দৃশ্য-১: বিংশ শতকের ষাটের দশকের শেষ দিকে পূর্ব-বাংলার সাধারণ জনগণ তাদের দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় নামে। এই আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক শহিদ হন।
দৃশ্য-২:
ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নাম তমদ্দুন মজলিস।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ তমদ্দুন মজলিস নামক একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে।
৬-৭ই সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত উক্ত সংগঠনের যুবকর্মী সম্মেলনে 'বাংলাকে শিক্ষা ও আইন আদালতের বাহন' করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ১৫ই সেপ্টেম্বর এই সংগঠন 'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু' নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। এ সময়ে তমদ্দুন মজলিস ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে।
উদ্দীপকের দৃশ্য-১ এ নির্দেশিত ঐতিহাসিক আন্দোলনটি হলো ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করে। এ বৈষম্যের প্রতিবাদ এবং বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা উত্থাপন করেন। পাকিস্তানি শাসকেরা এ দাবিকে মেনে নেয়নি। তাদের অব্যাহত দমন নিপীড়ন বাঙালিকে আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেয়। যার ফলস্বরূপ সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণে ১৯৬৯ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন সংঘটিত হয়। যা ইতিহাসে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত। এ আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদুজ্জামান আসাদ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা শহিদ হন।
উদ্দীপকের দৃশ্য-১ এ বলা হয়েছে, বিংশ শতকের ষাটের দশকের শেষ দিকে পূর্ব-বাংলার সাধারণ জনগণ তাদের দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় নামে। এই আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক শহিদ হন। এরূপ বর্ণনায় স্পষ্টভাবে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। এ আন্দোলনের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। স্বাধিকার আন্দোলনের তাৎক্ষণিক সাফল্য ছিল আগরতলা মামলা প্রত্যাহার এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ রাজবন্দিদের মুক্তিলাভ। তাছাড়া এ আন্দোলনের ফলে লৌহমানব খ্যাত সামরিক শাসক আইয়ুব খান পদত্যাগে বাধ্য হন। তার পদত্যাগের ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে জাতীয় ঐক্য আরো সুদৃঢ় হয়। এ পর্যায়ে তারা চূড়ান্ত লক্ষ্যার্জনের পথে অগ্রসর হতে থাকে।
উদ্দীপকের দৃশ্য-২ এ পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য প্রকাশ পেয়েছে। এ বৈষম্যের প্রেক্ষিতে ৬ দফা কর্মসূচি উত্থাপিত হয়েছিল- মন্তব্যটি যথার্থ।
৬ দফাকে পূর্ব বাংলার মুক্তির সনদ বলা হয়। পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের চরম বৈষম্যমূলক আচরণ ও অবহেলার বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম সুস্পষ্ট রূপ লাভ করে ৬ দফার স্বায়ত্তশাসনের দাবিনামায়। ১৯৬৬ সালের ৫-৬ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলসমূহের এক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার রক্ষায় এটি তুলে ধরেন।
উদ্দীপকের দৃশ্য-২ এ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার সামরিক বৈষম্য প্রকাশ পেয়েছে। স্থল বাহিনীতে কর্মরত অফিসারের শতকরা হার ছিল পূর্ব পাকিস্তানে ১.৩ ভাগ এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল ৯৮.৭ ভাগ। নৌবাহিনীতে কর্মরত অফিসারের শতকরা হার ছিল পূর্ব পাকিস্তানে ১.১ ভাগ এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ৯৮.৯ ভাগ। এছাড়া বিমান বাহিনীতে কর্মরত অফিসারের শতকরা হার ছিল পূর্ব পাকিস্তানে .০৫ ভাগ এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ৯৯.৯৫ ভাগ। এরূপ চিত্র থেকে দেখা যায়, সামরিক বা প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের পিছিয়ে থাকার কিংবা বৈষম্য তৎকালীন সময়ে পূর্ব পাকিস্তানকে পিছিয়ে রাখে। ফলশ্রুতিতে পূর্ব পাকিস্তান ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। তাছাড়া ১৯৬৫ সালে সংঘটিত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিল। এ বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে ছয় দফা দাবির একটি দাবিতে অঙ্গরাজ্যগুলোকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য আধা সামরিক বাহিনী গঠন করার ক্ষমতা দেয়ার দাবি উত্থাপন করা হয়।
আলোচনা শেষে বলা যায়, সামরিক বা প্রতিরক্ষা বাহিনীতে বৈষম্যসহ পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি সকল ধরনের বৈষম্য দূর করে এ অঞ্চলে স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা দাবি পেশ করেছিলেন।
ঘটনা-২: আন্দোলন ও সফলতার যোগসূত্র শীর্ষক আলোচনা সভায় জনাব কামাল বলেন, একটা সময় আমাদের জনপ্রিয় এক নেতার বিরুদ্ধে দেশের বিপক্ষে ষড়যন্ত্র করছেন। আবার পরবর্তী বছরে এর বিরুদ্ধে সৃষ্ট আন্দোলনে সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক নিহত হন। যার ফলে আমাদের দেশ আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে এগিয়ে যায়।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে মুক্তিযুদ্ধের চরিত্র দানে বিশাল ভূমিকা রাখায় ১৯৭০ সালের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বের দাবিদার।
১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল পাকিস্তানে সর্বজনীন ভোটে অনুষ্ঠিত প্রথম ও শেষ সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভকরে। এ ফলাফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিজয় ঘটে। পরাজয় ঘটে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর। কিন্তু তারা বাঙালির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ষড়যন্ত্র শুরু করে। এর প্রতিবাদে বাঙালি যে আন্দোলন শুরু করে তার চূড়ান্ত পর্যায়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। কার্যত সত্তরের নির্বাচনের পথ ধরেই বাঙালি লাভ করে স্বাধীনতা। এসব কারণেই ১৯৭০ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
রফিকের বাবার কথায় আমার পাঠ্যপুস্তকের ৬ দফা দাবির সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
৬ দফাকে পূর্ব বাংলার মুক্তির সনদ বলা হয়। পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের চরম বৈষম্যমূলক আচরণ ও অবহেলার বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম সুস্পষ্ট রূপ লাভ করে ৬ দফার স্বায়ত্তশাসনের দাবিনামায়। ১৯৬৬ সালের ৫-৬ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলসমূহের এক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার রক্ষায় এটি তুলে ধরেন।
