বইয়ের পাতায় আবদ্ধ জ্ঞান এবং অন্যের নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্পদ প্রয়োজনের সময় কোনো কাজে আসে না। বিদ্যাকে বুঝে আত্মস্থ ও প্রয়োগ করতে হয়, আর ধনকে নিজের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও ব্যবস্থাপনায় রাখতে হয়।
মানুষের অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও সৃজনশীল চিন্তা বইয়ে সঞ্চিত থাকে। কিন্তু কেবল বই কেনা, তাক সাজানো বা পরীক্ষার জন্য কিছু কথা মুখস্থ করাকে প্রকৃত শিক্ষা বলা যায় না। অর্জিত জ্ঞান দিয়ে সমস্যা সমাধান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মানবকল্যাণ এবং নিজের আচরণ উন্নত করতে না পারলে সে বিদ্যা নিষ্ক্রিয় থেকে যায়। একজন ব্যক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম মুখস্থ করেও রোগীর ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করতে না জানলে যেমন চিকিৎসক হতে পারেন না, তেমনি নৈতিকতার কথা পড়ে আচরণে অসততা রাখলে তার শিক্ষা অর্থহীন। ধনের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। নিজের নামে বিপুল সম্পদ থাকলেও যদি তা অন্যের হাতে এমনভাবে থাকে যে জরুরি সময়ে ব্যবহার করা যায় না, তবে সেই সম্পদ কার্যত নিজের নয়। তবে জ্ঞান ভাগ করলে কমে না, বরং বাড়ে; আর সম্পদ বিশ্বস্ত ব্যবস্থাপনায় অন্যের কাছে রাখা দোষ নয়। মূল কথা হলো প্রয়োজনের সময় জ্ঞান ও সম্পদের ওপর সচেতন অধিকার, সঠিক বোঝাপড়া এবং কার্যকর ব্যবহারের ক্ষমতা থাকতে হবে।
অতএব, গ্রন্থপাঠের সার্থকতা জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগে এবং সম্পদের সার্থকতা যথাসময়ে কল্যাণকর ব্যবহারে। আত্মস্থ বিদ্যা ও নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন ধনই মানুষের প্রকৃত সহায়।
বই কেনার অর্থ অপচয় নয়; এটি জ্ঞান, রুচি ও মানবিক বিকাশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। বইয়ের মূল্য ব্যয় হলেও তার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ও আনন্দ মানুষের জীবনকে যে সম্পদ দেয়, তার তুলনায় সেই অর্থ অতি সামান্য।
বই মানুষের জ্ঞানচক্ষু খুলে দেয়, কুসংস্কার দূর করে এবং পৃথিবীর নানা মানুষ, দেশ, যুগ ও ভাবনার সঙ্গে পরিচয় করায়। একটি ভালো বই পাঠককে প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে এবং নিজের ভুল সংশোধন করতে শেখায়। পাঠ্যবই পেশাগত যোগ্যতা বাড়ায়, সাহিত্য অনুভূতি ও কল্পনাশক্তিকে সমৃদ্ধ করে, আর ইতিহাস ও জীবনী মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা দেয়। বস্তুগত জিনিস ব্যবহারে ক্ষয় হয়, কিন্তু বই বহুবার পড়া যায়, অন্যকে ধার দেওয়া যায় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম জ্ঞান ছড়ায়। অপ্রয়োজনীয় বিলাস, ক্ষণস্থায়ী বিনোদন বা বদভ্যাসে যে অর্থ নষ্ট হয়, তার একটি অংশ বইয়ে ব্যয় করলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই লাভবান হয়। তবে শুধু বই কিনে তাক সাজালেই সুফল আসে না; বয়স, আগ্রহ ও প্রয়োজন অনুযায়ী মানসম্মত বই নির্বাচন করে মনোযোগ দিয়ে পড়তে এবং অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগাতে হয়। সামর্থ্য সীমিত হলে পাঠাগার, পুরোনো বইয়ের দোকান, বই বিনিময় বা যৌথ সংগ্রহের মাধ্যমেও পাঠাভ্যাস গড়া সম্ভব।
অতএব, বই কেনায় সামান্য অর্থ কমলেও মানুষ জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মানসিক ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ হয়। সত্যিকার অর্থে বই মানুষকে দেউলিয়া করে না; বরং অজ্ঞতার দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করে।
ভূমিকা
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন ১৯৭১ সালে সশস্ত্র জনযুদ্ধে রূপ নেয়। নয় মাসের ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের।
পটভূমি
১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রাজনৈতিক অধিকার ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় চেতনাকে শক্তিশালী করে। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকেরা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি।
অসহযোগ আন্দোলন ও ৭ই মার্চ
ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানার প্রতিবাদে ১৯৭১ সালের মার্চে পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণে জনগণকে মুক্তির সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেন। তাঁর নির্দেশে প্রশাসন, আদালত, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কার্যত বাঙালির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
গণহত্যা ও স্বাধীনতার সূচনা
২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরস্ত্র মানুষের ওপর গণহত্যা চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ লাইন ও জনবসতিতে নির্বিচারে হত্যা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হলে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, পুলিশ, ইপিআর সদস্য ও সাধারণ মানুষ প্রতিরোধযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
মুজিবনগর সরকার ও যুদ্ধ পরিচালনা
১০ই এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে শপথ নেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকে এগারোটি সেক্টরে ভাগ করে সংগঠিত করা হয়; কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানী মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব নেন।
গণযুদ্ধ ও মানুষের অবদান
মুক্তিযুদ্ধ ছিল সর্বস্তরের মানুষের জনযুদ্ধ। প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি গেরিলা দল শহর ও গ্রামে দখলদার বাহিনীর যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থায় আঘাত হানে। নারী যোদ্ধা, সেবিকা, আশ্রয়দাতা ও তথ্যসংগ্রাহক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন; অসংখ্য নারী পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। শিল্পী, সাহিত্যিক ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মীরা গান, সংবাদ ও অনুষ্ঠান দিয়ে মানুষকে প্রেরণা দেন। প্রবাসী বাঙালিরা অর্থ সংগ্রহ ও বিশ্বজনমত গঠনে কাজ করেন।
গণহত্যা ও আন্তর্জাতিক সমর্থন
পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা হত্যা, ধর্ষণ, লুট ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে দেশজুড়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ চালায়। প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ভারত শরণার্থীদের আশ্রয়, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও শেষ পর্যায়ে যৌথ যুদ্ধে সহায়তা করে। বিশ্বের সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীরা বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে জনমত গড়েন; ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ মুক্তিযুদ্ধের মানবিক সংকটকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে।
চূড়ান্ত বিজয়
ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী দ্রুত পরাজিত হয়। পরাজয় নিশ্চিত জেনে ১৪ই ডিসেম্বর তারা দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে জাতিকে মেধাশূন্য করার চেষ্টা চালায়। ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।
মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালিকে স্বাধীন ভূখণ্ড, জাতীয় পতাকা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দিয়েছে। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অসাম্প্রদায়িকতার আকাঙ্ক্ষা ছিল এ সংগ্রামের অন্তর্নিহিত শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান এবং স্বাধীনতাবিরোধী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সত্য তুলে ধরা নতুন প্রজন্মের কর্তব্য।
উপসংহার
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অসংখ্য মানুষের রক্ত, অশ্রু ও ত্যাগের ফসল। দুর্নীতি, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করে ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক দেশ গড়তে পারলেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো হবে।
ভূমিকা
অর্থ, শ্রম, জ্ঞান ও প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কৃষিপণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ বা বিপণনের উদ্যোগ যিনি গ্রহণ করেন, তিনি কৃষি উদ্যোক্তা। কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশে শিক্ষিত ও উদ্ভাবনী তরুণদের জন্য এ পেশা আত্মকর্মসংস্থান, নতুন চাকরি সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বড় সুযোগ।
কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তা
প্রথাগত কৃষক সাধারণত পরিবারের খাদ্যচাহিদা মেটানোকে অগ্রাধিকার দিয়ে উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রি করেন। কৃষি উদ্যোক্তা শুরু থেকেই বাজার, ব্যয়, লাভ, ঝুঁকি ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করেন। তিনি শুধু ফসল চাষে সীমাবদ্ধ নন; বীজ ও চারা উৎপাদন, মাছ চাষ, দুগ্ধ ও পোলট্রি খামার, মৌচাষ, কৃষিযন্ত্র ভাড়া, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং অনলাইন বিপণনেও উদ্যোগ নিতে পারেন।
উদ্যোগ নির্বাচনের প্রস্তুতি
সফল উদ্যোগের আগে স্থানীয় মাটি, পানি, আবহাওয়া, কাঁচামাল, শ্রম, যোগাযোগ ও বাজারের চাহিদা যাচাই করতে হয়। সম্ভাব্য ক্রেতা, প্রতিযোগী, উৎপাদন খরচ, বিক্রয়মূল্য ও লাভের হিসাবসহ বাস্তবসম্মত ব্যবসায় পরিকল্পনা তৈরি জরুরি। নিজের দক্ষতা ও পুঁজির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছোট পরিসরে শুরু করে ফলাফল বিশ্লেষণের পর ধীরে ধীরে সম্প্রসারণ করলে ঝুঁকি কমে।
উদ্যোক্তার গুণাবলি
কৃষি উদ্যোক্তাকে পরিশ্রমী, সৎ, ধৈর্যশীল, উদ্ভাবনী ও ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে হয়। দ্রুত সিদ্ধান্ত, হিসাব সংরক্ষণ, শ্রমিক পরিচালনা, দর-কষাকষি এবং ক্রেতার আস্থা অর্জনের দক্ষতা তাঁর দরকার। রোগবালাই, আবহাওয়া ও বাজারদরের পরিবর্তনে বিচলিত না হয়ে বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণের মানসিকতাও সফলতার শর্ত।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার
মানসম্মত বীজ, মাটি পরীক্ষা, সুষম সার, আধুনিক সেচ, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিযন্ত্র উৎপাদন ও খরচ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, মোবাইল পরামর্শ, ডিজিটাল হিসাব, অনলাইন বাজার এবং শীতল সংরক্ষণ প্রযুক্তি ঝুঁকি ও অপচয় কমায়। তবে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এমন অতিরিক্ত সার-কীটনাশক ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।
অর্থায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
নিজস্ব সঞ্চয়ের পাশাপাশি ব্যাংকঋণ, সমবায় বা সরকারি সহায়তা থেকে পুঁজি সংগ্রহ করা যায়। ঋণ নেওয়ার আগে পরিশোধক্ষমতা ও নগদ প্রবাহ হিসাব করা জরুরি। একই খামারে উপযোগী একাধিক পণ্য উৎপাদন, রোগ প্রতিরোধ, নিরাপদ অবকাঠামো, সঠিক নথি এবং সম্ভব হলে ফসল বা খামারবিমা ক্ষতির ঝুঁকি কমায়।
সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ
কৃষিপণ্য দ্রুত নষ্ট হওয়ায় পরিচ্ছন্ন সংগ্রহ, মানভিত্তিক বাছাই, উপযুক্ত প্যাকেজিং, গুদাম ও শীতল পরিবহনের ব্যবস্থা দরকার। দুধ থেকে দই, ফল থেকে জ্যাম বা আচার এবং শস্য থেকে প্যাকেটজাত খাদ্য তৈরি করলে মূল্য সংযোজন হয়। মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সমবায়, কৃষকের বাজার, চুক্তিভিত্তিক বিক্রি ও অনলাইন মাধ্যমে সরাসরি ক্রেতার কাছে পৌঁছানো ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে পারে।
বাংলাদেশে সম্ভাবনা
দেশের বিপুল জনসংখ্যা কৃষিপণ্যের বড় বাজার। বৈচিত্র্যময় মাটি ও জলবায়ুতে ধান, সবজি, ফল, ফুল, মাছ, দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিতেও সম্ভাবনা বাড়ছে। নারী ও তরুণেরা বাড়ির আঙিনা বা ক্ষুদ্র জমি থেকে নিরাপদ খাদ্য, নার্সারি, মাশরুম বা অনলাইন বিপণনের উদ্যোগ শুরু করতে পারেন।
চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
জমির স্বল্পতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগবালাই, পুঁজির অভাব, অস্থিতিশীল বাজারদর, সংরক্ষণঘাটতি ও মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব উদ্যোক্তাদের প্রধান বাধা। এসব মোকাবিলায় সহজ শর্তে ঋণ, মানসম্মত প্রশিক্ষণ, পরীক্ষিত উপকরণ, কৃষি সম্প্রসারণসেবা, কার্যকর শীতাগার, উন্নত পরিবহন এবং স্বচ্ছ বাজারতথ্য নিশ্চিত করা দরকার। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, ব্যাংক ও বেসরকারি সংস্থার সেবাকে উদ্যোক্তার কাছে সহজে পৌঁছে দিতে হবে।
নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ব
খাদ্য মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভুল ওজন বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে লাভ করা অনৈতিক। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ক্রেতার প্রতি জবাবদিহি একজন কৃষি উদ্যোক্তার মৌলিক দায়িত্ব।
উপসংহার
পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, সততা ও বাজারজ্ঞান একত্রিত হলে কৃষি লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ উদ্যোগে পরিণত হতে পারে। সফল কৃষি উদ্যোক্তা নিজের স্বাবলম্বিতা অর্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা ও জাতীয় সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
ভূমিকা
মাদকাসক্তি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য এক সর্বনাশা সমস্যা। যে তরুণ সমাজ দেশের ভবিষ্যৎ, মাদকের করাল গ্রাস তাদের স্বাস্থ্য, মেধা ও কর্মক্ষমতা ধ্বংস করে জাতীয় উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করে। তাই মাদক সম্পর্কে সচেতনতা, প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সমন্বিত ব্যবস্থা জরুরি।
মাদক ও মাদকাসক্তি
যেসব প্রাকৃতিক বা রাসায়নিক পদার্থ গ্রহণে সাময়িক উত্তেজনা, অবসাদ বা চেতনার পরিবর্তন ঘটে এবং বারবার গ্রহণের তীব্র নির্ভরতা তৈরি হয়, সেগুলো মাদক। চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে কিছু মাদকজাত উপাদান ওষুধ হিসেবে কাজে লাগলেও অপব্যবহার দেহ ও মনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মাদকের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্ভরতার অবস্থাই মাদকাসক্তি।
মাদকাসক্তির কারণ
কৌতূহল, সঙ্গদোষ, পারিবারিক অশান্তি, হতাশা, বেকারত্ব, ব্যর্থতা ও নিঃসঙ্গতা থেকে অনেকে প্রথম মাদক গ্রহণ করে। কেউ ভুলভাবে একে আধুনিকতা বা সাহসের পরিচয় মনে করে। পরিবারে নজরদারি ও স্নেহের অভাব, সুস্থ বিনোদনের স্বল্পতা এবং মাদকের সহজলভ্যতা ঝুঁকি বাড়ায়। অসাধু ব্যবসায়ীচক্র তরুণদের লক্ষ্য করে মাদক ছড়িয়ে বিপুল অবৈধ মুনাফা অর্জন করে।
শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি
দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণে মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, যকৃৎ, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষুধা, ঘুম, স্মৃতি, বিচারবোধ ও কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়; উদ্বেগ, বিষণ্নতা, সন্দেহপ্রবণতা ও সহিংস আচরণ দেখা দিতে পারে। একই মাদক থেকে আগের অনুভূতি পেতে ক্রমে বেশি মাত্রা দরকার হয় এবং হঠাৎ বন্ধ করলে তীব্র প্রত্যাহারজনিত সমস্যা সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত মাত্রা মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
পরিবার ও সমাজে প্রভাব
আসক্ত ব্যক্তি পড়াশোনা বা কর্মক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা ও মাদক কেনার ব্যয়ে পরিবার অর্থসংকটে পড়ে। অর্থ জোগাতে কেউ চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা বা সহিংস অপরাধে জড়ায়। পরিবারে অবিশ্বাস, কলহ ও নির্যাতন বাড়ে; শিশুদের নিরাপত্তা ও শিক্ষা ব্যাহত হয়। মাদক ব্যবসা দুর্নীতি, চোরাচালান ও সংগঠিত অপরাধকে শক্তিশালী করে সমাজের শান্তি নষ্ট করে।
প্রতিরোধের উপায়
সীমান্ত, পরিবহন ও বিপণনচক্রে কঠোর নজরদারি এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা, জীবনদক্ষতা শিক্ষা ও পরামর্শসেবা চালু করতে হবে। পরিবারকে সন্তানের আচরণ, মানসিক পরিবর্তন ও বন্ধুবৃত্তের প্রতি যত্নশীল হতে হবে; তবে সন্দেহ বা অপমান নয়, আস্থা ও খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ গড়তে হবে। খেলাধুলা, পাঠাগার, সংস্কৃতিচর্চা, স্বেচ্ছাসেবা এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান তরুণদের সুস্থ জীবনে যুক্ত রাখে। গণমাধ্যমকে মাদকের ক্ষতি তুলে ধরতে হবে, কিন্তু মাদক গ্রহণকে আকর্ষণীয় করে এমন উপস্থাপনা এড়াতে হবে।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন
মাদকাসক্তি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা; শুধু শাস্তি বা ঘৃণায় এর সমাধান হয় না। প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে শারীরিক চিকিৎসা, মনোসামাজিক পরামর্শ, প্রয়োজনে ওষুধ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন দরকার। চিকিৎসার পর পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা, শিক্ষা বা কর্মে পুনঃসংযোগ এবং নিয়মিত অনুসরণ আসক্তিকে ফিরে আসা থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। অননুমোদিত বা নির্যাতনমূলক কেন্দ্রের বদলে মানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থী ও যুবসমাজের ভূমিকা
প্রথম প্রস্তাবেই দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলা, মাদকাসক্ত বন্ধুকে গোপনে উৎসাহ না দিয়ে বিশ্বস্ত অভিভাবক বা পরামর্শকের সাহায্য নেওয়া এবং মাদকবিরোধী সচেতনতায় অংশ নেওয়া তরুণদের কর্তব্য। আত্মমর্যাদা, সঠিক বন্ধু নির্বাচন ও জীবনের ইতিবাচক লক্ষ্য মাদকের প্রলোভন থেকে রক্ষা করে।
উপসংহার
মাদক নির্মূল কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়; পরিবার, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত দায়িত্ব। সরবরাহ বন্ধ, ঝুঁকির কারণ দূর, সময়মতো চিকিৎসা এবং সুস্থ জীবনের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারলেই মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও কর্মক্ষম বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
তারিখ: ১৫ই জানুয়ারি ২০২৪
বরাবর
ব্যবস্থাপক
সোনালী ব্যাংক পিএলসি
কাপাসিয়া শাখা, গাজীপুর।
বিষয়: ক্ষুদ্র উদ্যোগ স্থাপনের জন্য ঋণ মঞ্জুরের আবেদন।
জনাব,
সবিনয় নিবেদন এই যে, আমি সোহেল, কাপাসিয়া উপজেলার একজন স্থায়ী বাসিন্দা। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর স্থানীয় বাজারে একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল সেবাকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করেছি। এ কেন্দ্র থেকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, অনলাইন আবেদন, মুদ্রণ ও অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তি সেবা দেওয়া হবে। উদ্যোগটির জন্য কম্পিউটার ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা, দোকান সাজানো এবং প্রাথমিক পরিচালন ব্যয় বাবদ মোট ৪,০০,০০০ টাকা প্রয়োজন। নিজস্ব সঞ্চয় থেকে ১,০০,০০০ টাকা বিনিয়োগ করতে পারব; অবশিষ্ট ৩,০০,০০০ টাকা আপনার ব্যাংকের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ কর্মসূচির আওতায় প্রয়োজন।
আমি একটি বাস্তবসম্মত ব্যবসায় পরিকল্পনা, ব্যয়ের হিসাব, প্রশিক্ষণ সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, ব্যাংক হিসাবের বিবরণ এবং প্রয়োজনীয় জামিনদারের কাগজপত্র সংযুক্ত করেছি। সম্ভাব্য আয় থেকে ব্যাংকের নির্ধারিত কিস্তি ও মুনাফা/সুদ নিয়মিত পরিশোধ করতে সক্ষম হব। ব্যাংক চাইলে প্রকল্পস্থল পরিদর্শন ও অতিরিক্ত তথ্য যাচাই করতে পারে।
অতএব, মহোদয়ের নিকট বিনীত আবেদন, আমার কাগজপত্র ও প্রকল্পের সম্ভাব্যতা বিবেচনা করে বিধি অনুযায়ী ৩,০০,০০০ টাকা ঋণ মঞ্জুর করে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে বাধিত করবেন।
বিনীত নিবেদক
সোহেল
পিতা: মো. আবদুল করিম
গ্রাম: তরগাঁও, ডাকঘর ও উপজেলা: কাপাসিয়া
জেলা: গাজীপুর
মোবাইল: ০১৭XXXXXXXX
সংযুক্তি: ব্যবসায় পরিকল্পনা, ব্যয়ের প্রাক্কলন, প্রশিক্ষণ সনদ, পরিচয়পত্র ও জামিনদারের কাগজপত্র।
তারিখ: ১৫ই জুন ২০২৪
বরাবর
সম্পাদক
দৈনিক যুগান্তর, ঢাকা।
বিষয়: দেশব্যাপী কার্যকরভাবে ‘বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ’ পালনের প্রয়োজনীয়তা।
জনাব,
আপনার বহুল প্রচারিত পত্রিকার ‘চিঠিপত্র’ বিভাগে প্রকাশের জন্য নিচের পত্রটি পাঠাচ্ছি।
বৃক্ষ মানুষের জীবন ও পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বৃক্ষ অক্সিজেন, খাদ্য, ঔষধ, কাঠ ও ছায়া দেয়; কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ, মাটি ক্ষয় রোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি কমাতে সহায়তা করে। কিন্তু নির্বিচার বৃক্ষনিধন, জনসংখ্যার চাপ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নে দেশের বনভূমি ও সবুজ এলাকা কমছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশে তাই ‘বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ’ পালন অত্যন্ত জরুরি। এ সময় বিদ্যালয়, সড়কের ধারে, উপকূলীয় বাঁধ, পতিত জমি ও বাড়ির আঙিনায় পরিবেশোপযোগী ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা লাগাতে হবে। কেবল চারা রোপণ নয়, পরিচর্যা, বেড়া ও বেঁচে থাকার নিয়মিত হিসাব নিশ্চিত করা দরকার। শিক্ষার্থী, বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার ও সামাজিক সংগঠনের সমন্বিত অংশগ্রহণেই কর্মসূচি সফল হতে পারে। বিষয়টির প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণে পত্রটি প্রকাশের অনুরোধ করছি।
বিনীত
সেলিম
কাপাসিয়া, গাজীপুর।
মানুষের মহত্ত্ব কেবল নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ভোগে প্রকাশ পায় না; অন্যের কল্যাণে স্বার্থ, শ্রম ও সম্পদ ত্যাগ করার মধ্যেই মনুষ্যত্বের প্রকৃত বিকাশ ঘটে। সংযম ও ত্যাগ মানুষকে সংকীর্ণ আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে মুক্ত করে বৃহত্তর মানবসমাজের সঙ্গে যুক্ত করে।
ভোগের আকাঙ্ক্ষা অসীম। একটি চাহিদা পূরণ হলে আরেকটি জন্ম নেয়; ফলে মানুষ লোভ, প্রতিযোগিতা ও অসন্তোষের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। বিপরীতে ত্যাগের মনোভাব মানুষকে সহমর্মী, উদার ও দায়িত্বশীল করে। মা সন্তানের জন্য নিজের আরাম বিসর্জন দেন, শিক্ষক শিক্ষার্থীর উন্নতির জন্য শ্রম দেন, আর দেশের স্বাধীনতার জন্য বীরেরা জীবন উৎসর্গ করেন—এসব ত্যাগেই মানবিক মহিমা উজ্জ্বল। সমাজে ধনী ব্যক্তি যদি সম্পদের অংশ অসহায়ের শিক্ষা ও চিকিৎসায় ব্যয় করেন, জ্ঞানী ব্যক্তি যদি জ্ঞান ভাগ করেন এবং সক্ষম মানুষ যদি দুর্যোগে বিপন্নের পাশে দাঁড়ান, তবে পারস্পরিক আস্থা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ত্যাগ মানে প্রয়োজনহীন আত্মনিপীড়ন বা সব সম্পদ পরিত্যাগ নয়; ন্যায়সঙ্গত প্রয়োজন পূরণ করে লোভ সংযত রাখা এবং বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য স্বেচ্ছায় কিছু ছাড় দেওয়াই প্রকৃত ত্যাগ। নিজের কর্তব্য অবহেলা করে লোকদেখানো দানও ত্যাগের আদর্শ নয়।
অতএব, সংযত ভোগ জীবনধারণের জন্য প্রয়োজন হলেও ত্যাগই মানুষকে হৃদয়ের ঐশ্বর্য ও নৈতিক উচ্চতা দেয়। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করলেই মনুষ্যত্ব পূর্ণতা লাভ করে।
অন্যায়কারী এবং অন্যায়ের নীরব সহ্যকারী উভয়েই সমাজের ক্ষতি করে। তাই ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য অপরাধ করা থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি সাহস ও বিবেকের সঙ্গে অন্যায়ের প্রতিবাদ করাও মানুষের কর্তব্য।
