ব্রহ্ম যখন জীব জগতের উপর প্রভুত্ব করেন তখন তাঁকে ঈশ্বর বলে। ঈশ্বর জগতের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং ধ্বংসকর্তা। এই জন্য তাঁকে পরমেশ্বর বলা হয়। ঈশ্বরের রূপের শেষ নেই। তিনি অনন্তরূপী; জ্ঞানীর কাছে তিনি ব্রহ্ম, যোগীর কাছে পরামাত্মা এবং ভক্তের কাছে তিনি ভগবান। বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে ঈশ্বর অনন্ত অসীম। তাঁর কোনো পরিবর্তন নেই। তিনি শাশ্বত, তিনি নিত্য, শুদ্ধ ও পরম পবিত্র। তিনি সকল কর্মের ফলদাতা। যে যে রকম কর্ম করে তিনি তাকে সে রকম ফল দিয়ে থাকেন। ঈশ্বর নিরাকার। প্রয়োজনে তিনি সাকার হতে পারেন। কারণ অনন্ত তাঁর শক্তি। ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজ করেন। ঋগবেদ অনুসারে তিনি পরম পুরুষ, তাঁর সহস্র, মস্তক, সহস্র চক্ষু, সহস্র চরণ। এ কথার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সর্বব্যাপিতাই বোঝানো হয়েছে। তিনি অদ্বিতীয়। তিনি জ্যোতিঃস্বরূপ, তিনি সকলের মধ্যে বিরাজ করেন।
সুতরাং বলা যায়, আনন্দ স্রষ্টার স্বরূপ সম্পর্কে উপরিউক্ত বিষয়গুলো জেনেছিল।
মূলত এ ধরনের উপাসনা বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমাকে (ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, সরস্বতী, লক্ষ্মী, মনসা প্রভৃতি) উদ্দেশ্য করেই করা হয়। প্রতীক উপাসনা সগুণ উপাসনা বা ভক্তিযোগ নামে পরিচিত। সগুণরূপে ঈশ্বর সাকাররূপে অবস্থান করেন। এ সময় তিনি প্রকৃতিতে প্রকাশিত। পূজা করাকে সগুণ উপাসনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
'নিরাকার' শব্দের অর্থ যার কোনো আকার নেই। মূলত এ ধরনের উপাসনা ধ্যান সাধনার মাধ্যমে করা হয়। জ্ঞানযোগ নিরাকার উপাসনার একটি অংশ। এ উপাসনা ঈশ্বরের কোনো প্রতিকৃতিকে উদ্দেশ্য করে করা হয় না। নিরাকাররূপে ঈশ্বর অদৃশ্য অবস্থায় অবস্থান করেন। তাঁকে উপলব্ধি করে তাঁর উপাসনা করা হয়। হিন্দুধর্মালম্বী কেউ নিরাকার, কেউবা সাকার উপাসনার মাধ্যমে ঈশ্বরকে পূজা বা আরাধনা করেন।
উদ্দীপকে দেখা যায়, অতনু বাবু প্রতিদিন সকালে ধ্যানে বসে ঈশ্বরের আরাধনা করেন। যা নিরাকার উপাসনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই বলা যায়, অতনু বাবুর আরাধনার পদ্ধতিকে নিরাকার উপাসনা বলে।
দৈনন্দিন জীবনে উপাসনার গুরুত্বকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
উপাসনা আমাদের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করে এবং মনে সুন্দর অনুভূতির সৃষ্টি করে। উপাসনার মধ্য দিয়ে আমাদের মনের দৃঢ়তা বৃদ্ধি পায় এবং আবেগ নিয়ন্ত্রিত হয়। এর ফলে আমরা যেকোনো ভাবাবেগ দ্বারা সহজেই তাড়িত হই না। এছাড়া উপাসনার মধ্য দিয়ে ঈশ্বর ও ভক্তের মধ্যে এক অনাবিল চেতনার সৃষ্টি হয়।
উপাসনার মধ্য দিয়ে শুধু যে ভক্ত আর ভগবানের মধ্যে সেতুবন্ধ রচিত হয় তা নয়। উপাসনার মধ্য দিয়ে মানুষ সত্য পথে পরিচালিত হয়। ব্যক্তির মধ্যে অহং, আমিত্ব ভাব ও হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়। অপরদিকে উপাসনার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি মোক্ষলাভ করতে পারে। এর ফলে ব্যক্তির চিরমুক্তি ঘটে। তার আর পুনর্জন্ম হয় না।
তাই সার্বিক আলোচনা অন্তে বলা যায়, দৈনন্দিন জীবনে উপাসনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই আমাদের সকলের নিয়মিত উপাসনা করতে হবে।
তাই বলা যায়, বিষ্ণু প্রতিপালনের দেবতা।
ঈশ্বর নিরাকার এজন্য আমরা সরাসরি তাঁর সেবা করতে পারি না। তিনি জীবের মাঝে অবস্থান করেন বলে জীবসেবা করলে তাঁর সেবা করা হয়। তাই আমাদের সবার উচিত জীবের সেবা করা। চঞ্চল কুমার মানুষের সেবা করার জন্য নিজের জমিতে গড়ে তুলেছেন পঞ্চাশ শয্যার হাসপাতাল। এছাড়াও তিনি সব সময় নানাভাবে জীবের কল্যাণ করার চেষ্টা করেন। চঞ্চলের এ ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে জীবসেবার মাধ্যমে ঈশ্বরের সেবা করার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়। জীবের সেবা করা হিন্দুধর্মের অন্যতম ব্রত হিসেবে পরিচিত। কেননা ঈশ্বর আমাদের সম্মুখেই আছেন। তাই তাঁকে খুঁজে বেড়ানোর দরকার নেই। যিনি জীবকে ভালোবাসেন, তিনি সেই সেবার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরেরই সেবা করেন। চঞ্চলের কর্মকাণ্ডে এ বিষয়েরই প্রতিফলন ঘটেছে।
তাই বলা যায়, চঞ্চলের মাঝে ঈশ্বরজ্ঞানে জীবসেবার গুণটিই ফুটে উঠেছে।
"জীবের মধ্যে এক ঈশ্বর বহুরূপে বিরাজমান এবং সকল সৃষ্টির মূলে রয়েছেন ঈশ্বর”- উক্তিটি যথার্থ।
সাধারণ অর্থে 'সেবা' বলতে পরিচর্যা করা বোঝায়। যেমন- অতিথি সেবা, জীবসেবা, ঈশ্বর সেবা প্রভৃতি। অপরের সন্তোষ বিধানের জন্য দেহ ও মনের সমন্বয়ে কল্যাণকর যে কাজ করা হয় তাকে সেবা বলে। জীবসেবা বলতে জীবের পরিচর্যা, সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি করাকে বোঝায়। এ ছাড়াও বুদ্ধি দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে, সহানুভূতি জানিয়ে, বিপদে পাশে দাঁড়িয়ে নানাভাবে সেবা করা যায়। আমরা জানি, ঈশ্বর জীবাত্মারূপে জীবের মধ্যে অবস্থান করেন। তাই জীবসেবা করলে ঈশ্বরকে সেবা করা হয়।জীবের সেবা করা হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান ব্রত হিসেবে বিবেচিত। 'যত্র জীবঃ তত্র শিবঃ'। অর্থাৎ যেখানে জীব সেখানেই শিব। এখানে শিব বলতে ঈশ্বরের কথাই বোঝানো হয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন :
'বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর
জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।'
এ কথার তাৎপর্য এই যে, বহুরূপে অর্থাৎ বহুজীবরূপে ঈশ্বর আমাদের সম্মুখেই আছেন। তাই তাঁকে খুঁজে বেড়ানোর দরকার নেই। যিনি জীবকে ভালোবাসেন, তিনি সেই সেবার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সেবা করেন। তাই হিন্দুধর্মে জীবকে ঈশ্বর বা ব্রহ্মজ্ঞানে সেবা করতে বলা হয়েছে। কারণ জীবকে সেবা করলেই ঈশ্বরের সেবা করা হয়।
সুতরাং ঈশ্বর জ্ঞানে জীবসেবা হিন্দুধর্মের একটি মূল বৈশিষ্ট্য এবং অন্যতম নৈতিক শিক্ষা।
বিবাহের মাধ্যমে সন্তানসন্ততি লাভ এবং তাদের ভরণপোষণসহ পারিবারিক জীবনে প্রতিদিন পাঁচটি যজ্ঞকর্মের অনুশীলন করতে হবে। এ পাঁচটি যজ্ঞ হচ্ছে- পিতৃযজ্ঞ, দৈবযজ্ঞ, ভূতযজ্ঞ, নৃযজ্ঞ ও ঋষিযজ্ঞ। মানুষ জন্মগ্রহণ করে মাতাপিতার মাধ্যমে। মাতাপিতার তত্ত্বাবধানে সেবা-শুশ্রুষায় বড় হতে থাকে। এই মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি, সেবা-যত্ন কর্মগুলো সন্তানের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। আর এ কর্তব্যগুলো সম্পাদন করে একজন সন্তান পিতৃযজ্ঞ সম্পন্ন করে থাকে। মানুষের জীবনধারণের জন্য প্রকৃতির দান গ্রহণ করতে হয়।
মানুষ সামাজিক জীব। জীবনের প্রয়োজনীয় অনেক দ্রব্যই সমাজের নিকট থেকে সংগ্রহ করতে হয়। মানুষ তার দৈনন্দিন চাহিদা যেমন-খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ইত্যাদি সমাজের ভিন্ন ভিন্ন লোকের নিকট থেকে পেয়ে থাকে। সামাজিক চাহিদার কারণে মানুষ মঠ, মন্দির, উপাসনালয়, বিদ্যালয় এবং চিকিৎসালয় ইত্যাদি স্থাপনের মধ্য দিয়ে সমাজের প্রতি তার কর্তব্য সম্পাদন করে। এটিকেই বলা হয় গার্হস্থ্য আশ্রমের কর্ম। ব্রহ্মচর্য শেষে বিবাহ করে সংসার ধর্ম পালন গার্হস্থ্য আশ্রমের অন্তর্গত।
'চিত্রে প্রদর্শিত আশ্রম ছাড়াও হিন্দুধর্মে অন্যান্য আশ্রমের উল্লেখ আছে'- উক্তিটি যথার্থ। আমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা হলো- স্বাভাবিকভাবে মানুষের জীবিত থাকার সময় ধরা হয় একশত বৎসর। এই শতবর্ষের জীবনকে চারটি স্তরে বা আশ্রমে বিভক্ত করা হয়। একে বলা হয় চতুরাশ্রম। চিত্রে প্রদর্শিত আশ্রমটি হলো গার্হস্থ্য আশ্রম। এছাড়াও অন্যান্য আশ্রম হলো-
ব্রহ্মচর্য আশ্রম : শাস্ত্র অনুযায়ী মানুষের জীবনের চারটি স্তর বা আশ্রমের মধ্যে প্রথম আশ্রমটি হলো ব্রহ্মচর্যাশ্রম। প্রতিটি মানুষের পাঁচ বছর বয়স হলেই গুরুগৃহে ব্রহ্মচর্য জীবন শুরু করতে হয়। গুরুর কাছে দীক্ষাগ্রহণ এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করতে হয়। এটাই ব্রহ্মচর্যাশ্রম। এ আশ্রমেই গুরুর নির্দেশে শিষ্য বিভিন্ন শাস্ত্র অধ্যয়ন করে এবং গুরুর কাছ থেকে আত্মসংযমী, পরিশ্রমী ও কঠোর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়ার শিক্ষা লাভ করে।
বানপ্রস্থ আশ্রম: বানপ্রস্থ আশ্রম জীবনের তৃতীয় স্তর। বানপ্রস্থ আশ্রমে মানুষ সংসারের দায়-দায়িত্ব সন্তানের উপর ন্যস্ত করে নির্জন পরিবেশে অবসর জীবনযাপন করে। এখানে সংসার জীবনের সঙ্গী স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে থাকতে পারেন তবে তাঁদের জীবনচর্চায় সংযম, ত্যাগ, নির্লোভ আচরণের বিধান থাকে। বানপ্রস্থে বনে যাওয়ার বিধান থাকলেও সভ্যতার অগ্রগতিতে মানুষ বনবাসী না হয়ে গৃহত্যাগ করে কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সেবা বা পূজা-অর্চনার মাধ্যমে বৈরাগ্যময় জীবনযাপন করতে পারে। এ পর্যায়ে ভজন, পূজন, কীর্তন, জপ, ধ্যান প্রভৃতি ধর্মীয় কর্মে মগ্ন থেকে বানপ্রস্থের জীবনস্তর কাটানো যায়।
সন্ন্যাস আশ্রম : আশ্রম জীবনের চতুর্থ পর্যায়ে আসে সন্ন্যাস। সন্ন্যাস বলতে এমন এক অবস্থাকে বোঝায় যখন ব্যক্তি একাকী জীবনধারণ করেন। এ সময় ব্যক্তি জাগতিক সকল কর্ম পরিত্যাগ করে কেবল ঈশ্বর চিন্তাতেই মগ্ন থাকেন। সন্ন্যাস গ্রহণ করলে মানুষ দেবতা হয়ে যায়। তাই সন্ন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, কর্মফলাসক্তি ও ভোগাসক্তি ত্যাগ। তাই বলা যায়, গার্হস্থ্য আশ্রম ছাড়াও আরও তিনটি আশ্রম রয়েছে।
মাদকদ্রব্য গ্রহণে শরীরে নানা রোগের সৃষ্টি হয়। মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটে। বিবেক বুদ্ধি লোপ পায়। ফলে মানুষ নানা অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। মাদকের টাকা যোগাড় করতে গিয়ে অনেকে অসৎ উপায় অবলম্বন করে। মাদক গ্রহণকারীরা পরিবার ও সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এর ফলে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। এসব অন্যায়ের কারণে মাদক গ্রহণ অধর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়।
শ্যামলকে শুধু শাসন নয়, সচেতনও করতে হবে। তাকে ধর্মীয় সংস্কৃতি ও নৈতিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কেননা ধর্মীয় সংস্কৃতি ও নৈতিক মূল্যবোধের আলোকে জীবন পবিত্র হয়। তাই বলা যায়, এ সব পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে শ্যামলের মাদকাসক্তি প্রতিরোধ ও প্রতিকার করা সম্ভব।
আমরা জানি, মাদকাসক্তি অনৈতিক ও অধর্মের পথ। কারণ মাদকদ্রব্য মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটায়। মাদক গ্রহণকারীর স্বাভাবিক চেতনাকে বিমূঢ় করে দেয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে দেখে অনেকেই এর দিকে আকৃষ্ট হতে পারে। কেননা মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে সঙ্গী-সাথিদের অত্যধিক প্রভাব রয়েছে।
মাদকাসক্তি একটি সামাজিক ব্যাধি। বর্তমান সমাজের অনেক তরুণ অসৎ সঙ্গীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই ঘৃণ্য বিষয়টির সাথে জড়িয়ে পড়েছে। বস্তুত মানুষের জীবনে সঙ্গীর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। একটি প্রবাদ আছে 'সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।' এ কারণে কেউ যদি বন্ধু হিসেবে খারাপ চরিত্রের কাউকে বেছে নেয় তবে আরও খারাপ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে এটা প্রকট আকার ধারণ করে। কেউ মাদকাসক্ত ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্ব করলে তারও মাদকাসক্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেকটা বেড়ে যায়। অনেক সময় মাদকাসক্ত সঙ্গীকে দেখে কৌতূহলবশত তার বন্ধুরা মাদক গ্রহণ করতে পারে যা শেষ পর্যন্ত আসক্তিতে পরিণত হয়। সার্বিক আলোচনার প্রেক্ষিতে এ কথা স্পষ্ট যে, মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে অসৎ সঙ্গীদের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এর ফলে একজন অন্যজনকে মাদকাসক্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে। যার দৃষ্টান্ত আমরা শ্যামলের জীবনে দেখতে পাই।
ক. বিবেকানন্দের প্রকৃত নাম
পৃথিবীতে যে সকল মনীষী তাদের অমিয় বাণী ও কর্মকাণ্ডের দ্বারা বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করেছেন তার মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দ অন্যতম। ছাত্রাবস্থায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে তার মনে নানা প্রশ্ন দেখা দেয় এবং ঈশ্বর সম্পর্কে চিন্তা তার মনকে আন্দোলিত করে। এরই মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দ কালীর সাধক শ্রীরামকৃষ্ণের দেখা পান এবং তার মাধ্যমে বিবেকানন্দ নিজের সকল প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পান। এরপর বিবেকানন্দ শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট ত্যাগের মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী হন। এরপর তিনি দেশ বিদেশের বহু স্থানে গমন করে তার ধর্মজ্ঞান প্রচার করেন এবং তার অসাধারণ বাগ্মীতার জন্য সবাই তাকে সাদরে গ্রহণ করে। বিবেকানন্দ মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন সবসময়। বিবেকানন্দ নারী স্বাধীনতার বিশ্বাসী ছিলেন। নারীশিক্ষাকে তিনি সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করতেন। বৈদিক যুগের মৈত্রেয়ী, গার্গী প্রমুখ বিদুষী নারীর উল্লেখ করে তিনি বলেছেন- সেই যুগে নারীরা যদি এত শিক্ষা লাভ করতে পারে তাহলে এ যুগের নারীরা পারবে না কেন? তার মতে, যে জাতি নারীদের সম্মান দেয় না, সে জাতি কখনো বড় হতে পারে না। 'নারীদের অবস্থার উন্নতি না করে বিশ্বের মঙ্গলসাধন করা সম্ভব নয়। কোনো পাখি একটি ডানা নিয়ে উড়তে পারে না।' এমনকি অধ্যাত্ম সাধনায় নারীরা যাতে সুযোগ পায় এবং এগিয়ে আসে তার জন্য তিনি সারদাবেদীর পরিচালনায় নারীদের একটি মঠ প্রতিষ্ঠারও পরিকল্পনা করেছিলেন।