উদ্দীপকের রফিক তার বাবার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়াতে যায়। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীরে লেখা কতকগুলো দাবি দেখতে পায়। বাবা রফিককে বলেন আমাদের 'ক' নামক একজন নেতা রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় কতকগুলো দাবি তৎকালীন শাসক বর্গের নিকট উত্থাপন করেছিলেন। এরূপ বর্ণনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক উত্থাপিত ছয় দফা দাবির সাদৃশ্য পাওয়া যায়। কেননা, এ দাবির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কতিপয় রাজনৈতিক দাবি তুলে ধরে যা পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
জনাব কামালের আলোচনায় যে দুটি বিষয়ের ইঙ্গিত রয়েছে তা হলো ১৯৬৮ সালের আগরতলা মামলা এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান। আমাদের দেশের আত্মপ্রকাশে এ দুটি ঘটনার ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা মামলা দায়ের করে এবং তাদের গ্রেপ্তার করে। মামলা শুরু হওয়ার পরই তা প্রত্যাহারের জন্য এদেশের ছাত্র, কৃষক-শ্রমিকসহ অন্যান্য পেশাজীবী লোকেরা তীব্র আন্দোলন শুরু করে। ১৯৬৯ সালে সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণের ফলে আন্দোলন বিপ্লবাত্মক রূপ ধারণ করে, যা উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নামে অভিহিত।
উদ্দীপকের ঘটনা-২ এ জনাব কামাল বলেন, একসময় আমাদের দেশের জনপ্রিয় নেতার বিরুদ্ধে শাসকবর্গ দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ করে। পরবর্তী বছরে এর বিরুদ্ধে সৃষ্ট আন্দোলনে সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক নিহত হন। ফলে আমাদের দেশ আত্মপ্রকাশের দিকে এগিয়ে যায়। পূর্বোক্ত আলোচনায় সুস্পষ্ট যে, উদ্দীপকের ঘটনা আগরতলা মামলা এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোনের ইতিহাসে আগরতলা মামলার প্রেক্ষিতে সৃষ্ট ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। এ আন্দোলনের তাৎক্ষণিক সাফল্য ছিল আগরতলা মামলা প্রত্যাহার এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ রাজবন্দিদের মুক্তিলাভ। এছাড়া এ আন্দোলনের ফলেই সামরিক শাসক আইয়ুব খান পদত্যাগে বাধ্য হন। তার পদত্যাগের ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে জাতীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় হয়। এ পর্যায়ে তারা চূড়ান্ত লক্ষ্য স্বাধীনতা অর্জনের পথে অগ্রসর হতে থাকে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট প্রদানের মাধ্যমে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় এবং তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ মহান মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করে। যার মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
উপরের আলোচনার পরিসমাপ্তিতে বলা যায়, আগরতলা মামলার ফলে সৃষ্ট ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পথ ধরেই জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। এ কারণে প্রশ্নোক্ত বক্তব্যটি যথার্থ।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট একচেটিয়া ভোট পেয়ে বিজয় অর্জন করে। এ কারণে এটিকে 'ব্যালট বিপ্লব' বলা হয়।
প্রাদেশিক আইনসভা নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসনেই বিজয় লাভ করে। আর ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসন লাভ করে। মুসলিম লীগের কুশাসন ও শোষণে জর্জরিত পূর্ব বাংলার জনগণের পুঞ্জীভূত বেদনা ও আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ ছিল যুক্তফ্রন্টের এ বিশাল বিজয়। এ কারণেই যুক্তফ্রন্টের বিজয়কে 'ব্যালট বিপ্লব' বলে আখ্যায়িত করা হয়।
আসামের মতো বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া আন্দোলনটি হলো ভাষা আন্দোলন যেটি ১৯৫২ সালে সংঘঠিত হয়।
দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মুখের ভাষা বাংলা হলেও ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে, উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এ ঘোষণা পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী জনগণকে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ করে তোলে। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাঙালিরা ভাষা আন্দোলন শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে এ আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। ১৯৫২ সালের ৩১শে জানুয়ারি কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে নতুনভাবে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ফলে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। পরিষদের নেতারা ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভমিছিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেদিন ছাত্র-জনতা মিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মিছিল বের করে এবং এক পর্যায়ে পুলিশ মিছিলে গুলি করে। এতে সালাম, বরকত, জব্বার, রফিকসহ অনেকে শহিদ হন।
উদ্দীপকে, ১৯৬১ সালে আসামের শিলচর শহরে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবির আন্দোলনে এক তরুণীসহ ১১ জন নিহত হয়। তাদের আন্দোলনের দরুন বাংলাভাষা শুধু আসামেই নয় পশ্চিমবঙ্গেরও প্রধান ভাষা এবং ভারতবর্ষের প্রধান ৫টি ভাষার একটি হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পায়। এরূপ বর্ণনায় স্পষ্টভাবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চিত্র প্রকাশ পায়। এ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১৯৪৭সালে এবং শেষ হয় ১৯৫২ সালে।
উদ্দীপকের ঘটনাটি তথা ভাষা আন্দোলনই ছিল বাঙালির মুক্তির প্রথম আন্দোলন। মন্তব্যটি যথার্থ।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে শুধু ধর্মের কারণে পাকিস্তান ও ভারত রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলিম হলেও তারা পশ্চিমাদের বৈষম্য ও অবহেলার শিকার হতে থাকে। বাঙালিরা ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম সোচ্চার হয়। প্রকৃতপক্ষে ভাষা আন্দোলন প্রাথমিক পর্যায়ে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে পরিচালিত হলেও ক্রমান্বয়ে তা রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে। ভাষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এর সঙ্গে যুক্ত হয়। ভাষা আন্দোলন এভাবে ক্রমশ বাঙালি জাতিকে জাতীয়তাবোধে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।
উদ্দীপকের আসামের ঘটনায় বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি প্রকাশ পেয়েছে। এ ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদ জাগিয়ে তুলতে ভূমিকা রাখে। কারণ ভাষা আন্দোলনের ফলে সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি পূর্ব বাংলার বাঙালির মোহ দ্রুত কেটে যেতে থাকে। নিজস্ব জাতিসত্তা সৃষ্টিতে ভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্ব তাদের কাছে অধিকতর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাঙালিরা আত্মপরিচয়ের ভিত্তিতে নিজস্ব অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি গড়ে তোলার গুরুত্ব উপলব্ধি করে। ঐ আন্দোলন পরবর্তীকালে বাঙালির সব রাজনৈতিক আন্দোলনের পিছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। সেই সাথে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে প্রথমে স্বায়ত্তশাসন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে পরিচালিত করে।
উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতিকে তাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। আর এই ঐক্য ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বাঙালির মধ্যে একাত্মতা সৃষ্টি করে তাদের স্বাধীনতা এনে দেয়।
ঘটনা-২: 'T' দেশের দু'টি অঞ্চলের মধ্যে ইতোপূর্বে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এতে কর্তৃপক্ষের প্রতি জনগণের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে একটি শংকাও কাজ করছিল। অবশেষে "এক ব্যক্তির এক ভোটের ভিত্তিতে" একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলা ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতিগত পরিচয়ে যে জাতীয় ঐক্য গঠিত হয় তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদ।
অর্থাৎ ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি পূর্বাপর ঘটনার মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে আমাদের মধ্যে যে জাতীয় চেতনার জন্ম হয়, তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বাঙালি জাতীয়তাবাদ মূলত বাঙালি জাতির ঐক্যের প্রতীক।
ঘটনা-১ এ উল্লিখিত বিষয়টি আমার পাঠ্যবইয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ঘটনাকে ইঙ্গিত করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর সম্মতিতে বিপ্লবী পরিষদের পরিকল্পনা ছিল একটি নির্দিষ্ট রাতে বাঙালিরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সবকয়টি ক্যান্টনমেন্টে কমান্ডো স্টাইলে হামলা চালিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাদের বন্দি করবে এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করবে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের ব্যাপারে একবার বঙ্গবন্ধু ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় গিয়েছিলেন। কিন্তু পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হওয়ার পূর্বেই ফাঁস হয়ে গেলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা দায়ের করে।
উদ্দীপকের ঘটনা-১ এ স্বাধীনতাকামী একজন জননেতা তাঁর জন্মভূমিকে স্বাধীন করার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে একটি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। শাসকগোষ্ঠী জানতে পেরে তাঁকে প্রধান আসামীসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এ বক্তব্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সাদৃশ্য পাওয়া যায়। আগরতলা মামলায় বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় এবং তাদের বন্দি করা হয়। শাসকগোষ্ঠী বন্দিদের সামরিক আদালতে বিচারকার্য শুরু করলে পূর্ব বাংলার জনগণ মামলা প্রত্যাহারের জন্য আন্দোলন শুরু করে। কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ সর্বাত্মক আন্দোলনে শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুসহ অন্য রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
ঘটনা-২ এ ১৯৭০ সালের নির্বাচনটি প্রকাশ পেয়েছে। এ নির্বাচনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশেষভাবে ভূমিকা রেখেছিল। মন্তব্যটি যথার্থ।
১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভকরে, যা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিজয়।
উদ্দীপকের ঘটনা-২ এ 'T' দেশের দু'টি অঞ্চলের মধ্যে ইতোপূর্বে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এতে কর্তৃপক্ষের প্রতি জনগণের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে একটি শংকাও কাজ করছিল। অবশেষে "এক ব্যক্তির এক ভোটের ভিত্তিতে" একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরূপ বর্ণনায় ১৯৭০ সালের পাকিস্তান সাধারণ পরিষদের নির্বাচনের সাদৃশ্য পাওয়া যায়। কেননা, ১৯৬৯ সালের ২৫শে মার্চ আইয়ুব খানের পদত্যাগের পর ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর সর্বপ্রথম এক ব্যক্তির এক ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনকে ৬ দফার পক্ষে গণভোট হিসেবে অভিহিত করে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাকিস্তানি সরকার ও স্বার্থান্বেষী মহলের জন্য এক বিরাট পরাজয় ডেকে আনে। তারা বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরোধিতা ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে থাকে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেয়। এই নির্বাচন বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে মুক্তিযুদ্ধের দিকে বহুদূর এগিয়ে দেয়।
অতএব উপরিউক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, ইতিহাসের পরিক্রমায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনের হাত ধরে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ জন্মলাভ করে।
১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণ, দমননীতি, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত বৈষম্য, বাংলা ভাষার অবমাননাসহ বিভিন্ন কারণে মুসলিম লীগের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষ আস্থাহীন হয়ে ওঠে। এমতাবস্থায় ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন, অগণতান্ত্রিক ও দুর্নীতিপরায়ণ মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম এবং গণতন্ত্রী দল এই ৪টি দল নিয়ে ১৯৫৩ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়।
উদ্দীপকে উল্লিখিত 'E' অঞ্চলের জনগণের অধিকার আদায়ের দাবির সাথে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবির সাদৃশ্য রয়েছে।
৬ দফাকে পূর্ব বাংলার মুক্তির সনদ বলা হয়। পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের চরম বৈষম্যমূলক আচরণ ও অবহেলার বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম সুস্পষ্ট রূপ লাভ করে ৬ দফার স্বায়ত্তশাসনের দাবিনামায়। ১৯৬৬ সালের ৫-৬ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলসমূহের এক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার রক্ষায় এটি তুলে ধরেন।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে, একটি দেশের দু'টি অঞ্চলের মধ্যে 'E' নামক অঞ্চলটি সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিল। এটিকে সুরক্ষার জন্য ঐ অঞ্চলের গণমানুষের নেতা কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের নিকট কিছু অধিকার আদায়ের দাবি উত্থাপন করেন। যা 'E' অঞ্চলের জনগণের সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল। এরূপ বর্ণনায় ছয়দফা দাবির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই কেন্দ্রীয় সরকার তথা পশ্চিম পাকিস্তান বিভিন্ন সময় নানা অজুহাতে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে চরম বৈষম্যমূলক আচরণ ও অবহেলা শুরু করে। যার প্রথম আঘাত আসে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে। রাজপথে রক্তের বিনিময়ে ১৯৫২ সালে বাঙালিরা ভাষার দাবি আদায় করে। এর পথ ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ৫-৬ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলের সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রাণের দাবি ঐতিহাসিক ৬ দফা পেশ করেন।