আইন সরাসরি অন্যায়কারীকে অপরাধী হিসেবে শাস্তি দেয়। কিন্তু অন্যায় শুধু একজনের শক্তিতে স্থায়ী হয় না; সহযোগী, উৎসাহদাতা এবং নীরব দর্শকের নিষ্ক্রিয়তাও তাকে সাহস জোগায়। কোনো দুর্বল মানুষের ওপর অত্যাচার হতে দেখে সবাই যদি ভয়ে বা স্বার্থে চুপ থাকে, অপরাধী মনে করে তার কাজে বাধা নেই। এভাবে অন্যায় সহ্য করতে করতে তা সমাজের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয় এবং একদিন নীরব ব্যক্তিও তার শিকার হতে পারে। প্রতিবাদ মানে অবশ্যই হঠকারী সংঘর্ষ নয়। ঘটনার সত্যতা যাচাই, আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিরাপদ সহায়তা, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে জানানো, সাক্ষ্য দেওয়া এবং আইনসম্মত সম্মিলিত প্রতিরোধই দায়িত্বশীল পথ। নিজের নিরাপত্তা বিবেচনা করে অন্যের সাহায্য নেওয়াও বিচক্ষণতা। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিশুদের ন্যায়বোধ, সহমর্মিতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস শেখাতে হবে। রাষ্ট্রকে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ ও সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভয় মানুষের বিবেককে নীরব না করে।
অতএব, অন্যায় করা যেমন নিন্দনীয়, সুবিধা বা ভয়ের কারণে তা মেনে নেওয়াও তেমনি বিবেকের অপরাধ। সচেতন, সাহসী ও আইননিষ্ঠ প্রতিবাদই অন্যায়ের বিস্তার রোধ করে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে পারে।
সড়কের বেহাল দশায় জনদুর্ভোগ চরমে
আরশ, জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক জনকণ্ঠ
দিনাজপুর, ১৫ই জুন ২০২৪: শহরের প্রধান ও সংযোগ সড়কগুলোর বিভিন্ন অংশ ভেঙে খানাখন্দে পরিণত হওয়ায় বাসিন্দাদের চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় বর্ষা শুরু হতেই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক স্থানে কার্পেটিং উঠে পাথর বেরিয়ে এসেছে, বড় বড় গর্তে বৃষ্টির পানি জমে আছে এবং সড়কের দুই পাশ দেবে গেছে। কোথাও নালা বন্ধ থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বিভিন্ন সেবা সংস্থা খোঁড়াখুঁড়ির পর যথাযথভাবে মেরামত না করা, অতিরিক্ত ভারী যান চলাচল এবং নিম্নমানের সংস্কারকাজকে এ অবস্থার জন্য দায়ী করছেন স্থানীয়রা। গর্ত এড়াতে যানবাহন হঠাৎ দিক পরিবর্তন করায় প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। রিকশা ও ইজিবাইকের যাত্রীরা তীব্র ঝাঁকুনিতে কষ্ট পাচ্ছেন; শিক্ষার্থী, রোগী, প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দুর্ভোগ আরও বেশি। ধীরগতির যান চলাচলে বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে যানজট তৈরি হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। শুষ্ক দিনে ধুলাবালুতে দোকানি ও পথচারীরা শ্বাসকষ্টসহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন।
এলাকাবাসীর দাবি, জরুরি ভিত্তিতে গর্ত ভরাট করে টেকসইভাবে সড়ক সংস্কার, কার্যকর নালা নির্মাণ এবং খোঁড়াখুঁড়িতে যুক্ত সেবা সংস্থাগুলোর কাজের সমন্বয় করতে হবে। নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষা ও কাজের নিয়মিত তদারকি ছাড়া সাময়িক মেরামতে স্থায়ী সমাধান হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেবে—এটাই সবার প্রত্যাশা।
শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত
ফাহিম, জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক জনকণ্ঠ
দিনাজপুর, ২২শে ফেব্রুয়ারি ২০২৪: আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে গতকাল জেলার শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলা ভাষার শুদ্ধ লিখিত রূপ, পরিচ্ছন্ন উপস্থাপন এবং নান্দনিক হস্তলিপির প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ আয়োজন করে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে বিদ্যালয় মিলনায়তন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
সকাল নয়টায় জাতীয় সংগীত এবং ভাষাশহিদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম এবং নবম-দশম—দুটি বিভাগে শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়। প্রতিযোগীদের জন্য ভাষা আন্দোলন, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধবিষয়ক পৃথক গদ্যাংশ নির্ধারণ করা হয় এবং লেখার জন্য চল্লিশ মিনিট সময় দেওয়া হয়। বিচারকমণ্ডলী অক্ষরের গঠন ও সমতা, শুদ্ধ বানান, শব্দ ও পঙ্ক্তির ব্যবধান, পরিচ্ছন্নতা এবং সামগ্রিক উপস্থাপনার ভিত্তিতে লেখা মূল্যায়ন করেন। প্রতিযোগিতা চলাকালে বাংলা লিপির সৌন্দর্য ও হাতের লেখা উন্নয়নের কৌশল নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বিকেলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ডিজিটাল যুগেও স্পষ্ট ও শুদ্ধ হাতের লেখা শিক্ষার্থীর মনোযোগ, ভাষাজ্ঞান, ধৈর্য ও সৃজনশীলতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। দুই বিভাগের প্রথম তিনজনকে বই, সনদ ও স্মারক দেওয়া হয়; সব অংশগ্রহণকারী প্রশংসাপত্র পায়। বিজয়ীদের নির্বাচিত লেখা বিদ্যালয়ের দেয়ালপত্রিকায় প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রধান শিক্ষকের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা এ ধরনের শিক্ষামূলক প্রতিযোগিতা নিয়মিত আয়োজনের দাবি জানান।
ভূমিকা
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন ১৯৭১ সালে সশস্ত্র জনযুদ্ধে রূপ নেয়। নয় মাসের ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের।
পটভূমি
১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রাজনৈতিক অধিকার ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় চেতনাকে শক্তিশালী করে। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকেরা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি।
অসহযোগ আন্দোলন ও ৭ই মার্চ
ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানার প্রতিবাদে ১৯৭১ সালের মার্চে পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণে জনগণকে মুক্তির সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেন। তাঁর নির্দেশে প্রশাসন, আদালত, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কার্যত বাঙালির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
গণহত্যা ও স্বাধীনতার সূচনা
২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরস্ত্র মানুষের ওপর গণহত্যা চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ লাইন ও জনবসতিতে নির্বিচারে হত্যা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হলে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, পুলিশ, ইপিআর সদস্য ও সাধারণ মানুষ প্রতিরোধযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
মুজিবনগর সরকার ও যুদ্ধ পরিচালনা
১০ই এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে শপথ নেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকে এগারোটি সেক্টরে ভাগ করে সংগঠিত করা হয়; কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানী মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব নেন।
গণযুদ্ধ ও মানুষের অবদান
মুক্তিযুদ্ধ ছিল সর্বস্তরের মানুষের জনযুদ্ধ। প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি গেরিলা দল শহর ও গ্রামে দখলদার বাহিনীর যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থায় আঘাত হানে। নারী যোদ্ধা, সেবিকা, আশ্রয়দাতা ও তথ্যসংগ্রাহক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন; অসংখ্য নারী পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। শিল্পী, সাহিত্যিক ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মীরা গান, সংবাদ ও অনুষ্ঠান দিয়ে মানুষকে প্রেরণা দেন। প্রবাসী বাঙালিরা অর্থ সংগ্রহ ও বিশ্বজনমত গঠনে কাজ করেন।
গণহত্যা ও আন্তর্জাতিক সমর্থন
পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা হত্যা, ধর্ষণ, লুট ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে দেশজুড়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ চালায়। প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ভারত শরণার্থীদের আশ্রয়, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও শেষ পর্যায়ে যৌথ যুদ্ধে সহায়তা করে। বিশ্বের সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীরা বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে জনমত গড়েন; ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ মুক্তিযুদ্ধের মানবিক সংকটকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে।
চূড়ান্ত বিজয়
ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী দ্রুত পরাজিত হয়। পরাজয় নিশ্চিত জেনে ১৪ই ডিসেম্বর তারা দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে জাতিকে মেধাশূন্য করার চেষ্টা চালায়। ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।
মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালিকে স্বাধীন ভূখণ্ড, জাতীয় পতাকা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দিয়েছে। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অসাম্প্রদায়িকতার আকাঙ্ক্ষা ছিল এ সংগ্রামের অন্তর্নিহিত শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান এবং স্বাধীনতাবিরোধী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সত্য তুলে ধরা নতুন প্রজন্মের কর্তব্য।
উপসংহার
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অসংখ্য মানুষের রক্ত, অশ্রু ও ত্যাগের ফসল। দুর্নীতি, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করে ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক দেশ গড়তে পারলেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো হবে।
ভূমিকা
কৃষি মানুষের খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং গ্রামীণ জীবিকার প্রধান ভিত্তি। একসময় কৃষিকাজ সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতি, কায়িক শ্রম ও প্রথাগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগ কৃষিকে এখন অধিক উৎপাদনশীল, সাশ্রয়ী, ঝুঁকিসহনীয় ও বাজারমুখী কর্মকাণ্ডে রূপান্তর করছে।
প্রথাগত কৃষির সীমাবদ্ধতা
দেশি বীজ, কাঠের লাঙল, অনিয়ন্ত্রিত সেচ এবং অনুমাননির্ভর সার ব্যবহারে উৎপাদন কম ও অনিশ্চিত ছিল। খরা, বন্যা, রোগবালাই বা পোকামাকড়ের আক্রমণে পুরো ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত। ফসল কাটা, মাড়াই, সংরক্ষণ ও পরিবহনে বেশি সময় ও শ্রম লাগত এবং অপচয়ও হতো প্রচুর।
উন্নত বীজ ও কৃষি গবেষণা
উদ্ভিদ প্রজনন ও গবেষণার মাধ্যমে উচ্চফলনশীল, স্বল্পমেয়াদি, লবণাক্ততা-, খরা- ও জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। মানসম্মত বীজ একই জমিতে বেশি ও নির্ভরযোগ্য ফলন দিতে পারে। রোগ শনাক্তকরণ, টিস্যু কালচার, নিরাপদ চারা উৎপাদন এবং স্থানীয় জাতের জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণেও বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন জাত ব্যবহারের আগে অঞ্চল, মাটি ও ঋতুর উপযোগিতা যাচাই করা দরকার।
মাটি, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা
মাটি পরীক্ষা করে অম্লতা, পুষ্টি ও জৈব পদার্থের অবস্থা জানা যায়; সে অনুযায়ী সুষম সার দিলে খরচ ও পরিবেশদূষণ কমে। কম্পোস্ট, সবুজ সার ও জীবাণুসারের সঙ্গে পরিমিত রাসায়নিক সার ব্যবহার মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে। গভীর ও অগভীর নলকূপ, সেচপাম্প, সৌরচালিত পাম্প, ড্রিপ ও স্প্রিংকলার প্রযুক্তি প্রয়োজনমতো পানি সরবরাহ করে। পানি ধরে রাখা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও সেচের সময়সূচি নির্ধারণ জলসম্পদের অপচয় কমায়।
কৃষিযান্ত্রিকীকরণ
পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, বীজবপন যন্ত্র, ধান রোপণযন্ত্র, রিপার, কম্বাইন হারভেস্টার ও মাড়াইযন্ত্র অল্প সময়ে বেশি কাজ করতে সাহায্য করে। শ্রমিকের সংকটকালে দ্রুত ফসল কেটে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগেই ঘরে তোলা যায়। ছোট ও খণ্ডিত জমির উপযোগী যন্ত্র, সমবায়ভিত্তিক ব্যবহার ও ভাড়াকেন্দ্র কৃষকের ব্যয় কমাতে পারে।
রোগবালাই ও পোকা দমন
বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় উপকারী পোকা রক্ষা করে জৈব, যান্ত্রিক ও সীমিত রাসায়নিক পদ্ধতিতে ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। রোগসহিষ্ণু জাত, পরিচ্ছন্ন বীজ, ফসল পর্যায়ক্রম এবং ফেরোমন ফাঁদ কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমায়। নির্বিচার কীটনাশক মানুষ, মাটি, পানি ও পরাগবাহী পোকাকে ক্ষতি করে; তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও নিরাপদ বিরতি মেনে ব্যবহার জরুরি।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি
আবহাওয়ার পূর্বাভাস কৃষককে বপন, সেচ, সার ও ফসল কাটার সময় নির্ধারণে সহায়তা করে। মোবাইল ফোন, কৃষি কলসেন্টার ও অনলাইন সেবায় রোগের ছবি পাঠিয়ে পরামর্শ, বাজারদর এবং দুর্যোগের সতর্কতা পাওয়া যায়। উপগ্রহচিত্র, ড্রোন ও ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা বড় এলাকায় ফসলের স্বাস্থ্য, আর্দ্রতা ও ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ
উন্নত গুদাম, শীতাগার, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং এবং শীতল পরিবহন ফসল কাটার পরের অপচয় কমায়। দুধ শীতলীকরণ, মাছ ও মাংসের কোল্ড চেইন এবং ফল-সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ কৃষিপণ্যের মূল্য ও স্থায়িত্ব বাড়ায়। ডিজিটাল বাজারতথ্য কৃষককে ন্যায্য দাম বুঝতে এবং সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশে সুফল ও চ্যালেঞ্জ
বৈজ্ঞানিক কৃষিতে ধান, সবজি, ফল, মাছ, পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদের উৎপাদন বেড়েছে এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ক্ষুদ্র জমি, যন্ত্রের উচ্চমূল্য, মানসম্মত বীজের অভাব, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং ঋণ ও বাজারের সীমাবদ্ধতা প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধা দেয়। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি, সার ও কীটনাশক ব্যবহার পরিবেশ ও মাটির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে।
করণীয়
কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণের সংযোগ শক্তিশালী করে উদ্ভাবন সহজ ভাষায় কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হবে। স্বল্পসুদে ঋণ, যন্ত্র ভাড়া, মানসম্মত উপকরণ, ফসলবিমা, সংরক্ষণাগার এবং ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা দরকার। নারী ও তরুণ কৃষককে প্রশিক্ষণ, ভূমি ও প্রযুক্তিতে সমান সুযোগ দিতে হবে। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষাকারী টেকসই কৃষিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
উপসংহার
বিজ্ঞান কৃষকের অভিজ্ঞতার বিকল্প নয়; বরং সেই অভিজ্ঞতাকে তথ্য, যন্ত্র ও গবেষণার শক্তিতে সমৃদ্ধ করে। বিজ্ঞানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব কৃষি সবার নাগালে পৌঁছাতে পারলে বাংলাদেশ খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের মর্যাদা ও টেকসই অর্থনীতিতে আরও এগিয়ে যাবে।
ভূমিকা
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত, শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক ও সাহিত্যিক। নারী যখন শিক্ষা, কর্ম ও সামাজিক অধিকার থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিল, তখন তিনি লেখনী, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং সংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের মুক্তি ও মর্যাদার পথ নির্মাণ করেন।
জন্ম ও পারিবারিক পরিবেশ
রোকেয়া ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জহির উদ্দিন মুহম্মদ আবু আলী সাবের এবং মাতা রাহাতুল্লোসা সাবেরা চৌধুরানী। রক্ষণশীল ও কঠোর পর্দাপ্রথার পরিবারে মেয়েদের বাংলা ও ইংরেজি শেখার সুযোগ ছিল না। কিন্তু জ্ঞানপিপাসু রোকেয়া বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের ও বোন করিমুল্লোসার সহযোগিতায় গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা লাভ করেন।
বিবাহ ও সাহিত্যচর্চার প্রেরণা
১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে বিহারের ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। উদারমনস্ক স্বামী রোকেয়াকে বাংলা ও ইংরেজি চর্চা এবং সমাজসেবায় উৎসাহ দেন। স্বামীর সহযোগিতায় তাঁর প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায়। ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে স্বামীর মৃত্যুর পরও রোকেয়া তাঁর আদর্শ ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি।
নারীশিক্ষা বিস্তারে অবদান
স্বামীর স্মৃতিতে ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে ভাগলপুরে মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে তিনি সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিকূলতার কারণে পরে কলকাতায় গিয়ে ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্যালয়টি পুনরায় চালু করেন। রক্ষণশীল পরিবারের অভিভাবকদের বোঝাতে তিনি ঘরে ঘরে গিয়েছেন এবং ছাত্রীদের যাতায়াতের জন্য আলাদা গাড়ির ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টি ক্রমে উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। নারীশিক্ষা যে কেবল অক্ষরজ্ঞান নয়, বরং আত্মমর্যাদা, অধিকারবোধ ও স্বনির্ভরতার পথ—এ বিশ্বাসই তাঁর কাজের ভিত্তি ছিল।
সাহিত্যিক জীবন
১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে ‘নবপ্রভা’ পত্রিকায় ‘পিপাসা’ প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে ‘মতিচুর’ প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, ইংরেজি রচনা Sultana’s Dream বা ‘সুলতানার স্বপ্ন’, উপন্যাস ‘পদ্মরাগ’ এবং ‘অবরোধবাসিনী’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্যঙ্গ, যুক্তি ও কল্পনার সাহায্যে তিনি নারীর অবরুদ্ধ জীবন, পুরুষতান্ত্রিক বৈষম্য, কুসংস্কার এবং মানসিক দাসত্বের সমালোচনা করেছেন। তাঁর সাহিত্য একই সঙ্গে শিল্পসফল ও সমাজজাগরণমূলক।
সংগঠন ও সমাজসংস্কার
নারীদের সংগঠিত ও সহায়তা করতে রোকেয়া ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে দরিদ্র নারীর শিক্ষা, কর্মদক্ষতা ও কল্যাণে কাজ করা হয়। তিনি বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, একতরফা তালাক, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং নারীর প্রতি সব ধরনের অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তাঁর লক্ষ্য পুরুষের বিরোধিতা নয়; নারী ও পুরুষের সমঅধিকার ও সম্মিলিত অগ্রগতির মাধ্যমে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা।
চিন্তাদর্শ ও প্রাসঙ্গিকতা
রোকেয়া উপলব্ধি করেছিলেন যে নারীকে পিছিয়ে রেখে কোনো জাতি এগোতে পারে না। শিক্ষা নারীর বিচারবুদ্ধি, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ায়। আজ নারীরা শিক্ষা, প্রশাসন, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, সাহিত্য ও রাজনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করছে; এর পেছনে রোকেয়ার সংগ্রাম এক গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা। তবে বাল্যবিবাহ, সহিংসতা, বৈষম্য ও শিক্ষাবঞ্চনা পুরোপুরি দূর হয়নি বলে তাঁর চিন্তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
মৃত্যু ও স্মৃতি
১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর কলকাতায় রোকেয়া মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিন ৯ই ডিসেম্বর বাংলাদেশে ‘রোকেয়া দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। তাঁর জীবন নারীমুক্তি, শিক্ষা ও মানবমর্যাদার সংগ্রামের উজ্জ্বল প্রতীক।
উপসংহার
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তাঁর সাহিত্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি নারীকে আত্মসচেতনতার পথে আহ্বান জানিয়েছেন। সাহস, যুক্তিবোধ ও মানবিকতার এই উত্তরাধিকার তাঁকে শুধু নারী জাগরণের অগ্রদূত নয়, সমগ্র বাঙালি সমাজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শকে পরিণত করেছে।
তারিখ: ১৫ই জুন ২০২৪
বরাবর
সম্পাদক
দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা
বিষয়: সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিকারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি।
জনাব,
আপনার বহুল প্রচারিত পত্রিকার ‘চিঠিপত্র’ বিভাগে প্রকাশের জন্য নিচের পত্রটি পাঠাচ্ছি।
দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মূল্যবান প্রাণহানি, পঙ্গুত্ব ও সম্পদের ক্ষতি ঘটছে। বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অদক্ষ ও ক্লান্ত চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ভাঙা বা অপরিকল্পিত সড়ক এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা এর প্রধান কারণ। চালকের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও মাদকাসক্তি, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং সড়ক দখলও ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক পথচারী ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং ও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করায় দুর্ঘটনার শিকার হন। একটি দুর্ঘটনায় পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য নিহত বা পঙ্গু হলে পুরো পরিবার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে পড়ে। প্রতিকারে চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স যাচাই, কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা, গতিসীমার কঠোর প্রয়োগ এবং সড়কের প্রকৌশলগত ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা, নিরাপদ গণপরিবহন গড়ে তোলা এবং চালক-পথচারী উভয়ের সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি। বিষয়টির প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য পত্রটি প্রকাশের অনুরোধ করছি।
বিনীত
পলাশ
যশোর।
১৫ই জুন ২০২৪
চেয়ারম্যান
অনন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদ
অনন্তপুর
বিষয়: এলাকায় একটি পাঠাগার স্থাপনের আবেদন।
মহোদয়,
বিনীত নিবেদন এই যে, আমি অনন্তপুর গ্রামের একজন স্থায়ী বাসিন্দা। আমাদের এলাকায় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও আগ্রহী পাঠক থাকলেও সবার ব্যবহারের উপযোগী কোনো পাঠাগার নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বাইরের সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও তথ্যবিষয়ক বই পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষও পত্রিকা, সাময়িকী এবং প্রয়োজনীয় তথ্যসামগ্রী ব্যবহার করতে পারছেন না। একটি সুশৃঙ্খল পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস, জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতা বাড়বে এবং তরুণেরা অবসর সময়কে কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করতে পারবে। স্থানীয় বাসিন্দারা বই সংগ্রহ ও স্বেচ্ছাসেবায় সহযোগিতা করতেও আগ্রহী।
অতএব, আমাদের এলাকায় উপযুক্ত স্থানে একটি গণপাঠাগার স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় বই, আসবাব ও পাঠকক্ষের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আপনার সদয় মর্জি কামনা করছি।
বিনীত
রিয়াদ
অনন্তপুর।
বার্ধক্য কেবল বয়সের ভার নয়; যে মন নতুন সত্য, পরিবর্তন ও জীবনের অগ্রযাত্রাকে গ্রহণ করতে অক্ষম হয়ে পুরোনো মিথ্যা ও জীর্ণতার সঙ্গে আঁকড়ে থাকে, সেই মনই প্রকৃত অর্থে বৃদ্ধ। বয়স বাড়লেও চিন্তা যদি সজীব, যুক্তিনিষ্ঠ ও কল্যাণমুখী থাকে, তবে মানুষ মানসিকভাবে তরুণ থাকতে পারে।