উদ্দীপকের মাধব ঈশ্বর লাভের ইচ্ছায় রামকৃষ্ণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তিনি পরবর্তীতে গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী হয়ে পড়েন। হিন্দুধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি বিশ্বধর্ম সম্মেলনে বক্তৃতা করেন এবং সারা বিশ্বে হিন্দুধর্ম প্রচার করেন।
যা স্বামী বিবেকানন্দের কর্মকাণ্ডের সাথে মিল রয়েছে।
বিবেকানন্দ নারী-স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। আর এজন্য নারীশিক্ষাকে তিনি সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করতেন। বৈদিক যুগের মৈত্রেয়ী, গার্গী প্রমুখ বিদুষী নারীর উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, সেই যুগে নারীরা যদি এত শিক্ষালাভ করতে পারে, তাহলে এ যুগের নারীরাও পারবে। তাঁর মতে, যে জাতি নারীদের সম্মান দেয় না, সে জাতি কখনো বড় হতে পারে না। নারীদের অবস্থার উন্নতি না করে বিশ্বের মঙ্গলসাধন করা সম্ভব নয়। কোনো পাখি একটি ডানা দিয়ে উড়তে পারে না। এমনকি অধ্যাত্ম সাধনায় নারীরা যাতে সুযোগ পায় এবং এগিয়ে আসে তার জন্য তিনি সারদাদেবীর পরিচালনায় নারীদের জন্য একটি মঠ প্রতিষ্ঠারও পরিকল্পনা করেছিলেন।
বিবেকানন্দ দেশের উন্নতির জন্য সমাজ সংস্কারের কথাও ভাবতেন।
তিনি বলতেন- দেশের উন্নতি করতে হলে সব স্তরের মানুষের উন্নয়ন প্রয়োজন। তিনি সমাজের নীচু স্তরের মানুষদের প্রতি উঁচু স্তরের মানুষের অত্যাচারের প্রতিবাদ করেছেন। সারা দেশ ঘুরে তিনি শ্রমিক শ্রেণির মানুষের অবস্থা দেখেছেন। তাঁদের পরিশ্রম করার ক্ষমতা দেখে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, এক সময় এঁরাই ভারতবর্ষ শাসন করবেন।
উদ্দীপকে দেখা যায়, মাধব বেদান্ত সমিতি গুরুদেবের আদর্শ প্রচারের জন্য রামকৃষ্ণমঠ প্রতিষ্ঠাসহ নারী শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নে কাজ করেন।
মাধবের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দের চরিত্রের প্রতিচ্ছবি লক্ষ করা যায়।
এসো হে বৈশাখ, এসো এসো
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে
মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা
দূর হয়ে যাক, যাক, যাক
এসো এসো।
জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে জামাইষষ্ঠী অনুষ্ঠিত হয়। এই দিন জামাইকে শ্বশুরবাড়িতে নিমন্ত্রণ করা হয়। খাওয়া-দাওয়ার বিশেষ আয়োজন করা হয়। জামাইকে নতুন জামা-কাপড় দেওয়া হয়। এদিন মূলত জামাই-শাশুড়ির দিন।
বাংলা সনের প্রথম দিন নতুন বছরকে বরণ করার মধ্য দিয়ে বর্ষবরণের উৎসব পালন করা হয়। এটি ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি পেয়েছে সার্বজনীনতা। বর্ষবরণ উৎসব আজ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক মহা উৎসব। এ দিনটি আমাদের সামনে হাজির হয় নতুনের বার্তা ও আশার আলো নিয়ে, তাই জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাছে এ দিনটি হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ ও বহু জাতি গোষ্ঠী অধ্যুষিত একটি শান্তির দেশ। এখানে প্রতিটি সম্প্রদায়ের রয়েছে নিজস্ব ধর্মীয় উৎসব। এগুলোর অধিকাংশই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আনন্দ অনুষঙ্গ বলে স্বীকৃত। কিন্তু পহেলা বৈশাখই একমাত্র উৎসব যা কোনো ধর্মের বা গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটা গোটা জাতির তথা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অখণ্ড বাঙালি জাতির উৎসব। বাংলাদেশের প্রতিটি বাঙালি বর্ষবরণের উৎসবে নিজেকে অখণ্ড সত্তারূপে ভাবে। ফলে এ উৎসবের মধ্যদিয়ে মানুষে-মানুষে, জাতিতে-জাতিতে, বর্ণে-বর্ণে সংহতি ও ঐক্য সুদৃঢ় হয়।
সংক্রান্তি : বাংলা মাসের শেষ দিনকে বলা হয় সংক্রান্তি। এ দিনে ঋতুভেদে ভিন্ন ভিন্ন মাসের সংক্রান্তি অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন উৎসব হয়।
গৃহপ্রবেশ : নবনির্মিত গৃহে প্রবেশ করার সময় মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান করা হয়। সেখানে নারায়ণ দেবতার পাশাপাশি বাস্তু বা ভূমিদেবতা এবং গৃহপতির অভীষ্ট দেবতা বা ঠাকুরের পূজা করা হয়।
জামাইষষ্ঠী : জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে জামাই ষষ্ঠী অনুষ্ঠিত হয়। এদিন জামাইকে শ্বশুড় বাড়িতে নিমন্ত্রণ করা হয়।
রাখীবন্ধন : রাখীবন্ধন অনুষ্ঠানে বোনেরা তাদের ভাইদের হাতে রাখী নামে একটি পবিত্র সুতা বেঁধে দেন। শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এ পর্বটি পালন করা হয়।
ভ্রাতৃদ্বিতীয়া : কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে এ উৎসব পালন করা হয়। বোনেরা তাদের ভাইদের দীর্ঘায়ু কামনায় কপালে ফোঁটা দিয়ে এ উৎসব পালন করে থাকে।
দীপাবলি : কালিপূজার দিন দীপাবলি উৎসব হয়। এ দিন প্রদীপ জ্বালিয়ে অন্ধকার দূর করা হয়।
হাতেখড়ি : সরস্বতী পূজার দিন শিশুদের শিক্ষাজীবনে প্রবেশের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হাতেখড়ি অনুষ্ঠান।
নবান্ন : হেমন্তকালের অগ্রহায়ণ মাসে নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি ভাত, নানা রকম পিঠা প্রভৃতি দিয়ে যে মাঙ্গলিক উৎসব হয়- তারই নাম নবান্ন।
সৃষ্টির স্থিতি ও প্রতিপালনের বেদতা। এ বিশ্বে যা কিছু আছে বিষ্ণু তা পালন ও রক্ষা করেন। দেবতারা বিপদে পড়লে বিষ্ণু তাদের উদ্ধার করেন। দুষ্টকে দমন ও শিষ্টকে পালন করার জন্য তিনি বহুরূপে এ পৃথিবীতে অবতারূপে আবির্ভূত হন। বিষ্ণুকে স্মরণ করলে পাপ দূরীভূত হয়, হৃদয় পবিত্র হয় ও মনে শান্তি আসে।
উদ্দীপকে মৌমিতা দেবী প্রতিদিন সকালে স্নান করে তার আরাধ্য দেবতার পূজা করেন। যিনি পালনের দেবতা হিসেবে পরিচিত। যাঁর নাম নিলে হৃদয় পরিশুদ্ধ হয় এবং মনে শান্তি আসে। যা বিষ্ণু দেবতার বৈশিষ্ট্যের সাথে মিল রয়েছে।
তাই বলা যায়, মৌমিতা দেবী বিষ্ণু দেবতার পূজা করেন।
শিল্পী দেবী শীতলা দেবীর পূজা করেন। শীতলা পূজার গুরুত্ব অপরিসীম। উদ্দীপকে শিল্পী দেবী ঈশ্বরের এক বিশেষ শক্তির পূজা করেন। যিনি বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ ও শান্তির দেবী হিসেবে পরিচিত। একারণেই শিল্পী দেবী সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকেন। যা শীতলা দেবীর সাথে মিল রয়েছে।
১. শীতলা দেবী বসন্ত রোগ থেকে আমাদের মুক্ত করে আমাদের শীতল করেন। এ কারণে তিনি সকলের কাছে সমাদৃত হয়েছেন।
২. দেবী শীতলাকে স্বাস্থ্যবিধি পালন বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দেবী বলা হয়। শীতলা পূজার মাধ্যমে আমরা স্বাস্থ্য বিধি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতন হয়ে থাকি।
৩. দেবী শীতলার দুই হাতে রয়েছে পূর্ণকুম্ভ ও সম্মার্জনী। কথিত আছে সম্মার্জনীর মাধ্যমে তিনি অমৃতময় শীতল জল ছিটিয়ে রোগ, তাপ, শোক দূর করে শীতল করেন। আমরাও বসন্তে আক্রান্ত রোগীদের সেবা করে তাদের শীতল করব। শীতলা পূ জার মধ্য দিয়ে আমরা এ ধরনের সেবামূলক কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ হই। কখনো কখনো তিনি নিমের পাতা বহন করে থাকেন। নিম বৃক্ষ রোগ প্রতিরোধকারী উদ্ভিদ। আমরা বাড়ির আঙ্গিনায় রোগ প্রতিরোধের জন্য নিম গাছ রোপণ করতে পারি।
ঈশ্বর জগতের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং ধ্বংসকর্তা। এই জন্য তাঁকে পরমেশ্বর বলা হয়। ঈশ্বরের রূপের শেষ নেই। তিনি অনন্তরূপী; জ্ঞানীর কাছে তিনি ব্রহ্ম, যোগীর কাছে পরামাত্মা এবং ভক্তের কাছে তিনি ভগবান। বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে ঈশ্বর অনন্ত অসীম। তাঁর কোনো পরিবর্তন নেই। তিনি শাশ্বত, তিনি নিত্য, শুদ্ধ ও পরম পবিত্র। তিনি সকল কর্মের ফলদাতা। যে যে রকম কর্ম করে তিনি তাকে সে রকম ফল দিয়ে থাকেন।
আত্মিক উন্নয়নে ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের অবদান অপরিসীম। মানুষ যাতে সৎ পথে থাকে ও সৎ চিন্তা করে সেজন্য ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র পাবনার হিমাইতপুরে প্রতিষ্ঠা করেন 'সৎসঙ্গ' আশ্রম। এর মাধ্যমে তিনি তার অনুসারীদের আত্মিক উন্নতির জন্য ব্রহ্মজ্ঞান লাভে সহায়তা করতেন।
দলে দলে লোক তাকে গুরু মেনে এই সঙ্ঘে যোগ দিতে লাগল। তিনি এই সঙ্ঘের মাধ্যমে ধর্মের সাথে কর্মের সংযোগ ঘটান। সৎসঙ্গের আদর্শ হচ্ছে- ধর্ম কোনো অলৌকিক ব্যাপার নয় বরং বিজ্ঞানসিদ্ধ জীবনসূত্র। ভালোবাসাই মহামূল্য যা দিয়ে শান্তি কেনা যায়। এই সঙ্গের পাঁচটি মূলনীতি হচ্ছে যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি, স্বস্ত্যয়নী ও সদাচার। আর এ সঙ্ঘের মূল স্তম্ভ হিসেবে শিক্ষা, কৃষি, শিল্প ও সুবিবাহ নীতিগুলো অনুশীলিত হচ্ছে। এমনিভাবে ধর্ম ও বিজ্ঞানকে একত্রিত করে জীবন গঠনই সৎসঙ্গীদের আদর্শ। তার ছড়া, কবিতা, প্রার্থনা, গীত, সংকীর্তন গান এগুলো বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছে। সৎসঙ্গ চায় আদর্শ মানুষ, আদর্শ গৃহী, আদর্শ ধর্মযাজক। তার দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন ধর্মের ঐক্য প্রতিষ্ঠায় নন্দিত হচ্ছে।
উদ্দীপকে বলাই বাবু একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিা করেন। তার সংগঠনের সদস্যরা ধর্ম ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে জীবন পরিচালনা করেন। তারা আদর্শ সংসারী হওয়ার চেষ্টা করেন। যা ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের সাথে মিল রয়েছে।
তাই বলা যায়, বলাই বাবু ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রকে অনুসরণ করেন।
স্বামী স্বরূপানন্দের প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের সাথে রঞ্জন বাবুর সংগঠনের সাদৃশ্য রয়েছে। তার মুখ্য উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করা হলো -
অযাচক আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী স্বরূপানন্দ। অযাচক অর্থ হলো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট হতে অর্থ না চাওয়া। এটাই এই সংগঠনের আদর্শ। এর মাধ্যমে চরিত্র গঠন হয়। কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেই নিজের দায়িত্বভার নেয়ার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠার ওপর জোর দেয়া হয়। যা উদ্দীপকের রনির ক্ষেত্রেও দেখা যায়। এইভাবে স্বাবলম্বী হয়ে সমাজের জন্য কাজ করাই এ সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে চরিত্র গঠন, সমাজসংস্কার, ব্রহ্মচর্য, স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা ও জগতের কল্যাণকর কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখাই হচ্ছে-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। এর সারকথা হলো নিজে ভালো মানুষ হওয়া এবং অপরকে ভালো মানুষ হতে সহায়তা করা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটা সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে এর মাধ্যমে। মানুষের প্রধান লক্ষ্য মোক্ষলাভ। মোক্ষলাভের জন্য নিজের পাশাপাশি জগতের কল্যাণ সাধন করা দরকার। সবার ভালো ও সহায়তায় একটা ভালো সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। অযাচক আশ্রম তথা স্বরূপানন্দের মতাদর্শ এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। তাঁর এই সংগঠনে যোগদানের মধ্য দিয়ে চারিত্রিক দৃঢ়তা ও স্বাবলম্বী হওয়ার মাধ্যমে চরিত্র গঠন করতে হবে। এর মাধ্যমে ব্রহ্মচর্য, সমাজসংস্কার ও জগতের কল্যাণ সম্ভব।
অযাচক আশ্রমের আদর্শ গ্রহণের মাধ্যমে নিজের পাশাপাশি দেশ ও সমাজের উন্নয়ন ও সংস্কারে ভূমিকা রাখতে পারে, তাই সঠিক উন্নয়নের জন্য তাঁর মতাদর্শ অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
নরেশের মধ্যে মানবতা গুণটি প্রকাশ পেয়েছে।
মানবতা মানুষের একটি বিশেষ নৈতিক গুণ এবং এটি ধর্মের অঙ্গ। মহত্ত্বের উৎসই হচ্ছে মানবতা। মানবতার কারণেই মানুষ অন্যান্য জীবজন্তু থেকে আলাদা। অসহায়কে সাহায্য করা, নিরন্নকে অন্ন, বস্ত্রহীনে বস্ত্র, তৃষ্ণার্তকে জল, দৃষ্টিহীনে দৃষ্টি, রুগ্নকে ওষুধ, গৃহহীনে গৃহ, শোকার্তকে সান্ত্বনা দান করা মানবতারই আরেক নাম। এসব কাজের মাধ্যমে মানবতা নামক গুণের প্রকাশ পায়। মানবতা গুণের দ্বারা মানুষের মহত্ত্ব প্রকাশ পায়। যারা এ নৈতিক গুণের অধিকারী তারা শিবজ্ঞানে জীবের সেবা করেন। তারা জানেন জীবের মধ্যে ঈশ্বর আত্মারূপে অবস্থান করেন। তাই জীবের সেবা করলে ঈশ্বরের সেবা করা হয়, ধর্ম সাধন হয়।
উদ্দীপকে নরেশ পাশের বাড়ির অসুস্থ একটি ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে। সে ছেলেটির সাথে কয়েকদিন হাসপাতালে থাকে। তাকে আর্থিকভাবেও সাহায্য করে। এতে মানবতা গুণটির প্রকাশ ঘটেছে।
তরণীসেন এক সৎসাহসী বারো বছরের বালক। সে ছিল রাক্ষসরাজ রাবণের ভাই বিভীষণের পুত্র। রাক্ষস বাহিনীর সাথে রাম-লক্ষ্মণের ভীষণ যুদ্ধ হচ্ছে এবং এ যুদ্ধে রাক্ষস বাহিনী পরাজিত হচ্ছে- এ খবর পেয়ে বালক তরণীসেন সাহস করে রথ নিয়ে যুদ্ধ করতে আসে।
রণক্ষেত্রে তার বাণের আঘাতে রামের পক্ষের অনেক বানর সৈন্য আহত হয়।
তরণীসেনের এ সৎসাহস দেখে রামচন্দ্র বিস্মিত হন। এ কারণে রণক্ষেত্রে তরণীসেনের মৃত্যুর পর তিনি তাকে আশীর্বাদ করেন। রামচন্দ্রের আশীর্বাদে তরণীসেন রাক্ষস দেহ পরিত্যাগ করে দিব্যদেহ ধারণ করে বৈকুণ্ঠে চলে যায়।
সুতরাং আমরা বলতে পারি, তরণীসেন বালক হওয়া সত্ত্বেও যে সৎসাহস ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে ইতিহাসে তা অম্লান। সে দেশকে শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করার জন্য সৎসাহস নিয়ে রাম-লক্ষ্মণের শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে দৃঢ় চিত্তে যুদ্ধ করে। বীরের মতো লড়ে তরণীসেন প্রাণ বিসর্জন দেয়।
উদ্দীপকে নিলয় বাবু নিজ জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও সমাজ ও দেশের মঙ্গলের জন্য বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করে। এরূপ ব্যক্তি দেশ ও জাতির অহংকার। এক্ষেত্রে নিলয় বাবু সৎসাহস দেখিয়ে জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও সমাজ ও দেশের মঙ্গলে অংশগ্রহণ করেন।
সুতরাং বলা যায়। নিলয় বাবুর মতো লোকবর্তমান সমাজব্যবস্থায় প্রয়োজন আছে।