'E' অঞ্চলের স্বাধীনতার পক্ষে তথা পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার পক্ষে উক্ত দাবিসমূহ তথা ছয় দফা দাবিসমূহ বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। মন্তব্যটি যথার্থ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রেক্ষাপটে যতগুলো আন্দোলন বাঙালিকে উজ্জীবিত করেছিল এর মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফা ভিত্তিক আন্দোলন। এই কর্মসূচি বাঙালির চেতনামু লে বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতার কথা বলা না হলেও এ কর্মসূচি বাঙালিদের স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে। এটিকে তাই বাঙালির মুক্তিসনদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
উদ্দীপকে ছয় দফার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা ঘোষিত হলে পূর্ব বাংলার মানুষ সেই দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। এ আন্দোলন স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। এ আন্দোলন ১৯৬৯ সালে সামরিক শাসন বিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আর এরই ফলে ত্বরান্বিত হয় স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পদত্যাগ এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকরা বিজয়ী প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বাঙালিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী এদেশে নির্মম গণহত্যা চালায়। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং শুরু হয় রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। প্রায় নয় মাস যুদ্ধের পর বাঙালি স্বাধীনতা অর্জন করে।
উপরিউক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, ৬ দফা দাবি বাঙালি জাতিকে স্বাধীকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ করে, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতা অর্জনের ভিত্তি রচনা করে।
ঘটনা-ক : ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধে একটি বিশেষ শ্রেণির মানুষের অবদান অপরিসীম। মুক্তিবাহিনীর অনিয়মিত শাখার এক বিরাট অংশ ছিল এই শ্রেণির মানুষ।
ঘটনা-খ : বিবিসি এবং ইউরোপের একটি দেশের অন্যান্য সংবাদ মাধ্যম ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংবাদ পরিবেশন করে। বিশেষ করে ওই দেশের একজন সংগীত শিল্পী কনসার্টের আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত তৈরি করার পাশাপাশি অর্থ সংগ্রহ করেন।
স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী দলকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার হীন উদ্দেশ্যেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তা মূলত 'অপারেশন সার্চলাইট' পরিচালনা করেছিল।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা না দিয়ে পাকিস্তানি শাসকরা টালবাহানা শুরু করে। তারা আলোচনার নামে সময় নষ্ট করে ২৫শে মার্চ রাতে অতর্কিতভাবে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর বর্বরোচিত সামরিক অভিযান চালিয়ে স্বাধীনতার দাবিকে চিরতরে ডুবিয়ে দিতে চেয়েছিল।
ঘটনা-খ-এ যুক্তরাজ্যের অবদানের কথা বলা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বিবিসি নিরপেক্ষ সংবাদ প্রচার করে বাংলাদেশের গণহত্যা ও মুক্তিসংগ্রামের কথা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে। ব্রিটিশ জনমত বাংলাদেশের পক্ষে গড়ে ওঠে। একই সময়ে জর্জ হ্যারিসন ও রবিশঙ্করের উদ্যোগে নিউইয়র্কে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠিত হলেও ব্রিটিশ গণমাধ্যম ও জনগণ ত্রাণ সংগ্রহ ও আন্তর্জাতিক জনমত সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বব্যাপী সমর্থন লাভ করে।
উদ্দীপকের ঘটনা-ক তে বর্ণিত গোষ্ঠীটি হলো এদেশের 'ছাত্রসমাজ', যাদের মহান আত্মত্যাগ ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ব্যতীত বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করা সত্যিই অত্যন্ত কঠিন হতো।
পাকিস্তানের চব্বিশ বছরের ইতিহাসে বাঙালিদের অধিকার আদায়ের প্রতিটি সংগ্রামেই ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল অবিস্মরণীয়।
উদ্দীপকের ঘটনা-ক তে বলা হয়েছে, একটি বিশেষ শ্রেণির মানুষ স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সকল আন্দোলনে এবং মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখে। মুক্তিবাহিনীর অনিয়মিত শাখার বিরাট অংশ ছিল তারা। এই বৈশিষ্ট্যগুলো সরাসরি আমাদের বীর ছাত্রসমাজের আত্মত্যাগের দিকেই ইঙ্গিত করে, যারা স্কুল-কলেজ ছেড়ে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ও স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে ছাত্ররাই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি। মুক্তিযুদ্ধে তাদের বিপুল অংশগ্রহণ, গেরিলা আক্রমণ ও অকাতরে প্রাণ বিসর্জন যুদ্ধের গতিকে ত্বরান্বিত করেছিল। ছাত্রসমাজের এই সংঘবদ্ধ শক্তি ও অমিত তেজ ছাড়া পাকিস্তানি সুসজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে দ্রুত বিজয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব হতো না। তাই উদ্দীপকের মন্তব্যটি সম্পূর্ণ যথার্থ।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান নিজের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে যে পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি চালু করেন, তা-ই মৌলিক গণতন্ত্র নামে পরিচিত।
মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মোট ৮০ হাজার নির্বাচিত ইউনিয়ন কাউন্সিল সদস্য নিয়ে নির্বাচকমণ্ডলী গঠন করার কথা বলা হয়। তাদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিধান রাখা হয়। এটি ছিল পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি মূলক ব্যবস্থা।
'ক' ছকের নামগুলো ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িত।
পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পরই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে পূর্ববাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয় তা ১৯৫২ সালে চূড়ান্ত আন্দোলনে রূপ লাভ করে। ১৯৫২ সালের ২৬শে জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর অনুকরণে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার নতুন ঘোষণা প্রদান করেন-এর প্রতিবাদে ছাত্রসমাজ ৩০ জানুয়ারি ধর্মঘট পালন করে। আব্দুল মতিনকে আহ্বায়ক করে 'রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' গঠিত হয়। ৩১শে জানুয়ারি কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে নতুনভাবে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হলে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। ছাত্ররা তাদের সিদ্ধান্তে অনঢ় থাকে। মিছিলে পুলিশ গুলি বর্ষণ করলে আবুল বরকত, আব্দুল জব্বার, রফিকউদ্দিন আহমেদ, আব্দুস সালামসহ আরও অনেকে শহিদ হন। ২২শে ফেব্রুয়ারি আবার শফিউর রহমান শহিদ হন। ফলে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