জীবন ও সমাজ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। নতুন জ্ঞান পুরোনো ভুল ধারণাকে সংশোধন করে, নতুন প্রজন্ম প্রচলিত অন্যায় ও কুসংস্কারকে প্রশ্ন করে এবং সৃজনশীল মানুষ অচল ব্যবস্থার বদলে উন্নত পথ নির্মাণ করে। কিন্তু কেউ যদি শুধু ‘এভাবেই তো চলে এসেছে’—এই যুক্তিতে বৈষম্য, গোঁড়ামি বা প্রমাণিত মিথ্যাকে রক্ষা করে, তবে সে জীবনের চলমান স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এমন মানসিকতা মৃত অভ্যাসকে জীবিত সত্যের ওপর চাপিয়ে দেয় এবং ব্যক্তি ও সমাজের উন্নতি বাধাগ্রস্ত করে। অন্যদিকে প্রবীণ মানুষও অভিজ্ঞতার আলোয় নতুন সত্য গ্রহণ, ভুল স্বীকার এবং তরুণের সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করলে নবীনচিত্তের পরিচয় দেন। তবে নতুন বলেই সবকিছু ভালো কিংবা পুরোনো বলেই সবকিছু পরিত্যাজ্য নয়। ঐতিহ্যের মানবিক ও সত্য অংশ সংরক্ষণ করতে হবে, আর যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও কল্যাণের বিচারে মিথ্যা ও ক্ষতিকর অংশ বর্জন করতে হবে।
অতএব, প্রকৃত তারুণ্য শরীরের বয়সে নয়, মুক্ত ও জীবন্ত চেতনায়। সত্যকে গ্রহণ, ভুলকে সংশোধন এবং পরিবর্তনের সঙ্গে সৃজনশীলভাবে এগিয়ে যাওয়ার সাহসই মানুষকে মানসিক বার্ধক্য থেকে রক্ষা করে।
বইয়ের পাতায় আবদ্ধ জ্ঞান এবং অন্যের নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্পদ প্রয়োজনের সময় কোনো কাজে আসে না। বিদ্যাকে বুঝে আত্মস্থ ও প্রয়োগ করতে হয়, আর ধনকে নিজের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও ব্যবস্থাপনায় রাখতে হয়।
মানুষের অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও সৃজনশীল চিন্তা বইয়ে সঞ্চিত থাকে। কিন্তু কেবল বই কেনা, তাক সাজানো বা পরীক্ষার জন্য কিছু কথা মুখস্থ করাকে প্রকৃত শিক্ষা বলা যায় না। অর্জিত জ্ঞান দিয়ে সমস্যা সমাধান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মানবকল্যাণ এবং নিজের আচরণ উন্নত করতে না পারলে সে বিদ্যা নিষ্ক্রিয় থেকে যায়। একজন ব্যক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম মুখস্থ করেও রোগীর ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করতে না জানলে যেমন চিকিৎসক হতে পারেন না, তেমনি নৈতিকতার কথা পড়ে আচরণে অসততা রাখলে তার শিক্ষা অর্থহীন। ধনের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। নিজের নামে বিপুল সম্পদ থাকলেও যদি তা অন্যের হাতে এমনভাবে থাকে যে জরুরি সময়ে ব্যবহার করা যায় না, তবে সেই সম্পদ কার্যত নিজের নয়। তবে জ্ঞান ভাগ করলে কমে না, বরং বাড়ে; আর সম্পদ বিশ্বস্ত ব্যবস্থাপনায় অন্যের কাছে রাখা দোষ নয়। মূল কথা হলো প্রয়োজনের সময় জ্ঞান ও সম্পদের ওপর সচেতন অধিকার, সঠিক বোঝাপড়া এবং কার্যকর ব্যবহারের ক্ষমতা থাকতে হবে।
অতএব, গ্রন্থপাঠের সার্থকতা জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগে এবং সম্পদের সার্থকতা যথাসময়ে কল্যাণকর ব্যবহারে। আত্মস্থ বিদ্যা ও নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন ধনই মানুষের প্রকৃত সহায়।
রাজশাহীতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত
আফিফ, রাজশাহী প্রতিনিধি, দৈনিক সংবাদ
রাজশাহী, ১৬ই জুলাই ২০২৪: পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি কমানো এবং সবুজ আচ্ছাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে গতকাল রাজশাহী নগরী ও সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
সকালে শহরের একটি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ফলদ চারা রোপণ করে জেলা প্রশাসক কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। আলোচনা সভায় বন কর্মকর্তারা বলেন, বৃক্ষ অক্সিজেন সরবরাহ ও কার্বন শোষণের পাশাপাশি ছায়া দেয়, মাটিক্ষয় রোধ করে, জীববৈচিত্র্যের আবাস গড়ে এবং তাপপ্রবাহের ক্ষতি কমাতে সহায়তা করে। বরেন্দ্র অঞ্চলের তুলনামূলক শুষ্ক আবহাওয়া বিবেচনায় কম পানিতে টিকে থাকা দেশীয় ফলদ, বনজ ও ঔষধি প্রজাতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
দিনব্যাপী বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, সড়কের পাশ, খালি সরকারি জমি এবং জলাশয়ের তীরে আম, জাম, কাঁঠাল, নিম, অর্জুন, বকুলসহ কয়েক শ চারা রোপণ ও বিতরণ করা হয়। বিশেষজ্ঞরা সঠিক দূরত্বে গর্ত তৈরি, মাটি প্রস্তুত, পানি দেওয়া এবং চারার চারপাশে সুরক্ষাবেষ্টনী নির্মাণের কৌশল দেখান। প্রতিটি স্থানের রোপিত চারার তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী দলের মধ্যে পরিচর্যার দায়িত্ব ভাগ করা হয়েছে। মৃত চারা প্রতিস্থাপন এবং বেঁচে থাকার হার নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ঘোষণাও দেওয়া হয়।
আয়োজকেরা জানান, শুধু এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, ধারাবাহিক পরিচর্যা ও অবৈধ বৃক্ষনিধন বন্ধ করাই এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ বজায় থাকলে উদ্যোগটি রাজশাহীর পরিবেশ উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবুজ নগর গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে নবীনবরণ ও বিদায়-সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত
সুমন, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
কুড়িগ্রাম, ৩০শে জানুয়ারি ২০২৪: উৎসবমুখর ও আবেগঘন পরিবেশে গতকাল কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ এবং এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায়-সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিদ্যালয়ের মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় সংগীত ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রধান শিক্ষক সভাপতির বক্তব্যে নবীনদের স্বাগত জানিয়ে নিয়মিত অধ্যয়ন, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চার আহ্বান জানান। তিনি বিদায়ী পরীক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশ নিতে বলেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শিক্ষা ও চরিত্র গঠনে বিদ্যালয়ের ভূমিকা তুলে ধরে উভয় শ্রেণির শিক্ষার্থীর সফলতা কামনা করেন। পরে জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীরা ফুল ও শুভেচ্ছা কার্ড দিয়ে নবীনদের বরণ করে নেয়। নবীনদের একজন নতুন পরিবেশে সবার সহযোগিতা কামনা করে অনুভূতি জানায়। বিদায়ী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে একজন বিদ্যালয়ে কাটানো দিনের স্মৃতিচারণ করে শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। তাদের হাতে স্মারক ও শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় পর্বে কবিতা আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য ও ছোট নাটক পরিবেশিত হয়। আনন্দ ও বিচ্ছেদের মিশ্র অনুভূতিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক বন্ধন আরও দৃঢ় করার অঙ্গীকার এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়।
ভূমিকা
কৃষি মানুষের খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং গ্রামীণ জীবিকার প্রধান ভিত্তি। একসময় কৃষিকাজ সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতি, কায়িক শ্রম ও প্রথাগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগ কৃষিকে এখন অধিক উৎপাদনশীল, সাশ্রয়ী, ঝুঁকিসহনীয় ও বাজারমুখী কর্মকাণ্ডে রূপান্তর করছে।
প্রথাগত কৃষির সীমাবদ্ধতা
দেশি বীজ, কাঠের লাঙল, অনিয়ন্ত্রিত সেচ এবং অনুমাননির্ভর সার ব্যবহারে উৎপাদন কম ও অনিশ্চিত ছিল। খরা, বন্যা, রোগবালাই বা পোকামাকড়ের আক্রমণে পুরো ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত। ফসল কাটা, মাড়াই, সংরক্ষণ ও পরিবহনে বেশি সময় ও শ্রম লাগত এবং অপচয়ও হতো প্রচুর।
উন্নত বীজ ও কৃষি গবেষণা
উদ্ভিদ প্রজনন ও গবেষণার মাধ্যমে উচ্চফলনশীল, স্বল্পমেয়াদি, লবণাক্ততা-, খরা- ও জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। মানসম্মত বীজ একই জমিতে বেশি ও নির্ভরযোগ্য ফলন দিতে পারে। রোগ শনাক্তকরণ, টিস্যু কালচার, নিরাপদ চারা উৎপাদন এবং স্থানীয় জাতের জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণেও বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন জাত ব্যবহারের আগে অঞ্চল, মাটি ও ঋতুর উপযোগিতা যাচাই করা দরকার।
মাটি, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা
মাটি পরীক্ষা করে অম্লতা, পুষ্টি ও জৈব পদার্থের অবস্থা জানা যায়; সে অনুযায়ী সুষম সার দিলে খরচ ও পরিবেশদূষণ কমে। কম্পোস্ট, সবুজ সার ও জীবাণুসারের সঙ্গে পরিমিত রাসায়নিক সার ব্যবহার মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে। গভীর ও অগভীর নলকূপ, সেচপাম্প, সৌরচালিত পাম্প, ড্রিপ ও স্প্রিংকলার প্রযুক্তি প্রয়োজনমতো পানি সরবরাহ করে। পানি ধরে রাখা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও সেচের সময়সূচি নির্ধারণ জলসম্পদের অপচয় কমায়।
কৃষিযান্ত্রিকীকরণ
পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, বীজবপন যন্ত্র, ধান রোপণযন্ত্র, রিপার, কম্বাইন হারভেস্টার ও মাড়াইযন্ত্র অল্প সময়ে বেশি কাজ করতে সাহায্য করে। শ্রমিকের সংকটকালে দ্রুত ফসল কেটে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগেই ঘরে তোলা যায়। ছোট ও খণ্ডিত জমির উপযোগী যন্ত্র, সমবায়ভিত্তিক ব্যবহার ও ভাড়াকেন্দ্র কৃষকের ব্যয় কমাতে পারে।
রোগবালাই ও পোকা দমন
বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় উপকারী পোকা রক্ষা করে জৈব, যান্ত্রিক ও সীমিত রাসায়নিক পদ্ধতিতে ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। রোগসহিষ্ণু জাত, পরিচ্ছন্ন বীজ, ফসল পর্যায়ক্রম এবং ফেরোমন ফাঁদ কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমায়। নির্বিচার কীটনাশক মানুষ, মাটি, পানি ও পরাগবাহী পোকাকে ক্ষতি করে; তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও নিরাপদ বিরতি মেনে ব্যবহার জরুরি।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি
আবহাওয়ার পূর্বাভাস কৃষককে বপন, সেচ, সার ও ফসল কাটার সময় নির্ধারণে সহায়তা করে। মোবাইল ফোন, কৃষি কলসেন্টার ও অনলাইন সেবায় রোগের ছবি পাঠিয়ে পরামর্শ, বাজারদর এবং দুর্যোগের সতর্কতা পাওয়া যায়। উপগ্রহচিত্র, ড্রোন ও ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা বড় এলাকায় ফসলের স্বাস্থ্য, আর্দ্রতা ও ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ
উন্নত গুদাম, শীতাগার, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং এবং শীতল পরিবহন ফসল কাটার পরের অপচয় কমায়। দুধ শীতলীকরণ, মাছ ও মাংসের কোল্ড চেইন এবং ফল-সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ কৃষিপণ্যের মূল্য ও স্থায়িত্ব বাড়ায়। ডিজিটাল বাজারতথ্য কৃষককে ন্যায্য দাম বুঝতে এবং সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশে সুফল ও চ্যালেঞ্জ
বৈজ্ঞানিক কৃষিতে ধান, সবজি, ফল, মাছ, পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদের উৎপাদন বেড়েছে এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ক্ষুদ্র জমি, যন্ত্রের উচ্চমূল্য, মানসম্মত বীজের অভাব, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং ঋণ ও বাজারের সীমাবদ্ধতা প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধা দেয়। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি, সার ও কীটনাশক ব্যবহার পরিবেশ ও মাটির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে।
করণীয়
কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণের সংযোগ শক্তিশালী করে উদ্ভাবন সহজ ভাষায় কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হবে। স্বল্পসুদে ঋণ, যন্ত্র ভাড়া, মানসম্মত উপকরণ, ফসলবিমা, সংরক্ষণাগার এবং ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা দরকার। নারী ও তরুণ কৃষককে প্রশিক্ষণ, ভূমি ও প্রযুক্তিতে সমান সুযোগ দিতে হবে। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষাকারী টেকসই কৃষিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
উপসংহার
বিজ্ঞান কৃষকের অভিজ্ঞতার বিকল্প নয়; বরং সেই অভিজ্ঞতাকে তথ্য, যন্ত্র ও গবেষণার শক্তিতে সমৃদ্ধ করে। বিজ্ঞানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব কৃষি সবার নাগালে পৌঁছাতে পারলে বাংলাদেশ খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের মর্যাদা ও টেকসই অর্থনীতিতে আরও এগিয়ে যাবে।
ভূমিকা
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন ১৯৭১ সালে সশস্ত্র জনযুদ্ধে রূপ নেয়। নয় মাসের ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের।
পটভূমি
১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রাজনৈতিক অধিকার ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় চেতনাকে শক্তিশালী করে। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকেরা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি।
অসহযোগ আন্দোলন ও ৭ই মার্চ
ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানার প্রতিবাদে ১৯৭১ সালের মার্চে পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণে জনগণকে মুক্তির সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেন। তাঁর নির্দেশে প্রশাসন, আদালত, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কার্যত বাঙালির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
গণহত্যা ও স্বাধীনতার সূচনা
২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরস্ত্র মানুষের ওপর গণহত্যা চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ লাইন ও জনবসতিতে নির্বিচারে হত্যা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হলে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, পুলিশ, ইপিআর সদস্য ও সাধারণ মানুষ প্রতিরোধযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
মুজিবনগর সরকার ও যুদ্ধ পরিচালনা
১০ই এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে শপথ নেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকে এগারোটি সেক্টরে ভাগ করে সংগঠিত করা হয়; কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানী মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব নেন।
গণযুদ্ধ ও মানুষের অবদান
মুক্তিযুদ্ধ ছিল সর্বস্তরের মানুষের জনযুদ্ধ। প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি গেরিলা দল শহর ও গ্রামে দখলদার বাহিনীর যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থায় আঘাত হানে। নারী যোদ্ধা, সেবিকা, আশ্রয়দাতা ও তথ্যসংগ্রাহক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন; অসংখ্য নারী পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। শিল্পী, সাহিত্যিক ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মীরা গান, সংবাদ ও অনুষ্ঠান দিয়ে মানুষকে প্রেরণা দেন। প্রবাসী বাঙালিরা অর্থ সংগ্রহ ও বিশ্বজনমত গঠনে কাজ করেন।
গণহত্যা ও আন্তর্জাতিক সমর্থন
পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা হত্যা, ধর্ষণ, লুট ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে দেশজুড়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ চালায়। প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ভারত শরণার্থীদের আশ্রয়, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও শেষ পর্যায়ে যৌথ যুদ্ধে সহায়তা করে। বিশ্বের সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীরা বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে জনমত গড়েন; ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ মুক্তিযুদ্ধের মানবিক সংকটকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে।
চূড়ান্ত বিজয়
ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী দ্রুত পরাজিত হয়। পরাজয় নিশ্চিত জেনে ১৪ই ডিসেম্বর তারা দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে জাতিকে মেধাশূন্য করার চেষ্টা চালায়। ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।
মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালিকে স্বাধীন ভূখণ্ড, জাতীয় পতাকা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দিয়েছে। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অসাম্প্রদায়িকতার আকাঙ্ক্ষা ছিল এ সংগ্রামের অন্তর্নিহিত শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান এবং স্বাধীনতাবিরোধী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সত্য তুলে ধরা নতুন প্রজন্মের কর্তব্য।
উপসংহার
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অসংখ্য মানুষের রক্ত, অশ্রু ও ত্যাগের ফসল। দুর্নীতি, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করে ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক দেশ গড়তে পারলেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো হবে।
ভূমিকা
সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। হারানো অর্থ, স্বাস্থ্য বা সুযোগ কখনো আংশিকভাবে ফিরে পাওয়া গেলেও অতিবাহিত একটি মুহূর্ত আর ফিরে আসে না। নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করার অভ্যাসই সময়ানুবর্তিতা, আর সাফল্যময় ও শৃঙ্খলিত জীবনের অন্যতম ভিত্তি এই গুণ।
সময়ের স্বরূপ
সময় নদীর স্রোতের মতো অবিরাম বয়ে চলে; কারও জন্য অপেক্ষা করে না। প্রকৃতিতেও সময়ের শৃঙ্খলা স্পষ্ট—সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত, ঋতুপরিবর্তন, জোয়ার-ভাটা এবং ফসলের চক্র নির্দিষ্ট নিয়মে ঘটে। যথাসময়ে বীজ না বুনলে কৃষক কাঙ্ক্ষিত ফসল পান না। মানুষের কাজেও উপযুক্ত মুহূর্ত হারালে পরে অধিক শ্রম দিয়েও একই ফল পাওয়া কঠিন হয়।
ব্যক্তিজীবনে গুরুত্ব
সময়নিষ্ঠ ব্যক্তি কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন, পরিকল্পনা মেনে চলেন এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। ফলে তাঁর কাজের মান বাড়ে, মানসিক চাপ কমে এবং অন্যের আস্থা অর্জিত হয়। অফিস, চিকিৎসা, পরিবহন, ব্যবসা কিংবা সভা—সব ক্ষেত্রেই সময়মতো উপস্থিতি পারস্পরিক সম্মান ও দক্ষতার পরিচয়। দেরি করলে শুধু নিজের নয়, অন্যের মূল্যবান সময়ও নষ্ট হয়।
শিক্ষাজীবনে সময়ানুবর্তিতা
শিক্ষার্থীর সাফল্যে সময় ব্যবস্থাপনা বিশেষ জরুরি। নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, প্রতিদিনের পাঠ প্রতিদিন শেখা, পুনরাবৃত্তি, খেলাধুলা ও বিশ্রামের জন্য সুষম সময়সূচি তাকে সুস্থ ও প্রস্তুত রাখে। পরীক্ষার আগের রাতে সব পড়া শেষ করার চেষ্টা উদ্বেগ বাড়ায়, অথচ অল্প অল্প করে নিয়মিত পড়লে জ্ঞান স্থায়ী হয়। সময়নিষ্ঠ শিক্ষার্থী সহশিক্ষা কার্যক্রমেও অংশ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিকাশের সুযোগ পায়।
জাতীয় জীবনে গুরুত্ব
একটি জাতির মানুষের কর্মঘণ্টা, উৎপাদন ও সেবার সঙ্গে উন্নয়নের গতি সরাসরি যুক্ত। সরকারি দপ্তরে বিলম্ব, প্রকল্পের সময়ক্ষেপণ, যানবাহনের অনিয়ম ও বিচারকার্যের দীর্ঘসূত্রতা অর্থ ও জনবিশ্বাস নষ্ট করে। বিপরীতে সময়মতো সিদ্ধান্ত, নির্মাণ, উৎপাদন ও সেবা সম্পন্ন হলে ব্যয় কমে, বিনিয়োগ বাড়ে এবং নাগরিক জীবন গতিশীল হয়। উন্নত জাতিগুলোর অগ্রগতির পেছনে শ্রমের পাশাপাশি সময়ের প্রতি শ্রদ্ধাও গুরুত্বপূর্ণ।
সময় অপচয়ের ফল
অলসতা, লক্ষ্যহীন আড্ডা, অতিরিক্ত ঘুম এবং অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের অনেক কর্মক্ষম সময় কেড়ে নেয়। কাজ ফেলে রাখার অভ্যাস শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়া, ভুল, ব্যর্থতা ও হতাশার সৃষ্টি করে। যৌবনে সময় নষ্ট করলে পরিণত বয়সে অনুশোচনা করেও হারানো সম্ভাবনা ফিরিয়ে আনা যায় না।
সময়ানুবর্তী হওয়ার উপায়
প্রতিদিনের কাজ লিখে অগ্রাধিকার ঠিক করা, বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ, বড় কাজকে ছোট ধাপে ভাগ করা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা বাদ দেওয়া দরকার। ঘড়ি বা স্মারকের সহায়তা নেওয়া যায়, তবে আত্মশৃঙ্খলাই প্রধান। বিশ্রাম ও বিনোদনের সময়ও পরিকল্পনায় রাখতে হবে, কারণ ক্লান্ত শরীর ও মন কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না। পরিবার ও বিদ্যালয়ে ছোটবেলা থেকেই সময়মতো ঘুম, জাগরণ, পাঠ ও উপস্থিতির অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
উপসংহার
জীবন আসলে সীমিত সময়ের সমষ্টি। যে মানুষ প্রতিটি মুহূর্তকে লক্ষ্য, শ্রম ও শৃঙ্খলার সঙ্গে কাজে লাগায়, সে নিজের জীবনকে সমৃদ্ধ করে এবং সমাজেরও উপকার করে। তাই সময়কে সম্মান করা এবং সময়ের কাজ সময়ে সম্পন্ন করাই সাফল্যের নিশ্চিত পথ।
১৫ই জুন ২০২৪
ময়মনসিংহ
প্রিয় রাহাত,
আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা নিও। আশা করি ভালো আছ। গত সপ্তাহে একটি ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণের যে আনন্দময় অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা তোমাকে জানাতে আজ লিখছি।
বিদ্যালয়ের শিক্ষা সফরে আমরা কুমিল্লার ময়নামতি শালবন বিহার দেখতে গিয়েছিলাম। খুব ভোরে ময়মনসিংহ থেকে বাসে রওনা হয়ে সকালে সেখানে পৌঁছাই। লালমাই-ময়নামতি অঞ্চলের সবুজ উঁচু ভূমির মধ্যে অবস্থিত এ প্রত্নস্থল একসময়ের প্রাচীন বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ। প্রবেশের পর চারদিকে সারিবদ্ধ ভিক্ষুকক্ষ, মাঝখানে কেন্দ্রীয় মন্দিরের ভিত্তি, ইটের অলংকরণ ও পুরোনো স্থাপনার বিন্যাস দেখে আমরা বিস্মিত হই। একজন পথপ্রদর্শক খননে পাওয়া পোড়ামাটির ফলক, মুদ্রা, শিলালিপি ও অন্যান্য নিদর্শনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝিয়ে দেন। পাশের ময়নামতি জাদুঘরে সংরক্ষিত মূর্তি, ধাতব সামগ্রী, মুদ্রা ও টেরাকোটা দেখে সে সময়ের ধর্ম, শিল্প ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাই। পাঠ্যবইয়ে পড়া ইতিহাসকে চোখের সামনে দেখতে পাওয়ার অনুভূতি ছিল অসাধারণ। পরিষ্কার পরিবেশ ও নীরব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও ভ্রমণকে আনন্দদায়ক করেছে। ফেরার পথে মনে হয়েছে, অতীতের পরিচয় বহনকারী এসব পুরাকীর্তি রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
সুযোগ পেলে তুমিও স্থানটি দেখে এসো। তোমার মা-বাবাকে আমার সালাম দেবে।
ইতি
তোমার বন্ধু
ইফতি
তারিখ: ১৫ই জুন ২০২৪
বরাবর
সম্পাদক
দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা
বিষয়: সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিকারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি।
জনাব,
আপনার বহুল প্রচারিত পত্রিকার ‘চিঠিপত্র’ বিভাগে প্রকাশের জন্য নিচের পত্রটি পাঠাচ্ছি।
দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মূল্যবান প্রাণহানি, পঙ্গুত্ব ও সম্পদের ক্ষতি ঘটছে। বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অদক্ষ ও ক্লান্ত চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ভাঙা বা অপরিকল্পিত সড়ক এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা এর প্রধান কারণ। চালকের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও মাদকাসক্তি, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং সড়ক দখলও ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক পথচারী ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং ও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করায় দুর্ঘটনার শিকার হন। একটি দুর্ঘটনায় পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য নিহত বা পঙ্গু হলে পুরো পরিবার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে পড়ে। প্রতিকারে চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স যাচাই, কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা, গতিসীমার কঠোর প্রয়োগ এবং সড়কের প্রকৌশলগত ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা, নিরাপদ গণপরিবহন গড়ে তোলা এবং চালক-পথচারী উভয়ের সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি। বিষয়টির প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য পত্রটি প্রকাশের অনুরোধ করছি।