আধুনিক গবেষকদের মতে, সুশ্রুত খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ অব্দে বর্তমান ছিলেন। তিনি বর্তমান বারাণসী নগরে গঙ্গার তীরে বাস করতেন এবং চিকিৎসাবিদ্যা চর্চা করতেন। তিনি প্রধানত শল্যবিদ্যার চর্চা করতেন। এজন্য তাকে বলা হয় 'ভারতীয় শল্যবিদ্যার জনক'। তিনি 'সুশ্রুত সংহিতা' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তার গ্রন্থে শল্যবিদ্যার ৩০০ প্রকার পদ্ধতি এবং ১২০টি অস্ত্রের বর্ণনা দিয়েছেন। 'সুশ্রুত সংহিতা' রচনা করে সুশ্রুত মানবজাতির বিশেষ মঙ্গল সাধন করেছেন।
উদ্দীপকে ডা. আদিত্য বাবু এমন একজন মহান চিকিৎসকের আদর্শ অনুসরণ করেন যিনি ভারতীয় শল্যবিদ্যার জনক হিসেবে পরিচিত। তিনি তাঁর গ্রন্থে শল্যবিদ্যার ৩০০ প্রকার পদ্ধতি এবং শতাধিক অস্ত্রের বর্ণনা দিয়েছেন। যা মহান চিকিৎসক সুশ্রুতের কর্মকাণ্ডের সাথে মিল রয়েছে। তাই বলা যায়, ডা. আদিত্য বাবু মহান চিকিৎসক সুশ্রুতের আদর্শ অনুসরণ করেন।
চরক ছিলেন প্রাচীন ভারতের একজন মহান চিকিৎসক। তাকে 'ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক' বলা হয়।
চরক মানুষের চিকিৎসা শুরু করেন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি একজন সুচিকিৎসক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর পূর্বে আত্রেয়, অগ্নিবেশ প্রমুখ আরো চিকিৎসক ছিলেন। তাঁরা বৈদ্যক বা চিকিৎসা গ্রন্থও রচনা করেছিলেন। চরক সে-সবের সংস্কার ও সারাংশ গ্রহণ করে একখানা নতুন গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তার নাম 'চরকসংহিতা'। প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্রে এটি একখানা বিখ্যাত গ্রন্থ। গ্রন্থটি আটটি ভাগে বিভক্ত- সূত্রস্থান, নিদানস্থান, বিমানস্থান, শারীরস্থান, ইন্দ্রিয়স্থান, চিকিৎসাস্থান, কল্পস্থান ও সিদ্ধিস্থান।
চরকই প্রথম মানব দেহের পরিপাক, বিপাক ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কে বলেন। তিনি শরীরের কার্যকারিতার জন্য তিনটি 'দোষ' বা উপাদানের কথা বলেছেন। সেগুলো হলো- বাত, পিত্ত ও কফ। এই তিনটির সামঞ্জস্য নষ্ট হলে শরীর অসুস্থ হয়। আর সামঞ্জস্য ফিরে এলে শরীর সুস্থ হয়। চরক এ-ও বলেছেন রোগের চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করা বেশি জরুরি। তিনি রোগীর চিকিৎসার পূর্বে রোগের কারণসমূহ এবং পরিবেশ সম্পর্কে যথার্থরূপে ভাবতে বলেছেন।
চরক প্রজনন বিদ্যা সম্পর্কে জানতেন। এমনকি শিশুর লিঙ্গ নির্ণয়ের কারণসমূহও তিনি জানতেন। মানব দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল। তিনি মানব দেহে দাঁতসহ ৩৬০টি অস্থির কথা বলেছেন। হৃৎপিণ্ডকে বলেছেন দেহের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। ১৩টি পথে এ কেন্দ্র সমগ্র শরীরের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমান কালেও আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় এ গ্রন্থের গুরুত্ব অনেক। চরকসংহিতা রচনা করে চরক সমগ্র মানব জাতির বিশেষ মঙ্গল সাধন করেছেন।
হিন্দুধর্ম দর্শন অনুসারে ঐশ্বর্য, বীর্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান ও বৈরাগ্যকে ভগ বলে। ভগ যাঁর মধ্যে পূর্ণরূপে আছে তিনিই ভগবান। বিষ্ণুপুরাণে বলা হয়েছে- যিনি ভূতগণের উৎপত্তি, বিনাশ, পরলোকে গতি, ইহলোকে আগমন এবং বিদ্যা-অবিদ্যা জানেন, তিনিই ভগবান। ঈশ্বরকে যখন এই ছয়টি গুণের অধীশ্বররূপে কল্পনা ও আরাধনা করা হয় তখন ঈশ্বরকে ভগবান বলা হয়। (শ্রীমদ্ভাগবত পূরাণ, ৬। ৫। ৭৯)। বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে ভগবান গুণময় এবং অশেষরূপের আধার। তিনি রসময়, আনন্দময় ও দয়াময়। তিনি তাঁর ভক্তদের বিভিন্নভাবে কৃপা করে থাকেন। ভগবানের মধ্যে ভক্ত তাঁর অভীষ্ট প্রত্যক্ষ করতে পারেন। ভগবান যে-কোনো রূপ ধারণ করে ভক্তকে দেখা দেন, লীলা করেন। তিনি প্রয়োজনে জীবের ন্যায় দেহধারী হয়ে তপস্যা, ধ্যান, প্রার্থনা ও সকল সুখ-দুঃখ ভোগ করেন। আবার ঈশ্বরাবেশে অপ্রাকৃত লীলা, দাবানল পান, একহাতে গোবর্ধন পর্বত ধারণ, পাষণ্ড-দলন এবং কঠোর তপস্যা করে সকলকে মুগ্ধ করেন এবং সকলের মঙ্গল করেন। সামান্য দেহধারী হয়ে ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে ভগবান তাঁর কাছে আসেন। প্রয়োজনে ভক্তের বোঝা তিনি বহন করেন। মোট কথা ঈশ্বর যখন জীবকে দয়া করেন তখন তাঁকে বলা হয় ভগবান।
উদ্দীপকে ক্ষমতাবান মহান একজনের বিশেষ ছয়টি গুণের জন্য তাঁকে বিশেষ নামে ডাকা হয়। তিনি ক্ষমতাবান হলেও ভক্তের ডাকে সাড়া দেন। প্রয়োজনে ভক্তের বোঝা নিজেই বহন করেন। জীবের ন্যায় দেহধারী হয়ে দুঃখ কষ্ট ভোগ করেন। যা ভাগবানের বৈশিষ্ট্যের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই বলা যায়, ক্ষমতাবান মহান একজনকে বিশেষ গুণের জন্য তাকে ভগবান নামে ডাকা হয়।
উদ্দীপকে মেধা মূর্তির সামনে বসে পূজা উপকরণ দ্বারা পূজা সম্পন্ন করে। যার মাধ্যমে সাকার উপাসনাটি ফুটে উঠেছে। রোদেলা একাকী নির্জন স্থানে চোখ বুঝে বসে সৃষ্টিকর্তার আরাধনা করে। রোদেলা বাবুর আরাধনায় ঈশ্বরের নিরাকার উপাসনার দিকটি প্রকাশ পেয়েছে। মেধা ও রোদেলার আরাধনার প্রকৃতি ভিন্ন। কেননা মেধা সাকার উপাসনা করেন আর রোদেলা নিরাকার উপাসনা করেন। সাকার উপাসনায় দেব-দেবীর প্রতিমাকে উদ্দেশ্য করে উপাসনা করা হয়। প্রতীক উপাসনা সগুণ উপাসনা বা ভক্তিযোগ নামে পরিচিত। সগুণরূপে ঈশ্বর সাকাররূপে অবস্থান করে। এ সময় তিনি প্রকৃতিতে প্রকাশিত। অন্যদিকে রোদেলা ধ্যান সাধনার মাধ্যমে নিরাকার উপাসনা করে। এ উপাসনায় ঈশ্বরের কোনো প্রকৃতিকে উদ্দেশ্য করে করা হয় না। নিরাকাররূপে ঈশ্বর অদৃশ্যভাবে অবস্থান করে। তাকে উপলব্ধি করে নিরাকার উপাসনা করা হয়।
সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের আলোকে মেধা ও রোদেলার আরাধনার ধরন ভিন্ন।
কাগজপত্রসহ টাকাভর্তি ব্যাগ দেখতে পায়। চারিদিকে তাকিয়ে দেখে কোনো লোকজন নেই। ব্যাগের গায়ে ঠিকানাসহ মোবাইল নম্বর লেখা দেখে। মালিককে মোবাইল না করে ব্যাগটি মালিকের ঠিকানায় পৌঁছে দিয়ে আসে। গুরুত্বপূর্ণ কাগজসহ টাকার ব্যাগ পেয়ে মালিক খুশি হয়। অপরদিকে মেধাবী ছাত্র মিহির লেখাপড়ায় ভালো। কিন্তু বর্তমানে খারাপ বন্ধুদের সাথে মিশে নেশার জগতে প্রবেশ করেছে। নেশা দ্রব্য ক্রয়ের জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন হয়। মাঝে মাঝে সে তার দাদা ও বাবার পকেট থেকে টাকা নেয়। অনেক রাত করে বাড়ি আসে। পরিবারের সদস্যদের সাথে খারাপ আচরণ করে।
এই নামযজ্ঞ সামাজিক জীবনে অনেক গুরুত্ব বহন করে। ভক্তরা আসেন
দূরদূরান্ত থেকে। হিন্দুরা বিশ্বাস করে শ্রীহরির নাম নিলে বা শুনলে সে পুণ্য লাভ হয়। দুঃখ-যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। আর এ বিশ্বাস নিয়েই মানুষ বহুদূর থেকে নামযজ্ঞ অনুষ্ঠানে যোগ দেয়। উদ্দীপকে চয়নদের গ্রামের বাড়িতে মন্দিরের মাঠে কয়েক প্রহরব্যাপী চলছে একটি অনুষ্ঠান। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তগণ দলে দলে এসে যোগ দিচ্ছে এ অনুষ্ঠানে। এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরামচন্দ্রের পূজা করা হয়। যা পাঠ্যবইয়ের নাম যজ্ঞ ধর্মানুষ্ঠানের সাথে মিল রয়েছে। তাই বলা যায়, চয়নদের গ্রামের বাড়িতে নামযজ্ঞ ধর্মানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
স্বয়ং ভগবান কিংবা তাঁর অবতারের আবির্ভাব স্থানকে পুণ্যস্থান বলা হয়। কোনো দেবালয়ের স্থানও পুন্যস্থান আর পুণ্যস্থানকে বলা হয় তীর্থস্থান। এগুলো ঐতিহাসিক স্থান বলেও আখ্যায়িত। তীর্থস্থান ভ্রমণ করা একটি পুণ্য কর্ম। ধর্মপালন করার মতো তীর্থদর্শন করাও একটি পবিত্র কর্তব্য। তীর্থদর্শনে মন পবিত্র হয়, অশান্ত মন শান্ত হয়। দুঃখ দুর হয়। পুণ্যলাভ হয়। পরকালে সদ্গতি হয়। এছাড়াও ঐতিহাসিক তীর্থস্থান ভ্রমণে জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি পায়। মনের প্রসারতা বাড়ে। সংকীর্ণতা দূর হয়। উদারতা বৃদ্ধি পায়। মনে আসে স্বস্তি। মহাপুরুষদের জীবনাচরণের নিদর্শন মনকে ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করে।
কাটা-ছেঁড়া বিদ্যায় পারদর্শী। তিনি ঔষধি গাছ-গাছড়ার মাধ্যমে মানুষের চিকিৎসা দেন। ভেষজবিদ্যার চিকিৎসাসংক্রান্ত গ্রন্থ রচনা করে তিনি মানব জাতির বিশেষ কল্যাণ সাধন করেন। অন্যদিকে মানিকের স্মরণশক্তি ছিল প্রখর। মানিকের মা, ছেলের ভবিষ্যৎ জানার জন্য এক সন্ন্যাসীকে দিয়ে হাতের রেখা পরীক্ষা করান। এতে করে জানতে পারেন তার ছেলের আয়ু খুবই কম। তার ষোল অথবা বত্রিশ বছরে মৃত্যুর যোগ আছে। এ কথা শুনে মানিক বাকি জীবন ব্রহ্ম সাধনায় কাটাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
কনকের মধ্যে ভারতের একজন মহান চিকিৎসক সুশ্রুতের আদর্শ ফুটে উঠেছে।
সুশ্রুত প্রাচীন ভারতের একজন মহান চিকিৎসক ছিলেন। তাঁর পিতার নাম বিশ্বামিত্র মুনি। দেবরাজ ইন্দ্র একদিন মর্ত্যবাসীকে ব্যাধিগ্রস্ত দেখে দেববৈদ্য ধন্বন্তরীকে সমগ্র আয়ুর্বেদ শিক্ষা দেন এবং বলেন পৃথিবীতে জন্ম নিতে। ইন্দ্রের কথামতো ধন্বন্তরী কাশীরাজের পুত্ররূপে দিবোদাস নামে জন্মগ্রহণ করেন। এ কথা জানতে পেরে বিশ্বামিত্র স্বীয় পুত্র সুশ্রুতকে তার নিকট পাঠান আয়ুর্বেদ শিক্ষার জন্য।
আধুনিক গবেষকদের মতে, সুশ্রুত খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ অব্দে বর্তমান ছিলেন। তিনি বর্তমান বারাণসী নগরে গঙ্গার তীরে বাস করতেন এবং চিকিৎসাবিদ্যা চর্চা করতেন। তিনি প্রধানত শল্যবিদ্যার চর্চা করতেন। এজন্য তাকে বলা হয় 'ভারতীয় শল্যবিদ্যার জনক'। তিনি 'সুশ্রুত সংহিতা' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তার গ্রন্থে শল্যবিদ্যার ৩০০ প্রকার পদ্ধতি এবং ১২০টি অস্ত্রের বর্ণনা দিয়েছেন। 'সুশ্রুত সংহিতা' রচনা করে সুশ্রুত মানবজাতির বিশেষ মঙ্গল সাধন করেছেন।
উদ্দীপকে কনক একজন মহান চিকিৎসক। তিনি মানব শরীরে কাটা-ছেঁড়া বিদ্যায় পারদর্শী। তিনি ঔষধি গাছ-গাছড়ার মাধ্যমে মানুষের চিকিৎসা দেন। ভেষজবিদ্যার চিকিৎসা সংক্রান্ত গ্রন্থ রচনা করে তিনি মানব জাতির বিশেষ কল্যাণ সাধন করেন। যা পাঠ্যবইযের মহান চিকিৎসক সুশ্রুতের কর্মকাণ্ডের সাথে মিল রয়েছে। তাই বলা যায়, কনকের মধ্যে ভারতের একজন মহান চিকিৎসক সুশ্রুতের আদর্শ ফুটে উঠেছে।
যে সকল ক্ষণজন্মা মনীষী তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য পৃথিবীতে অমর হয়ে আছেন তাদের মধ্যে শ্রীশঙ্করাচার্য অন্যতম। পণ্ডিতরা কোষ্ঠী দেখে তার স্বল্প আয়ুর কথা বললে তিনি ব্রহ্ম সাধনায় বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে ধর্মগুরু হিসেবে তিনি নতুন জীবন শুরু করেন। তিনি পুণ্যধাম বারাণসীতে আসেন এবং সেখানে ধর্ম প্রচার শুরু করেন। তার ধর্মের মূলকথা 'অদ্বৈতবাদ'। তিনি বলেন, 'ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা জীব ও ব্রহ্মে কোনো পার্থক্য নেই।'
শঙ্করাচার্য যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক জীবন যেমন বিপর্যস্ত ছিল, ধর্মীয় জীবনও তেমনি বিপর্যস্ত ছিল। জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে নানা কুসংস্কার ঢুকে পড়েছিল। হিন্দুধর্মও ম্লান হয়ে পড়েছিল। সমাজে বেদের কর্মকাণ্ড অর্থাৎ যাগ-যজ্ঞের প্রাধান্য বেড়ে গিয়েছিল। শঙ্কারচার্য তার অদ্বৈতমত প্রচার করে হিন্দুধর্মের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনেন। 'জীব ও ব্রহ্মের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই' এ কথা বলে তিনি মানুষের প্রতি মানুষের, এমনকি জীবের প্রতিও মানুষের ভালোবাসাকে জাগিয়ে তোলেন। এর ফলে জীবহিংসা কমে যায়। এটা শঙ্করাচার্যের একটা বড় অবদান। শুধু তা-ই নয়, তিনি যে ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্য ও বেদান্তভাষ্য রচনা করেছেন তা হিন্দু ধর্ম ও দর্শন চর্চার ক্ষেত্রে এক অসাধারণ অবদান। এছাড়া তিনি সাধারণ মানুষের জন্য মোহমুদগর, আনন্দলহরী, শিবস্তব, গোবিন্দাষ্টক প্রভৃতি গ্রন্থও রচনা করে গেছেন।
শ্রীকৃষ্ণ বলেন, কর্মই জীবন। জীবনধারণের জন্য কর্ম করতেই হবে। দ্বাপর যুগে ভগবান, শ্রীকৃষ্ণ বলেন, মোক্ষলাভের জন্য কর্মত্যাগের প্রয়োজন নেই। তার যারা মুক্তিলাভের আশায় জাগতিক কর্মকাণ্ড ত্যাগ করেন, তারাও আধ্যাত্মিক কর্ম অনুশীলন করেন।
বিবাহের মাধ্যমে সন্তানসন্ততি লাভ এবং তাদের ভরণপোষণসহ পারিবারিক জীবনে প্রতিদিন পাঁচটি যজ্ঞকর্মের অনুশীলন করতে হবে। এ পাঁচটি যজ্ঞ হচ্ছে- পিতৃযজ্ঞ, দৈবযজ্ঞ, ভূতযজ্ঞ, নৃযজ্ঞ ও ঋষিযজ্ঞ। মানুষ জন্মগ্রহণ করে মাতাপিতার মাধ্যমে। মাতাপিতার তত্ত্বাবধানে সেবা-শুশ্রুষায় বড় হতে থাকে। এই মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি, সেবা-যত্ন কর্মগুলো সন্তানের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। আর এ কর্তব্যগুলো সম্পাদন করে একজন সন্তান পিতৃযজ্ঞ সম্পন্ন করে থাকে। মানুষের জীবনধারণের জন্য প্রকৃতির দান গ্রহণ করতে হয়।
মানুষ সামাজিক জীব। জীবনের প্রয়োজনীয় অনেক দ্রব্যই সমাজের নিকট থেকে সংগ্রহ করতে হয়। মানুষ তার দৈনন্দিন চাহিদা যেমন-খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ইত্যাদি সমাজের ভিন্ন ভিন্ন লোকের নিকট থেকে পেয়ে থাকে। সামাজিক চাহিদার কারণে মানুষ মঠ, মন্দির, উপাসনালয়, বিদ্যালয় এবং চিকিৎসালয় ইত্যাদি স্থাপনের মধ্য দিয়ে সমাজের প্রতি তার কর্তব্য সম্পাদন করে। এটিকেই বলা হয় গার্হস্থ্য আশ্রমের কর্ম। ব্রহ্মচর্য শেষে বিবাহ করে সংসার ধর্ম পালন গার্হস্থ্য আশ্রমের অন্তর্গত।
উদ্দীপকে কমল বাবু পরিবারের সব কিছু দেখাশুনা করেন। সন্তানের খাওয়া পরা, লেখা-পড়া ও মা-বাবার ভরণপোষণের যাবতীয় খরচ বহন করেন। প্রতিদিন পাঁচটি যজ্ঞের অনুশীলন করেন। সমাজের অন্য সকল দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেন। যা গার্হস্থ্য আশ্রমের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই বলা যায়, কমল বাবুর কার্যকলাপ মানবজীবনের গার্হস্থ্য আশ্রমভুক্ত।