উদ্দীপকে 'ক' ছকে শফিউর রহমান ও রফিকউদ্দীন আহমেদ-এর নাম মূলত ৫২-এর ভাষা শহিদদের নাম। তাই 'ক' দ্বারা ভাষা আন্দোলন বোঝানো হয়েছে।
উদ্দীপকে 'খ' ছকের বর্ণিত আন্দোলনটি ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চায় যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ছকের 'খ'-তে উল্লিখিত নূর হোসেন এবং ডা. সামসুল আলম মিলন যেহেতু ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে শহিদ হয়েছেন, তাই তাদের নাম দ্বারা এ আন্দোলনকেই নির্দেশ করা হয়েছে। শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম আন্দোলন শুরু হয় ১৯৮২ সালে। পরবর্তীতে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে রাজনৈতিক দলগুলো বদ্ধমুল ধারণা লাভ করে যে, জেনারেল হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসন আমলে কোনো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই ১৯৮৭ সালে ৮ দল, ৭ দল ও ৫ দল জেনারেল এরশাদের পদ ত্যাগের এক দফা দাবিতে একমত পোষণ করে এবং সকল জোট ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করে। তিন জোটের হরতাল এবং ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির ফলে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর নূর হোসেন এবং ২৭শে নভেম্বর ডা. সামসুল আলম মিলন নিহত হন। ফলে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ফলে ১৯৯০-এর ৪ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদ ত্যাগের ঘোষণা দেন, যার ফল শ্রুতিতে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা শুরু হয়।
তাই বলা যায়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আমরা দেশের স্বার্থ রক্ষায় সচেতন হব। কারণ আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধারা এদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ও দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য তাদের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। অনেকে তাদের জীবনকে উৎসর্গ করে আমাদের এই প্রিয় স্বাধীন মাতৃভূমি উপহার দেন।
সুতরাং আমাদের উচিত তাদের এ মহান আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে দেশের স্বার্থ রক্ষায় সচেতন হওয়া। কারণ দেশের স্বার্থ, সঠিকভাবে রক্ষিত হলে আমাদেরই স্বার্থ রক্ষিত হবে।
উদ্দীপকে উল্লিখিত জোটটি পাঠ্যবইয়ের যুক্তফ্রন্ট ধারণাকে নির্দেশ করে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার। গঠনের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। এছাড়া প্রাদেশিক সরকার নিয়ে, কেন্দ্রীয় সরকারের টালবাহানা পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করে। তাই প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে। শোচনীয় পরাজয় ঘটানোর লক্ষ্যে ১৯৫৩ সালের ১৪ই নভেম্বর পাঁচটি দল মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। দল পাঁচটি হলো- আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম, খেলাফতে রব্বানী এবং গণতন্ত্রী দল। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনি প্রতিকী ছিল নৌকা। যুক্তফ্রন্ট ২১ দফা দাবি পেশ করে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ব্যাপকভাবে জয়লাভকরে। পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের ২৩৭ টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩ টি আসন লাভ করে। নির্বাচিত দল সরকার গঠন করে মাত্র ৫৬ দিন ক্ষমতায় ছিল।
তাই দেখা যাচ্ছে, 'খ' অঞ্চলের রাজনৈতিক জোটটি মূলত পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট।
উদ্দীপকে উল্লিখিত আন্দোলনটি হলো- ভাষা আন্দোলন। এই ভাষা আন্দোলন পরবর্তীকালে সকল রাজনৈতিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা। জুগিয়েছিল বলে আমি বিশ্বাস করি।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভাষা প্রশ্নে পূর্ব বাংলার মানুষদের মধ্যে যে আন্দোলন ১৯৪৭ এ শুরু হয়ে ১৯৫২ সালে এসে পূর্ণতা পায়, তা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের কে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে। বৈষম্যহীন সমাজ প্রত্যাশায় পাকিস্তানের প্রতি আগে যে মোহ ছিল তা দ্রুত কেটে যেতে থাকে। নিজস্ব জাতিসত্তা সৃষ্টিতে ভাষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রেও নিজেদের স্বকীয় আত্মপরিচয় উপলব্ধি করতে শুরু করে। ভাষা আন্দোলনের ফলে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে পূর্ব বাংলার বাঙালিরা মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস ও আত্মপ্রত্যয় খুঁজে পায়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর পঞ্চাশের দশকব্যাপী ছিল বাঙালিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতিকাল। ভাষা আন্দোলন পরবর্তী সকল রাজনৈতিক আন্দোলন, যেমন- ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন এবং ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ তথা প্রত্যেকটি আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় ছিল। এককথায় এ আন্দোলন মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। বাঙালিদের মধ্যে ঐক্য ও স্বাধীনতার চেতনা জাগিয়ে তোলে।
ফলে দেখা যায়, সকল রাজনৈতিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণার কেন্দ্রে ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান নিজের ক্ষমতা ও সামরিক শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে ১৯৫৮ সালে যে বিশেষ ব্যবস্থা চালু করেন তাই মৌলিক গণতন্ত্র নামে পরিচিত।
১৯৫৮ সালের ২৭শে অক্টোবর ক্ষমতা দখলের পর প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান 'মৌলক গণতন্ত্র' নামে একটি পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি চালু করেন। এ পদ্ধতিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচিত ৮০ হাজার ইউনিয়ন কাউন্সিল সদস্য নিয়ে নির্বাচকমণ্ডলী গঠন করা হয়। এ ব্যবস্থায় প্রাপ্তবয়স্ক সর্বস্তরের জনগণের পরিবর্তে শুধু তাদের ভোটেই প্রেসিডেন্ট, জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নির্বাচিত করার বিধান করা হয়।
ছকের 'খ' দ্বারা ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
ছয় দফা দাবি ছিল বাঙালি জাতির মুক্তিসনদ। পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক আচরণ যখন চরমে ওঠে, ঠিক তখনই বাঙালিদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। ১৯৬৬ সালের ৫-৬ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর এক সম্মেলনে যোগ দেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন।