বিনীত
মাছুম
ময়মনসিংহ।
মানুষের জীবনের সার্থকতা দীর্ঘ আয়ুতে নয়, মানবকল্যাণমূলক ও মহৎ কর্মে। যে ব্যক্তি নিজের কাজের দ্বারা দেশ, সমাজ ও মানুষের উপকার করেন, তিনি মৃত্যুর পরও মানুষের স্মৃতি ও ভালোবাসায় বেঁচে থাকেন।
মানুষ মরণশীল; তাই কেবল বহু বছর বেঁচে থাকলেই জীবন অর্থবহ হয় না। অনেকে দীর্ঘ জীবন লাভ করেও এমন কোনো কাজ করেন না, যার জন্য পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের স্মরণ করবে। বিপরীতে স্বল্পায়ু বহু মানুষ জ্ঞান, সাহিত্য, বিজ্ঞান, স্বাধীনতা ও মানবসেবায় অসামান্য অবদান রেখে চিরস্মরণীয় হয়েছেন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেও তাঁর সৃষ্টির জন্য আজও স্মরণীয়। ভাষাশহিদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং দেশের জন্য আত্মোৎসর্গকারী অসংখ্য তরুণ তাঁদের কর্ম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে অমর হয়েছেন। মানুষের দেহের জীবন সীমিত, কিন্তু একটি সৎ কাজ সমাজে নতুন কাজের অনুপ্রেরণা জাগায় এবং তার প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তৃত হয়। তাই অলস দীর্ঘায়ুর চেয়ে অল্প সময়ের কর্মময়, সৎ ও কল্যাণকর জীবন অনেক বেশি মূল্যবান।
অতএব, বয়সের সংখ্যা নয়, কর্মের গুণ ও কল্যাণকর প্রভাবই মানুষের প্রকৃত পরিচয়। মহৎ কর্মে জীবনকে পূর্ণ করতে পারলেই মানুষ মৃত্যুকে অতিক্রম করে স্মরণীয় ও চিরজীবী হয়ে থাকে।
বইয়ের পাতায় আবদ্ধ জ্ঞান এবং অন্যের নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্পদ প্রয়োজনের সময় কোনো কাজে আসে না। বিদ্যাকে বুঝে আত্মস্থ ও প্রয়োগ করতে হয়, আর ধনকে নিজের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও ব্যবস্থাপনায় রাখতে হয়।
মানুষের অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও সৃজনশীল চিন্তা বইয়ে সঞ্চিত থাকে। কিন্তু কেবল বই কেনা, তাক সাজানো বা পরীক্ষার জন্য কিছু কথা মুখস্থ করাকে প্রকৃত শিক্ষা বলা যায় না। অর্জিত জ্ঞান দিয়ে সমস্যা সমাধান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মানবকল্যাণ এবং নিজের আচরণ উন্নত করতে না পারলে সে বিদ্যা নিষ্ক্রিয় থেকে যায়। একজন ব্যক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম মুখস্থ করেও রোগীর ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করতে না জানলে যেমন চিকিৎসক হতে পারেন না, তেমনি নৈতিকতার কথা পড়ে আচরণে অসততা রাখলে তার শিক্ষা অর্থহীন। ধনের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। নিজের নামে বিপুল সম্পদ থাকলেও যদি তা অন্যের হাতে এমনভাবে থাকে যে জরুরি সময়ে ব্যবহার করা যায় না, তবে সেই সম্পদ কার্যত নিজের নয়। তবে জ্ঞান ভাগ করলে কমে না, বরং বাড়ে; আর সম্পদ বিশ্বস্ত ব্যবস্থাপনায় অন্যের কাছে রাখা দোষ নয়। মূল কথা হলো প্রয়োজনের সময় জ্ঞান ও সম্পদের ওপর সচেতন অধিকার, সঠিক বোঝাপড়া এবং কার্যকর ব্যবহারের ক্ষমতা থাকতে হবে।
অতএব, গ্রন্থপাঠের সার্থকতা জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগে এবং সম্পদের সার্থকতা যথাসময়ে কল্যাণকর ব্যবহারে। আত্মস্থ বিদ্যা ও নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন ধনই মানুষের প্রকৃত সহায়।
ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে নবীনবরণ ও বিদায়-সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত
অরুণ, শিক্ষার্থী প্রতিবেদক
ময়মনসিংহ, ৩০শে জানুয়ারি ২০২৪: উৎসবমুখর ও আবেগঘন পরিবেশে গতকাল ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ এবং এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায়-সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিদ্যালয়ের মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় সংগীত ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রধান শিক্ষক সভাপতির বক্তব্যে নবীনদের স্বাগত জানিয়ে নিয়মিত অধ্যয়ন, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চার আহ্বান জানান। তিনি বিদায়ী পরীক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশ নিতে বলেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শিক্ষা ও চরিত্র গঠনে বিদ্যালয়ের ভূমিকা তুলে ধরে উভয় শ্রেণির শিক্ষার্থীর সফলতা কামনা করেন। পরে জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীরা ফুল ও শুভেচ্ছা কার্ড দিয়ে নবীনদের বরণ করে নেয়। নবীনদের একজন নতুন পরিবেশে সবার সহযোগিতা কামনা করে অনুভূতি জানায়। বিদায়ী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে একজন বিদ্যালয়ে কাটানো দিনের স্মৃতিচারণ করে শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। তাদের হাতে স্মারক ও শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় পর্বে কবিতা আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য ও ছোট নাটক পরিবেশিত হয়। আনন্দ ও বিচ্ছেদের মিশ্র অনুভূতিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক বন্ধন আরও দৃঢ় করার অঙ্গীকার এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়।
ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত
ধ্রুব, নিজস্ব সংবাদদাতা, দৈনিক ইত্তেফাক
ময়মনসিংহ, ২২শে ফেব্রুয়ারি ২০২৪: আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে গতকাল জেলার ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলা ভাষার শুদ্ধ লিখিত রূপ, পরিচ্ছন্ন উপস্থাপন এবং নান্দনিক হস্তলিপির প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ আয়োজন করে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে বিদ্যালয় মিলনায়তন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
সকাল নয়টায় জাতীয় সংগীত এবং ভাষাশহিদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম এবং নবম-দশম—দুটি বিভাগে শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়। প্রতিযোগীদের জন্য ভাষা আন্দোলন, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধবিষয়ক পৃথক গদ্যাংশ নির্ধারণ করা হয় এবং লেখার জন্য চল্লিশ মিনিট সময় দেওয়া হয়। বিচারকমণ্ডলী অক্ষরের গঠন ও সমতা, শুদ্ধ বানান, শব্দ ও পঙ্ক্তির ব্যবধান, পরিচ্ছন্নতা এবং সামগ্রিক উপস্থাপনার ভিত্তিতে লেখা মূল্যায়ন করেন। প্রতিযোগিতা চলাকালে বাংলা লিপির সৌন্দর্য ও হাতের লেখা উন্নয়নের কৌশল নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বিকেলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ডিজিটাল যুগেও স্পষ্ট ও শুদ্ধ হাতের লেখা শিক্ষার্থীর মনোযোগ, ভাষাজ্ঞান, ধৈর্য ও সৃজনশীলতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। দুই বিভাগের প্রথম তিনজনকে বই, সনদ ও স্মারক দেওয়া হয়; সব অংশগ্রহণকারী প্রশংসাপত্র পায়। বিজয়ীদের নির্বাচিত লেখা বিদ্যালয়ের দেয়ালপত্রিকায় প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রধান শিক্ষকের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা এ ধরনের শিক্ষামূলক প্রতিযোগিতা নিয়মিত আয়োজনের দাবি জানান।
শুধু প্রাণ ও দৈহিক অস্তিত্ব মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে শ্রেষ্ঠ করে না। বিবেক, অনুভূতি, মানবিকতা ও নৈতিকতায় সমৃদ্ধ মনই একজন প্রাণীকে প্রকৃত মানুষে পরিণত করে।
সব জীবই খাদ্য গ্রহণ করে, বেড়ে ওঠে, আত্মরক্ষা করে এবং বংশবিস্তার করে। মানুষও এসব জৈব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, কিন্তু তার বিশেষত্ব হলো চিন্তাশীল মন। মন মানুষকে ভালো-মন্দ বিচার, অন্যের দুঃখ অনুভব, সত্য ও সৌন্দর্য উপলব্ধি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষমতা দেয়। এই মনের শক্তিতেই মানুষ ভাষা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প, আইন ও সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে। শুধু বুদ্ধি থাকলেই অবশ্য মনুষ্যত্ব পূর্ণ হয় না; সেই বুদ্ধির সঙ্গে বিবেক, সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ ও সংযম যুক্ত হওয়া চাই। যে ব্যক্তি নিজের স্বার্থে অন্যকে শোষণ করে, দুর্বলের কষ্টে উদাসীন থাকে বা জ্ঞানকে ধ্বংসের কাজে ব্যবহার করে, সে দৈহিকভাবে মানুষ হলেও মানবিক অর্থে মানুষ নয়। বিপরীতে যে ব্যক্তি অন্যের বিপদে এগিয়ে আসে, সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, ভুল স্বীকার করে এবং সকল জীবের মর্যাদা রক্ষা করে, তার মধ্যেই প্রকৃত মানুষের পরিচয় প্রকাশ পায়। মনকে শিক্ষা, সৎ সঙ্গ, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সেবার মাধ্যমে পরিশীলিত করতে হয়; না হলে লোভ, হিংসা ও অহংকার তার মানবিক শক্তিকে নষ্ট করে।
অতএব, প্রাণ মানুষকে জীবিত রাখে, কিন্তু উদার ও বিবেকবান মন তাকে মনুষ্যত্ব দান করে। মানবিক গুণের চর্চায় মনকে বিকশিত করতে পারলেই মানুষ নামের সত্য মর্যাদা অর্জিত হয়।
বিদ্যা মানুষের জ্ঞান বাড়ায়, কিন্তু চরিত্রহীন মানুষের হাতে সেই জ্ঞান কল্যাণের বদলে ক্ষতির অস্ত্র হতে পারে। তাই দুর্জন ব্যক্তি যত বিদ্বানই হোক, তার সঙ্গ ও প্রভাব থেকে দূরে থাকা উচিত।
সত্যবাদিতা, ন্যায়বোধ, সহমর্মিতা ও সংযমহীন মানুষই দুর্জন। উচ্চশিক্ষা বা বুদ্ধিমত্তা তার অসৎ প্রবৃত্তিকে সব সময় সংশোধন করে না; বরং কখনো সে জ্ঞানকে প্রতারণা, শোষণ ও অন্যায়কে আরও কৌশলী করতে ব্যবহার করে। বিষধর সাপের মাথায় মূল্যবান মণি আছে বলে কেউ তার সান্নিধ্য গ্রহণ করে না, কারণ মণির লোভে প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকে। তেমনি দুর্জনের কাছ থেকে কিছু জ্ঞান বা সুবিধা পাওয়া গেলেও তার সঙ্গ মানুষের চরিত্র, সুনাম ও নিরাপত্তার ক্ষতি করতে পারে। সঙ্গ মানুষের চিন্তা ও আচরণে গভীর প্রভাব ফেলে; অসৎ সঙ্গী ধীরে ধীরে অন্যকেও মিথ্যা, লোভ ও অনৈতিক কাজে অভ্যস্ত করে তোলে। বিপরীতে অল্পশিক্ষিত কিন্তু সৎ মানুষের সাহচর্য বিশ্বাস, শান্তি ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। তবে দুর্জনকে ঘৃণা করে অবিচার করা নয়; তার অন্যায় থেকে নিজেকে রক্ষা করা, প্রয়োজনে আইনসম্মত প্রতিবাদ করা এবং সংশোধনের সুযোগ দেওয়াই বিবেচকের কাজ।
অতএব, মানুষের মূল্য শুধু বিদ্যায় নয়, সেই বিদ্যার নৈতিক ব্যবহারে। চরিত্রহীন বিদ্বানের ক্ষতিকর সঙ্গ পরিত্যাগ করে সৎ ও কল্যাণপ্রবণ মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের পথ।
ভূমিকা
সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। হারানো অর্থ, স্বাস্থ্য বা সুযোগ কখনো আংশিকভাবে ফিরে পাওয়া গেলেও অতিবাহিত একটি মুহূর্ত আর ফিরে আসে না। নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করার অভ্যাসই সময়ানুবর্তিতা, আর সাফল্যময় ও শৃঙ্খলিত জীবনের অন্যতম ভিত্তি এই গুণ।
সময়ের স্বরূপ
সময় নদীর স্রোতের মতো অবিরাম বয়ে চলে; কারও জন্য অপেক্ষা করে না। প্রকৃতিতেও সময়ের শৃঙ্খলা স্পষ্ট—সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত, ঋতুপরিবর্তন, জোয়ার-ভাটা এবং ফসলের চক্র নির্দিষ্ট নিয়মে ঘটে। যথাসময়ে বীজ না বুনলে কৃষক কাঙ্ক্ষিত ফসল পান না। মানুষের কাজেও উপযুক্ত মুহূর্ত হারালে পরে অধিক শ্রম দিয়েও একই ফল পাওয়া কঠিন হয়।
ব্যক্তিজীবনে গুরুত্ব
সময়নিষ্ঠ ব্যক্তি কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন, পরিকল্পনা মেনে চলেন এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। ফলে তাঁর কাজের মান বাড়ে, মানসিক চাপ কমে এবং অন্যের আস্থা অর্জিত হয়। অফিস, চিকিৎসা, পরিবহন, ব্যবসা কিংবা সভা—সব ক্ষেত্রেই সময়মতো উপস্থিতি পারস্পরিক সম্মান ও দক্ষতার পরিচয়। দেরি করলে শুধু নিজের নয়, অন্যের মূল্যবান সময়ও নষ্ট হয়।
শিক্ষাজীবনে সময়ানুবর্তিতা
শিক্ষার্থীর সাফল্যে সময় ব্যবস্থাপনা বিশেষ জরুরি। নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, প্রতিদিনের পাঠ প্রতিদিন শেখা, পুনরাবৃত্তি, খেলাধুলা ও বিশ্রামের জন্য সুষম সময়সূচি তাকে সুস্থ ও প্রস্তুত রাখে। পরীক্ষার আগের রাতে সব পড়া শেষ করার চেষ্টা উদ্বেগ বাড়ায়, অথচ অল্প অল্প করে নিয়মিত পড়লে জ্ঞান স্থায়ী হয়। সময়নিষ্ঠ শিক্ষার্থী সহশিক্ষা কার্যক্রমেও অংশ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিকাশের সুযোগ পায়।
জাতীয় জীবনে গুরুত্ব
একটি জাতির মানুষের কর্মঘণ্টা, উৎপাদন ও সেবার সঙ্গে উন্নয়নের গতি সরাসরি যুক্ত। সরকারি দপ্তরে বিলম্ব, প্রকল্পের সময়ক্ষেপণ, যানবাহনের অনিয়ম ও বিচারকার্যের দীর্ঘসূত্রতা অর্থ ও জনবিশ্বাস নষ্ট করে। বিপরীতে সময়মতো সিদ্ধান্ত, নির্মাণ, উৎপাদন ও সেবা সম্পন্ন হলে ব্যয় কমে, বিনিয়োগ বাড়ে এবং নাগরিক জীবন গতিশীল হয়। উন্নত জাতিগুলোর অগ্রগতির পেছনে শ্রমের পাশাপাশি সময়ের প্রতি শ্রদ্ধাও গুরুত্বপূর্ণ।
সময় অপচয়ের ফল
অলসতা, লক্ষ্যহীন আড্ডা, অতিরিক্ত ঘুম এবং অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের অনেক কর্মক্ষম সময় কেড়ে নেয়। কাজ ফেলে রাখার অভ্যাস শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়া, ভুল, ব্যর্থতা ও হতাশার সৃষ্টি করে। যৌবনে সময় নষ্ট করলে পরিণত বয়সে অনুশোচনা করেও হারানো সম্ভাবনা ফিরিয়ে আনা যায় না।
সময়ানুবর্তী হওয়ার উপায়
প্রতিদিনের কাজ লিখে অগ্রাধিকার ঠিক করা, বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ, বড় কাজকে ছোট ধাপে ভাগ করা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা বাদ দেওয়া দরকার। ঘড়ি বা স্মারকের সহায়তা নেওয়া যায়, তবে আত্মশৃঙ্খলাই প্রধান। বিশ্রাম ও বিনোদনের সময়ও পরিকল্পনায় রাখতে হবে, কারণ ক্লান্ত শরীর ও মন কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না। পরিবার ও বিদ্যালয়ে ছোটবেলা থেকেই সময়মতো ঘুম, জাগরণ, পাঠ ও উপস্থিতির অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
উপসংহার
জীবন আসলে সীমিত সময়ের সমষ্টি। যে মানুষ প্রতিটি মুহূর্তকে লক্ষ্য, শ্রম ও শৃঙ্খলার সঙ্গে কাজে লাগায়, সে নিজের জীবনকে সমৃদ্ধ করে এবং সমাজেরও উপকার করে। তাই সময়কে সম্মান করা এবং সময়ের কাজ সময়ে সম্পন্ন করাই সাফল্যের নিশ্চিত পথ।
ভূমিকা
কৃষি মানুষের খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং গ্রামীণ জীবিকার প্রধান ভিত্তি। একসময় কৃষিকাজ সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতি, কায়িক শ্রম ও প্রথাগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগ কৃষিকে এখন অধিক উৎপাদনশীল, সাশ্রয়ী, ঝুঁকিসহনীয় ও বাজারমুখী কর্মকাণ্ডে রূপান্তর করছে।
প্রথাগত কৃষির সীমাবদ্ধতা
দেশি বীজ, কাঠের লাঙল, অনিয়ন্ত্রিত সেচ এবং অনুমাননির্ভর সার ব্যবহারে উৎপাদন কম ও অনিশ্চিত ছিল। খরা, বন্যা, রোগবালাই বা পোকামাকড়ের আক্রমণে পুরো ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত। ফসল কাটা, মাড়াই, সংরক্ষণ ও পরিবহনে বেশি সময় ও শ্রম লাগত এবং অপচয়ও হতো প্রচুর।
উন্নত বীজ ও কৃষি গবেষণা
উদ্ভিদ প্রজনন ও গবেষণার মাধ্যমে উচ্চফলনশীল, স্বল্পমেয়াদি, লবণাক্ততা-, খরা- ও জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। মানসম্মত বীজ একই জমিতে বেশি ও নির্ভরযোগ্য ফলন দিতে পারে। রোগ শনাক্তকরণ, টিস্যু কালচার, নিরাপদ চারা উৎপাদন এবং স্থানীয় জাতের জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণেও বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন জাত ব্যবহারের আগে অঞ্চল, মাটি ও ঋতুর উপযোগিতা যাচাই করা দরকার।
মাটি, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা
মাটি পরীক্ষা করে অম্লতা, পুষ্টি ও জৈব পদার্থের অবস্থা জানা যায়; সে অনুযায়ী সুষম সার দিলে খরচ ও পরিবেশদূষণ কমে। কম্পোস্ট, সবুজ সার ও জীবাণুসারের সঙ্গে পরিমিত রাসায়নিক সার ব্যবহার মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে। গভীর ও অগভীর নলকূপ, সেচপাম্প, সৌরচালিত পাম্প, ড্রিপ ও স্প্রিংকলার প্রযুক্তি প্রয়োজনমতো পানি সরবরাহ করে। পানি ধরে রাখা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও সেচের সময়সূচি নির্ধারণ জলসম্পদের অপচয় কমায়।
কৃষিযান্ত্রিকীকরণ
পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, বীজবপন যন্ত্র, ধান রোপণযন্ত্র, রিপার, কম্বাইন হারভেস্টার ও মাড়াইযন্ত্র অল্প সময়ে বেশি কাজ করতে সাহায্য করে। শ্রমিকের সংকটকালে দ্রুত ফসল কেটে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগেই ঘরে তোলা যায়। ছোট ও খণ্ডিত জমির উপযোগী যন্ত্র, সমবায়ভিত্তিক ব্যবহার ও ভাড়াকেন্দ্র কৃষকের ব্যয় কমাতে পারে।
রোগবালাই ও পোকা দমন
বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় উপকারী পোকা রক্ষা করে জৈব, যান্ত্রিক ও সীমিত রাসায়নিক পদ্ধতিতে ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। রোগসহিষ্ণু জাত, পরিচ্ছন্ন বীজ, ফসল পর্যায়ক্রম এবং ফেরোমন ফাঁদ কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমায়। নির্বিচার কীটনাশক মানুষ, মাটি, পানি ও পরাগবাহী পোকাকে ক্ষতি করে; তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও নিরাপদ বিরতি মেনে ব্যবহার জরুরি।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি
আবহাওয়ার পূর্বাভাস কৃষককে বপন, সেচ, সার ও ফসল কাটার সময় নির্ধারণে সহায়তা করে। মোবাইল ফোন, কৃষি কলসেন্টার ও অনলাইন সেবায় রোগের ছবি পাঠিয়ে পরামর্শ, বাজারদর এবং দুর্যোগের সতর্কতা পাওয়া যায়। উপগ্রহচিত্র, ড্রোন ও ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা বড় এলাকায় ফসলের স্বাস্থ্য, আর্দ্রতা ও ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ
উন্নত গুদাম, শীতাগার, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং এবং শীতল পরিবহন ফসল কাটার পরের অপচয় কমায়। দুধ শীতলীকরণ, মাছ ও মাংসের কোল্ড চেইন এবং ফল-সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ কৃষিপণ্যের মূল্য ও স্থায়িত্ব বাড়ায়। ডিজিটাল বাজারতথ্য কৃষককে ন্যায্য দাম বুঝতে এবং সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশে সুফল ও চ্যালেঞ্জ
বৈজ্ঞানিক কৃষিতে ধান, সবজি, ফল, মাছ, পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদের উৎপাদন বেড়েছে এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ক্ষুদ্র জমি, যন্ত্রের উচ্চমূল্য, মানসম্মত বীজের অভাব, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং ঋণ ও বাজারের সীমাবদ্ধতা প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধা দেয়। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি, সার ও কীটনাশক ব্যবহার পরিবেশ ও মাটির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে।
করণীয়
কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণের সংযোগ শক্তিশালী করে উদ্ভাবন সহজ ভাষায় কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হবে। স্বল্পসুদে ঋণ, যন্ত্র ভাড়া, মানসম্মত উপকরণ, ফসলবিমা, সংরক্ষণাগার এবং ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা দরকার। নারী ও তরুণ কৃষককে প্রশিক্ষণ, ভূমি ও প্রযুক্তিতে সমান সুযোগ দিতে হবে। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষাকারী টেকসই কৃষিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
উপসংহার
বিজ্ঞান কৃষকের অভিজ্ঞতার বিকল্প নয়; বরং সেই অভিজ্ঞতাকে তথ্য, যন্ত্র ও গবেষণার শক্তিতে সমৃদ্ধ করে। বিজ্ঞানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব কৃষি সবার নাগালে পৌঁছাতে পারলে বাংলাদেশ খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের মর্যাদা ও টেকসই অর্থনীতিতে আরও এগিয়ে যাবে।
ভূমিকা
মাদকাসক্তি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য এক সর্বনাশা সমস্যা। যে তরুণ সমাজ দেশের ভবিষ্যৎ, মাদকের করাল গ্রাস তাদের স্বাস্থ্য, মেধা ও কর্মক্ষমতা ধ্বংস করে জাতীয় উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করে। তাই মাদক সম্পর্কে সচেতনতা, প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সমন্বিত ব্যবস্থা জরুরি।
মাদক ও মাদকাসক্তি
যেসব প্রাকৃতিক বা রাসায়নিক পদার্থ গ্রহণে সাময়িক উত্তেজনা, অবসাদ বা চেতনার পরিবর্তন ঘটে এবং বারবার গ্রহণের তীব্র নির্ভরতা তৈরি হয়, সেগুলো মাদক। চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে কিছু মাদকজাত উপাদান ওষুধ হিসেবে কাজে লাগলেও অপব্যবহার দেহ ও মনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মাদকের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্ভরতার অবস্থাই মাদকাসক্তি।
মাদকাসক্তির কারণ
কৌতূহল, সঙ্গদোষ, পারিবারিক অশান্তি, হতাশা, বেকারত্ব, ব্যর্থতা ও নিঃসঙ্গতা থেকে অনেকে প্রথম মাদক গ্রহণ করে। কেউ ভুলভাবে একে আধুনিকতা বা সাহসের পরিচয় মনে করে। পরিবারে নজরদারি ও স্নেহের অভাব, সুস্থ বিনোদনের স্বল্পতা এবং মাদকের সহজলভ্যতা ঝুঁকি বাড়ায়। অসাধু ব্যবসায়ীচক্র তরুণদের লক্ষ্য করে মাদক ছড়িয়ে বিপুল অবৈধ মুনাফা অর্জন করে।
শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি
দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণে মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, যকৃৎ, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষুধা, ঘুম, স্মৃতি, বিচারবোধ ও কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়; উদ্বেগ, বিষণ্নতা, সন্দেহপ্রবণতা ও সহিংস আচরণ দেখা দিতে পারে। একই মাদক থেকে আগের অনুভূতি পেতে ক্রমে বেশি মাত্রা দরকার হয় এবং হঠাৎ বন্ধ করলে তীব্র প্রত্যাহারজনিত সমস্যা সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত মাত্রা মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
পরিবার ও সমাজে প্রভাব
আসক্ত ব্যক্তি পড়াশোনা বা কর্মক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা ও মাদক কেনার ব্যয়ে পরিবার অর্থসংকটে পড়ে। অর্থ জোগাতে কেউ চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা বা সহিংস অপরাধে জড়ায়। পরিবারে অবিশ্বাস, কলহ ও নির্যাতন বাড়ে; শিশুদের নিরাপত্তা ও শিক্ষা ব্যাহত হয়। মাদক ব্যবসা দুর্নীতি, চোরাচালান ও সংগঠিত অপরাধকে শক্তিশালী করে সমাজের শান্তি নষ্ট করে।
প্রতিরোধের উপায়
সীমান্ত, পরিবহন ও বিপণনচক্রে কঠোর নজরদারি এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা, জীবনদক্ষতা শিক্ষা ও পরামর্শসেবা চালু করতে হবে। পরিবারকে সন্তানের আচরণ, মানসিক পরিবর্তন ও বন্ধুবৃত্তের প্রতি যত্নশীল হতে হবে; তবে সন্দেহ বা অপমান নয়, আস্থা ও খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ গড়তে হবে। খেলাধুলা, পাঠাগার, সংস্কৃতিচর্চা, স্বেচ্ছাসেবা এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান তরুণদের সুস্থ জীবনে যুক্ত রাখে। গণমাধ্যমকে মাদকের ক্ষতি তুলে ধরতে হবে, কিন্তু মাদক গ্রহণকে আকর্ষণীয় করে এমন উপস্থাপনা এড়াতে হবে।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন
মাদকাসক্তি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা; শুধু শাস্তি বা ঘৃণায় এর সমাধান হয় না। প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে শারীরিক চিকিৎসা, মনোসামাজিক পরামর্শ, প্রয়োজনে ওষুধ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন দরকার। চিকিৎসার পর পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা, শিক্ষা বা কর্মে পুনঃসংযোগ এবং নিয়মিত অনুসরণ আসক্তিকে ফিরে আসা থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। অননুমোদিত বা নির্যাতনমূলক কেন্দ্রের বদলে মানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থী ও যুবসমাজের ভূমিকা