আশ্রম জীবনে চতুর্থ পর্যায়ে আসে সন্ন্যাসের কথা। এ সময় পঁচাত্তর থেকে একশ বছরের মধ্যে জীবনধারণে শাস্ত্রীয় নির্দেশ আছে। সন্ন্যাস শব্দের অর্থ সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ। এই আশ্রমে এসে সন্ন্যাসী একাকী জীবনধারণ করবেন। এ সময় সন্ন্যাসীদের সঙ্গে তার স্ত্রীও থাকবেন না। সন্ন্যাসী জাগতিক সকল কর্ম পরিত্যাগ করে কেবল ঈশ্বর চিন্তাতেই মগ্ন থাকবেন। মাত্র দুপুরবেলার আহারের সামগ্রী লোকালয় থেকে সংগ্রহ করবেন। বাকি দুবেলা দুধ, ফল ইত্যাদি সংগ্রহ করে স্বল্প পরিমাণে আহার করবেন। আশ্রয়হীন অবস্থায় মন্দিরে ও দেবালয়ে ক্ষণকালের জন্য আশ্রয় নিতে পারেন। পোশাক-পরিচ্ছদ থাকবে নিতান্তই সাধারণ। অতীত জীবনের সব স্মৃতি পরিহার করে একমনে একধ্যানে ঈশ্বরচিন্তায় মগ্ন থাকবেন। এর ফলে ঈশ্বর লাভ সম্ভব। শাস্ত্রবচনে জানা যায়, 'দন্ডগ্রহণমাত্রেণ নরো নারায়ণো ভবেৎ।' অর্থাৎ সন্ন্যাস গ্রহণ করলেই মানুষ নারায়ণ বা দেবতা হয়ে যায়। তবে সন্ন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে কর্মফলাসক্তি ও ভোগাসক্তি ত্যাগ। এ
সম্পর্কে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে-
কর্মফলের বাসনা না করে যিনি কর্তব্যকর্ম করেন, তিনিই সন্ন্যাসী, তিনিই যোগী। শুধু গৃহাদি কর্ম বা শরীর ধারণের উপকরণ সংগ্রহে কর্মত্যাগই সন্ন্যাস নয়।
পরিশেষে বলা যায়, জীবনে ঈশ্বর লাভের জন্য সন্ন্যাস আশ্রম খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
দেব-দেবীরা হলেন ঈশ্বরের সাকার রূপ। ঈশ্বর এ মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং ধ্বংসকর্তা। তিনি নিরাকার, আবার প্রয়োজনে সাকার রূপও ধারণ করেন। ঈশ্বর যখন নিজের কোনো গুণ বা ক্ষমতাকে কোনো বিশেষ আকার বা রূপে প্রকাশ করেন তখন তাদেরকে দেব-দেবী বলা হয়। যেমন- ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, দুর্গা, সরস্বতী ইত্যাদি। সাকার বা প্রতীক উপাসনা বিভিন্ন দেব-দেবীকে খুশি করার জন্য করা হয়। এ সময় দেব-দেবীর মূর্তি তৈরি করে তার সামনে পূজা করা হয়।
উদ্দীপকে দেখা যায়, অমল বাবু প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সূর্যকে প্রণাম করেন। স্নান সেরে তিনি মন্দিরে গিয়ে বিভিন্ন উপাচারের মাধ্যমে দেবতার পূজা করেন, যা পাঠ্যবইয়ের সাকার উপাসনার সাথে মিল রয়েছে। তাই বলা যায়, অমল বাবুর কর্মকাণ্ডে সাকার উপাসনার দিকটি ফুটে উঠেছে।
হ্যাঁ, কমল বাবুর অনুসরণকৃত পদ্ধতি তথা ঈশ্বরজ্ঞানে জীবসেবার মাধ্যমে ঈশ্বর লাভ করা যায়।
সাধারণ অর্থে 'সেবা' বলতে পরিচর্যা করা বোঝায়। যেমন- অতিথি সেবা, জীবসেবা, ঈশ্বর সেবা প্রভৃতি। অপরের সন্তোষ বিধানের জন্য দেহ ও মনের সমন্বয়ে কল্যাণকর যে কাজ করা হয় তাকে সেবা বলে। জীবসেবা বলতে জীবের পরিচর্যা, সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি করাকে বোঝায়। এ ছাড়াও বুদ্ধি দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে, সহানুভূতি জানিয়ে, বিপদে পাশে দাঁড়িয়ে নানাভাবে সেবা করা যায়। আমরা জীবের সেবা করব কেন? আমরা জানি, ঈশ্বর জীবাত্মারূপে জীবের মধ্যে অবস্থান করেন। তাই জীবসেবা করলে ঈশ্বরকে সেবা করা হয়।
জীবের সেবা করা হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান ব্রত হিসেবে বিবেচিত।
'যত্র জীবঃ তত্র শিবঃ'। অর্থাৎ যেখানে জীব সেখানেই শিব। এখানে শিব বলতে ঈশ্বরের কথাই বোঝানো হয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন:
'বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর
জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।'
এ কথার তাৎপর্য এই যে, বহুরূপে অর্থাৎ বহুজীবরূপে ঈশ্বর আমাদের সম্মুখেই আছেন। তাই তাঁকে খুঁজে বেড়ানোর দরকার নেই। যিনি জীবকে ভালোবাসেন, তিনি সেই সেবার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সেবা করেন। তাই হিন্দুধর্মে জীবকে ঈশ্বর বা ব্রহ্মজ্ঞানে সেবা করতে বলা হয়েছে। কারণ জীবকে সেবা করলেই ঈশ্বরের সেবা করা হয়।
সুতরাং বলা যায়, কমল বাবুর অনুসরণকৃত পদ্ধতিতে ঈশ্বর লাভ করা সম্ভব।
দৃশ্যকল্প-২ : সুপর্ণা একদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে এক ছিনতাইকারী তার গলার চেইন নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। এমন সময় পথচারী সুমন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছিনতাইকারীকে ধরে চেইনটি উদ্ধার করে সুপর্ণাকে ফেরত দেয়।
দৃশ্যকল্প-১ থেকে মূলত মানবতার শিক্ষা পাওয়া যায়।
সমির নিজের ক্ষুধা উপেক্ষা করে নিজের সমস্ত খাবার এক ভিক্ষুককে দিয়ে দেয়। এতে বোঝা যায়, মানবিক দায়িত্ব পালন করতে গেলে কখনো কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়।
মানুষের মধ্যে মানবতা থাকার কারণে তাকে অন্যান্য জীব থেকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়। যার মানবতা নেই তাকে মানুষ বলা যায় না। প্রকৃত মানুষ হওয়ার জন্য প্রয়োজন মানবিক গুণাবলি। যার মধ্যে এই মানবিক গুণ রয়েছে তাকেই প্রকৃত মানব বলে আখ্যায়িত করা যায়।
মানুষের প্রতি মানুষের রয়েছে দরদ, রয়েছে সংবেদনশীলতা। যুগে যুগে মানুষ সত্যের সাধনায় জীবন উৎসর্গ করেছে। মানুষের মঙ্গলের জন্য দুঃখ বরণ করেছে। সেবায়, ত্যাগে, কর্মে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে ধন্য রয়েছে। মানুষের কল্যাণ কামনায় নিজের মেধা, শ্রম কাজে লাগিয়ে নিজেকে সার্থক করেছে, করেছে মহান। মহত্ত্বের উৎস হলো মানবতা বা মানবপ্রেম। মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অসংখ্য মহৎ প্রাণ ব্যক্তি নিজের জীবনের সর্বস্ব অন্যের জন্য উৎসর্গ করে গেছেন। কেবল অর্থ দিয়ে নয়, নিজের জীবন দিয়েও অনেক মহানুভব ব্যক্তি চরম ত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন। জীবে দয়াই মানবজাতির কল্যাণকর পথ। নিরন্নকে অন্ন, বস্ত্রহীনে বস্ত্র, তৃষ্ণার্তকে জল, দৃষ্টিহীনে দৃষ্টি, বিদ্যাহীনে বিদ্যা, ধর্মহীনে ধর্মজ্ঞান, বিপন্নকে আশ্রয়, ভয়ার্তকে অভয়, রুগ্নকে ঔষধ, গৃহহীনকে গৃহ, শোকার্তকে সান্ত্বনা দান করা মানবতারই আরেক নাম।
দৃশ্যকল্প-২ এ সুপর্ণা একদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে এক ছিনতাইকারী তার গলার চেইন নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। এমন সময় পথচারী সুমন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছিনতাইকারীকে ধরে চেইনটি উদ্ধার করে সুপর্ণাকে ফেরত দেয়। যা পাঠ্যবইয়ের তরণীসেনের আদর্শের সাথে মিল রয়েছে।
তরণীসেন এক সৎসাহসী বারো বছরের বালক। সে ছিল রাক্ষসরাজ রাবণের ভাই বিভীষণের পুত্র। রাক্ষস বাহিনীর সাথে রাম-লক্ষ্মণের ভীষণ যুদ্ধ হচ্ছে এবং এ যুদ্ধে রাক্ষস বাহিনী পরাজিত হচ্ছে- এ খবর পেয়ে বালক তরণীসেন সাহস করে রথ নিয়ে যুদ্ধ করতে আসে ।
রণক্ষেত্রে তার বাণের আঘাতে রামের পক্ষের অনেক বানর সৈন্য আহত হয়। তরণীসেনের এ সৎসাহস দেখে রামচন্দ্র বিস্মিত হন। এ কারণে রণক্ষেত্রে তরণীসেনের মৃত্যুর পর তিনি তাকে আশীর্বাদ করেন। রামচন্দ্রের আশীর্বাদে তরণীসেন রাক্ষস দেহ পরিত্যাগ করে দিব্যদেহ ধারণ করে বৈকুণ্ঠে চলে যায়।
সুতরাং আমরা বলতে পারি, তরণীসেন বালক হওয়া সত্ত্বেও যে সৎসাহস ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে ইতিহাসে তা অম্লান। সে দেশকে শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করার জন্য সৎসাহস নিয়ে রাম-লক্ষ্মণের শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে দৃঢ় চিত্তে যুদ্ধ করে। বীরের মতো লড়ে তরণীসেন প্রাণ বিসর্জন দেয়।
সুশ্রুত প্রাচীন ভারতের একজন মহান চিকিৎসক ছিলেন। তাঁর পিতার নাম বিশ্বামিত্র মুনি। দেবরাজ ইন্দ্র একদিন মর্ত্যবাসীকে ব্যাধিগ্রস্ত দেখে দেববৈদ্য ধন্বন্তরীকে সমগ্র আয়ুর্বেদ শিক্ষা দেন এবং বলেন পৃথিবীতে জন্ম নিতে। ইন্দ্রের কথামতো ধন্বন্তরী কাশীরাজের পুত্ররূপে দিবোদাস নামে জন্মগ্রহণ করেন। এ কথা জানতে পেরে বিশ্বামিত্র স্বীয় পুত্র সুশ্রুতকে তার নিকট পাঠান আয়ুর্বেদ শিক্ষার জন্য। আধুনিক গবেষকদের মতে, সুশ্রুত খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ অব্দে বর্তমান ছিলেন। তিনি বর্তমান বারাণসী নগরে গঙ্গার তীরে বাস করতেন এবং চিকিৎসাবিদ্যা চর্চা করতেন। তিনি প্রধানত শল্যবিদ্যার চর্চা করতেন। এজন্য তাকে বলা হয় 'ভারতীয় শল্যবিদ্যার জনক'। তিনি 'সুশ্রুত সংহিতা' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তার গ্রন্থে শল্যবিদ্যার ৩০০ প্রকার পদ্ধতি এবং ১২০টি অস্ত্রের বর্ণনা দিয়েছেন। 'সুশ্রুত সংহিতা' রচনা করে সুশ্রুত মানবজাতির বিশেষ মঙ্গল সাধন করেছেন।
উদ্দীপকে রীতার মা ভারতবর্ষের একজন চিকিৎসকের কাহিনি বলেন। তিনি আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে শিক্ষালাভ করেন। এছাড়াও 'সুশ্রুত সংহিতা' নামে একখানা গ্রন্থ রচনা করেন, যা মহান চিকিৎসক সুশ্রুতের কর্মকাণ্ডের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই বলা যায়, রীতার মায়ের কাহিনির সাথে সুশ্রুত-এর মিল রয়েছে।
তপনের বলা মহাপুরুষ তথা শ্রীশঙ্করাচার্যের মধ্যে যে আদর্শ ফুটে উঠেছে, তা পাঠ্যপুস্তকের আলোকে বিশ্লেষণ করা হলো-
উদ্দীপকে তপন একজন মেধাবী বালকের কথা বলেন, যে ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করে অল্প বয়সেই পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তাঁর ধর্মের মূল কথা 'অদ্বৈতবাদ'। এসব কর্মকাণ্ড শ্রীশঙ্করাচার্যের মধ্যে নিহিত।
যে সকল ক্ষণজন্মা মনীষী তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য পৃথিবীতে অমর হয়ে আছেন তাদের মধ্যে শ্রীশঙ্করাচার্য অন্যতম। পণ্ডিতরা কোষ্ঠী দেখে তার স্বল্প আয়ুর কথা বললে তিনি ব্রহ্ম সাধনায় বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে ধর্মগুরু হিসেবে তিনি নতুন জীবন শুরু করেন। তিনি পুণ্যধাম বারাণসীতে আসেন এবং সেখানে ধর্ম প্রচার শুরু করেন। তার ধর্মের মূলকথা 'অদ্বৈতবাদ'। তিনি বলেন, 'ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা জীব ও ব্রহ্মে কোনো পার্থক্য নেই।'
শঙ্করাচার্য যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক জীবন যেমন বিপর্যস্ত ছিল, ধর্মীয় জীবনও তেমনি বিপর্যস্ত ছিল। জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে নানা কুসংস্কার ঢুকে পড়েছিল। হিন্দুধর্মও ম্লান হয়ে পড়েছিল। সমাজে বেদের কর্মকাণ্ড অর্থাৎ যাগ-যজ্ঞের প্রাধান্য বেড়ে গিয়েছিল। শঙ্কারচার্য তার অদ্বৈতমত প্রচার করে হিন্দুধর্মের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনেন। 'জীব ও ব্রহ্মের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই' এ কথা বলে তিনি মানুষের প্রতি মানুষের, এমনকি জীবের প্রতিও মানুষের ভালোবাসাকে জাগিয়ে তোলেন।
ঘটনা-২ : রাধানগর গ্রামে কয়েক প্রহর ব্যাপী একটি ধর্মানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে নানা সুর, তাল ও ছন্দে কীর্তন পরিবেশন করা হয়। ভগবানের নাম শ্রবণের জন্য ভক্তরা দূর-দূরান্ত থেকে সেখানে এসে মিলিত হয়।
দৃশ্যকল্প-২ : অমল রায়ের ছেলে প্রবীর রায় ছোটবেলা থেকেই ঈশ্বরের আরাধনা করে। কিন্তু অমল রায়ের চাওয়া ছেলে তাকে কাজ-কর্মে সাহায্য করুক। তবে কোনো ভাবেই তার ছেলে তাকে কোনো কাজেই সাহায্য করে না। বরং সে আরও বেশি করে ঈশ্বর সাধনায় নিজেকে যুক্ত করে। অমল রায় প্রবীর রায়কে ঈশ্বর সাধনা থেকে দূরে রাখতে না পেরে তাকে নানাভাবে হত্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি তাকে হত্যা করতে পারেন না।
উদ্দীপকের দৃশ্যকল্প-১ এ দিবার মধ্যে যে আচরণিক মূল্যবোধ লক্ষ্য
করা যায় সেটি হলো সততা। নিম্নে সততা ও বিভিন্ন গুণাবলীর কারণে পরিবার ও সমাজ কীভাবে উপকৃত হতে পারে তা পাঠ্যবইয়ের আলোকে ব্যাখ্যা করা হলো:
মানুষ পরিবারবদ্ধ হয়ে বাস করে। আর আমরা তো জানি পরিবারের সকল সদস্যের স্বার্থ একসূত্রে গাঁথা থাকে। তাই ধর্মপথ অনুসরণ তথা অনুশীলনের ক্ষেত্রে পারিবারিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিবারে বড়দের কাছ থেকে ছোটরা আচার-আচরণ শেখে। পরিবারের ছোটরা বড়দের অনুসরণ ও অনুকরণ করে। তাই পরিবারে ধর্মপথ অনুশীলন-অনুসরণের চর্চা থাকা চাই। পরিবারের যদি সর্বদা সত্য কথার চর্চা হয়, কেউ যদি মিথ্যার আশ্রয় না নেয়, তাহলে সে পরিবারে কেউ মিথ্যার আশ্রয় নেবে না। পরিবারে যদি আত্মসংযম শেখানো হয়, লোভকে দমন করার দৃষ্টান্ত থাকে, তাহলে সে পরিবারে কেউ লোভী হবে না। যে পরিবারের ধর্মাদর্শ 'রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন'-এ অক্রোধের চেতনা, সে পরিবারে শান্তি বিরাজ করবেই। সহমর্মিতা ও পরমতসহিষ্ণুতা পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের একটি অতি প্রয়োজনীয় নৈতিক মূল্যবোধ। এর অভাবে গণতন্ত্র ও সংহতি বিনষ্ট হয়।
পরিবারে কেউ যদি নিজের মত অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়, তাহলে পরমতসহিষ্ণুতার আদর্শ সে পরিবারে থাকতে পারে না। ওই পরিবারের সদস্যরা সমাজেও গণতান্ত্রিক মনোভাব দেখান না। অতি আদরের শিশু-কিশোর সদস্যরা মা-বাবাকে নিজের মত অনুসারে কাজ করতে বাধ্য করে। যখন যা চাইবে, তা দিতে হবে। এ মানসিকতা নিয়ে সে যখন সমাজ-জীবনে আচরণ করতে যায়, তখন সে পরমতসহিষ্ণুতা তো দেখায়ই না, বরং নিজের মতো জোর করে অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। পরিবারের সদস্যরা সততা, সত্যপ্রিয়তা, পরমতসহিষ্ণুতা ও মানবতায় মণ্ডিত ধর্মপথ অনুসরণ করলে, পরিবার শান্তিপূর্ণ থাকবে। আর প্রতিটি পরিবার যদি ধর্মপথে চলে, তাহলে সমাজও ধর্মপথে চলবে।
যদৃশ্যকল্প-২ এর প্রবীর চরিত্রটি পাঠ্যবইয়ের ধর্মের জয় উপাখ্যানের হরিভক্ত প্রহ্লাদ চরিত্রেরই প্রতিচ্ছবি। এই ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ একমত। নিম্নে এর মতামতের সপক্ষে যুক্তি দেয়া হলো :
সত্যযুগে হিরণ্যকশিপু বলে এক রাজা ছিলেন। তিনি ছিলেন দৈত্যদের রাজা। দৈত্যরা চিরকাল দেবতাদের প্রতি রুষ্ট থাকেন। তাই হিরণ্যকশিপু ছিলেন হরিবিদ্বেষী। কিন্তু তার পুত্র ছিলেন হরিভক্ত। তার নাম প্রহ্লাদ। অনেক চেষ্টা করেও রাজা হিরণ্যকশিপু পুত্র প্রহ্লাদের হৃদয় থেকে হরিভক্তি দূর করতে পারেন না। পরে তাকে হত্যা করার নানা চেষ্টা করা হয়। পাহাড় থেকে ফেলে দিয়ে, বিষধর সর্পের প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করে, হাতির পায়ের নিচে ফেলে, বিষমিশ্রিত অন্ন দিয়ে। কোনোভাবেই প্রহ্লাদকে হত্যা করা যায় না। শ্রীহরি তাকে সর্বাবস্থায় রক্ষা করেন। পরবর্তী সময় শ্রীহরি নৃসিংহ অবতার রূপে হিরণ্যকশিপুকে বধ করেন।