উদ্দীপকের 'খ' ঘটনাটি সংঘটিত হয় ১৯৬৬ সালে যা ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনকে ইঙ্গিত করে। কেননা বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবীতে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবী পেশ করেন। যার প্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক আন্দোলনের সূচনা হয়।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশে 'ক' দ্বারা নির্দেশিত আন্দোলন তথা ভাষা আন্দোলনের ভূমিকা ছিল অনন্য।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে শুধু ধর্মের কারণে পাকিস্তান ও ভারত রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলিম হলেও তারা পশ্চিমাদের বৈষম্য ও অবহেলার শিকার হতে থাকে। বাঙালিরা ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম সোচ্চার হয়। প্রকৃতপক্ষে ভাষা আন্দোলন প্রাথমিক পর্যায়ে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে পরিচালিত হলেও ক্রমান্বয়ে তা রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে। ভাষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এর সঙ্গে যুক্ত হয়। ভাষা আন্দোলন এভাবে ক্রমশ বাঙালি জাতিকে জাতীয়তাবোধে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।
উদ্দীপকের 'ক' চিহ্নিত ঘটনাটি ১৯৫২ সালে সংঘটিত হয় যেটি ভাষা আন্দোলনকে নির্দেশ করে। ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতিসত্তার জাগরুক শক্তি। কেননা, ভাষা আন্দোলনের ফলে সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি পূর্ব বাংলার বাঙালির মোহ দ্রুত কেটে যেতে থাকে। নিজস্ব জাতিসত্তা সৃষ্টিতে ভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্ব তাদের কাছে অধিকতর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাঙালিরা আত্মপরিচয়ের ভিত্তিতে নিজস্ব অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি গড়ে তোলার গুরুত্ব উপলব্ধি করে। এভাবে ভাষাকেন্দ্রিক এ আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচিত হয়, যা পরবর্তীতে বাঙালিদের মধ্যে স্বাধীনতার বীজ জাগিয়ে তোলে। ঐ আন্দোলন পরবর্তীকালে বাঙালির সব রাজনৈতিক আন্দোলনের পিছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
সেই সাথে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে প্রথমে স্বায়ত্তশাসন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে পরিচালিত করে।
উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতিকে তাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। আর এই ঐক্য বিভিন্ন পর্ব পার হয়ে তাদের স্বাধীনতা এনে দেয়।
জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালের ২৭শে অক্টোবর ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর নিজের ক্ষমতা ও সামরিক শাসনকে দীঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে 'মৌলিক গণতন্ত্র' (বেসিক ডেমোক্রেসি) নামে একটি পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি চালু করেন। এই পদ্ধতিতে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচিত ৮০ হাজার ইউনিয়ন কাউন্সিল (বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ) সদস্য নিয়ে নির্বাচকমণ্ডলী গঠন করা হবে। আর তাদের ভোটেই প্রেসিডেন্ট এবং জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সকল সদস্য নির্বাচিত হবেন।
উদ্দীপকের ১ম অংশে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিফলন ঘটেছে।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি মারাত্মক বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের দিকটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে পূর্ব বাংলার চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তান অনেক বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করেছিল।
উদ্দীপকের A ও B একটি দেশের দুটি অঞ্চল। কিন্তু দেশ শাসনের ক্ষেত্রে A অঞ্চলের মানুষের প্রাধান্য বেশি। বাজেটে B অঞ্চরের জন্য মোট বরাদ্দের চারভাগের এক ভাগ রাখা হতো। এরূপ বর্ণনায় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকাশ পেয়েছে। পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে পূর্ব বাংলার চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তান অনেক বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করেছিল।
১৯৫৫-১৯৫৬ থেকে ১৯৫৯-১৯৬০ অর্থবছর পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান লাভ করেছিল মোট বাজেট বরাদ্দের মাত্র ১১৩ কোটি ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা, অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তান পেয়েছিল ৫০০ কোটি টাকা। একইভাবে ১৯৬০-৬১ থেকে ১৯৬৪-৬৫ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬৪৮ কোটি টাকা আর পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তা ছিল ২২,২৩০ কোটি টাকা। পূর্ব বাংলার পাট, চা, চামড়া প্রভৃতি বিদেশে রপ্তানি করে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো, তার সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় হতো। ফলে ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন, কৃষিসহ অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের চাইতে কয়েকগুণ পিছিয়ে পড়ে।
উদ্দীপকের ২য় অংশে আগরতলা মামলা প্রতিফলিত হয়েছে। এই মামলা ও তৎপরবর্তী আন্দোলনের প্রভাবে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর সম্মতিতে বিপ্লবী পরিষদের পরিকল্পনা ছিল একটি নির্দিষ্ট রাতে বাঙালিরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সবকয়টি ক্যান্টনমেন্টে কমান্ডো স্টাইলে হামলা চালিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাদের বন্দি করবে এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেেশর স্বাধীনতা ঘোষণা করবে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের ব্যাপারে একবার বঙ্গবন্ধু ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় গিয়েছিলেন। কিন্তু পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হওয়ার পূর্বেই ফাঁস হয়ে গেলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা দায়ের করে।
উদ্দীপকের ২য় অংশে বলা হয়েছে, 'B' অঞ্চলের একজন নেতা তার অঞ্চলের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি কিছু পরিকল্পনা হাতে নেন। ফলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু 'B' অঞ্চলের মানুষের তীব্র আন্দোলনের মুখে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এখানে মূলত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট। কেননা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এমনই একটা পরিকল্পনা করেন যা পরবর্তীতে ফাঁস হয়ে যায়। ফলে বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় এবং তাদের বন্দি করা হয়। শাসকগোষ্ঠী বন্দিদের সামরিক আদালতে বিচার কার্য শুরু করলে পূর্ব বাংলার জনগণ মামলা প্রত্যাহারের জন্য আন্দোলন শুরু করে। কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ সর্বাত্মক আন্দোলনে শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুসহ অন্য রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ঐতিহাসিক আগরতলা মামলার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা এবং ছাত্রদের ১১ দফার ভিত্তিতে যে গণআন্দোলন সৃষ্টি হয় তাই ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তরে ষড়যন্ত্র করলে বাঙালিরা মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