প্রথম প্রস্তাবেই দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলা, মাদকাসক্ত বন্ধুকে গোপনে উৎসাহ না দিয়ে বিশ্বস্ত অভিভাবক বা পরামর্শকের সাহায্য নেওয়া এবং মাদকবিরোধী সচেতনতায় অংশ নেওয়া তরুণদের কর্তব্য। আত্মমর্যাদা, সঠিক বন্ধু নির্বাচন ও জীবনের ইতিবাচক লক্ষ্য মাদকের প্রলোভন থেকে রক্ষা করে।
উপসংহার
মাদক নির্মূল কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়; পরিবার, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত দায়িত্ব। সরবরাহ বন্ধ, ঝুঁকির কারণ দূর, সময়মতো চিকিৎসা এবং সুস্থ জীবনের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারলেই মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও কর্মক্ষম বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
অন্যকে কোনো নীতি বা আদর্শ অনুসরণের উপদেশ দেওয়ার আগে নিজের জীবনে তা পালন করতে হয়। কথার চেয়ে ব্যক্তিগত দৃষ্টান্ত মানুষকে অনেক বেশি প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করে।
উপদেশ দেওয়া সহজ, কিন্তু তা নিজে পালন করা কঠিন। যে ব্যক্তি সততার কথা বলেন অথচ নিজে অসৎ কাজ করেন, কিংবা ধূমপান ত্যাগের পরামর্শ দিয়েও নিজে ধূমপান করেন, তাঁর কথা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয় না। বিপরীতে শিক্ষক সময়নিষ্ঠ হলে শিক্ষার্থীরা সময়ের মূল্য শেখে; অভিভাবক সত্যবাদী হলে সন্তানও সত্য বলার প্রেরণা পায়। ইতিহাসের মহৎ নেতা ও সমাজসংস্কারকেরা শুধু মুখে আদর্শ প্রচার করেননি, নিজেদের ত্যাগ ও আচরণের মাধ্যমে সেই আদর্শের কার্যকারিতা দেখিয়েছেন। তাঁদের জীবন তাই মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য শিক্ষায় পরিণত হয়েছে। নিজের দুর্বলতা সংশোধন না করে অন্যের ত্রুটি নির্দেশ করলে তা ভণ্ডামি বলে মনে হয় এবং ভালো উপদেশও গুরুত্ব হারায়। তাই যে নীতি শেখাতে চাই, প্রথমে আত্মসংযম ও সাধনার মাধ্যমে সেটি নিজের চরিত্রে প্রতিষ্ঠা করা দরকার। তখন আচরণ ও কথার সামঞ্জস্য উপদেশকে শক্তিশালী করে এবং অন্যকে আন্তরিকভাবে তা অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করে।
সুতরাং, আদর্শ প্রচারের শ্রেষ্ঠ উপায় হলো আদর্শ জীবনযাপন। নিজে যা পালন করি, কেবল তা-ই অন্যকে শেখালে ব্যক্তি ও সমাজে সত্যিকার নৈতিক পরিবর্তন সম্ভব হয়।
মানুষের জীবনে সুখ ও দুঃখ কোনোটিই চিরস্থায়ী নয়। দুঃসময়ের অন্ধকারের আড়ালেই সুসময়ের আলো অপেক্ষা করে; তাই বিপদ দেখে ভয় না পেয়ে আশা, সাহস ও ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে হয়।
মেঘে ঢেকে গেলে সূর্য বা চাঁদকে সাময়িকভাবে দেখা যায় না, কিন্তু মেঘ তাদের অস্তিত্ব মুছে দিতে পারে না। কিছুক্ষণ পর মেঘ সরে গেলে আলো আবার পৃথিবীকে উজ্জ্বল করে। মানুষের জীবনেও ব্যর্থতা, রোগ, দারিদ্র্য, শোক ও নানা সংকট কালো মেঘের মতো আসে। তখন দুর্বলচিত্ত মানুষ মনে করে, এই দুঃখ আর শেষ হবে না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে প্রতিকূল অবস্থাও বদলে যায়। যে ব্যক্তি হতাশ না হয়ে সমস্যার কারণ বোঝে, যথাযথ চেষ্টা চালায় এবং প্রয়োজনে অন্যের সাহায্য গ্রহণ করে, সে ধীরে ধীরে সংকট অতিক্রম করতে পারে। ইতিহাসে বহু মানুষ পরাজয়, কারাবরণ বা অভাবের মধ্যেও আশা হারাননি; অধ্যবসায়ের ফলে তাঁরাই সাফল্য অর্জন করেছেন। তাই বিপদের সময় অবিবেচক সিদ্ধান্ত না নিয়ে আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম ও নৈতিকতা বজায় রাখা দরকার। সুখের সময়েও অহংকারী না হয়ে মনে রাখতে হবে যে জীবনের অবস্থা পরিবর্তনশীল।
অতএব, দুঃসময়কে স্থায়ী ভেবে ভেঙে পড়া উচিত নয়। ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে বাধা মোকাবিলা করলে অন্ধকার কেটে যায় এবং জীবনে পুনরায় আশা, সাফল্য ও আনন্দের আলো ফিরে আসে।
ভূমিকা
উৎসব মানুষের দৈনন্দিন শ্রম ও একঘেয়েমির মধ্যে আনন্দ, মিলন ও নবজাগরণের বার্তা আনে। নদীমাতৃক, কৃষিনির্ভর ও বহু ধর্ম-সংস্কৃতির দেশ বাংলাদেশে জাতীয়, ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঋতুভিত্তিক নানা উৎসব পালিত হয়। এসব উৎসব বাঙালির ইতিহাস, বিশ্বাস, জীবনযাত্রা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রাণবন্ত পরিচয় বহন করে।
উৎসবের বৈচিত্র্য
বাংলাদেশের উৎসবগুলোকে প্রধানত জাতীয়, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও লোকজ উৎসবে ভাগ করা যায়। কোনো উৎসব শোক ও শ্রদ্ধার, কোনোটি বিজয় ও আনন্দের, আবার কোনোটি ফসল, ঋতু বা পারিবারিক বন্ধনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ভিন্ন উৎসে জন্ম নিলেও অধিকাংশ উৎসব মানুষকে একত্র করে এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বাড়ায়।
শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষাশহিদদের স্মরণ ও সব মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার দিন। ভোরে খালি পায়ে প্রভাতফেরি, জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা, শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি পালিত হয়। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী মর্যাদা লাভ করেছে।
স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস
ছাব্বিশে মার্চ স্বাধীনতা দিবস এবং ষোলোই ডিসেম্বর বিজয় দিবস বাংলাদেশের দুটি প্রধান জাতীয় উৎসব। স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, কুচকাওয়াজ, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের শহিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করা হয়। এসব দিন নাগরিককে স্বাধীনতার মূল্য, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেয়।
বাংলা নববর্ষ
পয়লা বৈশাখ বাঙালির সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব। পুরোনো বছরের গ্লানি ভুলে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে মানুষ বৈশাখী শোভাযাত্রা, মেলা, গান, নৃত্য ও লোকজ আয়োজনে অংশ নেয়। ব্যবসায়ীরা হালখাতা খোলেন এবং গ্রামাঞ্চলে নানা খেলাধুলা ও মেলার আয়োজন হয়। ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণিনির্বিশেষে অংশগ্রহণের কারণে নববর্ষ অসাম্প্রদায়িক বাঙালি পরিচয়ের শক্তিশালী প্রতীক।
ধর্মীয় উৎসব
মুসলমানদের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা বাংলাদেশের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম। নামাজ, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ, সেমাই ও খাবার ভাগ করা, ফিতরা ও কোরবানির মাংস বিতরণের মাধ্যমে আনন্দ ও সহমর্মিতা প্রকাশ পায়। হিন্দু সম্প্রদায় দুর্গাপূজা, সরস্বতীপূজা ও জন্মাষ্টমী; বৌদ্ধ সম্প্রদায় বুদ্ধপূর্ণিমা; খ্রিষ্টান সম্প্রদায় বড়দিন ও ইস্টার পালন করে। প্রতিবেশীরা পরস্পরের উৎসবে শুভেচ্ছা ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি দৃঢ় হয়।
কৃষি ও লোকজ উৎসব
অগ্রহায়ণে নতুন ধান ঘরে তোলাকে কেন্দ্র করে নবান্ন উৎসব পালিত হয়। নতুন চালের পিঠা, পায়েস, গান ও মেলায় কৃষকের শ্রমের সাফল্য উদযাপিত হয়। পৌষমেলা, পিঠা উৎসব, নৌকাবাইচ, বলীখেলা এবং বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রামীণ মেলা লোকসংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখে। পাহাড়ি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বৈসাবি, বিজু, সাংগ্রাইসহ বর্ষবিদায় ও নববর্ষের উৎসব বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে।
সামাজিক ও পারিবারিক উৎসব
বিবাহ, জন্মদিন, অন্নপ্রাশন, আকিকা এবং নানা পারিবারিক অনুষ্ঠান আত্মীয়তা ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে। বিদ্যালয়ের নবীনবরণ, বিদায়-সংবর্ধনা, বইমেলা ও ক্রীড়া-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও মানুষের সৃজনশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ায়।
অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
উৎসবকে কেন্দ্র করে পোশাক, খাদ্য, হস্তশিল্প, পরিবহন, পর্যটন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। কারিগর, কৃষক, শিল্পী ও উদ্যোক্তারা আয়ের সুযোগ পান। লোকগান, নৃত্য, কারুশিল্প ও আঞ্চলিক খাবারের চর্চা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়। উৎসব তাই আনন্দের পাশাপাশি ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও অর্থনীতিরও চালিকাশক্তি।
সমস্যা ও করণীয়
অতিরিক্ত বাণিজ্যিকতা, অপচয়, উচ্চ শব্দ, যানজট, খাদ্যে ভেজাল, প্লাস্টিক বর্জ্য ও নিরাপত্তাহীনতা উৎসবের আনন্দ নষ্ট করতে পারে। কখনো গুজব বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষও সম্প্রীতির জন্য হুমকি হয়ে ওঠে। তাই আইনশৃঙ্খলা, অগ্নিনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, পরিবেশবান্ধব সাজসজ্জা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। আড়ম্বরের প্রতিযোগিতা না করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া উচিত।
উপসংহার
বাংলাদেশের উৎসব বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের উজ্জ্বল প্রকাশ। ইতিহাসের স্মৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, কৃষিজীবন ও লোকঐতিহ্যকে ধারণ করে এসব উৎসব মানুষকে কাছাকাছি আনে। সম্প্রীতি, সংযম, নিরাপত্তা ও পরিবেশসচেতনতার সঙ্গে উৎসব পালন করলেই তা সত্যিকার অর্থে জাতীয় জীবনকে আনন্দময় ও মানবিক করে তুলবে।
ভূমিকা
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সম্পদস্বল্প বাংলাদেশকে অনেকে সম্ভাবনাহীন মনে করেছিল। কিন্তু মানুষের শ্রম, মেধা, সাহস ও সৃজনশীলতায় দেশ বারবার সংকট অতিক্রম করে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই ধারাবাহিক সাফল্যই বাংলাদেশের অদম্য অগ্রযাত্রার পরিচয়।
স্বাধীনতা থেকে উন্নয়নের যাত্রা
১৯৭১ সালে অবকাঠামো, উৎপাদনব্যবস্থা ও অর্থনীতি বিপর্যস্ত অবস্থায় স্বাধীন বাংলাদেশের পথচলা শুরু হয়। সীমিত সম্পদ নিয়েও কৃষি পুনর্গঠন, শিক্ষার প্রসার, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দারিদ্র্যের বাধা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ উৎপাদন ও উন্নয়নের চাকা সচল রেখেছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে বিশ্বে নতুন আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দিয়েছে।
কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা
উন্নত বীজ, সেচ, কৃষিযন্ত্র, গবেষণা ও কৃষকের পরিশ্রমে খাদ্য উৎপাদন বহুগুণ বেড়েছে। ধান, সবজি, মাছ, ফল ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে অগ্রগতি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী করেছে। অল্প জমিতে অধিক উৎপাদন এবং দুর্যোগসহিষ্ণু ফসল উদ্ভাবন বাংলাদেশের কৃষিকে নতুন সক্ষমতা দিয়েছে।
শিল্প ও অর্থনীতি
তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের প্রধান শক্তিগুলোর একটি। প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো অর্থ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, ওষুধ, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য শিল্প অর্থনীতিকে বহুমুখী করছে। নারীর ব্যাপক কর্মঅংশগ্রহণ পরিবার ও জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও যোগাযোগের উন্নতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অবকাঠামো ও প্রযুক্তি
পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। মেট্রোরেল, মহাসড়ক, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু নির্মাণ মানুষের যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহন সহজ করছে। মোবাইল যোগাযোগ, ইন্টারনেট, অনলাইন শিক্ষা, মোবাইল আর্থিক সেবা ও ডিজিটাল সরকারি সেবা নাগরিক জীবনে গতি এনেছে। মহাকাশে নিজস্ব যোগাযোগ উপগ্রহ পাঠানো প্রযুক্তিগত সক্ষমতারও প্রতীক।
মানব উন্নয়ন
প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ, নারীশিক্ষা, টিকাদান, মাতৃ ও শিশুসেবা, নিরাপদ পানি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা মানুষের জীবনমান উন্নত করেছে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও শান্তিরক্ষায় অবদানও বিশ্বে দেশের মর্যাদা বাড়িয়েছে।
চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
অগ্রগতির পাশাপাশি বেকারত্ব, দুর্নীতি, বৈষম্য, মূল্যস্ফীতি, যানজট, দূষণ, মানসম্মত শিক্ষার ঘাটতি ও জলবায়ু পরিবর্তন বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নয়নকে টেকসই করতে সুশাসন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, দক্ষ জনশক্তি, গবেষণা, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়নের সুফল যেন অঞ্চল ও শ্রেণি নির্বিশেষে সবার কাছে পৌঁছে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
উপসংহার
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পরিশ্রমী ও সংগ্রামী মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সততা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সম্মিলিত উদ্যোগে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলে অদম্য অগ্রযাত্রা আরও বেগবান হবে এবং বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
ভূমিকা
মাদকাসক্তি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য এক সর্বনাশা সমস্যা। যে তরুণ সমাজ দেশের ভবিষ্যৎ, মাদকের করাল গ্রাস তাদের স্বাস্থ্য, মেধা ও কর্মক্ষমতা ধ্বংস করে জাতীয় উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করে। তাই মাদক সম্পর্কে সচেতনতা, প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সমন্বিত ব্যবস্থা জরুরি।
মাদক ও মাদকাসক্তি
যেসব প্রাকৃতিক বা রাসায়নিক পদার্থ গ্রহণে সাময়িক উত্তেজনা, অবসাদ বা চেতনার পরিবর্তন ঘটে এবং বারবার গ্রহণের তীব্র নির্ভরতা তৈরি হয়, সেগুলো মাদক। চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে কিছু মাদকজাত উপাদান ওষুধ হিসেবে কাজে লাগলেও অপব্যবহার দেহ ও মনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মাদকের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্ভরতার অবস্থাই মাদকাসক্তি।
মাদকাসক্তির কারণ
কৌতূহল, সঙ্গদোষ, পারিবারিক অশান্তি, হতাশা, বেকারত্ব, ব্যর্থতা ও নিঃসঙ্গতা থেকে অনেকে প্রথম মাদক গ্রহণ করে। কেউ ভুলভাবে একে আধুনিকতা বা সাহসের পরিচয় মনে করে। পরিবারে নজরদারি ও স্নেহের অভাব, সুস্থ বিনোদনের স্বল্পতা এবং মাদকের সহজলভ্যতা ঝুঁকি বাড়ায়। অসাধু ব্যবসায়ীচক্র তরুণদের লক্ষ্য করে মাদক ছড়িয়ে বিপুল অবৈধ মুনাফা অর্জন করে।
শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি
দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণে মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, যকৃৎ, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষুধা, ঘুম, স্মৃতি, বিচারবোধ ও কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়; উদ্বেগ, বিষণ্নতা, সন্দেহপ্রবণতা ও সহিংস আচরণ দেখা দিতে পারে। একই মাদক থেকে আগের অনুভূতি পেতে ক্রমে বেশি মাত্রা দরকার হয় এবং হঠাৎ বন্ধ করলে তীব্র প্রত্যাহারজনিত সমস্যা সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত মাত্রা মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
পরিবার ও সমাজে প্রভাব
আসক্ত ব্যক্তি পড়াশোনা বা কর্মক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা ও মাদক কেনার ব্যয়ে পরিবার অর্থসংকটে পড়ে। অর্থ জোগাতে কেউ চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা বা সহিংস অপরাধে জড়ায়। পরিবারে অবিশ্বাস, কলহ ও নির্যাতন বাড়ে; শিশুদের নিরাপত্তা ও শিক্ষা ব্যাহত হয়। মাদক ব্যবসা দুর্নীতি, চোরাচালান ও সংগঠিত অপরাধকে শক্তিশালী করে সমাজের শান্তি নষ্ট করে।
প্রতিরোধের উপায়
সীমান্ত, পরিবহন ও বিপণনচক্রে কঠোর নজরদারি এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা, জীবনদক্ষতা শিক্ষা ও পরামর্শসেবা চালু করতে হবে। পরিবারকে সন্তানের আচরণ, মানসিক পরিবর্তন ও বন্ধুবৃত্তের প্রতি যত্নশীল হতে হবে; তবে সন্দেহ বা অপমান নয়, আস্থা ও খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ গড়তে হবে। খেলাধুলা, পাঠাগার, সংস্কৃতিচর্চা, স্বেচ্ছাসেবা এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান তরুণদের সুস্থ জীবনে যুক্ত রাখে। গণমাধ্যমকে মাদকের ক্ষতি তুলে ধরতে হবে, কিন্তু মাদক গ্রহণকে আকর্ষণীয় করে এমন উপস্থাপনা এড়াতে হবে।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন
মাদকাসক্তি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা; শুধু শাস্তি বা ঘৃণায় এর সমাধান হয় না। প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে শারীরিক চিকিৎসা, মনোসামাজিক পরামর্শ, প্রয়োজনে ওষুধ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন দরকার। চিকিৎসার পর পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা, শিক্ষা বা কর্মে পুনঃসংযোগ এবং নিয়মিত অনুসরণ আসক্তিকে ফিরে আসা থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। অননুমোদিত বা নির্যাতনমূলক কেন্দ্রের বদলে মানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থী ও যুবসমাজের ভূমিকা
প্রথম প্রস্তাবেই দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলা, মাদকাসক্ত বন্ধুকে গোপনে উৎসাহ না দিয়ে বিশ্বস্ত অভিভাবক বা পরামর্শকের সাহায্য নেওয়া এবং মাদকবিরোধী সচেতনতায় অংশ নেওয়া তরুণদের কর্তব্য। আত্মমর্যাদা, সঠিক বন্ধু নির্বাচন ও জীবনের ইতিবাচক লক্ষ্য মাদকের প্রলোভন থেকে রক্ষা করে।
উপসংহার
মাদক নির্মূল কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়; পরিবার, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত দায়িত্ব। সরবরাহ বন্ধ, ঝুঁকির কারণ দূর, সময়মতো চিকিৎসা এবং সুস্থ জীবনের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারলেই মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও কর্মক্ষম বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
১৫ই জুন ২০২৩
বরিশাল
প্রিয় রাকিব,
আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা নিও। আশা করি ভালো আছ। গত সপ্তাহে একটি ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণের যে আনন্দময় অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা তোমাকে জানাতে আজ লিখছি।
বিদ্যালয়ের শিক্ষা সফরে আমরা কুমিল্লার ময়নামতি শালবন বিহার দেখতে গিয়েছিলাম। খুব ভোরে বরিশাল থেকে বাসে রওনা হয়ে সকালে সেখানে পৌঁছাই। লালমাই-ময়নামতি অঞ্চলের সবুজ উঁচু ভূমির মধ্যে অবস্থিত এ প্রত্নস্থল একসময়ের প্রাচীন বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ। প্রবেশের পর চারদিকে সারিবদ্ধ ভিক্ষুকক্ষ, মাঝখানে কেন্দ্রীয় মন্দিরের ভিত্তি, ইটের অলংকরণ ও পুরোনো স্থাপনার বিন্যাস দেখে আমরা বিস্মিত হই। একজন পথপ্রদর্শক খননে পাওয়া পোড়ামাটির ফলক, মুদ্রা, শিলালিপি ও অন্যান্য নিদর্শনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝিয়ে দেন। পাশের ময়নামতি জাদুঘরে সংরক্ষিত মূর্তি, ধাতব সামগ্রী, মুদ্রা ও টেরাকোটা দেখে সে সময়ের ধর্ম, শিল্প ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাই। পাঠ্যবইয়ে পড়া ইতিহাসকে চোখের সামনে দেখতে পাওয়ার অনুভূতি ছিল অসাধারণ। পরিষ্কার পরিবেশ ও নীরব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও ভ্রমণকে আনন্দদায়ক করেছে। ফেরার পথে মনে হয়েছে, অতীতের পরিচয় বহনকারী এসব পুরাকীর্তি রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
সুযোগ পেলে তুমিও স্থানটি দেখে এসো। তোমার মা-বাবাকে আমার সালাম দেবে।
ইতি
তোমার বন্ধু
সুমন
১৫ই জুন ২০২৩
প্রধান শিক্ষক
রংপুর উচ্চ বিদ্যালয়
রংপুর
মাধ্যম: শ্রেণিশিক্ষক, দশম শ্রেণি
বিষয়: অনুপস্থিতির কারণে ছুটি মঞ্জুরের আবেদন।
মহোদয়,
বিনীত নিবেদন এই যে, আমি আপনার বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির একজন নিয়মিত শিক্ষার্থী। হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় গত ১১ই জুন থেকে ১৩ই জুন ২০২৩ পর্যন্ত তিন দিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকতে পারিনি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশ্রাম গ্রহণের পর বর্তমানে আমি সুস্থ হয়ে পুনরায় শ্রেণিকক্ষে যোগ দিয়েছি। অনুপস্থিত সময়ের পাঠ ও শ্রেণিকাজ সহপাঠীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছি। আমার উপস্থিতির রেকর্ডে যেন উল্লিখিত দিনগুলো অনুমোদিত ছুটি হিসেবে গণ্য হয়, সে জন্য এই আবেদন করছি।
অতএব, আমার অনিচ্ছাকৃত অনুপস্থিতির উল্লিখিত তিন দিনের ছুটি মঞ্জুর করার জন্য আপনার সদয় অনুমতি কামনা করছি।
বিনীত
সাহেদ
শ্রেণি: দশম
শাখা: ক
রোল: ১২
সংযুক্তি: চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রের অনুলিপি।
মানুষের জীবনের সার্থকতা দীর্ঘ আয়ুতে নয়, মানবকল্যাণমূলক ও মহৎ কর্মে। যে ব্যক্তি নিজের কাজের দ্বারা দেশ, সমাজ ও মানুষের উপকার করেন, তিনি মৃত্যুর পরও মানুষের স্মৃতি ও ভালোবাসায় বেঁচে থাকেন।
মানুষ মরণশীল; তাই কেবল বহু বছর বেঁচে থাকলেই জীবন অর্থবহ হয় না। অনেকে দীর্ঘ জীবন লাভ করেও এমন কোনো কাজ করেন না, যার জন্য পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের স্মরণ করবে। বিপরীতে স্বল্পায়ু বহু মানুষ জ্ঞান, সাহিত্য, বিজ্ঞান, স্বাধীনতা ও মানবসেবায় অসামান্য অবদান রেখে চিরস্মরণীয় হয়েছেন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেও তাঁর সৃষ্টির জন্য আজও স্মরণীয়। ভাষাশহিদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং দেশের জন্য আত্মোৎসর্গকারী অসংখ্য তরুণ তাঁদের কর্ম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে অমর হয়েছেন। মানুষের দেহের জীবন সীমিত, কিন্তু একটি সৎ কাজ সমাজে নতুন কাজের অনুপ্রেরণা জাগায় এবং তার প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তৃত হয়। তাই অলস দীর্ঘায়ুর চেয়ে অল্প সময়ের কর্মময়, সৎ ও কল্যাণকর জীবন অনেক বেশি মূল্যবান।
অতএব, বয়সের সংখ্যা নয়, কর্মের গুণ ও কল্যাণকর প্রভাবই মানুষের প্রকৃত পরিচয়। মহৎ কর্মে জীবনকে পূর্ণ করতে পারলেই মানুষ মৃত্যুকে অতিক্রম করে স্মরণীয় ও চিরজীবী হয়ে থাকে।
মানুষের জীবনে সুখ ও দুঃখ কোনোটিই চিরস্থায়ী নয়। দুঃসময়ের অন্ধকারের আড়ালেই সুসময়ের আলো অপেক্ষা করে; তাই বিপদ দেখে ভয় না পেয়ে আশা, সাহস ও ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে হয়।
মেঘে ঢেকে গেলে সূর্য বা চাঁদকে সাময়িকভাবে দেখা যায় না, কিন্তু মেঘ তাদের অস্তিত্ব মুছে দিতে পারে না। কিছুক্ষণ পর মেঘ সরে গেলে আলো আবার পৃথিবীকে উজ্জ্বল করে। মানুষের জীবনেও ব্যর্থতা, রোগ, দারিদ্র্য, শোক ও নানা সংকট কালো মেঘের মতো আসে। তখন দুর্বলচিত্ত মানুষ মনে করে, এই দুঃখ আর শেষ হবে না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে প্রতিকূল অবস্থাও বদলে যায়। যে ব্যক্তি হতাশ না হয়ে সমস্যার কারণ বোঝে, যথাযথ চেষ্টা চালায় এবং প্রয়োজনে অন্যের সাহায্য গ্রহণ করে, সে ধীরে ধীরে সংকট অতিক্রম করতে পারে। ইতিহাসে বহু মানুষ পরাজয়, কারাবরণ বা অভাবের মধ্যেও আশা হারাননি; অধ্যবসায়ের ফলে তাঁরাই সাফল্য অর্জন করেছেন। তাই বিপদের সময় অবিবেচক সিদ্ধান্ত না নিয়ে আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম ও নৈতিকতা বজায় রাখা দরকার। সুখের সময়েও অহংকারী না হয়ে মনে রাখতে হবে যে জীবনের অবস্থা পরিবর্তনশীল।
অতএব, দুঃসময়কে স্থায়ী ভেবে ভেঙে পড়া উচিত নয়। ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে বাধা মোকাবিলা করলে অন্ধকার কেটে যায় এবং জীবনে পুনরায় আশা, সাফল্য ও আনন্দের আলো ফিরে আসে।
দিনাজপুর শহরের সড়ক বেহাল, দুর্ভোগে নগরবাসী
শফিক, দিনাজপুর প্রতিনিধি, দৈনিক ইত্তেফাক
দিনাজপুর, ১৫ই জুন ২০২৩: দিনাজপুর শহরের প্রধান ও সংযোগ সড়কগুলোর বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে ভরে যাওয়ায় নগরবাসীর চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। বর্ষায় গর্তে পানি জমে সড়ক ও নালার পার্থক্য বোঝা যায় না, আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালুতে পথচারী ও দোকানিরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন।