উদ্দীপকে দেখা যায়, অমল রায়ের ছেলে প্রবীর রায় ছোটবেলা থেকেই ঈশ্বরে আরাধনা করে। কিন্তু অমল রায় চায় ছেলে তাকে সংসারের কাজেকর্মে সাহায্য করুক। তবে প্রবীর রায় ঈশ্বর আরাধনা ছাড়া আর কোনোকাজেই মন বসাতে পারে না এবং করতে চায় না। তাই অমল রায় প্রবীর রায়কে ঈশ্বর আরাধনা থেকে দূরে রাখতে না পেরে নানাভাবে হত্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি তাকে হত্যা করতে পারেন না। উপাখ্যান থেকেও আমরা দেখতে পাই, বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদকে কোনোভাবেই হিরণ্যকশিপু হত্যা করতে পারেন না। কারণ তাকে সর্বাবস্থায় শ্রীহরি রক্ষা করেন।
তাই বলা যায়, উদ্দীপকের প্রবীর রায় উপাখ্যানের প্রহ্লাদেরই প্রতিচ্ছবি।
অপরদিকে বিপুল বাবু দীর্ঘদিন যাবৎ মেরুদণ্ড ব্যথা ও ডায়াবেটিক রোগে ভুগছিল। তার কাকার পরামর্শে সে নিয়মিত একটি আসন অনুশীলন করে। এখন সে সম্পূর্ণ সুস্থ।
এই আসন অনুশীলনকালীন আসনকারীর দেহ বৃক্ষের মতো দেখায় বলে একে বৃক্ষাসন বলে।
বৃক্ষাসনে প্রথমেই দুই পা জোড়া করে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। এ সময় পায়ের পাতা মাটিতে সমানভাবে লেগে থাকবে। এবার ডান পা হাঁটুতে ভেঙে গোড়ালি বাম ঊরুমূলে রাখতে হবে, পায়ের পাতা উঁরুর সঙ্গে লেগে থাকবে। পাশাপাশি পায়ের আঙ্গুলগুলো থাকবে নিচের দিকে ফেরানো। এরপর কেবল বাঁ-পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। পাশাপাশি নমস্কারের ভঙ্গিতে হাতের তালু দুটি জোড়া করে বুকের কাছে আনতে হবে। তারপর তালু দুটি জোড়া রেখে হাত দুটি সোজা মাথার ওপর নিতে হবে। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রেখে এভাবে ১০ সেকেন্ড নিশ্চল হয়ে থাকতে হবে। পরে হাত নামিয়ে হাতের তালু দুটি ছেড়ে দিয়ে ডান পা সোজা করে আবার আগের মতো দুপায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। এবার ঠিক একইভাবে ডান পায়ে দাঁড়িয়ে আসনটি করতে হবে। অর্থাৎ ডান পায়ে দাঁড়িয়ে বাম পা হাঁটুতে ভেঙে গোড়ালি ডান উরুমূলে রাখতে হবে। এবারও শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রেখে একইভাবে ১০ সেকেন্ড নিশ্চল হয়ে থাকতে হবে। আবার আগের মতো দুই পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। শেষে শবাসনে ১০ সেকেন্ড বিশ্রাম নিতে হবে। এভাবে তিনবার আসনটি অনুশীলন করতে হবে। ১০ সেকেন্ডে অভ্যস্ত হয়ে গেলে আস্তে আস্তে সময় বাড়িয়ে ৩০ সেকেন্ড করতে হবে।
উদ্দীপকের বিপুল বাবুর অনুশীলনকৃত আসনটি হলো হলাসন।
নিচে আসনটির প্রভাব বিশ্লেষণ করা হলো:
হলাসন অনুশীলনের ফলে আমাদের মেরুদণ্ড নমনীয় ও সুস্থ থাকে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস, বাত ও সায়টিকার ব্যথা, পেটের পীড়া, কোষ্ঠবদ্ধতা ইত্যাদি রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকে বা দূর হয়।
নিয়মিত হলাসন অনুশীলন করলে- মেরুদণ্ড সুস্থ ও নমনীয় হবে এবং স্থিতিস্থাপকতা বজায় থাকবে। এর ফলে মেরুদণ্ড সংলগ্ন স্নায়ুকেন্দ্র ও মেরুদণ্ডের দুপাশের পেশি সতেজ ও সক্রিয় হবে। প্লীহা, যকৃৎ, মূত্রাশয় প্রভৃতির কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। থাইরয়েড, প্যারাথাইরয়েড, টনসিল ইত্যাদি গ্রন্থি সবল ও সক্রিয় হবে। এ ছাড়াও হলাসন অনুশীলনে পেট, কোমর ও নিতম্বের মেদ কমে দেহ সুঠাম ও সুন্দর হবে। পিঠে ব্যথা থাকলে তাও দূর হবে।
ঘটনা-২ : নিপন মহন্ত পেশায় একজন শিক্ষক। একদিন বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে রাস্তার ধারে রক্তাক্ত অবস্থায় একটি বিড়াল পড়ে থাকতে দেখলেন। এটা দেখে তিনি বিড়ালটিকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেন।
এ ধরনের উপাসনা ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, সরস্বতী, লক্ষ্মী, মনসা প্রভৃতি দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে করা হয়। প্রতীক উপাসনা বা সাকার উপাসনা ভক্তিযোগ নামে পরিচিত। সগুণরূপে ঈশ্বর সাকাররূপে অবস্থান করেন। এ সময় তিনি প্রতিকৃতিতে প্রকাশিত হন। ঈশ্বরের এমন পূজা করাকে সাকার বা সগুণ উপাসনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সকল প্রকার উপাসনারই মূল লক্ষ্য ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ। ঈশ্বর সকল উপাসনারই মূল সুর হৃদয়ঙ্গম করেন।
ঘটনা-১ এর কণক বাবু একজন নিষ্ঠাবান পুরোহিত। তিনি প্রতিদিন শ্রীকৃষ্ণের মূর্তির সামনে বসে প্রার্থনা করেন। এই পদ্ধতি ঈশ্বরের উপাসনা করার বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি। প্রার্থনা, স্তব-স্তুতির মধ্য দিয়ে আরাধনা করলে ঈশ্বর প্রসন্ন হন এবং ভক্তের মনোবাসনা পূরণ করেন।এ উপাসনার মধ্য দিয়ে ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সেতুবন্ধন গড়ে উঠে। ভক্ত ভগবানকে হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে উপলব্ধি করতে পারে।
ঘটনা-২ এ নিপন মহন্ত এর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জীবজ্ঞানে ঈশ্বর সেবার বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ঘটেছে।
ঘটনা-২ নিপুন মহন্ত পেশায় একজন শিক্ষক। তিনি বিদ্যালয় যাওয়ার সময় একটি বিড়ালকে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেন। নিপুন মহন্তর মধ্যে জীবসেবার বৈশিষ্ট্যটি ফুটে উঠেছে। নিম্নে তা বিশ্লেষণ করা হলো:
আমরা জানি, ঈশ্বর জীবাত্মারূপে জীবের মধ্যে অবস্থান করেন। তাই জীবসেবা করলে ঈশ্বরকে সেবা করা হয়।
জীবের সেবা করা হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান ব্রত হিসেবে বিবেচিত।
'যত্র জীবঃ তত্র শিবঃ'। অর্থাৎ যেখানে জীব সেখানেই শিব। এখানে শিব বলতে ঈশ্বরের কথাই বোঝানো হয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন:
'বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর
জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।'
এ কথার তাৎপর্য এই যে, বহুরূপে অর্থাৎ বহুজীবরূপে ঈশ্বর আমাদের সম্মুখেই আছেন। তাই তাঁকে খুঁজে বেড়ানোর দরকার নেই। যিনি জীবকে ভালোবাসেন, তিনি সেই সেবার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সেবা করেন। তাই হিন্দুধর্মে জীবকে ঈশ্বর বা ব্রহ্মজ্ঞানে সেবা করতে বলা হয়েছে। কারণ জীবকে সেবা করলেই ঈশ্বরের সেবা করা হয়।
সুতরাং ঈশ্বর জ্ঞানে জীবসেবা হিন্দুধর্মের একটি মূল বৈশিষ্ট্য এবং অন্যতম নৈতিক শিক্ষা।
দৃশ্যকল্প-২: দুর্গাপুর গ্রামে রোমন নামে এক ছেলে জন্মগ্রহণ করে। ছাত্র হিসেবে তার ছিল অসাধারণ মেধা। ধর্মের প্রতি তার ছিল প্রচণ্ড অনুরাগ। মাত্র ১২ বছর বয়সে সে সংসার ত্যাগ করে এক সাধুর সাথে সন্ন্যাস যাত্রা করে।
মীরাবাঈ খুব ছোটোবেলা থেকেই ভক্তিরসাত্মক ভজন রচনায় অসামান্য প্রতিভার পরিচয় দেন। যৌবনে তিনি চিতোরের রানা সংগ্রামসিংহের পুত্র ভোজরাজের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। শ্বশুর বাড়িতে মীরার কোনো কিছুর অভাব নেই। অতুল ঐশ্বর্য। অসংখ্য দাস-দাসী। কিন্তু এসবের প্রতি মীরার কোনো আসক্তি নেই। জীবনে তাঁর একমাত্র কাম্য বস্তু হলো কৃষ্ণপ্রেম আর গিরিধারীলালের সাক্ষাৎ লাভ। তিনি শুধু সাধন-ভজন নিয়েই থাকেন। প্রাসাদে কোনো সাধু-সন্ত এলে ছুটে যেতেন তাঁর কাছে। একমনে হরিকথা শুনতেন। কখনো কখনো ভাবাবিষ্ট হয়ে নিজের কণ্ঠেই শুরু করতেন ভজন গান। তাঁর কণ্ঠ এত মধুর ছিল যে সবাই মন দিয়ে তা শুনত।
একসময় কৃষ্ণপ্রেমের টানে মীরা বৃন্দাবনে এসে উপস্থিত হন। বৃন্দাবনে এসে মীরা তীব্রভাবে প্রেমভক্তিতে আপ্লুত হয়ে পড়েন। দিকে দিকে তার নাম-যশ ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর একদিন বৃন্দাবনের লীলা সাঙ্গ করে মীরা শ্রীকৃষ্ণের স্মৃতিবিজড়িত স্থান দ্বারকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। দ্বারকাধামে এসে রণছোড়জীর বিগ্রহের ভজন-পূজনেই জীবনের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত করেন। এই দ্বারকাধামেই তাঁর দেহলীলা সংবরণ হয়।
পাঠ্যবইয়ের আলোচনা আমরা দেখতে পাই, নিত্যানন্দের প্রকৃত নাম ছিল কুবের। ছাত্র হিসেবে তিনি মেধাবী ছিলেন। কিন্তু পড়াশোনায় তাঁর একদম মন ছিল না। ধর্মকথা শুনতে তিনি খুব ভালোবাসতেন। খেলার পরিবর্তে মন্দিরে গিয়ে বসে থাকতেন। সর্বদা কৃষ্ণের কথা ভাবতেন। কীভাবে কৃষ্ণকে পাওয়া যাবে সর্বক্ষণ এটাই ছিল তার ভাবনা। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি পিতামাতার অনুমতি নিয়ে গৃহত্যাগ করেন। অনেক অরণ্য, পাহাড়-পর্বত, তীর্থস্থান ঘুড়ে বেড়াতে লাগলেন। এভাবে একদিন উপস্থিত হলেন কাঙ্ক্ষিত বৃন্দাবনে। তিনি ব্যাকুল হয়ে পাগলের মতো শ্রীকৃষ্ণের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। হঠাৎ একদিন কৃষ্ণ তাকে স্বপ্নে সাক্ষাৎ দেন এবং তাকে নির্দেশ দেন নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সাথে প্রেমভক্তি প্রচারে যোগ দিতে। নবদ্বীপে নন্দন আচার্যের গৃহে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সাথে তার সাক্ষাৎ হয় এবং দুজনে নেচে গেয়ে জাতিধর্ম নির্বিশেষে হরিনাম বিলাতে লাগলেন। ফলে দলে দলে লোক তাদের অনুসারী হলো। জগাই-মাধাইয়ের মতো অসংখ্য পাপীকে তিনি কৃষ্ণনামের দ্বারা উদ্ধার করেন। গৌরাঙ্গের দ্বারা আদিষ্ট হয়ে নিত্যানন্দ গৌড়রাজ্যে, বিশেষ নবদ্বীপে কৃষ্ণনাম ও প্রেমধর্ম প্রচার করতে লাগলেন। তিনি কৃষ্ণনামের সাথে একীভূত করে দেন শ্রীগৌরাঙ্গের নাম। গৌরাঙ্গ প্রবর্তিত প্রেমধর্মের এক মহাপ্রচারকরূপে গৌড়দেশে আবির্ভূত হন নিত্যানন্দ। সকলে সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে এক সারিতে এসে দাঁড়ায়। সার্থক হয় শ্রীগৌরাঙ্গের প্রেমভক্তি ও কৃষ্ণনামের আন্দোলন। নিত্যানন্দও চির অমর হয়ে থাকেন গৌড়বাসীর অন্তরে।
দৃশ্যকল্প-২ : রাকেশ বাবার বড় ছেলে এবং তারা চার ভাই। তাঁর বাবার তিন স্ত্রী। সৎ মায়ের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে রাকেশ স্ত্রীসহ বাবার সকল সম্পত্তি রেখে অন্যত্র চলে যান। ভাই রতন সঙ্গী হয়ে সবসময় ভাই রাকেশকে ছায়ার মতো ঘিরে রাখে।
চরকই প্রথম মানব দেহের পরিপাক, বিপাক ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কে বলেন। তিনি শরীরের কার্যকারিতার জন্য তিনটি 'দোষ' বা উপাদানের কথা বলেছেন। সেগুলো হলো- বাত, পিত্ত ও কফ। এই তিনটির সামঞ্জস্য নষ্ট হলে শরীর অসুস্থ হয়। আর সামঞ্জস্য ফিরে এলে শরীর সুস্থ হয়। চরক এ-ও বলেছেন- রোগের চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করা বেশি জরুরি। তিনি রোগীর চিকিৎসার পূর্বে রোগের কারণসমূহ এবং পরিবেশ সম্পর্কে যথার্থরূপে ভাবতে বলেছেন।
যে সকল ক্ষণজন্মা মনীষী তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য পৃথিবীতে অমর হয়ে আছেন তাদের মধ্যে শ্রীশঙ্করাচার্য অন্যতম। পণ্ডিতরা কোষ্ঠী দেখে তার স্বল্প আয়ুর কথা বললে তিনি ব্রহ্ম সাধনায় বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে ধর্মগুরু হিসেবে তিনি নতুন জীবন শুরু করেন। তিনি পুণ্যধাম বারাণসীতে আসেন এবং সেখানে ধর্ম প্রচার শুরু করেন। তার ধর্মের মূলকথা 'অদ্বৈতবাদ'। তিনি বলেন, 'ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা জীব ও ব্রহ্মে কোনো পার্থক্য নেই।'
শঙ্করাচার্য যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক জীবন যেমন বিপর্যস্ত ছিল, ধর্মীয় জীবনও তেমনি বিপর্যস্ত ছিল। জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে নানা কুসংস্কার ঢুকে পড়েছিল। হিন্দুধর্মও ম্লান হয়ে পড়েছিল। সমাজে বেদের কর্মকাণ্ড অর্থাৎ যাগ-যজ্ঞের প্রাধান্য বেড়ে গিয়েছিল। শঙ্কারচার্য তার অদ্বৈতমত প্রচার করে হিন্দুধর্মের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনেন। 'জীব ও ব্রহ্মের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই' এ কথা বলে তিনি মানুষের প্রতি মানুষের, এমনকি জীবের প্রতিও মানুষের ভালোবাসাকে জাগিয়ে তোলেন। এর ফলে জীবহিংসা কমে যায়। এটা শঙ্করাচার্যের একটা বড় অবদান। শুধু তা-ই নয়, তিনি যে ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্য ও বেদান্তভাষ্য রচনা করেছেন তা হিন্দু ধর্ম ও দর্শন চর্চার ক্ষেত্রে এক অসাধারণ অবদান। এছাড়া তিনি সাধারণ মানুষের জন্য মোহমুদগর, আনন্দলহরী, শিবস্তব, গোবিন্দাষ্টক প্রভৃতি গ্রন্থও রচনা করে গেছেন।
১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে বিবেকানন্দ আমেরিকা যান এবং শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্বধর্ম সম্মেলনে বক্তৃতা দেন। তিনি তাঁর বক্তৃতায় বলেন, 'হিন্দুধর্ম পৃথিবীর সকল ধর্মকে সমান সত্য মনে করে। সব ধর্মেরই লক্ষ্য এক। নদীসমূহ যেমন এক সাগরে গিয়ে মিলিত হয়, তেমনি সকল ধর্মেরই লক্ষ্য এক-ঈশ্বরলাভ। তাই বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি।' তিনি আরো বলেন, 'খ্রিষ্টানকে হিন্দু বা বৌদ্ধ হতে হবে না; অথবা হিন্দু বা বৌদ্ধকে খ্রিষ্টান হতে হবে না; কিন্তু প্রত্যেক ধর্মই অন্যান্য ধর্মের ভাগগুলো গ্রহণ করে পুষ্টিলাভ করবে এবং নিজস্ব বিশেষত্ব বজায় রেখে নিজ প্রকৃতি অনুসারে বিকাশলাভ করবে।' বিবেকানন্দের এই বক্তৃতায় সবাই মুগ্ধ হন। ধর্মসভার বিচারে তিনি হন শ্রেষ্ঠ বক্তা।
বিবেকানন্দের বিপুল অধ্যাত্মশক্তি ও কর্মব্রতের মধ্য দিয়ে ভারতের আত্মা সেদিন জেগে উঠেছিল। দেশের ধর্মক্ষেত্রে ও সমাজজীবনে জেগেছিল এক নতুন প্রাণস্পন্দন। আত্মবিস্মৃত জাতি সেদিন দেশের সনাতন ধর্মজীবন থেকে প্রাণরস আহরণে প্রবৃত্ত হয়ে উঠেছিল। ভারতের অন্তর্নিহিত ঐক্যবোধ জাতীয় জীবনে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
পরিশেষে বলা যায়, ভারতবাসীর জীবন ও হিন্দুধর্ম প্রচারে স্বামী বিবেকানন্দের অবদান অনস্বীকার্য।
অন্যদিকে অসীম বাবু এমন এক বিশেষ সাধন পথ অবলম্বন করেন যেটাতে যম, নিয়ম, ধ্যানসহ মোট আটটি ধাপ অনুসরণ ও অনুশীলন করতে হয়।