দৃশ্যপট-১: দশম শ্রেণির ছাত্রী রীমা টিভিতে নাটক দেখছিল। নাটকে একটি মেডিকেল কলেজের দিক থেকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে একটি মিছিল এগিয়ে আসতে দেখা যায়, হঠাৎ পুলিশ মিছিলের ওপর আক্রমণ চালায়। এতে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়।
দৃশ্যপট-২: রীমার দাদা রীমাকে একটি নির্বাচনের কথা বলেন। নির্বাচনটিতে একটি দল বিপুল ভোটে জয়লাভ করার পরও ক্ষমতাসীন সরকার দলটির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে টালবাহানা শুরু করে।
রীমার দেখা নাটকের ঘটনাটি আমার পাঠ্যপুস্তকের ভাষা আন্দোলনের ঘটনাকে ইঙ্গিত করেছে।
বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাঙালিরা ভাষা আন্দোলন শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে এ আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। ১৯৫২ সালের ৩১শে জানুয়ারি কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে নতুনভাবে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ফলে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। পরিষদের নেতারা ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ মিছিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেদিন ছাত্র-জনতা মিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মিছিল বের করে এবং এক পর্যায়ে পুলিশ মিছিলে গুলি করে। এতে সালাম, বরকত, জব্বার, রফিকসহ অনেকে শহিদ হন।
উদ্দীপকের দশম শ্রেণির ছাত্রী রীমা টিভিতে নাটক দেখছিল। নাটকে একটি মেডিকেল কলেজের দিক থেকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে একটি মিছিল এগিয়ে আসতে দেখা যায়, হঠাৎ পুলিশ মিছিলের উপর আক্রমণ চালায়। এতে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়। এরূপ বর্ণনায় স্পষ্টভাবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সাদৃশ্য পাওয়া যায়। কেননা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে মিছিল বের করলে পুলিশ তাতে গুলি চালায় এবং অনেকে শহিদ হন যেটি উদ্দীপকে স্পষ্ট। সুতরাং এখানে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে চিত্র প্রকাশ পেয়েছে।
দৃশ্যপট-২ এর নির্বাচনটি ১৯৭০ সালের নির্বাচনকে নির্দেশ করে। এ নির্বাচন পরবর্তীতে জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনাকে আরও বেগবান করে। মন্তব্যটি যথার্থ।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সামরিক শাসক আইয়ুব খানের পতনের পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি এক ঘোষণায় পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি দেন। আর এ নির্বাচনই বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ভূমিকা পালন করে।
উদ্দীকের দৃশ্যপট-২ এর রীমার দাদা রীমাকে একটি নির্বাচনের কথা বলেন। নির্বাচনটিতে একটি দল বিপুল ভোটে জয়লাভ করার পরও ক্ষমতাসীন সরকার দলটির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে টালবাহানা শুরু করে। এখানে ১৯৭০ সালের পাকিস্তান সাধারণ পরিষদের নির্বাচনের বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনকে বাংলাদেশ সৃষ্টির মূল প্রণোদনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর সর্বপ্রথম এক ব্যক্তির এক ভোটের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ফলে ৬ দফা ও ১১ দফার প্রতি জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মূলত এ নির্বাচনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিজয় ঘটে। অপরদিকে এটি ছিল পাকিস্তানের স্বার্থান্বেষী সরকারের জন্য বিরাট পরাজয়। শাসকগোষ্ঠী নির্বাচনে বিজয়ী বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিরোধিতা এবং ষড়যন্ত্র করতে থাকে। যার প্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠী পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এবং এর ফলাফল হিসেবে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, ১৯৭০ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ব্যাপক প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে। আর এ কারণেই আমি প্রশ্নের বক্তব্যকে যথার্থ বলে মনে করি।
৬ দফা হলো ৬টি দাবী সংবলিত একটি ঐতিহাসিক দাবী যেটি ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে উত্থাপন করেন।
১৯৬৬ সালের ৫-৬ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলসমূহের এক সম্মেলনে যোগদান করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য ৬ দফা দাবি তুলে ধরেন। এর রাজস্ব সংক্রান্ত দফাটি হলো- সকল প্রকার কর ধার্য করার ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। আঞ্চলিক সরকারের আদায়কৃত রাজস্বের একটা নির্দিষ্ট অংশ কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। এই দফাটির মাধ্যমে মূলত পূর্ব-পাকিস্তানের অর্থনৈতিক মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়।
ঘটনা- দ্বারা ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনকে নির্দেশ করা হয়েছে।
নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ১৯৫৪ সালের ৩০মে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করে পাকিস্তানি প্রশাসন। পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক সামরিক-বেসামরিক শাসকগোষ্ঠীর অশুভ তৎপরতার ফলে সংসদ ও সরকার কার্যকর ভূমিকায় থাকেনি। ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী ক্ষমতা দখলের সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদে পরস্পরবিরোধী এমএলএদের মধ্যে মারামারির মতো এক অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। এতে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী গুরুতর আহত হয়ে পরে হাসপাতালে মারা যান। এরই সুযোগ নিয়ে ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা সামরিক আইন জারি করেন। উদ্দীপকের Y ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হলেন ইস্কান্দার মির্জা এবং আইয়ুব খান। এই দুইজন ব্যক্তি ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন জারি এবং তৎপরবর্তী শাসনামলের ঘটনার সাথে জড়িত। প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সামরিক শাসনের প্রতিষ্ঠাকারী হলেও ১৯৫৮ সালের ২৭শে অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান ইস্কান্দার মীর্জাকে উৎখাত ও দেশত্যাগে বাধ্য করে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি নিজেকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত করেন। সামরিক শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র নামে একটি ব্যবস্থা চালু করেন। সামরিক শাসনের ফলে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের হাতে। পূর্ব পাকিস্তানের সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য চরম আকার ধারণ করতে থাকে।
উদ্দীপকের ঘটনা X ও Z দ্বারা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানকে নির্দেশ করা হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরণাদায়ক শক্তি হিসেবে এ দুটি ঘটনার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।
বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাঙালিরা ভাষা আন্দোলন শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে এ আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। ১৯৫২ সালের ৩১শে জানুয়ারি কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে নতুনভাবে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ফলে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। পরিষদের নেতারা ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ মিছিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেদিন ছাত্র-জনতা মিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মিছিল বের করে এবং এক পর্যায়ে পুলিশ মিছিলে গুলি করে। এতে সালাম, বরকত, জব্বার, রফিকসহ অনেকে শহিদ হন। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলন বানচাল করতে ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা মামলা দায়ের করে তাদের বন্দি করা হয়। এ মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ১৯৬৯ সাল নাগাদ আন্দোলন চরমে ওঠে। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দল, পেশাজীবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে এ আন্দোলনে যুক্ত হয়। জানুয়ারিতে ছাত্রসমাজ ১১ দফা দাবি নিয়ে রাজপথে নামে। একে একে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদুজ্জামান আসাদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা শহিদ হন। এতে গণআন্দোলন এতই তীব্রতা লাভ করে যে, আন্দোলন দমনে শাসকচক্রের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
উদ্দীপকের X এবং Z ঘটনাদ্বয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সাথে জড়িত। এ দুটো আন্দোলন আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে। ভাষা আন্দোলন আমাদের মাঝে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে জাগ্রত করে। যার প্রেক্ষিতে সূচিত হয় ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলন। ড. শামসুজ্জোহা ও আসাদুজ্জামান আসাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
এরপর বাঙালি বুঝতে পারে নিজের স্বাধীন রাষ্ট্র ছাড়া শোষণহীন ভাবে বেঁচে থাকার উপায় নেই। ফলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি সমাজ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে।
সুতরাং আলোচনা থেকে বলা যায়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করে আর ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান সেই চেতনায় অগ্নিসংযোগ করে। যার প্রেক্ষিতে বাঙালি পেয়ে যায় কাঙ্খিত প্রাণের স্বাধীনতা।
ঘটনা-১: বিদ্যালয়ে 'স্বাধীনতা দিবস' উদযাপনের দিন কালাম স্যার বক্তৃতা দিতে যেয়ে বলেন, পঞ্চাশের দশকে পূর্ব বাংলায় একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে চারটি দল সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করে।
ঘটনা-২: জনাব মামুন ১৬ ডিসেম্বর তারিখের দৈনিক পত্রিকা পড়ে জানতে পারেন যে, পূর্ব বাংলায় এক ব্যক্তির এক ভোটের ভিত্তিতে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে পূর্ব বাংলায় প্রধান রাজনৈতিক দল বিপুল ভোটে বিজয় অর্জন করে।
১৯৬৬ সালে ৫-৬ই ফেব্রুয়ারি লাহোর অনুষ্ঠিত বিরোধী দলসমূহের এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে ছয় দফা দাবি ছিল প্রথম জোর প্রতিবাদ। এতে বাঙালির তীব্র প্রত্যাশিত স্বায়ত্তশাসনের জোর দাবি তুলে ধরা হয়। এতে প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতার কথা বলা না হলেও এ কর্মসূচি বাঙালিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে। আর এ কারণেই ৬ দফাকে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ বলা হয়।
ঘটনা-১ এর নির্বাচনের সাথে পাকিস্তান আমলের ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সাদৃশ্য রয়েছে।
শাসক দল মুসলিম লীগ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘদিন নির্বাচনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার গঠনের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। প্রাদেশিক সরকার নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের এমন টালবাহানা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের দাবির মুখে ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়।
উদ্দীপকের ঘটনা-১ এর বিদ্যালয়ে 'স্বাধীনতা দিবস' উদযাপনের দিন কালাম স্যার বক্তৃতা দিতে যেয়ে বলেন, পঞ্চাশের দশকে পূর্ব বাংলায় একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে চারটি দল সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করে। কালাম স্যারের এরূপ বক্তব্যে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য এবং ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় ঘটানোর লক্ষ্যে ১৯৫৩ সালের ১৪ই নভেম্বর আওয়ামী লীগ যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। চারটি দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়; চারটি দল হলো: আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম এবং গণতন্ত্রী দল। ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের ২৩৭টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসনে জয় লাভ করে।
ঘটনা-২ এ ১৯৭১ সালের পাকিস্তান সাধারণ পরিষদ নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে এ নির্বাচনের প্রভাব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভকরে, যা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিজয়।
উদ্দীপকের ঘটনা-২ এ জনাব মামুন ১৬ই ডিসেম্বর তারিখের দৈনিক পত্রিকা পড়ে জানতে পারেন যে, পূর্ববাংলায় এক ব্যক্তির এক ভোটের ভিত্তিতে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে পূর্ববাংলার প্রধান রাজনৈতিক দল বিপুল ভোটে বিজয় অর্জন করে। এখানে মূলত ১৯৭০ সালের পাকিস্তান সাধারণ পরিষদ নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। কেননা, ১৯৬৯ সালের ২৫শে মার্চ আইয়ুব খানের পদত্যাগের পর ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর সর্বপ্রথম এক ব্যক্তির এক ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনকে ৬ দফার পক্ষে গণভোট হিসেবে অভিহিত করে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাকিস্তানি সরকার ও স্বার্থান্বেষী মহলের জন্য এক বিরাট পরাজয় ডেকে আনে। তারা বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরোধিতা ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে থাকে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেয়। এই নির্বাচন বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে মুক্তিযুদ্ধের দিকে বহুদূর এগিয়ে দেয়।
অতএব উপরিউক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, ইতিহাসের পরিক্রমায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনের হাত ধরে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ জন্মলাভ করে।