সরেজমিনে বিভিন্ন পাড়া, বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, কোথাও কার্পেটিং উঠে পাথর বেরিয়ে এসেছে, কোথাও বড় গর্ত তৈরি হয়েছে এবং অনেক স্থানে সড়কের দুই পাশ দেবে গেছে। অপর্যাপ্ত নালা ও বন্ধ জলনিষ্কাশনব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে থাকে। বিভিন্ন সেবা সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ির পর সড়ক যথাযথভাবে মেরামত না করা এবং ভারী যান চলাচলও ক্ষতি বাড়াচ্ছে। গর্ত এড়াতে যানবাহন হঠাৎ দিক পরিবর্তন করায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। রিকশা ও ইজিবাইকের যাত্রীরা ঝাঁকুনিতে কষ্ট পাচ্ছেন; শিক্ষার্থী, রোগী ও প্রবীণদের দুর্ভোগ আরও বেশি। ধীরগতির যান চলাচলে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে।
নগরবাসীর দাবি, জরুরি ভিত্তিতে গর্ত ভরাট করে টেকসইভাবে সড়ক সংস্কার, কার্যকর নালা নির্মাণ এবং সেবা সংস্থাগুলোর কাজের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। কাজের মান তদারকি ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না হলে সাময়িক মেরামতে জনদুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবে—এটাই শহরবাসীর প্রত্যাশা।
ঠাকুরগাঁও আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে নবীনবরণ ও বিদায়-সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত
মাসুম, শিক্ষার্থী প্রতিবেদক
ঠাকুরগাঁও, ৩০শে জানুয়ারি ২০২৩: উৎসবমুখর ও আবেগঘন পরিবেশে গতকাল ঠাকুরগাঁও আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ এবং এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায়-সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিদ্যালয়ের মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় সংগীত ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রধান শিক্ষক সভাপতির বক্তব্যে নবীনদের স্বাগত জানিয়ে নিয়মিত অধ্যয়ন, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চার আহ্বান জানান। তিনি বিদায়ী পরীক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশ নিতে বলেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শিক্ষা ও চরিত্র গঠনে বিদ্যালয়ের ভূমিকা তুলে ধরে উভয় শ্রেণির শিক্ষার্থীর সফলতা কামনা করেন। পরে জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীরা ফুল ও শুভেচ্ছা কার্ড দিয়ে নবীনদের বরণ করে নেয়। নবীনদের একজন নতুন পরিবেশে সবার সহযোগিতা কামনা করে অনুভূতি জানায়। বিদায়ী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে একজন বিদ্যালয়ে কাটানো দিনের স্মৃতিচারণ করে শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। তাদের হাতে স্মারক ও শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় পর্বে কবিতা আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য ও ছোট নাটক পরিবেশিত হয়। আনন্দ ও বিচ্ছেদের মিশ্র অনুভূতিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক বন্ধন আরও দৃঢ় করার অঙ্গীকার এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়।
১৫ই জুন ২০২৩
চট্টগ্রাম
প্রিয় আম্বিয়া,
আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা নিও। আশা করি ভালো আছ। গত সপ্তাহে একটি ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণের যে আনন্দময় অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা তোমাকে জানাতে আজ লিখছি।
বিদ্যালয়ের শিক্ষা সফরে আমরা কুমিল্লার ময়নামতি শালবন বিহার দেখতে গিয়েছিলাম। খুব ভোরে চট্টগ্রাম থেকে বাসে রওনা হয়ে সকালে সেখানে পৌঁছাই। লালমাই-ময়নামতি অঞ্চলের সবুজ উঁচু ভূমির মধ্যে অবস্থিত এ প্রত্নস্থল একসময়ের প্রাচীন বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ। প্রবেশের পর চারদিকে সারিবদ্ধ ভিক্ষুকক্ষ, মাঝখানে কেন্দ্রীয় মন্দিরের ভিত্তি, ইটের অলংকরণ ও পুরোনো স্থাপনার বিন্যাস দেখে আমরা বিস্মিত হই। একজন পথপ্রদর্শক খননে পাওয়া পোড়ামাটির ফলক, মুদ্রা, শিলালিপি ও অন্যান্য নিদর্শনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝিয়ে দেন। পাশের ময়নামতি জাদুঘরে সংরক্ষিত মূর্তি, ধাতব সামগ্রী, মুদ্রা ও টেরাকোটা দেখে সে সময়ের ধর্ম, শিল্প ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাই। পাঠ্যবইয়ে পড়া ইতিহাসকে চোখের সামনে দেখতে পাওয়ার অনুভূতি ছিল অসাধারণ। পরিষ্কার পরিবেশ ও নীরব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও ভ্রমণকে আনন্দদায়ক করেছে। ফেরার পথে মনে হয়েছে, অতীতের পরিচয় বহনকারী এসব পুরাকীর্তি রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
সুযোগ পেলে তুমিও স্থানটি দেখে এসো। তোমার মা-বাবাকে আমার সালাম দেবে।
ইতি
তোমার বন্ধু
সাজু
রবীন্দ্রজয়ন্তী ১৪৩০
সুধী,
আগামী ২৫শে বৈশাখ ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ৮ই মে ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ সকাল ১০টায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দক্ষিণ সুরমা সরকারি হাইস্কুলের উদ্যোগে বিদ্যালয় মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। ‘রবীন্দ্রনাথের মানবতাবোধ ও শিক্ষাচিন্তা’ বিষয়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করবেন একজন বিশিষ্ট রবীন্দ্রগবেষক। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন। আলোচনা শেষে শিক্ষার্থীরা রবীন্দ্রসংগীত, কবিতা আবৃত্তি, নৃত্য ও কবির রচনা অবলম্বনে সংক্ষিপ্ত নাটক পরিবেশন করবে।
রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এ আয়োজনে আপনার সানুগ্রহ উপস্থিতি আন্তরিকভাবে কামনা করছি।
বকুল
সাংস্কৃতিক সম্পাদক
দক্ষিণ সুরমা সরকারি হাইস্কুল, সিলেট।
অনুষ্ঠানসূচি
- সকাল ১০:০০ — অতিথিদের আসন গ্রহণ ও উদ্বোধনী সংগীত
- সকাল ১০:১০ — স্বাগত বক্তব্য ও মূল আলোচনা
- সকাল ১০:৫০ — রবীন্দ্রসংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্য
- সকাল ১১:৩০ — নাট্য পরিবেশনা
- দুপুর ১২:০০ — সভাপতির বক্তব্য ও সমাপ্তি
অন্যকে কোনো নীতি বা আদর্শ অনুসরণের উপদেশ দেওয়ার আগে নিজের জীবনে তা পালন করতে হয়। কথার চেয়ে ব্যক্তিগত দৃষ্টান্ত মানুষকে অনেক বেশি প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করে।
উপদেশ দেওয়া সহজ, কিন্তু তা নিজে পালন করা কঠিন। যে ব্যক্তি সততার কথা বলেন অথচ নিজে অসৎ কাজ করেন, কিংবা ধূমপান ত্যাগের পরামর্শ দিয়েও নিজে ধূমপান করেন, তাঁর কথা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয় না। বিপরীতে শিক্ষক সময়নিষ্ঠ হলে শিক্ষার্থীরা সময়ের মূল্য শেখে; অভিভাবক সত্যবাদী হলে সন্তানও সত্য বলার প্রেরণা পায়। ইতিহাসের মহৎ নেতা ও সমাজসংস্কারকেরা শুধু মুখে আদর্শ প্রচার করেননি, নিজেদের ত্যাগ ও আচরণের মাধ্যমে সেই আদর্শের কার্যকারিতা দেখিয়েছেন। তাঁদের জীবন তাই মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য শিক্ষায় পরিণত হয়েছে। নিজের দুর্বলতা সংশোধন না করে অন্যের ত্রুটি নির্দেশ করলে তা ভণ্ডামি বলে মনে হয় এবং ভালো উপদেশও গুরুত্ব হারায়। তাই যে নীতি শেখাতে চাই, প্রথমে আত্মসংযম ও সাধনার মাধ্যমে সেটি নিজের চরিত্রে প্রতিষ্ঠা করা দরকার। তখন আচরণ ও কথার সামঞ্জস্য উপদেশকে শক্তিশালী করে এবং অন্যকে আন্তরিকভাবে তা অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করে।
সুতরাং, আদর্শ প্রচারের শ্রেষ্ঠ উপায় হলো আদর্শ জীবনযাপন। নিজে যা পালন করি, কেবল তা-ই অন্যকে শেখালে ব্যক্তি ও সমাজে সত্যিকার নৈতিক পরিবর্তন সম্ভব হয়।
যে ব্যক্তি অন্যায় করে এবং যে জেনেশুনে তা নীরবে সহ্য করে, উভয়েই নৈতিকভাবে অপরাধী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করা অন্যায়কারীকে শক্তি ও সুযোগ জোগায়।
অন্যায়কারী নিজের স্বার্থ, লোভ বা ক্ষমতার জন্য মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে। আইন তার শাস্তির বিধান করে, কিন্তু সমাজে অন্যায় টিকে থাকে প্রায়ই নির্লিপ্ত দর্শকের কারণে। কেউ অত্যাচার দেখেও ভয়ে, সুবিধার আশায় বা উদাসীনতায় চুপ থাকলে অপরাধী ধরে নেয় যে তার কাজে বাধা নেই। এ নীরবতা পরোক্ষ সমর্থনে পরিণত হয় এবং ছোট অন্যায় ক্রমে বড় অত্যাচারে রূপ নেয়। বিদ্যালয়ে দুর্বল সহপাঠীর ওপর নিপীড়ন, কর্মক্ষেত্রে দুর্নীতি কিংবা সমাজে বৈষম্য—প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সচেতন মানুষের প্রতিবাদ ক্ষতি থামাতে পারে। প্রতিবাদ অবশ্যই সত্যনিষ্ঠ, বিবেকসম্পন্ন ও আইনসম্মত হতে হবে; প্রতিশোধ বা নতুন সহিংসতা সৃষ্টি করা তার উদ্দেশ্য নয়। ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো, প্রমাণ সংরক্ষণ, কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং জনমত গড়ে তোলা ন্যায় প্রতিষ্ঠার কার্যকর উপায়। যারা নিজের নিরাপত্তার যুক্তিতে সব অন্যায় মেনে নেয়, তারা শেষ পর্যন্ত অন্যায়ের বিস্তার থেকে নিজেরাও রক্ষা পায় না।
অতএব, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে শুধু অন্যায় না করাই যথেষ্ট নয়; অন্যায় প্রতিরোধেও সাহসী হতে হয়। অন্যায়কারী ও তার নীরব সহায়ক উভয়েই বিবেকের বিচারে নিন্দা ও ঘৃণার যোগ্য।
ভূমিকা
সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। হারানো অর্থ, স্বাস্থ্য বা সুযোগ কখনো আংশিকভাবে ফিরে পাওয়া গেলেও অতিবাহিত একটি মুহূর্ত আর ফিরে আসে না। নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করার অভ্যাসই সময়ানুবর্তিতা, আর সাফল্যময় ও শৃঙ্খলিত জীবনের অন্যতম ভিত্তি এই গুণ।
সময়ের স্বরূপ
সময় নদীর স্রোতের মতো অবিরাম বয়ে চলে; কারও জন্য অপেক্ষা করে না। প্রকৃতিতেও সময়ের শৃঙ্খলা স্পষ্ট—সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত, ঋতুপরিবর্তন, জোয়ার-ভাটা এবং ফসলের চক্র নির্দিষ্ট নিয়মে ঘটে। যথাসময়ে বীজ না বুনলে কৃষক কাঙ্ক্ষিত ফসল পান না। মানুষের কাজেও উপযুক্ত মুহূর্ত হারালে পরে অধিক শ্রম দিয়েও একই ফল পাওয়া কঠিন হয়।
ব্যক্তিজীবনে গুরুত্ব
সময়নিষ্ঠ ব্যক্তি কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন, পরিকল্পনা মেনে চলেন এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। ফলে তাঁর কাজের মান বাড়ে, মানসিক চাপ কমে এবং অন্যের আস্থা অর্জিত হয়। অফিস, চিকিৎসা, পরিবহন, ব্যবসা কিংবা সভা—সব ক্ষেত্রেই সময়মতো উপস্থিতি পারস্পরিক সম্মান ও দক্ষতার পরিচয়। দেরি করলে শুধু নিজের নয়, অন্যের মূল্যবান সময়ও নষ্ট হয়।
শিক্ষাজীবনে সময়ানুবর্তিতা
শিক্ষার্থীর সাফল্যে সময় ব্যবস্থাপনা বিশেষ জরুরি। নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, প্রতিদিনের পাঠ প্রতিদিন শেখা, পুনরাবৃত্তি, খেলাধুলা ও বিশ্রামের জন্য সুষম সময়সূচি তাকে সুস্থ ও প্রস্তুত রাখে। পরীক্ষার আগের রাতে সব পড়া শেষ করার চেষ্টা উদ্বেগ বাড়ায়, অথচ অল্প অল্প করে নিয়মিত পড়লে জ্ঞান স্থায়ী হয়। সময়নিষ্ঠ শিক্ষার্থী সহশিক্ষা কার্যক্রমেও অংশ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিকাশের সুযোগ পায়।
জাতীয় জীবনে গুরুত্ব
একটি জাতির মানুষের কর্মঘণ্টা, উৎপাদন ও সেবার সঙ্গে উন্নয়নের গতি সরাসরি যুক্ত। সরকারি দপ্তরে বিলম্ব, প্রকল্পের সময়ক্ষেপণ, যানবাহনের অনিয়ম ও বিচারকার্যের দীর্ঘসূত্রতা অর্থ ও জনবিশ্বাস নষ্ট করে। বিপরীতে সময়মতো সিদ্ধান্ত, নির্মাণ, উৎপাদন ও সেবা সম্পন্ন হলে ব্যয় কমে, বিনিয়োগ বাড়ে এবং নাগরিক জীবন গতিশীল হয়। উন্নত জাতিগুলোর অগ্রগতির পেছনে শ্রমের পাশাপাশি সময়ের প্রতি শ্রদ্ধাও গুরুত্বপূর্ণ।
সময় অপচয়ের ফল
অলসতা, লক্ষ্যহীন আড্ডা, অতিরিক্ত ঘুম এবং অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের অনেক কর্মক্ষম সময় কেড়ে নেয়। কাজ ফেলে রাখার অভ্যাস শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়া, ভুল, ব্যর্থতা ও হতাশার সৃষ্টি করে। যৌবনে সময় নষ্ট করলে পরিণত বয়সে অনুশোচনা করেও হারানো সম্ভাবনা ফিরিয়ে আনা যায় না।
সময়ানুবর্তী হওয়ার উপায়
প্রতিদিনের কাজ লিখে অগ্রাধিকার ঠিক করা, বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ, বড় কাজকে ছোট ধাপে ভাগ করা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা বাদ দেওয়া দরকার। ঘড়ি বা স্মারকের সহায়তা নেওয়া যায়, তবে আত্মশৃঙ্খলাই প্রধান। বিশ্রাম ও বিনোদনের সময়ও পরিকল্পনায় রাখতে হবে, কারণ ক্লান্ত শরীর ও মন কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না। পরিবার ও বিদ্যালয়ে ছোটবেলা থেকেই সময়মতো ঘুম, জাগরণ, পাঠ ও উপস্থিতির অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
উপসংহার
জীবন আসলে সীমিত সময়ের সমষ্টি। যে মানুষ প্রতিটি মুহূর্তকে লক্ষ্য, শ্রম ও শৃঙ্খলার সঙ্গে কাজে লাগায়, সে নিজের জীবনকে সমৃদ্ধ করে এবং সমাজেরও উপকার করে। তাই সময়কে সম্মান করা এবং সময়ের কাজ সময়ে সম্পন্ন করাই সাফল্যের নিশ্চিত পথ।
ভূমিকা
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন ১৯৭১ সালে সশস্ত্র জনযুদ্ধে রূপ নেয়। নয় মাসের ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের।
পটভূমি
১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রাজনৈতিক অধিকার ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় চেতনাকে শক্তিশালী করে। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকেরা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি।
অসহযোগ আন্দোলন ও ৭ই মার্চ
ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানার প্রতিবাদে ১৯৭১ সালের মার্চে পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণে জনগণকে মুক্তির সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেন। তাঁর নির্দেশে প্রশাসন, আদালত, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কার্যত বাঙালির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
গণহত্যা ও স্বাধীনতার সূচনা
২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরস্ত্র মানুষের ওপর গণহত্যা চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ লাইন ও জনবসতিতে নির্বিচারে হত্যা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হলে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, পুলিশ, ইপিআর সদস্য ও সাধারণ মানুষ প্রতিরোধযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
মুজিবনগর সরকার ও যুদ্ধ পরিচালনা
১০ই এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে শপথ নেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকে এগারোটি সেক্টরে ভাগ করে সংগঠিত করা হয়; কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানী মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব নেন।
গণযুদ্ধ ও মানুষের অবদান
মুক্তিযুদ্ধ ছিল সর্বস্তরের মানুষের জনযুদ্ধ। প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি গেরিলা দল শহর ও গ্রামে দখলদার বাহিনীর যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থায় আঘাত হানে। নারী যোদ্ধা, সেবিকা, আশ্রয়দাতা ও তথ্যসংগ্রাহক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন; অসংখ্য নারী পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। শিল্পী, সাহিত্যিক ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মীরা গান, সংবাদ ও অনুষ্ঠান দিয়ে মানুষকে প্রেরণা দেন। প্রবাসী বাঙালিরা অর্থ সংগ্রহ ও বিশ্বজনমত গঠনে কাজ করেন।
গণহত্যা ও আন্তর্জাতিক সমর্থন
পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা হত্যা, ধর্ষণ, লুট ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে দেশজুড়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ চালায়। প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ভারত শরণার্থীদের আশ্রয়, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও শেষ পর্যায়ে যৌথ যুদ্ধে সহায়তা করে। বিশ্বের সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীরা বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে জনমত গড়েন; ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ মুক্তিযুদ্ধের মানবিক সংকটকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে।
চূড়ান্ত বিজয়
ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী দ্রুত পরাজিত হয়। পরাজয় নিশ্চিত জেনে ১৪ই ডিসেম্বর তারা দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে জাতিকে মেধাশূন্য করার চেষ্টা চালায়। ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।
মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালিকে স্বাধীন ভূখণ্ড, জাতীয় পতাকা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দিয়েছে। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অসাম্প্রদায়িকতার আকাঙ্ক্ষা ছিল এ সংগ্রামের অন্তর্নিহিত শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান এবং স্বাধীনতাবিরোধী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সত্য তুলে ধরা নতুন প্রজন্মের কর্তব্য।
উপসংহার
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অসংখ্য মানুষের রক্ত, অশ্রু ও ত্যাগের ফসল। দুর্নীতি, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করে ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক দেশ গড়তে পারলেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো হবে।
ভূমিকা
মাদকাসক্তি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য এক সর্বনাশা সমস্যা। যে তরুণ সমাজ দেশের ভবিষ্যৎ, মাদকের করাল গ্রাস তাদের স্বাস্থ্য, মেধা ও কর্মক্ষমতা ধ্বংস করে জাতীয় উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করে। তাই মাদক সম্পর্কে সচেতনতা, প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সমন্বিত ব্যবস্থা জরুরি।
মাদক ও মাদকাসক্তি
যেসব প্রাকৃতিক বা রাসায়নিক পদার্থ গ্রহণে সাময়িক উত্তেজনা, অবসাদ বা চেতনার পরিবর্তন ঘটে এবং বারবার গ্রহণের তীব্র নির্ভরতা তৈরি হয়, সেগুলো মাদক। চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে কিছু মাদকজাত উপাদান ওষুধ হিসেবে কাজে লাগলেও অপব্যবহার দেহ ও মনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মাদকের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্ভরতার অবস্থাই মাদকাসক্তি।
মাদকাসক্তির কারণ
কৌতূহল, সঙ্গদোষ, পারিবারিক অশান্তি, হতাশা, বেকারত্ব, ব্যর্থতা ও নিঃসঙ্গতা থেকে অনেকে প্রথম মাদক গ্রহণ করে। কেউ ভুলভাবে একে আধুনিকতা বা সাহসের পরিচয় মনে করে। পরিবারে নজরদারি ও স্নেহের অভাব, সুস্থ বিনোদনের স্বল্পতা এবং মাদকের সহজলভ্যতা ঝুঁকি বাড়ায়। অসাধু ব্যবসায়ীচক্র তরুণদের লক্ষ্য করে মাদক ছড়িয়ে বিপুল অবৈধ মুনাফা অর্জন করে।
শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি
দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণে মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, যকৃৎ, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষুধা, ঘুম, স্মৃতি, বিচারবোধ ও কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়; উদ্বেগ, বিষণ্নতা, সন্দেহপ্রবণতা ও সহিংস আচরণ দেখা দিতে পারে। একই মাদক থেকে আগের অনুভূতি পেতে ক্রমে বেশি মাত্রা দরকার হয় এবং হঠাৎ বন্ধ করলে তীব্র প্রত্যাহারজনিত সমস্যা সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত মাত্রা মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
পরিবার ও সমাজে প্রভাব
আসক্ত ব্যক্তি পড়াশোনা বা কর্মক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা ও মাদক কেনার ব্যয়ে পরিবার অর্থসংকটে পড়ে। অর্থ জোগাতে কেউ চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা বা সহিংস অপরাধে জড়ায়। পরিবারে অবিশ্বাস, কলহ ও নির্যাতন বাড়ে; শিশুদের নিরাপত্তা ও শিক্ষা ব্যাহত হয়। মাদক ব্যবসা দুর্নীতি, চোরাচালান ও সংগঠিত অপরাধকে শক্তিশালী করে সমাজের শান্তি নষ্ট করে।
প্রতিরোধের উপায়
সীমান্ত, পরিবহন ও বিপণনচক্রে কঠোর নজরদারি এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা, জীবনদক্ষতা শিক্ষা ও পরামর্শসেবা চালু করতে হবে। পরিবারকে সন্তানের আচরণ, মানসিক পরিবর্তন ও বন্ধুবৃত্তের প্রতি যত্নশীল হতে হবে; তবে সন্দেহ বা অপমান নয়, আস্থা ও খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ গড়তে হবে। খেলাধুলা, পাঠাগার, সংস্কৃতিচর্চা, স্বেচ্ছাসেবা এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান তরুণদের সুস্থ জীবনে যুক্ত রাখে। গণমাধ্যমকে মাদকের ক্ষতি তুলে ধরতে হবে, কিন্তু মাদক গ্রহণকে আকর্ষণীয় করে এমন উপস্থাপনা এড়াতে হবে।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন
মাদকাসক্তি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা; শুধু শাস্তি বা ঘৃণায় এর সমাধান হয় না। প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে শারীরিক চিকিৎসা, মনোসামাজিক পরামর্শ, প্রয়োজনে ওষুধ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন দরকার। চিকিৎসার পর পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা, শিক্ষা বা কর্মে পুনঃসংযোগ এবং নিয়মিত অনুসরণ আসক্তিকে ফিরে আসা থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। অননুমোদিত বা নির্যাতনমূলক কেন্দ্রের বদলে মানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থী ও যুবসমাজের ভূমিকা
প্রথম প্রস্তাবেই দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলা, মাদকাসক্ত বন্ধুকে গোপনে উৎসাহ না দিয়ে বিশ্বস্ত অভিভাবক বা পরামর্শকের সাহায্য নেওয়া এবং মাদকবিরোধী সচেতনতায় অংশ নেওয়া তরুণদের কর্তব্য। আত্মমর্যাদা, সঠিক বন্ধু নির্বাচন ও জীবনের ইতিবাচক লক্ষ্য মাদকের প্রলোভন থেকে রক্ষা করে।
উপসংহার
মাদক নির্মূল কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়; পরিবার, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত দায়িত্ব। সরবরাহ বন্ধ, ঝুঁকির কারণ দূর, সময়মতো চিকিৎসা এবং সুস্থ জীবনের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারলেই মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও কর্মক্ষম বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
১৫ই জুন ২০২৩
চেয়ারম্যান
ত্রিশাল উপজেলা পরিষদ
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ
বিষয়: এলাকায় একটি পাঠাগার স্থাপনের আবেদন।
মহোদয়,
বিনীত নিবেদন এই যে, আমি ত্রিশাল উপজেলার একজন স্থায়ী বাসিন্দা। আমাদের এলাকায় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও আগ্রহী পাঠক থাকলেও সবার ব্যবহারের উপযোগী কোনো পাঠাগার নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বাইরের সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও তথ্যবিষয়ক বই পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষও পত্রিকা, সাময়িকী এবং প্রয়োজনীয় তথ্যসামগ্রী ব্যবহার করতে পারছেন না। একটি সুশৃঙ্খল পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস, জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতা বাড়বে এবং তরুণেরা অবসর সময়কে কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করতে পারবে। স্থানীয় বাসিন্দারা বই সংগ্রহ ও স্বেচ্ছাসেবায় সহযোগিতা করতেও আগ্রহী।
অতএব, আমাদের এলাকায় উপযুক্ত স্থানে একটি গণপাঠাগার স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় বই, আসবাব ও পাঠকক্ষের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আপনার সদয় মর্জি কামনা করছি।
বিনীত
প্রত্যয়
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।
তারিখ: ১৫ই জুন ২০২৩
বরাবর
সম্পাদক
দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা
বিষয়: সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিকারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি।
জনাব,
আপনার বহুল প্রচারিত পত্রিকার ‘চিঠিপত্র’ বিভাগে প্রকাশের জন্য নিচের পত্রটি পাঠাচ্ছি।
দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মূল্যবান প্রাণহানি, পঙ্গুত্ব ও সম্পদের ক্ষতি ঘটছে। বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অদক্ষ ও ক্লান্ত চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ভাঙা বা অপরিকল্পিত সড়ক এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা এর প্রধান কারণ। চালকের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও মাদকাসক্তি, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং সড়ক দখলও ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক পথচারী ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং ও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করায় দুর্ঘটনার শিকার হন। একটি দুর্ঘটনায় পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য নিহত বা পঙ্গু হলে পুরো পরিবার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে পড়ে। প্রতিকারে চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স যাচাই, কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা, গতিসীমার কঠোর প্রয়োগ এবং সড়কের প্রকৌশলগত ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা, নিরাপদ গণপরিবহন গড়ে তোলা এবং চালক-পথচারী উভয়ের সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি। বিষয়টির প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য পত্রটি প্রকাশের অনুরোধ করছি।
বিনীত
একজন সচেতন নাগরিক
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।
অন্যকে কোনো নীতি বা আদর্শ অনুসরণের উপদেশ দেওয়ার আগে নিজের জীবনে তা পালন করতে হয়। কথার চেয়ে ব্যক্তিগত দৃষ্টান্ত মানুষকে অনেক বেশি প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করে।
উপদেশ দেওয়া সহজ, কিন্তু তা নিজে পালন করা কঠিন। যে ব্যক্তি সততার কথা বলেন অথচ নিজে অসৎ কাজ করেন, কিংবা ধূমপান ত্যাগের পরামর্শ দিয়েও নিজে ধূমপান করেন, তাঁর কথা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয় না। বিপরীতে শিক্ষক সময়নিষ্ঠ হলে শিক্ষার্থীরা সময়ের মূল্য শেখে; অভিভাবক সত্যবাদী হলে সন্তানও সত্য বলার প্রেরণা পায়। ইতিহাসের মহৎ নেতা ও সমাজসংস্কারকেরা শুধু মুখে আদর্শ প্রচার করেননি, নিজেদের ত্যাগ ও আচরণের মাধ্যমে সেই আদর্শের কার্যকারিতা দেখিয়েছেন। তাঁদের জীবন তাই মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য শিক্ষায় পরিণত হয়েছে। নিজের দুর্বলতা সংশোধন না করে অন্যের ত্রুটি নির্দেশ করলে তা ভণ্ডামি বলে মনে হয় এবং ভালো উপদেশও গুরুত্ব হারায়। তাই যে নীতি শেখাতে চাই, প্রথমে আত্মসংযম ও সাধনার মাধ্যমে সেটি নিজের চরিত্রে প্রতিষ্ঠা করা দরকার। তখন আচরণ ও কথার সামঞ্জস্য উপদেশকে শক্তিশালী করে এবং অন্যকে আন্তরিকভাবে তা অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করে।
সুতরাং, আদর্শ প্রচারের শ্রেষ্ঠ উপায় হলো আদর্শ জীবনযাপন। নিজে যা পালন করি, কেবল তা-ই অন্যকে শেখালে ব্যক্তি ও সমাজে সত্যিকার নৈতিক পরিবর্তন সম্ভব হয়।
মানুষের জীবনে সুখ ও দুঃখ কোনোটিই চিরস্থায়ী নয়। দুর্দিনের অন্ধকারের আড়ালেই সুদিনের আলো অপেক্ষা করে; তাই বিপদে ভয় না পেয়ে ধৈর্য, সাহস ও আশাবাদ নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়।
মেঘ সাময়িকভাবে সূর্য বা চাঁদকে ঢেকে দিলেও তাদের আলো নিভিয়ে দিতে পারে না। বাতাসে মেঘ সরে গেলে আকাশ আবার উজ্জ্বল হয়। মানবজীবনেও রোগ, শোক, অভাব, ব্যর্থতা ও অপমান কখনো কালো মেঘের মতো নেমে আসে। দুর্বলচিত্ত মানুষ তখন মনে করে, এ সংকটের আর শেষ নেই; ফলে সে হতাশ হয়ে কর্মশক্তি হারায়। কিন্তু ইতিহাস ও ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা বলে, চেষ্টা ও সময়ের সঙ্গে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। পরীক্ষায় ব্যর্থ শিক্ষার্থী নতুন পরিকল্পনায় পরিশ্রম করে সফল হতে পারে; বিপর্যস্ত জাতিও ঐক্য ও সংগ্রামের মাধ্যমে পুনরায় মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। প্রতিকূলতা মানুষের ধৈর্য, সাহস ও সুপ্ত শক্তিকে পরীক্ষা করে এবং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ দেয়। তাই দুঃসময়ে আতঙ্কিত না হয়ে বাস্তবতা বুঝে পরিকল্পিতভাবে সংকট মোকাবিলা করা উচিত। অন্ধ আশায় বসে থাকা নয়, আশাবাদকে কর্মের শক্তিতে রূপ দেওয়াই সাফল্যের পথ।
অতএব, রাতের পরে যেমন ভোর আসে, দুঃখের পরেও তেমনি সুখের সম্ভাবনা জাগে। ধৈর্য ও কর্মে অটল মানুষই দুর্দিন পেরিয়ে জীবনের আলো ফিরে পায়।
ভূমিকা
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সম্পদস্বল্প বাংলাদেশকে অনেকে সম্ভাবনাহীন মনে করেছিল। কিন্তু মানুষের শ্রম, মেধা, সাহস ও সৃজনশীলতায় দেশ বারবার সংকট অতিক্রম করে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই ধারাবাহিক সাফল্যই বাংলাদেশের অদম্য অগ্রযাত্রার পরিচয়।
স্বাধীনতা থেকে উন্নয়নের যাত্রা
১৯৭১ সালে অবকাঠামো, উৎপাদনব্যবস্থা ও অর্থনীতি বিপর্যস্ত অবস্থায় স্বাধীন বাংলাদেশের পথচলা শুরু হয়। সীমিত সম্পদ নিয়েও কৃষি পুনর্গঠন, শিক্ষার প্রসার, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দারিদ্র্যের বাধা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ উৎপাদন ও উন্নয়নের চাকা সচল রেখেছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে বিশ্বে নতুন আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দিয়েছে।
কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা
উন্নত বীজ, সেচ, কৃষিযন্ত্র, গবেষণা ও কৃষকের পরিশ্রমে খাদ্য উৎপাদন বহুগুণ বেড়েছে। ধান, সবজি, মাছ, ফল ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে অগ্রগতি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী করেছে। অল্প জমিতে অধিক উৎপাদন এবং দুর্যোগসহিষ্ণু ফসল উদ্ভাবন বাংলাদেশের কৃষিকে নতুন সক্ষমতা দিয়েছে।
শিল্প ও অর্থনীতি
তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের প্রধান শক্তিগুলোর একটি। প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো অর্থ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, ওষুধ, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য শিল্প অর্থনীতিকে বহুমুখী করছে। নারীর ব্যাপক কর্মঅংশগ্রহণ পরিবার ও জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও যোগাযোগের উন্নতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অবকাঠামো ও প্রযুক্তি
পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। মেট্রোরেল, মহাসড়ক, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু নির্মাণ মানুষের যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহন সহজ করছে। মোবাইল যোগাযোগ, ইন্টারনেট, অনলাইন শিক্ষা, মোবাইল আর্থিক সেবা ও ডিজিটাল সরকারি সেবা নাগরিক জীবনে গতি এনেছে। মহাকাশে নিজস্ব যোগাযোগ উপগ্রহ পাঠানো প্রযুক্তিগত সক্ষমতারও প্রতীক।
মানব উন্নয়ন
প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ, নারীশিক্ষা, টিকাদান, মাতৃ ও শিশুসেবা, নিরাপদ পানি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা মানুষের জীবনমান উন্নত করেছে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও শান্তিরক্ষায় অবদানও বিশ্বে দেশের মর্যাদা বাড়িয়েছে।
চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
অগ্রগতির পাশাপাশি বেকারত্ব, দুর্নীতি, বৈষম্য, মূল্যস্ফীতি, যানজট, দূষণ, মানসম্মত শিক্ষার ঘাটতি ও জলবায়ু পরিবর্তন বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নয়নকে টেকসই করতে সুশাসন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, দক্ষ জনশক্তি, গবেষণা, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়নের সুফল যেন অঞ্চল ও শ্রেণি নির্বিশেষে সবার কাছে পৌঁছে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
উপসংহার
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পরিশ্রমী ও সংগ্রামী মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সততা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সম্মিলিত উদ্যোগে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলে অদম্য অগ্রযাত্রা আরও বেগবান হবে এবং বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
ভূমিকা
প্রকৃতির সৌন্দর্য ও সম্পদে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা, বজ্রপাত, পাহাড়ধস ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি এ দেশের মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
দুর্যোগপ্রবণতার কারণ
বাংলাদেশ গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার নিম্ন বদ্বীপে অবস্থিত। অসংখ্য নদী, নিচু সমতল ভূমি, বঙ্গোপসাগরের ফানেল আকৃতির উপকূল এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাত দেশকে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে রাখে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন উজাড়, নদী-খাল দখল, দুর্বল জলনিষ্কাশন এবং পাহাড় কাটা মানুষের তৈরি ঝুঁকি বাড়ায়। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, অনিয়মিত বৃষ্টি, তাপপ্রবাহ ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বন্যা ও নদীভাঙন
বর্ষায় অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। স্বাভাবিক বন্যা জমিতে পলি এনে উর্বরতা বাড়ালেও দীর্ঘস্থায়ী বা আকস্মিক বন্যা ফসল, ঘরবাড়ি, সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ক্ষতি করে। নদীভাঙনে প্রতিবছর বহু মানুষ জমি ও বসতভিটা হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়। হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যা পাকা ধান নষ্ট করে কৃষকের সারা বছরের জীবিকা বিপন্ন করতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবল বাতাস, ভারী বৃষ্টি ও জলোচ্ছ্বাস নিয়ে আঘাত হানে। এতে প্রাণহানি, লবণাক্ততা, বাঁধভাঙা, গবাদিপশু ও ফসলের ক্ষতি ঘটে। উপকূলীয় বন ও ম্যানগ্রোভ প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করলেও নির্বিচার বৃক্ষনিধন সুরক্ষা দুর্বল করে।
অন্যান্য দুর্যোগ
উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরা কৃষি ও পানির সংকট সৃষ্টি করে। অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস ঘটে; বজ্রপাতে মাঠে কর্মরত মানুষ প্রাণ হারায়। অপরিকল্পিত ও বিধিবহির্ভূত ভবনের কারণে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো ভূমিকম্পে বড় ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে। অগ্নিকাণ্ড, জলাবদ্ধতা ও তাপপ্রবাহও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ নগর দুর্যোগে পরিণত হচ্ছে।
ক্ষয়ক্ষতি
প্রাকৃতিক দুর্যোগে শুধু মানুষ ও সম্পদ নষ্ট হয় না; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ ও স্থানীয় অর্থনীতি দীর্ঘদিন ব্যাহত থাকে। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের অভাবে রোগ ছড়ায়, নারী ও শিশু নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে এবং দরিদ্র মানুষ আরও দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যায়। দুর্যোগের মানসিক আঘাতও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
প্রস্তুতি ও প্রতিকার
বাংলাদেশ আগাম সতর্কবার্তা, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি, স্বেচ্ছাসেবক, আশ্রয়কেন্দ্র ও উদ্ধারব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। তবু ঝুঁকিভিত্তিক ভূমি ব্যবহার, টেকসই বাঁধ ও সড়ক, নদী-খাল রক্ষা, নগরের কার্যকর নালা, ভূমিকম্পসহনীয় ভবন এবং উপকূলীয় বনায়ন আরও জোরদার করতে হবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক মহড়া, প্রাথমিক চিকিৎসা, শুকনা খাবার ও নিরাপদ পানির প্রস্তুতি এবং দ্রুত পুনর্বাসন জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কমাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও প্রয়োজন।
উপসংহার
প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, আগাম প্রস্তুতি ও জনসচেতনতায় ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো যায়। সরকার, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের সমন্বিত উদ্যোগই দুর্যোগসহিষ্ণু বাংলাদেশ গড়ার পথ।
ভূমিকা
উৎসব মানুষের দৈনন্দিন শ্রম ও একঘেয়েমির মধ্যে আনন্দ, মিলন ও নবজীবনের সঞ্চার করে। বহু ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী ও লোকঐতিহ্যের দেশ বাংলাদেশে সারা বছর নানা জাতীয়, ধর্মীয়, সামাজিক ও ঋতুভিত্তিক উৎসব পালিত হয়। এসব উৎসব দেশের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির উজ্জ্বল প্রকাশ।
বাংলা নববর্ষ ও লোকজ উৎসব
পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব। নতুন পোশাক, মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা, গান, নৃত্য ও লোকজ আয়োজনে শহর-গ্রাম মুখর হয়ে ওঠে। নবান্নে নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দ ভাগ করা হয়। পৌষমেলা, চৈত্রসংক্রান্তি, পিঠা উৎসব, নৌকাবাইচ, বলীখেলা ও বিভিন্ন আঞ্চলিক মেলা কৃষিজীবন ও লোকসংস্কৃতির স্মৃতি বহন করে।
ধর্মীয় উৎসব
মুসলমানদের দুই ঈদ, শবে বরাত ও ঈদে মিলাদুন্নবী; হিন্দুদের দুর্গাপূজা, সরস্বতীপূজা ও জন্মাষ্টমী; বৌদ্ধদের বুদ্ধপূর্ণিমা এবং খ্রিষ্টানদের বড়দিন বাংলাদেশের প্রধান ধর্মীয় উৎসবের অন্তর্ভুক্ত। এসব দিনে মানুষ প্রার্থনা, দান, আত্মীয়তার বন্ধন ও আনন্দের মাধ্যমে ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রকাশ করে। ভিন্ন ধর্মের মানুষের পরস্পরের উৎসবে শুভেচ্ছা ও সহযোগিতা দেশের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করে।
জাতীয় ও ঐতিহাসিক দিবস
একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস জাতির সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের স্মৃতিবাহী। প্রভাতফেরি, স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা, আলোচনা, কুচকাওয়াজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষ ভাষাশহিদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করে। জাতীয় শোক ও গৌরবের এসব অনুষ্ঠান নতুন প্রজন্মের ইতিহাসচেতনা ও দেশপ্রেম গড়ে তোলে।
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উৎসব
পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈসাবি, রাখাইনদের সাংগ্রাই, মণিপুরিদের রাস উৎসব এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ফসল ও ঋতুকেন্দ্রিক আয়োজন বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বহুবর্ণ করেছে। নিজস্ব পোশাক, গান, নৃত্য, খাদ্য ও আচার এসব উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষা জাতীয় বৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য জরুরি।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
উৎসবে আত্মীয়-স্বজনের মিলন ঘটে, ভুল-বোঝাবুঝি কমে এবং সহযোগিতা ও সৌহার্দ্য বাড়ে। মেলা ও কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে তাঁতি, কারিগর, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও শিল্পীরা আয়ের সুযোগ পান। গান, নাটক, আবৃত্তি ও হস্তশিল্পের চর্চায় সাংস্কৃতিক সৃজনশীলতাও বিকশিত হয়।
সমস্যা ও করণীয়
অতিরিক্ত বাণিজ্যিকতা, অপচয়, উচ্চ শব্দ, যানজট, নিরাপত্তাহীনতা ও পরিবেশদূষণ কখনো উৎসবের সৌন্দর্য নষ্ট করে। উৎসবকে মাদক, অশ্লীলতা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থেকে মুক্ত রাখতে আইনশৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা এবং সামাজিক সচেতনতা দরকার। আনন্দ যেন দরিদ্র ও প্রতিবন্ধী মানুষসহ সবার কাছে পৌঁছে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের উৎসবগুলো শুধু বিনোদন নয়; এগুলো ইতিহাস, বিশ্বাস, কৃষিজীবন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ধারক। পারস্পরিক সম্মান, সংযম ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে উৎসব পালন করলে বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং জাতীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে।
তারিখ: ১৫ই জুন ২০২৩
বরাবর
সম্পাদক
দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা
বিষয়: সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিকারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি।
জনাব,
আপনার বহুল প্রচারিত পত্রিকার ‘চিঠিপত্র’ বিভাগে প্রকাশের জন্য নিচের পত্রটি পাঠাচ্ছি।
দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মূল্যবান প্রাণহানি, পঙ্গুত্ব ও সম্পদের ক্ষতি ঘটছে। বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অদক্ষ ও ক্লান্ত চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ভাঙা বা অপরিকল্পিত সড়ক এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা এর প্রধান কারণ। চালকের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও মাদকাসক্তি, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং সড়ক দখলও ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক পথচারী ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং ও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করায় দুর্ঘটনার শিকার হন। একটি দুর্ঘটনায় পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য নিহত বা পঙ্গু হলে পুরো পরিবার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে পড়ে। প্রতিকারে চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স যাচাই, কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা, গতিসীমার কঠোর প্রয়োগ এবং সড়কের প্রকৌশলগত ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা, নিরাপদ গণপরিবহন গড়ে তোলা এবং চালক-পথচারী উভয়ের সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি। বিষয়টির প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য পত্রটি প্রকাশের অনুরোধ করছি।
বিনীত
মাহির
দিনাজপুর।
১৫ই জুন ২০২৩
চেয়ারম্যান
শুভপুর ইউনিয়ন পরিষদ
কুমিল্লা সদর, কুমিল্লা
বিষয়: এলাকায় একটি পাঠাগার স্থাপনের আবেদন।
মহোদয়,
বিনীত নিবেদন এই যে, আমি কুমিল্লা সদর উপজেলার শুভপুর ইউনিয়নের একজন স্থায়ী বাসিন্দা। আমাদের এলাকায় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও আগ্রহী পাঠক থাকলেও সবার ব্যবহারের উপযোগী কোনো পাঠাগার নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বাইরের সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও তথ্যবিষয়ক বই পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষও পত্রিকা, সাময়িকী এবং প্রয়োজনীয় তথ্যসামগ্রী ব্যবহার করতে পারছেন না। একটি সুশৃঙ্খল পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস, জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতা বাড়বে এবং তরুণেরা অবসর সময়কে কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করতে পারবে। স্থানীয় বাসিন্দারা বই সংগ্রহ ও স্বেচ্ছাসেবায় সহযোগিতা করতেও আগ্রহী।
অতএব, আমাদের এলাকায় উপযুক্ত স্থানে একটি গণপাঠাগার স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় বই, আসবাব ও পাঠকক্ষের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আপনার সদয় মর্জি কামনা করছি।
বিনীত
নাবিল
শুভপুর, কুমিল্লা সদর, কুমিল্লা।
বিদ্যা মানুষের জ্ঞান বাড়ায়, কিন্তু চরিত্রহীন মানুষের হাতে সেই জ্ঞান কল্যাণের বদলে ক্ষতির অস্ত্র হতে পারে। তাই দুর্জন ব্যক্তি যত বিদ্বানই হোক, তার সঙ্গ ও প্রভাব থেকে দূরে থাকা উচিত।
সত্যবাদিতা, ন্যায়বোধ, সহমর্মিতা ও সংযমহীন মানুষই দুর্জন। উচ্চশিক্ষা বা বুদ্ধিমত্তা তার অসৎ প্রবৃত্তিকে সব সময় সংশোধন করে না; বরং কখনো সে জ্ঞানকে প্রতারণা, শোষণ ও অন্যায়কে আরও কৌশলী করতে ব্যবহার করে। বিষধর সাপের মাথায় মূল্যবান মণি আছে বলে কেউ তার সান্নিধ্য গ্রহণ করে না, কারণ মণির লোভে প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকে। তেমনি দুর্জনের কাছ থেকে কিছু জ্ঞান বা সুবিধা পাওয়া গেলেও তার সঙ্গ মানুষের চরিত্র, সুনাম ও নিরাপত্তার ক্ষতি করতে পারে। সঙ্গ মানুষের চিন্তা ও আচরণে গভীর প্রভাব ফেলে; অসৎ সঙ্গী ধীরে ধীরে অন্যকেও মিথ্যা, লোভ ও অনৈতিক কাজে অভ্যস্ত করে তোলে। বিপরীতে অল্পশিক্ষিত কিন্তু সৎ মানুষের সাহচর্য বিশ্বাস, শান্তি ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। তবে দুর্জনকে ঘৃণা করে অবিচার করা নয়; তার অন্যায় থেকে নিজেকে রক্ষা করা, প্রয়োজনে আইনসম্মত প্রতিবাদ করা এবং সংশোধনের সুযোগ দেওয়াই বিবেচকের কাজ।
অতএব, মানুষের মূল্য শুধু বিদ্যায় নয়, সেই বিদ্যার নৈতিক ব্যবহারে। চরিত্রহীন বিদ্বানের ক্ষতিকর সঙ্গ পরিত্যাগ করে সৎ ও কল্যাণপ্রবণ মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের পথ।
ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে সৌন্দর্য, কাব্য ও কল্পনার চেয়ে খাদ্যের প্রয়োজনই প্রধান হয়ে ওঠে। জীবনধারণের মৌলিক চাহিদা অপূর্ণ থাকলে পূর্ণিমার মনোরম চাঁদও তার চোখে খাবারের রুটির মতো প্রতিভাত হয়।
খাদ্য মানুষের প্রথম মৌলিক প্রয়োজন। ক্ষুধা শরীরকে দুর্বল করে, চিন্তাকে সংকুচিত করে এবং মানুষের সমস্ত মনোযোগ আহারের সন্ধানে কেন্দ্রীভূত করে। পেট ভরা মানুষের কাছে চাঁদের আলো, ফুলের সৌন্দর্য বা কবিতার ছন্দ আনন্দের উৎস; কিন্তু দীর্ঘদিন অনাহারে থাকা শ্রমজীবী মানুষের কাছে এসব বিলাসিতা। সে পূর্ণিমার গোল চাঁদে রোমান্টিক সৌন্দর্য নয়, ঝলসানো রুটির আকৃতি দেখে, কারণ তার চেতনা ক্ষুধার যন্ত্রণায় আচ্ছন্ন। দারিদ্র্য যখন মানুষের খাদ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসার অধিকার কেড়ে নেয়, তখন জীবন হয়ে ওঠে কঠিন বাস্তবতার গদ্য; কাব্যের কোমলতা সেখানে স্থান পায় না। এর অর্থ সৌন্দর্যের মূল্য নেই নয়, বরং সৌন্দর্য উপলব্ধির আগে মানুষের ন্যূনতম জীবনধারণের নিশ্চয়তা দরকার। ক্ষুধার্তকে কেবল সৌন্দর্যের কথা শোনানো নিষ্ঠুরতা; আগে তার খাদ্য ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের ব্যবস্থা করা মানবিক কর্তব্য।
সুতরাং, ক্ষুধা মানুষের নান্দনিক অনুভূতিকে বাস্তব প্রয়োজনের অধীন করে। সমাজে সাহিত্য-সংস্কৃতির সত্যিকারের বিকাশ চাইলে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূর করে সবার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ভূমিকা
কৃষি মানুষের খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং গ্রামীণ জীবিকার প্রধান ভিত্তি। একসময় কৃষিকাজ সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতি, কায়িক শ্রম ও প্রথাগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগ কৃষিকে এখন অধিক উৎপাদনশীল, সাশ্রয়ী, ঝুঁকিসহনীয় ও বাজারমুখী কর্মকাণ্ডে রূপান্তর করছে।
প্রথাগত কৃষির সীমাবদ্ধতা
দেশি বীজ, কাঠের লাঙল, অনিয়ন্ত্রিত সেচ এবং অনুমাননির্ভর সার ব্যবহারে উৎপাদন কম ও অনিশ্চিত ছিল। খরা, বন্যা, রোগবালাই বা পোকামাকড়ের আক্রমণে পুরো ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত। ফসল কাটা, মাড়াই, সংরক্ষণ ও পরিবহনে বেশি সময় ও শ্রম লাগত এবং অপচয়ও হতো প্রচুর।
উন্নত বীজ ও কৃষি গবেষণা
উদ্ভিদ প্রজনন ও গবেষণার মাধ্যমে উচ্চফলনশীল, স্বল্পমেয়াদি, লবণাক্ততা-, খরা- ও জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। মানসম্মত বীজ একই জমিতে বেশি ও নির্ভরযোগ্য ফলন দিতে পারে। রোগ শনাক্তকরণ, টিস্যু কালচার, নিরাপদ চারা উৎপাদন এবং স্থানীয় জাতের জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণেও বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন জাত ব্যবহারের আগে অঞ্চল, মাটি ও ঋতুর উপযোগিতা যাচাই করা দরকার।