অষ্টাঙ্গযোগের সর্বশেষ অঙ্গ হচ্ছে সমাধি। সমাধির মাধ্যমে পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলন ঘটে, সাধকের সাধনা শেষ হয়। অর্থাৎ ধ্যানের সর্বোচ্চ শিখরে উঠে সাধক সমাধি লাভ করেন। তখন মনশূন্য, বুদ্ধিশূন্য, অহংশূন্য হয়ে সাধকের সাথে পরমাত্মার মিলন ঘটে।
ধ্যান অর্থ নিরবচ্ছিন্ন গভীর চিন্তা। মন যদি নিরবচ্ছিন্নভাবে ঈশ্বরের চিন্তা করে তাহলে দীর্ঘ চিন্তনের পর অন্তিমে ঈশ্বরোপম হতে পারে। ধ্যানে যোগীর দেহ শ্বাস-প্রশ্বাস ইন্দ্রিয় মন বিচারশক্তি অহংকার সবকিছু ঈশ্বরে লীন হয়ে যায় এবং তিনি এমন এক সচেতন অতিন্দ্রীয় অবস্থায় চলে যান যা ব্যাখ্যা করা যায় না। তখন পরম আনন্দ ছাড়া তাঁর আর কোনো অনুভূতি হয় না। তিনি তাঁর আপন অন্তরের আলোও দেখতে পান।
উদ্দীপকে দেখা যায়, সুবোধ বাবু একজন যোগী। তিনি জগতের সমস্ত আসক্তি পরিত্যাগ করে এক নির্জন স্থানে বসে পরমাত্মার সাথে সংযোগ স্থাপনের প্রয়াস পান। তিনি জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে পরিত্রাণ লাভ করবেন বলে বিশ্বাস করেন, যা ধ্যানের সাথে মিল রয়েছে। তাই বলা যায়, সুবোধ বাবুর কর্মকাণ্ডে ধ্যান প্রতিফলিত হয়েছে।
অষ্টাঙ্গযোগ অনুসরণ ও অনুশীলনের মানুষের অশান্ত মন শান্ত হয় ও তার আত্মশক্তি বৃদ্ধি পায়। প্রমত্তা নদীতে বাঁধ দিয়ে, খাল খনন করে যখন তাকে সঠিকভাবে বশে আনা হয় তখন এক বিশাল জলাধারের সৃষ্টি হয়, সেই জলাধারের জলে ফসল ফলে, বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, মানুষের জীবন সুখ ও সমৃদ্ধিতে ভরে ওঠে। ঠিক তেমনি অষ্টাঙ্গযোগ পালন করে অশান্ত মনকে বশে আনতে পারা যায়, বিধায় শান্তির পারাবার সৃষ্টি হয়। আত্মোন্নয়নে অপরিমেয় শক্তি লাভ করা যায়।
অষ্টাঙ্গযোগ ধর্ম, আধ্যাত্ম, মানবতা এবং বিজ্ঞানের প্রতি ক্ষেত্রেই নিজেকে প্রয়োজনীয় রূপে প্রমাণ করেছে। পৃথিবী থেকে খুন, সংঘর্ষ যদি কোনো উপায়ে বন্ধ করতে হয়, তাহলে সেটা অষ্টাঙ্গযোগের মাধ্যমেই সম্ভব। যদি পৃথিবীর সব লোক বাস্তবে এই ব্যাপারটা নিয়ে একমত হয় যে, বিশ্বে শান্তি স্থাপিত হওয়া উচিত, তাহলে তার একমাত্র সমাধানই হচ্ছে অষ্টাঙ্গযোগের চর্চা। অষ্টাঙ্গযোগে জীবনের সাধারণ ব্যবহার থেকে শুরু করে ধ্যান এবং সমাধিসহ আধ্যাত্মের উচ্চতম অবস্থাগুলোর অনুপম সমাবেশ রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি নিজের অস্তিত্বের খোঁজ করে এবং জীবনের পূর্ণ সত্যের সঙ্গে পরিচিত হতে চায়, তাহলে তাঁর অষ্টাঙ্গযোগের পালন অবশ্যই করা উচিত।
অষ্টাঙ্গযোগ দ্বারাই ব্যক্তিগত এবং সামাজিক একতা, শারীরিক সুস্থতা, বৌদ্ধিক জাগরণ, মানসিক শান্তি এবং আত্মিক আনন্দের অনুভূতি হতে পারে।
সুভাস বাবু হিন্দুধর্মের বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন করে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে জানার চেষ্টা করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, তার নিজের এবং বিশ্বের সকল প্রাণীর মধ্যে একই চেতনা বিরাজমান।
অন্যদিকে সুফল বাবু ফলের আশা পরিত্যাগ করে সর্ব কর্মফল ঈশ্বরে সমর্পণ করেন। তিনি চিন্তা করেন সব কিছুই ঈশ্বরের। আমি শুধু তার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি মাত্র।
ঈশ্বর এ মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং সংহারকর্তা। অর্থাৎ ঈশ্বর যে তিনটি প্রধান ক্রিয়া সাধন করে থাকেন, তা হলো সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়। তিনি নিরাকার, আবার প্রয়োজনে সাকার রূপ ধারণ করেন। দেবদেবী ঈশ্বরের সাকার রূপ। ঈশ্বর নিজের কোনো গুণ বা ক্ষমতাকে কোনো বিশেষ আকার বা রূপে প্রকাশ করেন- যেমন ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, দুর্গা, সরস্বতী ইত্যাদি। এঁরা সকলেই ঈশ্বরের বিশেষ গুণ বা ক্ষমতা ধারণ করে রয়েছেন। ঈশ্বর যে-রূপে সৃষ্টি করেন তাঁর নাম ব্রহ্মা। তিনি বিশ্ব ও বিশ্বের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। বিশ্ব সৃষ্টি করা ছাড়াও ব্রহ্মা নাট্যশাস্ত্র, বাস্তুশাস্ত্র প্রভৃতি শাস্ত্রের উদ্ভাবক। তিনি কল্যাণমূলক কাজ করে থাকেন।
উদ্দীপকে পার্থ বাবু ঈশ্বরের এমন শক্তির পূজা করেন যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। এই শক্তি বাস্তুশাস্ত্রের উদ্ভাবক হিসেবেও পরিচিত। এসব গুণাবলি ব্রহ্মা দেবতার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই বলা যায়, পার্থ বাবু ব্রহ্মা দেবতার পূজা করেন।
উদ্দীপকে মৌমিতা দেবী ঈশ্বরের যে শক্তির পূজা করেন তিনি আমাদের সবাইকে পালন করেন। এই শক্তি বিভিন্ন সময়ে দেবতাদের বিপদমুক্ত করেন।
বিষ্ণু সৃষ্টির স্থিতি ও প্রতিপালনের দেবতা। এ বিশ্বে যা কিছু আছে বিষ্ণু তা পালন ও রক্ষা করেন। দেবতারা বিপদে পড়লে বিষ্ণু তাদের উদ্ধার করেন। দুষ্টকে দমন ও শিষ্টকে পালন করার জন্য তিনি বহুরূপে এ পৃথিবীতে অবতাররূপে আবির্ভূত হন। বিষ্ণুকে স্মরণ করলে পাপ দূরীভূত হয়, হৃদয় পবিত্র হয় ও মনে শান্তি আসে। গীতা অনুসারে বিষ্ণু স্বয়ং বলেন, "যে আমাকে স্মরণ করে, আমি তাকে মুক্তি দিই।” বিষ্ণু আশ্রয়ে আসা মানেই পাপ থেকে মুক্তির পথ ধরা। তিনি শুধু বাহ্যিক নয়, অন্তরাত্মার পাপও দূর করতে সক্ষম। তাই ভক্তরা বিশ্বাস করেন, শ্রীবিষ্ণুই চূড়ান্ত আশ্রয়, যিনি পাপ মোচন করে আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটান।
সুতরাং বলা যায়, মৌমিতা দেবী বিষ্ণু দেবতার পূজা করেন। এ দেবতা পাপ দূরীভূত করতে সক্ষম।
ধর্মের দশটি বাহ্য লক্ষণ (ধৃতি, ক্ষমা, দম, ধী, বিদ্যা, অক্রোধ, প্রভৃতি) যার মধ্যে প্রকাশ পায় বা যিনি ধর্মের ঐ দশটি লক্ষণ নিজের জীবনে চলার পথে অনুসরণ করেন তিনিই ধার্মিক। ধার্মিক ব্যক্তি বেদ, স্মৃতি, সদাচার ও বিবেকের আহ্বানকে প্রামাণ্য বলে মনে করেন। ধার্মিক ব্যক্তি কখনো ধৈর্য হারান না। তিনি ক্ষমতা থাকলেও ক্ষমা করেন। ক্ষমতার দম্ভ দ্বারা তিনি পরিচালিত হন না। তিনি সর্বাবস্থায় নিজেকে সংযত করতে পারেন। ধার্মিক ব্যক্তি ধীশক্তিসম্পন্ন। তার প্রজ্ঞা তাকে মহান করে তোলে। সকল কিছু বিচার করার অনন্যশক্তি দান করে। তিনি নানা বিদ্যায় পারদর্শী। ধী ও বিদ্যা তাঁকে চরিত্রের উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করে। ধার্মিক ব্যক্তি সত্যপ্রিয়।
তিনি কখনো সত্য থেকে দূরে সরে যান না। ধার্মিক ব্যক্তি সুখে-দুঃখে নিরুদ্বেগ থাকেন। আনন্দে অতি উদ্বেল হন না বা দুঃখে ভেঙে পড়েন না। দান ও দয়া ধার্মিকের দুটি প্রধান নৈতিক গুণ। ধার্মিক ব্যক্তি বিনয়ী। তিনি নিজেকে তৃণের চেয়েও নীচু মনে করেন। তিনি বৃক্ষের চেয়েও সহিষ্ণু হন। তিনি সমদর্শী।
উদ্দীপকে দেখা যায়, প্রদীপ বাবু সদা বিনয়ী। তিনি নিজেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মনে করেন। তার মধ্যে প্রচণ্ড সহিষ্ণুতা লক্ষ করা যায়। সবাইকে তিনি সমান চোখে দেখেন। যা ধার্মিকের কর্মকাণ্ডের সাথে মিল রয়েছে। তাই বলা যায়, প্রদীপ বাবুর মধ্যে ধার্মিকের স্বরূপ প্রকাশ পায়।
ধার্মিক সদা সন্তুষ্ট থাকেন। তিনি সদানন্দ, সদা হাস্যময় ও সদা প্রফুল্ল। প্রাপ্তি তাকে অহংকারী করে না ও অপ্রাপ্তি তাঁকে বিষণ্ণ করে না। তিনি তার ধর্মকে ঈশ্বরের কর্ম বলে বিবেচনা করেন এবং সকল কর্মের ফল ঈশ্বরকে সমর্পণ করেন। ধার্মিক ব্যক্তি ত্যাগ করে আনন্দ পান। সেবা করে তৃপ্ত হন। তার কর্ম জ্ঞান দ্বারা পরিদ্রুত এবং ভক্তি দ্বারা বিশোধিত। ধর্মগ্রন্থে আছে, ধার্মিক ইহলোকে শান্তি পান এবং পরলোকে তার স্বর্গ লাভ হয়। ধার্মিক ধার্মিকতার চরম অবস্থায় ব্রহ্ম লাভ করেন, তার জীবাত্মা পরমাত্মায় লীন হয়ে যায় এবং ধার্মিক মোক্ষ বা চিরমুক্তি লাভ করেন।
অন্যদিকে অধার্মিক সবসময় অতৃপ্ত থাকেন বলে সর্বদাই বিষণ্ণ থাকেন। কাম তাকে তাড়িত করে, ক্রোধ তাকে উত্তেজিত করে, লোভ, তাকে আকর্ষণ করে ও তার অধঃপতন ঘটায়। ইহলোকে তিনি কুকর্মে লিপ্ত থাকেন। কখনো কখনো কৃত কুকর্মের জন্য দণ্ডিত হন এবং দণ্ড ভোগ করেন। ধর্মশাস্ত্র অনুসারে কুকর্ম থেকে পাপ অর্জিত হয়। পাপ মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনে। পাপী নরকযন্ত্রণা ভোগ করেন। নরকযন্ত্রণা ভোগের পর আবার তাকে পৃথিবীতে এসে মানবেতর প্রাণীরূপে জন্মগ্রহণ করতে হয়। জন্ম-নরকযন্ত্রণা-মৃত্যুর চক্রে তিনি কেবল আবর্তিত হতে থাকেন।
পরিশেষে বলা যায়, প্রদীপ বাবুর কার্যকলাপের মাধ্যমে স্বর্গলাভ এবং অর্হিতার কার্যকলাপে নরক যন্ত্রণা ভোগ করবে।
দেব-দেবীরা হলেন ঈশ্বরের সাকার রূপ। ঈশ্বর এ মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং ধ্বংসকর্তা। তিনি নিরাকার, আবার প্রয়োজনে সাকার রূপও ধারণ করেন। ঈশ্বর যখন নিজের কোনো গুণ বা ক্ষমতাকে কোনো বিশেষ আকার বা রূপে প্রকাশ করেন তখন তাদেরকে দেব-দেবী বলা হয়। যেমন- ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, দুর্গা, সরস্বতী ইত্যাদি। সাকার বা প্রতীক উপাসনা বিভিন্ন দেব-দেবীকে খুশি করার জন্য করা হয়। এ সময় দেব-দেবীর মূর্তি তৈরি করে তার সামনে পূজা করা হয়।
উদ্দীপকে অবিনাশ বাবু একজন সাধু ব্যক্তি। তিনি বিভিন্নভাবে ঈশ্বরের কৃপালাভের চেষ্টা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন স্রষ্টার বিভিন্ন রূপ ও শক্তি দেহধারী হয়ে ভক্তের বোঝা বহন করেন, যা পাঠ্যবইয়ের সাকার উপাসনার সাথে মিল রয়েছে। তাই বলা যায়, অবিনাশ বাবু স্রষ্টার সাকার রূপের কৃপালাভের চেষ্টা করেছেন।
উদ্দীপকে সুলতা দেবী ঈশ্বরের অনুগ্রহ লাভের জন্য নিরাকার উপাসনা করেন।
উদ্দীপকে সুলতা দেবী ঈশ্বরের অনুকম্পা লাভের জন্য প্রতীক বা চিন্তাহীনভাবে ঈশ্বরের উপাসনা করেন। অর্থাৎ তিনি ঈশ্বরের নিরাকার উপাসনা করেন। 'নিরাকার' শব্দের অর্থ যার কোনো আকার নেই। মূলত এ ধরনের উপাসনা ধ্যানসাধনার মাধ্যমে করা হয়। জ্ঞানযোগ নিরাকার উপাসনার একটি অংশ। হিন্দুধর্মাবলম্বী কেউ নিরাকার, কেউবা সাকার উপাসনার মাধ্যমে ঈশ্বরকে পূজা বা আরাধনা করেন। এ সম্পর্কে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় উল্লেখ করেছেন –
যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্।
মম বৰ্ম্মানুবর্তন্তে মনুষ্যঃ পার্থ সর্বশঃ। (গীতা ৪/১১)
অর্থাৎ, যারা যেভাবে আমাকে ভজনা করে তাদের সেভাবেই আমি কৃপা করে থাকি। মনুষ্যগণ সর্বপ্রকারে আমার পথ অনুসরণ করে। দেবদেবীগণ একই ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপ। তাই হিন্দুধর্মের একের মধ্যে বহুর সমাবেশ বা বহুর মধ্যে একের অভিব্যক্তি ঘটেছে।
পরিশেষে বলা যায়, নিরাকার ঈশ্বরকে অদৃশ্য অবস্থায় উপলব্ধি করে তাঁর উপাসনা করা হয়।
মোক্ষলাভের পূর্ব পর্যন্ত বারবার জন্মগ্রহণ করে পৃথিবীতে আসতে হবে। ভোগ করতে হবে জন্ম, জরা ও মৃত্যুর যন্ত্রণা। আর মোক্ষলাভকরলে ব্রহ্ম বা পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মা মিশে যাবে। একেই বলে ব্রহ্মলগ্ন হওয়া। এরই অপর নাম মোক্ষলাভ।
সত্যযুগে দৈত্যদের রাজা ছিল হিরণ্যকশিপু। দৈত্যরা চিরকাল দেবতাদের প্রতি রুষ্ট ছিল। কিন্তু দেবতাবিদ্বেষী হিরণ্যকশিপুর ঘরেই জন্ম নিয়েছিলেন হরিভক্ত প্রহ্লাদ। দম্ভ ও কর্তৃত্বের জোরে হিরণ্যকশিপু নিজের হরিভক্ত পুত্রকে বারংবার মারতে উদ্যত হয়। কিন্তু সে এই পাপকার্যে সফল হয়নি। উদ্দীপকেও দেখা যায় বিত্তশালী ও শক্তিশালী রাজন নিজেকে সর্বময় ক্ষমতায় অধিকারী মনে করে। সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস নেই বলে সে হরিভক্ত আপনজনকে বারবার মারার চেষ্টা করে। কিন্তু এতে সে সফল হয়নি।
উদ্দীপকে নৃপেন বাবু ছিলেন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি নিজেকে অনেক বড়ো মনে করেন। ঈশ্বর বলতে তিনি কিছু বোঝেন না। তিনি মনে করেন নিজেই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু তার ছেলে সুকেশ ঈশ্বরভক্ত। সে ঈশ্বর ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। এতে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে মারতে চাইলেও সে বেঁচে যায়। যা হিরণ্যকশিপুর চরিত্রের সাথে মিল রয়েছে। তাই বলা যায়, হিরণ্যকশিপুর চরিত্রের সাথে নৃপেন বাবুর চরিত্রের মিল রয়েছে।
সত্যযুগে দৈত্যদের রাজা ছিল হিরণ্যকশিপু। দৈত্যরা চিরকাল দেবতাদের প্রতি রুষ্ট ছিল। কিন্তু দেবতাবিদ্বেষী দাম্ভিক হিরণ্যকশিপুর ঘরেই জন্ম নিয়েছিলেন হরিভক্ত প্রহ্লাদ। হরিনাম জপ ছাড়া সে কিছুই বোঝে না। তাই নিজের পুত্রের হরিপ্রেমে আকুলতা দেখে হিরণ্যকশিপু অনেক ক্ষিপ্ত হলো। পুত্রের মন থেকে হরিনাম দূর করার জন্য নানা রকম শাস্তির ব্যবস্থা করে। কিন্তু প্রহ্লাদের মন থেকে হরিনাম দূর করতে পারে না। প্রহ্লাদের মন হরিনামে পবিত্র ছিল। শ্রীহরিই সবসময় প্রহ্লাদকে রক্ষা করত। আর এর মূলে ছিল হরির প্রতি বিশ্বাস। বিশ্বাসই ধর্মের মূল। তাই তো শত চেষ্টা করার পর প্রহ্লাদকে হিরণ্যকশিপু হত্যা করতে পারেনি। ধার্মিকের জয় হয়েছে। ঈশ্বরের বিশ্বাস থাকলে ধর্মের জয় হয়। সাথে ধার্মিকেরও জয় হয়।
'ধর্মের জয়' উপাখ্যানের অনুরূপ ঘটনা উদ্দীপকের সুকেশের ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়। কারণ সেও ছিল ঈশ্বরভক্ত। এ কারণে তার বাবা তাকে মারতে চাইলেও সে বেঁচে যায়। তার বিশ্বাস ধর্মই ধার্মিককে রক্ষা করে। মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, ধর্ম নষ্ট হলে ধর্মই ধর্মনষ্টকারীকে বিনাশ করেন। আর ধর্ম রক্ষিত হলে ধর্মই ধার্মিককে রক্ষা করেন।
পরিশেষে বলা যায়, ধর্ম মানুষকে সঠিক পথে চলতে সহায়তা করে। এ কারণে ধর্মের জয় সবসময় হয়। অনেক ক্ষেত্রে সাময়িক বিপদে ধার্মিক কষ্ট পান কিন্তু পরিণামে ধর্ম এবং ধার্মিক জয় লাভ করে। যার দৃষ্টান্ত উদ্দীপকে ও 'ধর্মের জয়' উপাখ্যানে পরিলক্ষিত হয়।
উদ্দীপকে দেখা যায়, কৌশিক বাবু একজন চিকিৎসক। তিনি গরীব, দুঃস্থ ও অসহায় রোগীদের বিনামূল্যে অপারেশনসহ ঔষধপত্র বিতরণ করেন। ছুটির দিনগুলোতে তিনি গরীবদের মাঝে বস্ত্র দান করেন, যা মানবতা গুণের সাথে মিল রয়েছে। তাই বলা যায়, কৌশিক বাবুর মধ্যে মানবতা গুণের প্রতিফলন ঘটেছে।
তরণীসেন ছিলেন রাবণের ভাই বিভীষণের পুত্র। তিনি সৎসাহসের এক উজ্জ্বল প্রতিমূর্তি। রাম-লক্ষ্মণের সাথে রাক্ষস বাহিনীর যুদ্ধে রাক্ষস বাহিনীর বড়ো বড়ো বীর যোদ্ধা প্রাণ ত্যাগ করে। সোনার লঙ্কা পরিণত হয় শ্মশানে। এ অবস্থায় মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও দেশকে রক্ষার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে যান তরণীসেন। এ যুদ্ধে রামের বৈষ্ণব অস্ত্রে তরণীসেন মৃত্যুবরণ করেন। বস্তুত এভাবেই সৎসাহসের অধিকারী ব্যক্তি নিজের জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও দেশের মঙ্গলের জন্য প্রতিবাদ করেন।
