আমবাগানে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে মীর জাফর ষড়যন্ত্রমূলকভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অসহযোগিতা করে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকে, ফলে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত এবং পরবর্তীতে নিহত হন।
পলাশির যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে বাংলায় কেবল সিরাজের মৃত্যু ও মুসলিম শাসনের অবসানই ঘটেনি, তা ঔপনিবেশিক শাসনের পথ সুগম করে। এ যুদ্ধের ফলে ইংরেজরা মীর জাফরকে বাংলার সিংহাসনে বসালেও তিনি ছিলেন নামেমাত্র নবাব, প্রকৃত ক্ষমতা ছিল বরার্ট ক্লাইভের হাতে। এ যুদ্ধে নবাবের পরাজয়ের ফলে ইংরেজ বণিকেরা বাংলায় একচেটিয়া ব্যবসায় বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে। তারা বিনা শুল্কে ব্যবসায় করার ফলে দেশীয় ব্যবসায়ীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একই সাথে ফরাসি বণিকরাও এদেশ থেকে বিদায় নেয়। যুদ্ধের পর ইংরেজ শক্তির স্বার্থে এদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন হতে থাকে। বাংলার স্থানীয় শিল্প ও বাণিজ্য ধ্বংসের মুখে পড়ে। এ যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী পরিণতি ছিল উপমহাদেশে কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠা। আর এভাবেই নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ে বাংলা তথা ভারতের স্বাধীনতা ভুলষ্ঠিত হয়।
পরিশেষে বলা যায়, ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। আর এর পরিণতিতে দীর্ঘ দুইশত বছর বাংলাকে ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের শিকার হতে হয়।