উদ্দীপকে অনামিল বাবু পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে শত্রুপক্ষকে পরাজিত করেন। অনামিল বাবুর এ ঘটনার মাধ্যমে তরণীসেনের আদর্শ প্রকাশ পেয়েছে। তরনীসেন মাত্র বারো বছরের বালক হয়েও সৎসাহস দেখিয়েছেন। দেশ ও দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যুদ্ধ করেছেন। সুতরাং বলা যায়, অনামিল বাবু মাতৃভূমি রক্ষার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তরণীসেনের মতো সৎসাহসের পরিচয় দিয়েছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন কালীর সাধক। কালীমূর্তিতে তিনি পুজো দিতেন। এর মধ্য দিয়েই তিনি মায়ের সাধনা করতেন। তাই বলে মূর্তিপূজার বিরোধী ব্রাহ্মধর্মের সঙ্গে তাঁর কোনো বিরোধ ছিল না। ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম নেতা কেশবচন্দ্র সেনের সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর সম্পর্ক। কেশবচন্দ্রই প্রথম তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতা এবং তাঁর সম্পাদিত পত্রিকার মাধ্যমে রামকৃষ্ণদেবের কথা প্রচার করেন। এ থেকেই বোঝা যায় শ্রীরামকৃষ্ণ কতটা পরমতসহিষ্ণু ছিলেন। তাঁর সাধন-প্রণালি এবং ধর্মচর্চার মধ্য দিয়ে সর্বধর্ম সমন্বয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটা শ্রীরামকৃষ্ণের একটা বড়ো অবদান। শ্রীরামকৃষ্ণ মানুষের জাতি, কুল, মান, শিক্ষা, প্রতিপত্তি ইত্যাদি দেখতেন না। তিনি দেখতেন মানুষের অন্তর। তাই তাঁর কাছে উঁচু-নীচু সব শ্রেণির মানুষ আসত। তাইতো দক্ষিণেশ্বর মন্দির ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। শ্রীরামকৃষ্ণ সকল নারীর মধ্যে জগন্মাতাকে দর্শন করতেন। নারীমাত্রই তাঁর কাছে ছিল মাতৃস্বরূপা। তাইতো নিজের স্ত্রীকেও তিনি মাতৃজ্ঞানে পুজো করেছিলেন। জগতে এরূপ ঘটনা দ্বিতীয়টি আর নেই।
উদ্দীপকে দেখা যায়, আশুতোষ বাবু মা কালীর সাধক তিনি মানুষের জাতি, কুল, মান ইত্যাদি দেখতেন না। নারীদেরকে মাতৃজ্ঞানে পূজা করতেন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতিতে গভীর বিশ্বাসী ছিলেন। এসব কর্মকাণ্ডের সাথে শ্রীরামকৃষ্ণের কর্মকাণ্ডের মিল রয়েছে। তাই বলা যায়, আশুতোষ বাবুর সাধনপথ শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে মিল রয়েছে।
যে সকল ক্ষণজন্মা মনীষী তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য পৃথিবীতে অমর হয়ে আছেন তাদের মধ্যে শ্রীশঙ্করাচার্য অন্যতম। পণ্ডিতরা কোষ্ঠী দেখে তার স্বল্প আয়ুর কথা বললে তিনি ব্রহ্ম সাধনায় বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে ধর্মগুরু হিসেবে তিনি নতুন জীবন শুরু করেন। তিনি পুণ্যধাম বারাণসীতে আসেন এবং সেখানে ধর্ম প্রচার শুরু করেন। তার ধর্মের মূলকথা 'অদ্বৈতবাদ'। তিনি বলেন, 'ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা জীব ও ব্রহ্মে কোনো পার্থক্য নেই।'
শঙ্করাচার্য যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক জীবন যেমন বিপর্যস্ত ছিল, ধর্মীয় জীবনও তেমনি বিপর্যস্ত ছিল। জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে নানা কুসংস্কার ঢুকে পড়েছিল। হিন্দুধর্মও ম্লান হয়ে পড়েছিল। সমাজে বেদের কর্মকাণ্ড অর্থাৎ যাগ-যজ্ঞের প্রাধান্য বেড়ে গিয়েছিল। শঙ্কারচার্য তার অদ্বৈতমত প্রচার করে হিন্দুধর্মের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনেন। 'জীব ও ব্রহ্মের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই' এ কথা বলে তিনি মানুষের প্রতি মানুষের, এমনকি জীবের প্রতিও মানুষের ভালোবাসাকে জাগিয়ে তোলেন। এর ফলে জীবহিংসা কমে যায়। এটা শঙ্করাচার্যের একটা বড় অবদান। শুধু তা-ই নয়, তিনি যে ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্য ও বেদান্তভাষ্য রচনা করেছেন তা হিন্দু ধর্ম ও দর্শন চর্চার ক্ষেত্রে এক অসাধারণ অবদান। এছাড়া তিনি সাধারণ মানুষের জন্য মোহমুদগর, আনন্দলহরী, শিবস্তব, গোবিন্দাষ্টক প্রভৃতি গ্রন্থও রচনা করে গেছেন।
হিন্দুধর্মের সকল কিছুর মূলে ভগবান স্বয়ং অবস্থান করছেন। এছাড়া সকল বেদের মূলেও তিনিই অবস্থান করছেন। অর্থাৎ ঈশ্বর আছেন, তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তিনি সকল জীবের অন্তরাত্মা। সবকিছু তার থেকে সৃষ্ট, সুতরাং ঈশ্বরই ধর্মের মূল উৎস।
'নিরাকার' শব্দের অর্থ যার কোনো আকার নেই। মূলত এ ধরনের উপাসনা ধ্যান সাধনার মাধ্যমে করা হয়। জ্ঞানযোগ নিরাকার উপাসনার একটি অংশ। এ উপাসনা ঈশ্বরের কোনো প্রতিকৃতিকে উদ্দেশ্য করে করা হয় না। নিরাকাররূপে ঈশ্বর অদৃশ্য অবস্থায় অবস্থান করেন। তাঁকে উপলব্ধি করে তাঁর উপাসনা করা হয়। হিন্দুধর্মালম্বী কেউ নিরাকার, কেউবা সাকার উপাসনার মাধ্যমে ঈশ্বরকে পূজা বা আরাধনা করেন।
উদ্দীপকের সত্যেন বাবু সকাল-সন্ধ্যায় ঈশ্বর সাধনায় গভীরভাবে নিমগ্ন থাকেন। তিনি যে কাজ করেন তার কোনো ফলের আশা করেন না। সত্যেন বাবু কোনো দেব-দেবীর সামনে প্রার্থনা করেন না। তিনি শুধু ঈশ্বরের সাধনায় মগ্ন থেকে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করেন। তাই সত্যেন বাবুর উপাসনা পদ্ধতি নিরাকার।
উদ্দীপকে সত্যেন বাবু প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় ঈশ্বর আরাধনায় মগ্ন থাকেন। তিনি মনে করেন এটা ঈশ্বরের কর্ম, তিনি শুধু উপলক্ষ মাত্র। তিনি কোন দেব-দেবীর সামনে বসে আরাধনা করেন না। তিনি নিজের চিন্তায় মনে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করেন। তাই সত্যেন বাবুর উপাসনায় উপাসনার নিরাকার দিকটি ফুটে উঠেছে। অপরদিকে সুজয় বাবু প্রতিদিন গৃহে বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করেন। প্রার্থনার সময় তিনি সন্তানের মঙ্গলও কামনা করতেন। সুজয় বাবুর উপাসনায় সাকার উপাসনার প্রতিফলন ঘটেছে। সাকার উপাসনাকে প্রতীক উপাসনা বা সগুণ উপাসনা বা ভক্তিযোগ নামে পরিচিত। সগুণরূপে ঈশ্বর সাকাররূপে অবস্থান করেন। এ সময় তিনি প্রকৃতিতে প্রকাশিত। অপরদিকে, নিরাকার উপাসনায় ঈশ্বরের কোন প্রতিকৃতিকে উদ্দেশ্য করে করা হয় না। নিরাকার রূপে ঈশ্বর অদৃশ্যভাবে অবস্থান করেন। তাঁকে উপলব্ধি করে নিরাকার উপাসনা করা হয়। পরিবেশেষে বলা যায়, সত্যেন বাবু ও সুজয় বাবুর উপাসনার ধরন ভিন্ন। উভয়েই ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে ঈশ্বর আরাধনা করেন।
'হল' শব্দের অর্থ লাঙ্গল। এই আসনে দেহভঙ্গি অনেকটা হল অর্থাৎ লাঙ্গলের মতো দেখায় বলে একে হলাসন বলে। এ আসনটি অনুশীলনের সময় পা দুটো সোজা করে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়তে হবে। উরু, হাঁটু ও পায়ের পাতা জোড়া থাকবে। হাত দুটো সোজা করে শরীরের দু পাশে রাখতে হবে। এবার নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে পা দুটো জোড়া ও সোজা অবস্থায় আস্তে আস্তে উপরে তুলতে হবে এবং মাথার পেছনে যতদূর সম্ভব দূরে নিতে হবে যেন পায়ের আঙ্গুলগুলো মাটি স্পর্শ করতে পারে।
শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রেখে এই অবস্থায় ৩০ সেকেন্ড থাকতে হবে। এরপর আস্তে আস্তে পা নামিয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে হবে এবং শবাসনে ৩০ সেকেন্ড বিশ্রাম নিতে হবে। এভাবে আসনটি তিনবার অনুশীলন করতে হবে। এ আসনটি নিয়মিত অনুশীলন করলে মেরুদণ্ড সুস্থ ও নমনীয় থাকে। কোষ্ঠাবদ্ধতা, অজীর্ণ, পেট ফাঁপাসহ পেটের যাবতীয় রোগ দূর হয়। এগুলো ছাড়াও আসনটি অনুশীলনের আরো অনেক উপকারিতা রয়েছে।
গরুড়াসন নিয়মিত অনুশীলন করলে -
১. পায়ের ও হাতের গঠন সুন্দর হওয়ার সাথে সাথে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পায়।
২. পায়ে বাত হতে পারে না।
৩. পায়ের পেশিতে খিল ধরতে পারে না।
৪. উরু, নিতম্ব, পেট আর হাতের উপরের দিক মজবুত হয়।
৫. নিতম্ব, হাঁটু আর গোড়ালির গাঁটের নমনীয়তা বাড়ে।
৬. কাঁধ শক্ত হয়ে গিয়ে থাকলে তা ভালো হয়।
৭. বাঁকা মেরুদণ্ড সোজা হয়।
৮. ব্রহ্মচর্য রক্ষা করা সহজ হয়।
৯. দেহ লম্বা হয়।
১০. দেহের ভারসাম্য ঠিক থাকে।
১১. কিডনি ভালো থাকে।
অন্যদিকে সুনীতি দেবী একজন ধর্মপরায়ণা নারী। তিনি মানুষের দুঃখ দুর্দশায় সাহায্যের জন্য সবসময় এগিয়ে আসেন। কেউ যদি তার কাছে কিছু চাইতে আসে কখনো খালি হাতে তাকে ফিরিয়ে দেন না। তার কাছে যা কিছু থাকে তার সবটাই তিনি দিতে প্রস্তুত থাকেন।
উদ্দীপকের সুমন বাবু দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসেন। দেশের ক্রান্তিলগ্নে যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করেছেন। দেশের জন্য জীবন দিতেও তিনি সদা প্রস্তুত ছিলেন। তাই দেশের বিজয়ে তিনি গৌরবান্বিত বোধ করেন। সুমন বাবুর মধ্যে পাঠ্যবইয়ের তরণী সেন চরিত্রের সৎসাহসের দিকটি পরিলক্ষিত হয়। নিম্নে তা ব্যাখ্যা করা হলো-
তরণীসেন ছিলেন রাবণের ভাই বিভীষণের পুত্র। তিনি সৎসাহসের এক উজ্জ্বল প্রতিমূর্তি। রাম-লক্ষ্মণের সাথে রাক্ষস বাহিনীর যুদ্ধে রাক্ষস বাহিনীর বড়ো বড়ো বীর যোদ্ধা প্রাণ ত্যাগ করে। সোনার লঙ্কা পরিণত হয় শ্মশানে। এ অবস্থায় মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও দেশকে রক্ষার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে যান তরণীসেন। এ যুদ্ধে রামের বৈষ্ণব অস্ত্রে তরণীসেন মৃত্যুবরণ করেন। বস্তুত এভাবেই সৎসাহসের অধিকারী ব্যক্তি নিজের জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও দেশের মঙ্গলের জন্য প্রতিবাদ করেন।
উদ্দীপকের সুমন বাবুও তরণী সেনের মতো সৎসাহসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি প্রয়োজনে দেশের জন্য জীবন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও দেশের জন্য যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করেছেন। তাই বলা যায়, পাঠ্যবইয়ের তরণী সেনের মতো উদ্দীপকের সুমন বাবুর চরিত্রেও সৎসাহসের দিকটি পরিলক্ষিত হয়।
উদ্দীপকের সুনীতি দেবীর মধ্যে 'মানবতা' নামক নৈতিক গুনের প্রকাশ ঘটেছে। নিম্নে তা পাঠ্যপুস্তকের আলোকে বিশ্লেষণ করা হলো-
রন্তিবর্মা নামে এক প্রজাবৎসল ও কৃষ্ণভক্ত রাজা ছিলেন। তিনি শুধু রাজা ছিলেন না, ছিলেন রাজার রাজা, মহারাজা, সম্রাট। সম্রাট হয়েও রন্তিবর্মা পার্থিব বিষয়ের প্রতি আসক্ত নন। শ্রীকৃষ্ণের চরণকেই তিনি একমাত্র সম্পদ বলে জ্ঞান করেন। শ্রীকৃষ্ণে সবকিছু সমর্পণ করে তিনি একবার অযাচক বৃত্তি গ্রহণ করেন। অযাচক বৃত্তি হলো কারও কাছে কিছু চাওয়া যাবে না, লোকে ইচ্ছা করে বা দয়া করে যা দেবে তাই দিয়েই দিন যাপন করতে হবে। অযাচক বৃত্তি গ্রহণ করার পর একে একে আটচল্লিশ দিন কেটে গেছে। এই আটচল্লিশ দিনে কেউ তাঁকে কিছু দেয়নি। তিনিও খেতে চাননি। ঊনপঞ্চাশতম দিবসে একভক্ত তাকে একটি থালায় করে কিছু খাবার দিয়ে গেলেন। এবার তার উপবাস ভঙ্গ হবে। হঠাৎ তার সামনে একজন ভিক্ষুক উপস্থিত সাথে একটি কুকুর। উভয়ের শরীর খুবই কাহিল। দেখেই দেখেই বোঝা যাচ্ছে কতদিন কিছুই খায়নি। ক্ষুধার্ত লোকটির করুণ অবস্থা দেখে রাজা রন্তিবর্মার চোখে জল এলো। রাজা কিছুক্ষণ পূর্বে যে খাবার ভিক্ষা পেয়েছেন এর সবটাই ভিক্ষুক ও তার কুকুরটিকে দিয়ে দিলেন। এরই নাম মানবতাবোধ।
উদ্দীপকে দেখা যায়, সুনীতি দেবী একজন ধর্মপরায়ণা নারী। তিনি সবসময় মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় এগিয়ে আসেন। তার কাছে কেউ কিছু চাইতে এসে খালি হাতে ফিরে যায় না কখনো। তার কাছে যা থাকে তার সবটাই তিনি দিতে প্রস্তুত থাকেন। সুনীতি দেবীর এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি মানবতার দৃষ্টান্তস্বরূপ।
পরিশেষে বলা যায়, পাঠ্যবইয়ের রন্তিবর্মার মতো মানবতাবোধের প্রকাশ ঘটেছে সুনীতি দেবীর চরিত্রেও।
উদ্দীপকের সৈকত বাবুর মধ্যে বিবেকানন্দ চরিত্রের নারী স্বাধীনতার দিকটি ফুটে উঠেছে। নিম্নে তা ব্যাখ্যা করা হলো-
বিবেকানন্দ নারী-স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। আর এজন্য নারীশিক্ষাকে তিনি সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করতেন। বৈদিক যুগের মৈত্রেয়ী, গার্গী প্রমুখ বিদুষী নারীর উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, সেই যুগে নারীরা যদি এত শিক্ষালাভ করতে পারে, তাহলে এ যুগের নারীরাও পারবে। তাঁর মতে, যে জাতি নারীদের সম্মান দেয় না, সে জাতি কখনো বড় হতে পারে না। নারীদের অবস্থার উন্নতি না করে বিশ্বের মঙ্গলসাধন করা সম্ভম্ব নয়। কোনো পাখি একটি ডানা দিয়ে উড়তে পারে না। এমনকি আধ্যাত্ম সাধনায় নারীরা যাতে সুযোগ পায় এবং এগিয়ে আসে তার জন্য তিনি সারদাদেবীর পরিচালনায় নারীদের জন্য একটি মঠ প্রতিষ্ঠারও পরিকল্পনা করেছিলেন।
উদ্দীপক থেকে দেখতে পাই, সৈকত বাবু কয়েকটি গার্লস স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। নারীরা যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে এবং সাবলীলভাবে চলাফেরা করতে পারে তার জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, স্বামী বিবেকানন্দ নারী শিক্ষা সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করতেন এবং তার জন্য তিনি আজীবন কাজ করে গিয়েছেন। তাই সৈকত বাবুর মধ্যেও নারী স্বাধীনতার গুণটি বিবেকানন্দর মতো ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপকের শৌর্য বাবুর কাজটি জীবসেবার পরিচায়ক। নিম্নে স্বামী বিবেকানন্দের অমর বাণীর আলোকে শৌর্য বাবুর কাজটির যথার্থতা মূল্যায়ন করা হলো-
বিবেকানন্দের গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো- খালি পেটে ধর্ম হয় না। তাই সবার আগে মানুষের দারিদ্র্য ঘোচাতে হবে। স্বামী বিবেকানন্দ সত্য ধর্ম সম্পর্কে বলেছেন। তিনি বলেছেন, ঈশ্বরসেবার আগে তাঁর সৃষ্ট জীবের সেবা করতে হবে। জীবসেবা করলেই ঈশ্বরসেবা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন-
'বহুরূপে সম্মুখে তোমার? ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর?
জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর ॥'
তাঁর কাছে জাতি-বর্ণের কোনো ভেদাভেদ ছিল না। সবাই সমান তাঁর কাছে। এই জীবসেবাই ছিল বিবেকানন্দের ঈশ্বরসেবার মূল মন্ত্র।
উদ্দীপকের শৌর্য বাবু প্রতিটি জীবকে ভালোবাসেন। তিনি মনে করেন এর মধ্য দিয়েই ঈশ্বরের সান্নিধ্য পাওয়া সম্ভব। স্বামী বিবেকানন্দের বাণী থেকেও আমরা দেখতে পাই, তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বরের সৃষ্টি জীবের সেবা করা মানেই পক্ষান্তরে ঈশ্বরেরই সেবা করা। জীবসেবাই ঈশ্বর সেবার মূলমন্ত্র। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের শৌর্য বাবু স্বামী বিবেকানন্দের ঈশ্বর সেবার মূলমন্ত্রের মাধ্যমেই জীবন অতিবাহিত করেছেন।
দৃশ্যকল্প-২ : সমর রায়ের ছেলে প্রান্তিক রায় ছোটবেলা থেকেই ঈশ্বরের
আরাধনা করে। কিন্তু সমর রায়ের চাওয়া ছেলে তাকে কাজ-কর্মে সাহায্য করুক। তবে কোনো ভাবেই তার ছেলে তাকে কোনো কাজেই সাহায্য করে না। বরং সে আরও বেশি করে ঈশ্বর সাধনায় নিজেকে যুক্ত করে। সমর রায় প্রান্তিক রায়কে ঈশ্বর সাধনা থেকে দূরে রাখতে না পেরে তাকে নানাভাবে হত্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি তাকে হত্যা করতে পারেন না।
মূল্যবোধ লক্ষ করা যায়। নিম্নে এর মাধ্যমে কিভাবে পরিবার ও সমাজ উপকৃত হতে পারে তা পাঠ্যবইয়ের আলোকে ব্যাখ্যা করা হলো-
সৎকর্ম আর ধর্ম দ্বারা উদ্বুদ্ধ। তার এই আচরণিক মূল্যবোধ দ্বারা সমাজ ও পরিবার উপকৃত হতে পারে। সত্য ও ন্যায়ের পথই ধর্মের পথ। সত্যকে কখনও ধ্বংস করা যায় না। আবার যিনি সত্যাশ্রয়ী তার ক্ষতিও করা যায় না। তিনি পরিবার ও সমাজের মঙ্গলই করেন। অসত্য আর অন্যায় পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করে। দিয়ার এই কর্ম ও আচরণগুলো পরিবার ও সমাজের অনুকরণীয় ও শিক্ষণীয়। যারা এই
মূল্যবোধ বিশ্বাসী তারাই মূলত সমাজের, সমাজস্থিত মানুষের, পরিবারের প্রকৃত কল্যাণ সাধন করেন।
উদ্দীপকে দিয়ার চরিত্রে আমরা নৈতিক মূল্যবোধের স্পষ্ট প্রতিকলন ও সৎকর্মের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখতে পাই।
ঘটনা-২ : সজীব মহন্ত পেশায় একজন শিক্ষক। একদিন বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে রাস্তার ধারে রক্তাক্ত অবস্থায় একটি বিড়াল পড়ে থাকতে দেখলেন। এটা দেখে তিনি বিড়ালটিকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেন।
ঘটনা-১ এ দেখতে পাই, কুমার বাবু একজন নিষ্ঠাবান পুরোহিত। তিনি প্রতিদিন শ্রীকৃষ্ণের মূর্তির সামনে বসে প্রার্থনা করেন। এ ধরনের উপাসনা ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, সরস্বতী, মনসা প্রভৃতি দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে করা হয়। সগুণরূপে ঈশ্বর সাকাররূপে অবস্থান করেন। এই সময় তিনি প্রতিকৃতিতে প্রকাশিত। সাকার উপাসনা পদ্ধতি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করার বহুল ব্যবহৃত উপাসনা পদ্ধতি।
ঘটনা-২ এর সজীব মহন্ত বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে রক্তাক্ত বিড়ালকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে হসপিটালে নিয়ে যায়। সজীব মহন্তর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে হিন্দু ধর্মের জীবসেবা বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ঘটেছে। নিচে তা বিশ্লেষণ করা হলো।
সাধারণ অর্থে 'সেবা' বলতে পরিচর্যা করা বোঝায়। যেমন- অতিথি সেবা, জীবসেবা, ঈশ্বর সেবা প্রভৃতি। অপরের সন্তোষ বিধানের জন্য দেহ ও মনের সমন্বয়ে কল্যাণকর যে কাজ করা হয় তাকে সেবা বলে। জীবসেবা বলতে জীবের পরিচর্যা, সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি করাকে বোঝায়। এ ছাড়াও বুদ্ধি দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে, সহানুভূতি জানিয়ে, বিপদে পাশে দাঁড়িয়ে নানাভাবে সেবা করা যায়। আমরা জীবের সেবা করব কেন? আমরা জানি, ঈশ্বর জীবাত্মারূপে জীবের মধ্যে অবস্থান করেন। তাই জীবসেবা করলে ঈশ্বরকে সেবা করা হয়।
জীবের সেবা করা হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান ব্রত হিসেবে বিবেচিত। 'যত্র জীবঃ তত্র শিবঃ'। অর্থাৎ যেখানে জীব সেখানেই শিব। এখানে শিব বলতে ঈশ্বরের কথাই বোঝানো হয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন :
'বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর
জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।'
এ কথার তাৎপর্য এই যে, বহুরূপে অর্থাৎ বহুজীবরূপে ঈশ্বর আমাদের সম্মুখেই আছেন। তাই তাঁকে খুঁজে বেড়ানোর দরকার নেই। যিনি জীবকে ভালোবাসেন, তিনি সেই সেবার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সেবা করেন। তাই হিন্দুধর্মে জীবকে ঈশ্বর বা ব্রহ্মজ্ঞানে সেবা করতে বলা হয়েছে। কারণ জীবকে সেবা করলেই ঈশ্বরের সেবা করা হয়।
সুতরাং ঈশ্বর জ্ঞানে জীবসেবা হিন্দুধর্মের একটি মূল বৈশিষ্ট্য এবং অন্যতম নৈতিক শিক্ষা।
ঘটনা-২ : রামনগর গ্রামে কয়েক প্রহরব্যাপী একটি ধর্মানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে নানা সুর, তাল ও ছন্দে কীর্তন পরিবেশন করা হয়। ভগবানের নাম শ্রবণের জন্য ভক্তরা দূর-দূরান্ত থেকে সেখানে এসে মিলিত হয়।
অর্ধকূর্মাসন অনুশীলন করলে শরীর অনেক শিথিল হয়, মেরুদণ্ড সতেজ হয়, পেটের অভ্যন্তরীণ অংশগুলো সবল ও সক্রিয় হয়। আসনকারী অনেক বেশি প্রাণশক্তি ও সুস্বাস্থ্য লাভ করে। মস্তিষ্ক শান্ত হয়। যকৃৎ ভালো থাকে। অজীর্ণ, অম্বল, ক্ষুধামান্দ্য, কোষ্ঠকাঠিন্য, আমাশয় ইত্যাদি দূর হয়। হজমশক্তি বাড়ে। পেটে বায়ু থাকলে তার প্রকোপ কমে। হাঁপানি ও ডায়াবেটিসের উপকার হয়। পায়ের পেশির ব্যথা ও হাড়ের বাত সারে। কাঁধের পেশির ব্যথা ভালো হয়। পেটের ও নিতম্বের চর্বি কমে। পেট ও উরুর পেশি সবল হয়।
অর্ধকূর্মাসনের কারণে শরীর সুস্থ ও সবল থাকে। শারীরিক সুস্থতার কারণে মানসিক শান্তিও বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া এই আসন অনুশীলনে মন অনেক ধীর, স্থির ও শান্ত হয় এবং ব্যক্তি সুখ ও দুঃখ সমানভাবে গ্রহণ করার উপযোগিতা অর্জন করে। এ আসন অনুশীলনের মধ্য দিয়ে আসনকারী আস্তে আস্তে দুঃখ-যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয়, ভোগ-বিলাসের প্রতি উদাসীন হয়।
উপরের আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, মানসিক শান্তি ও শারীরিক সুস্থতার জন্য অর্ধকূর্মাসনের সঠিক অনুশীলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমাজের খারাপ অবস্থা দেখে খুবই কষ্ট পান। তিনি নিজ এলাকা ঘুরে ঘুরে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেন এবং সমস্যা নিরসন ও এলাকার উন্নয়নের জন্য মানুষকে ধর্মপথে চলতে অনুপ্রাণিত করেন। মানবধর্মে বিশ্বাসী এই যুবক সকল ধর্মের সমন্বয়ে সমাজে শান্তি স্থাপনে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি হিন্দু ধর্মের প্রচারের জন্য আমেরিকার এক সেমিনারে যোগ দেন।
ঘটনা-২ : মানিক ব্যানার্জি ছোট বেলায় মাঝে মাঝে প্রকৃতির বিভিন্ন রূপ দেখে ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়তেন। স্কুলের পড়ালেখায় তাঁর মন বসে না। তার মন পড়ে থাকে ভজন কীর্তন ও পূজা পার্বনে। তিনি মাঝে মাঝে নির্জন জায়গায় ভাবাবিষ্ট হয়ে থাকেন। এক সময় তিনি দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে মায়ের পূজায় মন সপে দেন।
এজন্য তাকে বলা হয় 'ভারতীয় শল্যবিদ্যার জনক'।
উদ্দীপকে বিধান রায়ের সাথে পাঠ্যবইয়ের যে মহাপুরুষের মিল পাওয়া যায় তাঁর নাম হলো স্বামী বিবেকানন্দ। নিম্নে তা ব্যাখ্যা করা
হলো-
স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৬৩ সালের ১২ই জানুয়ারি কলকাতার জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা বিশ্বনাথ দত্ত এবং মাতা ভুবনেশ্বরী দেবী।
বিবেকানন্দের প্রকৃত নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত।
নরেন্দ্রনাথ ১৮৮৪ সনে বিএ পাস করেন। তারপর তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট দীক্ষা নেন। তখন তার নাম হয় বিবেকানন্দ। বিবেকানন্দ গৃহত্যাগ করে সারা ভারতবর্ষ ঘুরলেন এবং নিজের চোখে ভারতবাসীর দুরবস্থা দেখলেন। কীভাবে এ দেশ থেকে দেশবাসীকে উদ্ধার করা যায়, সে কথাও চিন্তা করতে লাগলেন। ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে বিবেকানন্দ আমেরিকা যান এবং শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্বধর্ম সম্মেলনে বক্তৃতা
দেন। তিনি হিন্দু-ধর্ম-দর্শন, বিশেষত বেদান্ত দর্শন ও মানবধর্ম সম্পর্কে একের পর এক বক্তৃতা দিয়ে আমেরিকা জয় করেন।
প্রায় চার বছর পর বিবেকানন্দ ১৮৯৭ সালে দেশে ফিরে আসেন। এবং সমস্ত অন্যায় ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। তার কাছে কোনো জাতিভেদ ছিল না। তিনি বললেন- নীচ জাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর সকলেই আমাদের ভাই। বিবেকানন্দ নারী শিক্ষাকে সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করতেন। তাঁর মতে, যে জাতি নারীদের সম্মান দেয় না, সে জাতি কখনো বড় হতে পারে না। তিনি দেশের উন্নতির জন্য শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের কথাও ভাবতেন। সমাজের দরিদ্রের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার এবং খাদ্যের অভাব পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি সতীদাহ প্রথা এবং বাল্যবিবাহের ঘোর বিরোধী ছিলেন।
এভাবে স্বামী বিবেকানন্দ ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি সমাজ সংস্কার এবং দেশের উন্নয়নের কথাও ভেবেছেন।
গদাধরের অল্প বয়সে তাঁর পিতার মৃত্যুর হয়। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর জীবনে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসে। তিনি কখনো শ্মশানে গিয়ে বসে থাকেন। কখনো বা নির্জন বাগানে গিয়ে সময় কাটান। সাধু-বৈষ্ণবদের দেখলে কৌতূহল ভরে তাঁদের আচরণ লক্ষ করেন। তাঁদের নিকট ভজন শেখেন। এ অবস্থায় অগ্রজ রামকুমার তাঁকে কোলকাতা নিয়ে যান। সেখানে ঝামাপুকুরে অবস্থিত নিজের টোলে তাঁকে ভর্তি করিয়ে দেন। কিন্তু গদাধরের মনের কোনো পরিবর্তন হয় না। আগের মতোই লেখাপড়ায় তিনি উদাসীন থাকেন।
এমন সময় রানি রাসমণি প্রতিষ্ঠিত কালী মন্দিরের পুরোহিত হিসেবে রামকুমার দক্ষিণেশ্বরে আসেন। গদাধরও তাঁর সঙ্গে আসেন। মা-কালীর বিগ্রহ এবং পূজার্চনা দেখে তিনি খুবই আনন্দিত হন। তিনি যেন এতদিন এমন একটা কিছুই চেয়েছিলেন। তাই কখনও তিনি মায়ের মন্দিরে ভাবতন্ময় হয়ে থাকেন, কখনও বা আত্মমগ্ন অবস্থায় গঙ্গার তীরে ঘুরে বেড়ান।
হঠাৎ একদিন অগ্রজ রামকুমারের অকালমৃত্যু হয়। ফলে মায়ের পূজার ভার পড়ে গদাধরের ওপর। মনেপ্রাণে তিনি মায়ের পূজা আরম্ভকরেন। মায়ের পূজায় ভক্তিগীতি গাওয়ার সময় প্রায়ই তিনি অচেতন হয়ে পড়তেন। কালক্রমে এখানেই কালীসাধনায় তাঁর সিদ্ধিলাভ ঘটে।
তিনি স্ত্রী সারদা দেবীকে আধ্যাত্মিক জ্ঞান দান করেন, যা অচিরেই তাঁকে 'আধ্যাতিক জননী' পদে উন্নীত করে। এভাবে গদাধর সর্বত্র চৈতন্যরূপিনী দেবীর দর্শন লাভ করেন।
এরপর গদাধরের সাধন জীবনে আসেন সন্ন্যাসী তোতাপুরী। তিনি গদাধরকে বেদান্ত সাধনায় দীক্ষিত করেন এবং তান্ত্রিক সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন।
পরিশেষে বলা যায়, মানিক ব্যানার্জীও ছোটবেলা থেকে ভাব তন্ময় হয়ে থাকতেন। পরবর্তীতে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে মায়ের পূজায় মন সপে দেন। তাই মানিক ব্যানার্জীর মধ্যে রামকৃষ্ণের প্রভাব লক্ষণীয়।