মাটি, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা
মাটি পরীক্ষা করে অম্লতা, পুষ্টি ও জৈব পদার্থের অবস্থা জানা যায়; সে অনুযায়ী সুষম সার দিলে খরচ ও পরিবেশদূষণ কমে। কম্পোস্ট, সবুজ সার ও জীবাণুসারের সঙ্গে পরিমিত রাসায়নিক সার ব্যবহার মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে। গভীর ও অগভীর নলকূপ, সেচপাম্প, সৌরচালিত পাম্প, ড্রিপ ও স্প্রিংকলার প্রযুক্তি প্রয়োজনমতো পানি সরবরাহ করে। পানি ধরে রাখা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও সেচের সময়সূচি নির্ধারণ জলসম্পদের অপচয় কমায়।
কৃষিযান্ত্রিকীকরণ
পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, বীজবপন যন্ত্র, ধান রোপণযন্ত্র, রিপার, কম্বাইন হারভেস্টার ও মাড়াইযন্ত্র অল্প সময়ে বেশি কাজ করতে সাহায্য করে। শ্রমিকের সংকটকালে দ্রুত ফসল কেটে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগেই ঘরে তোলা যায়। ছোট ও খণ্ডিত জমির উপযোগী যন্ত্র, সমবায়ভিত্তিক ব্যবহার ও ভাড়াকেন্দ্র কৃষকের ব্যয় কমাতে পারে।
রোগবালাই ও পোকা দমন
বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় উপকারী পোকা রক্ষা করে জৈব, যান্ত্রিক ও সীমিত রাসায়নিক পদ্ধতিতে ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। রোগসহিষ্ণু জাত, পরিচ্ছন্ন বীজ, ফসল পর্যায়ক্রম এবং ফেরোমন ফাঁদ কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমায়। নির্বিচার কীটনাশক মানুষ, মাটি, পানি ও পরাগবাহী পোকাকে ক্ষতি করে; তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও নিরাপদ বিরতি মেনে ব্যবহার জরুরি।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি
আবহাওয়ার পূর্বাভাস কৃষককে বপন, সেচ, সার ও ফসল কাটার সময় নির্ধারণে সহায়তা করে। মোবাইল ফোন, কৃষি কলসেন্টার ও অনলাইন সেবায় রোগের ছবি পাঠিয়ে পরামর্শ, বাজারদর এবং দুর্যোগের সতর্কতা পাওয়া যায়। উপগ্রহচিত্র, ড্রোন ও ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা বড় এলাকায় ফসলের স্বাস্থ্য, আর্দ্রতা ও ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ
উন্নত গুদাম, শীতাগার, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং এবং শীতল পরিবহন ফসল কাটার পরের অপচয় কমায়। দুধ শীতলীকরণ, মাছ ও মাংসের কোল্ড চেইন এবং ফল-সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ কৃষিপণ্যের মূল্য ও স্থায়িত্ব বাড়ায়। ডিজিটাল বাজারতথ্য কৃষককে ন্যায্য দাম বুঝতে এবং সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশে সুফল ও চ্যালেঞ্জ
বৈজ্ঞানিক কৃষিতে ধান, সবজি, ফল, মাছ, পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদের উৎপাদন বেড়েছে এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ক্ষুদ্র জমি, যন্ত্রের উচ্চমূল্য, মানসম্মত বীজের অভাব, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং ঋণ ও বাজারের সীমাবদ্ধতা প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধা দেয়। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি, সার ও কীটনাশক ব্যবহার পরিবেশ ও মাটির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে।
করণীয়
কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণের সংযোগ শক্তিশালী করে উদ্ভাবন সহজ ভাষায় কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হবে। স্বল্পসুদে ঋণ, যন্ত্র ভাড়া, মানসম্মত উপকরণ, ফসলবিমা, সংরক্ষণাগার এবং ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা দরকার। নারী ও তরুণ কৃষককে প্রশিক্ষণ, ভূমি ও প্রযুক্তিতে সমান সুযোগ দিতে হবে। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষাকারী টেকসই কৃষিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
উপসংহার
বিজ্ঞান কৃষকের অভিজ্ঞতার বিকল্প নয়; বরং সেই অভিজ্ঞতাকে তথ্য, যন্ত্র ও গবেষণার শক্তিতে সমৃদ্ধ করে। বিজ্ঞানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব কৃষি সবার নাগালে পৌঁছাতে পারলে বাংলাদেশ খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের মর্যাদা ও টেকসই অর্থনীতিতে আরও এগিয়ে যাবে।
ভূমিকা
মাদকাসক্তি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য এক সর্বনাশা সমস্যা। যে তরুণ সমাজ দেশের ভবিষ্যৎ, মাদকের করাল গ্রাস তাদের স্বাস্থ্য, মেধা ও কর্মক্ষমতা ধ্বংস করে জাতীয় উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করে। তাই মাদক সম্পর্কে সচেতনতা, প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সমন্বিত ব্যবস্থা জরুরি।
মাদক ও মাদকাসক্তি
যেসব প্রাকৃতিক বা রাসায়নিক পদার্থ গ্রহণে সাময়িক উত্তেজনা, অবসাদ বা চেতনার পরিবর্তন ঘটে এবং বারবার গ্রহণের তীব্র নির্ভরতা তৈরি হয়, সেগুলো মাদক। চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে কিছু মাদকজাত উপাদান ওষুধ হিসেবে কাজে লাগলেও অপব্যবহার দেহ ও মনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মাদকের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্ভরতার অবস্থাই মাদকাসক্তি।
মাদকাসক্তির কারণ
কৌতূহল, সঙ্গদোষ, পারিবারিক অশান্তি, হতাশা, বেকারত্ব, ব্যর্থতা ও নিঃসঙ্গতা থেকে অনেকে প্রথম মাদক গ্রহণ করে। কেউ ভুলভাবে একে আধুনিকতা বা সাহসের পরিচয় মনে করে। পরিবারে নজরদারি ও স্নেহের অভাব, সুস্থ বিনোদনের স্বল্পতা এবং মাদকের সহজলভ্যতা ঝুঁকি বাড়ায়। অসাধু ব্যবসায়ীচক্র তরুণদের লক্ষ্য করে মাদক ছড়িয়ে বিপুল অবৈধ মুনাফা অর্জন করে।
শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি
দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণে মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, যকৃৎ, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষুধা, ঘুম, স্মৃতি, বিচারবোধ ও কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়; উদ্বেগ, বিষণ্নতা, সন্দেহপ্রবণতা ও সহিংস আচরণ দেখা দিতে পারে। একই মাদক থেকে আগের অনুভূতি পেতে ক্রমে বেশি মাত্রা দরকার হয় এবং হঠাৎ বন্ধ করলে তীব্র প্রত্যাহারজনিত সমস্যা সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত মাত্রা মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
পরিবার ও সমাজে প্রভাব
আসক্ত ব্যক্তি পড়াশোনা বা কর্মক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা ও মাদক কেনার ব্যয়ে পরিবার অর্থসংকটে পড়ে। অর্থ জোগাতে কেউ চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা বা সহিংস অপরাধে জড়ায়। পরিবারে অবিশ্বাস, কলহ ও নির্যাতন বাড়ে; শিশুদের নিরাপত্তা ও শিক্ষা ব্যাহত হয়। মাদক ব্যবসা দুর্নীতি, চোরাচালান ও সংগঠিত অপরাধকে শক্তিশালী করে সমাজের শান্তি নষ্ট করে।
প্রতিরোধের উপায়
সীমান্ত, পরিবহন ও বিপণনচক্রে কঠোর নজরদারি এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা, জীবনদক্ষতা শিক্ষা ও পরামর্শসেবা চালু করতে হবে। পরিবারকে সন্তানের আচরণ, মানসিক পরিবর্তন ও বন্ধুবৃত্তের প্রতি যত্নশীল হতে হবে; তবে সন্দেহ বা অপমান নয়, আস্থা ও খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ গড়তে হবে। খেলাধুলা, পাঠাগার, সংস্কৃতিচর্চা, স্বেচ্ছাসেবা এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান তরুণদের সুস্থ জীবনে যুক্ত রাখে। গণমাধ্যমকে মাদকের ক্ষতি তুলে ধরতে হবে, কিন্তু মাদক গ্রহণকে আকর্ষণীয় করে এমন উপস্থাপনা এড়াতে হবে।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন
মাদকাসক্তি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা; শুধু শাস্তি বা ঘৃণায় এর সমাধান হয় না। প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে শারীরিক চিকিৎসা, মনোসামাজিক পরামর্শ, প্রয়োজনে ওষুধ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন দরকার। চিকিৎসার পর পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা, শিক্ষা বা কর্মে পুনঃসংযোগ এবং নিয়মিত অনুসরণ আসক্তিকে ফিরে আসা থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। অননুমোদিত বা নির্যাতনমূলক কেন্দ্রের বদলে মানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থী ও যুবসমাজের ভূমিকা
প্রথম প্রস্তাবেই দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলা, মাদকাসক্ত বন্ধুকে গোপনে উৎসাহ না দিয়ে বিশ্বস্ত অভিভাবক বা পরামর্শকের সাহায্য নেওয়া এবং মাদকবিরোধী সচেতনতায় অংশ নেওয়া তরুণদের কর্তব্য। আত্মমর্যাদা, সঠিক বন্ধু নির্বাচন ও জীবনের ইতিবাচক লক্ষ্য মাদকের প্রলোভন থেকে রক্ষা করে।
উপসংহার
মাদক নির্মূল কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়; পরিবার, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত দায়িত্ব। সরবরাহ বন্ধ, ঝুঁকির কারণ দূর, সময়মতো চিকিৎসা এবং সুস্থ জীবনের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারলেই মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও কর্মক্ষম বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
ভূমিকা
প্রকৃতির সৌন্দর্য ও সম্পদে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা, বজ্রপাত, পাহাড়ধস ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি এ দেশের মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
দুর্যোগপ্রবণতার কারণ
বাংলাদেশ গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার নিম্ন বদ্বীপে অবস্থিত। অসংখ্য নদী, নিচু সমতল ভূমি, বঙ্গোপসাগরের ফানেল আকৃতির উপকূল এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাত দেশকে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে রাখে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন উজাড়, নদী-খাল দখল, দুর্বল জলনিষ্কাশন এবং পাহাড় কাটা মানুষের তৈরি ঝুঁকি বাড়ায়। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, অনিয়মিত বৃষ্টি, তাপপ্রবাহ ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বন্যা ও নদীভাঙন
বর্ষায় অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। স্বাভাবিক বন্যা জমিতে পলি এনে উর্বরতা বাড়ালেও দীর্ঘস্থায়ী বা আকস্মিক বন্যা ফসল, ঘরবাড়ি, সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ক্ষতি করে। নদীভাঙনে প্রতিবছর বহু মানুষ জমি ও বসতভিটা হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়। হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যা পাকা ধান নষ্ট করে কৃষকের সারা বছরের জীবিকা বিপন্ন করতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবল বাতাস, ভারী বৃষ্টি ও জলোচ্ছ্বাস নিয়ে আঘাত হানে। এতে প্রাণহানি, লবণাক্ততা, বাঁধভাঙা, গবাদিপশু ও ফসলের ক্ষতি ঘটে। উপকূলীয় বন ও ম্যানগ্রোভ প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করলেও নির্বিচার বৃক্ষনিধন সুরক্ষা দুর্বল করে।
অন্যান্য দুর্যোগ
উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরা কৃষি ও পানির সংকট সৃষ্টি করে। অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস ঘটে; বজ্রপাতে মাঠে কর্মরত মানুষ প্রাণ হারায়। অপরিকল্পিত ও বিধিবহির্ভূত ভবনের কারণে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো ভূমিকম্পে বড় ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে। অগ্নিকাণ্ড, জলাবদ্ধতা ও তাপপ্রবাহও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ নগর দুর্যোগে পরিণত হচ্ছে।
ক্ষয়ক্ষতি
প্রাকৃতিক দুর্যোগে শুধু মানুষ ও সম্পদ নষ্ট হয় না; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ ও স্থানীয় অর্থনীতি দীর্ঘদিন ব্যাহত থাকে। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের অভাবে রোগ ছড়ায়, নারী ও শিশু নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে এবং দরিদ্র মানুষ আরও দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যায়। দুর্যোগের মানসিক আঘাতও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
প্রস্তুতি ও প্রতিকার
বাংলাদেশ আগাম সতর্কবার্তা, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি, স্বেচ্ছাসেবক, আশ্রয়কেন্দ্র ও উদ্ধারব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। তবু ঝুঁকিভিত্তিক ভূমি ব্যবহার, টেকসই বাঁধ ও সড়ক, নদী-খাল রক্ষা, নগরের কার্যকর নালা, ভূমিকম্পসহনীয় ভবন এবং উপকূলীয় বনায়ন আরও জোরদার করতে হবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক মহড়া, প্রাথমিক চিকিৎসা, শুকনা খাবার ও নিরাপদ পানির প্রস্তুতি এবং দ্রুত পুনর্বাসন জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কমাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও প্রয়োজন।
উপসংহার
প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, আগাম প্রস্তুতি ও জনসচেতনতায় ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো যায়। সরকার, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের সমন্বিত উদ্যোগই দুর্যোগসহিষ্ণু বাংলাদেশ গড়ার পথ।
তারিখ: ১৫ই জুন ২০২৩
বরাবর
সম্পাদক
দৈনিক প্রথম আলো, ঢাকা
বিষয়: ফরিদপুরের জয়পুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দুর্দশা সম্পর্কে পত্র।
জনাব,
আপনার বহুল প্রচারিত পত্রিকার ‘চিঠিপত্র’ বিভাগে প্রকাশের জন্য নিচের পত্রটি পাঠাচ্ছি।
ফরিদপুর জেলার জয়পুর ইউনিয়নের বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। অথচ দীর্ঘদিনের অবহেলায় কেন্দ্রটির সেবাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী অপ্রতুল; যাঁরা কর্মরত আছেন, তাঁদেরও অনেক সময় নিয়মিত পাওয়া যায় না। ওষুধের মজুত সীমিত, রোগনির্ণয়ের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই এবং পরীক্ষাগারের কার্যক্রমও অনিয়মিত। ভবনের দেয়াল ও ছাদ ক্ষতিগ্রস্ত, অপেক্ষাকক্ষ অপরিচ্ছন্ন এবং বিশুদ্ধ পানি ও শৌচাগারের ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। ফলে গর্ভবতী নারী, শিশু, প্রবীণ ও দরিদ্র রোগীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন। জরুরি রোগীকে দূরের জেলা হাসপাতালে পাঠাতে হয়; সময় ও পরিবহনের অভাবে অনেকের চিকিৎসা বিলম্বিত হচ্ছে। এলাকাবাসী একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানালেও দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই শূন্য পদে দ্রুত জনবল নিয়োগ, চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত, পর্যাপ্ত ওষুধ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ, ভবন সংস্কার এবং সেবার মান তদারকির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ কামনা করছি।
বিনীত
ফাহিম
জয়পুর ইউনিয়ন, ফরিদপুর।
১৫ই জুন ২০২৩
বিক্রয় কর্মকর্তা
ঢাকা প্রকাশনী
বাংলাবাজার, ঢাকা–১১০০
বিষয়: ডাকযোগে পুস্তক পাঠানোর আবেদন।
মহোদয়,
বিনীত নিবেদন এই যে, আপনাদের প্রকাশিত নিচের বইগুলো আমার পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত সংগ্রহের জন্য প্রয়োজন। বইগুলো স্থানীয় বাজারে না পাওয়ায় প্রতিটির একটি করে কপি ভিপি বা ক্যাশ অন ডেলিভারি হিসেবে ডাকযোগে নিচে দেওয়া ঠিকানায় পাঠানোর অনুরোধ করছি। বইয়ের মূল্য, ডাকমাশুল ও প্রযোজ্য অন্যান্য খরচ বই গ্রহণের সময় পরিশোধ করব। কোনো বই মজুত না থাকলে তার পরিবর্তে অন্য বই না পাঠিয়ে আমাকে আগে জানালে কৃতজ্ঞ থাকব। বইগুলো যাতে অক্ষত থাকে, সে জন্য নিরাপদ মোড়কে পাঠানোর অনুরোধ রইল।
বইয়ের তালিকা:
১. বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি — ১ কপি
২. বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা — ১ কপি
৩. নির্বাচিত বাংলা প্রবন্ধ — ১ কপি
অতএব, উপর্যুক্ত বইগুলো যথাশীঘ্র ডাকযোগে পাঠানোর ব্যবস্থা করে বাধিত করবেন।
বিনীত
জনি
জিন্দাবাজার, সিলেট।
মুঠোফোন: ০১XXXXXXXXX
মানুষের জীবনের সার্থকতা দীর্ঘ আয়ুতে নয়, মানবকল্যাণমূলক ও মহৎ কর্মে। যে ব্যক্তি নিজের কাজের দ্বারা দেশ, সমাজ ও মানুষের উপকার করেন, তিনি মৃত্যুর পরও মানুষের স্মৃতি ও ভালোবাসায় বেঁচে থাকেন।
মানুষ মরণশীল; তাই কেবল বহু বছর বেঁচে থাকলেই জীবন অর্থবহ হয় না। অনেকে দীর্ঘ জীবন লাভ করেও এমন কোনো কাজ করেন না, যার জন্য পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের স্মরণ করবে। বিপরীতে স্বল্পায়ু বহু মানুষ জ্ঞান, সাহিত্য, বিজ্ঞান, স্বাধীনতা ও মানবসেবায় অসামান্য অবদান রেখে চিরস্মরণীয় হয়েছেন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেও তাঁর সৃষ্টির জন্য আজও স্মরণীয়। ভাষাশহিদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং দেশের জন্য আত্মোৎসর্গকারী অসংখ্য তরুণ তাঁদের কর্ম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে অমর হয়েছেন। মানুষের দেহের জীবন সীমিত, কিন্তু একটি সৎ কাজ সমাজে নতুন কাজের অনুপ্রেরণা জাগায় এবং তার প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তৃত হয়। তাই অলস দীর্ঘায়ুর চেয়ে অল্প সময়ের কর্মময়, সৎ ও কল্যাণকর জীবন অনেক বেশি মূল্যবান।
অতএব, বয়সের সংখ্যা নয়, কর্মের গুণ ও কল্যাণকর প্রভাবই মানুষের প্রকৃত পরিচয়। মহৎ কর্মে জীবনকে পূর্ণ করতে পারলেই মানুষ মৃত্যুকে অতিক্রম করে স্মরণীয় ও চিরজীবী হয়ে থাকে।
ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে সৌন্দর্য, কাব্য ও কল্পনার চেয়ে খাদ্যের প্রয়োজনই প্রধান হয়ে ওঠে। জীবনধারণের মৌলিক চাহিদা অপূর্ণ থাকলে পূর্ণিমার মনোরম চাঁদও তার চোখে খাবারের রুটির মতো প্রতিভাত হয়।
খাদ্য মানুষের প্রথম মৌলিক প্রয়োজন। ক্ষুধা শরীরকে দুর্বল করে, চিন্তাকে সংকুচিত করে এবং মানুষের সমস্ত মনোযোগ আহারের সন্ধানে কেন্দ্রীভূত করে। পেট ভরা মানুষের কাছে চাঁদের আলো, ফুলের সৌন্দর্য বা কবিতার ছন্দ আনন্দের উৎস; কিন্তু দীর্ঘদিন অনাহারে থাকা শ্রমজীবী মানুষের কাছে এসব বিলাসিতা। সে পূর্ণিমার গোল চাঁদে রোমান্টিক সৌন্দর্য নয়, ঝলসানো রুটির আকৃতি দেখে, কারণ তার চেতনা ক্ষুধার যন্ত্রণায় আচ্ছন্ন। দারিদ্র্য যখন মানুষের খাদ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসার অধিকার কেড়ে নেয়, তখন জীবন হয়ে ওঠে কঠিন বাস্তবতার গদ্য; কাব্যের কোমলতা সেখানে স্থান পায় না। এর অর্থ সৌন্দর্যের মূল্য নেই নয়, বরং সৌন্দর্য উপলব্ধির আগে মানুষের ন্যূনতম জীবনধারণের নিশ্চয়তা দরকার। ক্ষুধার্তকে কেবল সৌন্দর্যের কথা শোনানো নিষ্ঠুরতা; আগে তার খাদ্য ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের ব্যবস্থা করা মানবিক কর্তব্য।
সুতরাং, ক্ষুধা মানুষের নান্দনিক অনুভূতিকে বাস্তব প্রয়োজনের অধীন করে। সমাজে সাহিত্য-সংস্কৃতির সত্যিকারের বিকাশ চাইলে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূর করে সবার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ভূমিকা
প্রকৃতির সৌন্দর্য ও সম্পদে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা, বজ্রপাত, পাহাড়ধস ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি এ দেশের মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
দুর্যোগপ্রবণতার কারণ
বাংলাদেশ গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার নিম্ন বদ্বীপে অবস্থিত। অসংখ্য নদী, নিচু সমতল ভূমি, বঙ্গোপসাগরের ফানেল আকৃতির উপকূল এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাত দেশকে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে রাখে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন উজাড়, নদী-খাল দখল, দুর্বল জলনিষ্কাশন এবং পাহাড় কাটা মানুষের তৈরি ঝুঁকি বাড়ায়। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, অনিয়মিত বৃষ্টি, তাপপ্রবাহ ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বন্যা ও নদীভাঙন
বর্ষায় অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। স্বাভাবিক বন্যা জমিতে পলি এনে উর্বরতা বাড়ালেও দীর্ঘস্থায়ী বা আকস্মিক বন্যা ফসল, ঘরবাড়ি, সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ক্ষতি করে। নদীভাঙনে প্রতিবছর বহু মানুষ জমি ও বসতভিটা হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়। হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যা পাকা ধান নষ্ট করে কৃষকের সারা বছরের জীবিকা বিপন্ন করতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবল বাতাস, ভারী বৃষ্টি ও জলোচ্ছ্বাস নিয়ে আঘাত হানে। এতে প্রাণহানি, লবণাক্ততা, বাঁধভাঙা, গবাদিপশু ও ফসলের ক্ষতি ঘটে। উপকূলীয় বন ও ম্যানগ্রোভ প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করলেও নির্বিচার বৃক্ষনিধন সুরক্ষা দুর্বল করে।
অন্যান্য দুর্যোগ
উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরা কৃষি ও পানির সংকট সৃষ্টি করে। অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস ঘটে; বজ্রপাতে মাঠে কর্মরত মানুষ প্রাণ হারায়। অপরিকল্পিত ও বিধিবহির্ভূত ভবনের কারণে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো ভূমিকম্পে বড় ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে। অগ্নিকাণ্ড, জলাবদ্ধতা ও তাপপ্রবাহও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ নগর দুর্যোগে পরিণত হচ্ছে।
ক্ষয়ক্ষতি
প্রাকৃতিক দুর্যোগে শুধু মানুষ ও সম্পদ নষ্ট হয় না; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ ও স্থানীয় অর্থনীতি দীর্ঘদিন ব্যাহত থাকে। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের অভাবে রোগ ছড়ায়, নারী ও শিশু নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে এবং দরিদ্র মানুষ আরও দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যায়। দুর্যোগের মানসিক আঘাতও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
প্রস্তুতি ও প্রতিকার
বাংলাদেশ আগাম সতর্কবার্তা, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি, স্বেচ্ছাসেবক, আশ্রয়কেন্দ্র ও উদ্ধারব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। তবু ঝুঁকিভিত্তিক ভূমি ব্যবহার, টেকসই বাঁধ ও সড়ক, নদী-খাল রক্ষা, নগরের কার্যকর নালা, ভূমিকম্পসহনীয় ভবন এবং উপকূলীয় বনায়ন আরও জোরদার করতে হবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক মহড়া, প্রাথমিক চিকিৎসা, শুকনা খাবার ও নিরাপদ পানির প্রস্তুতি এবং দ্রুত পুনর্বাসন জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কমাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও প্রয়োজন।
উপসংহার
প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, আগাম প্রস্তুতি ও জনসচেতনতায় ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো যায়। সরকার, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের সমন্বিত উদ্যোগই দুর্যোগসহিষ্ণু বাংলাদেশ গড়ার পথ।
ভূমিকা
অর্থ, শ্রম, জ্ঞান ও প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কৃষিপণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ বা বিপণনের উদ্যোগ যিনি গ্রহণ করেন, তিনি কৃষি উদ্যোক্তা। কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশে শিক্ষিত ও উদ্ভাবনী তরুণদের জন্য এ পেশা আত্মকর্মসংস্থান, নতুন চাকরি সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বড় সুযোগ।
কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তা
প্রথাগত কৃষক সাধারণত পরিবারের খাদ্যচাহিদা মেটানোকে অগ্রাধিকার দিয়ে উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রি করেন। কৃষি উদ্যোক্তা শুরু থেকেই বাজার, ব্যয়, লাভ, ঝুঁকি ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করেন। তিনি শুধু ফসল চাষে সীমাবদ্ধ নন; বীজ ও চারা উৎপাদন, মাছ চাষ, দুগ্ধ ও পোলট্রি খামার, মৌচাষ, কৃষিযন্ত্র ভাড়া, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং অনলাইন বিপণনেও উদ্যোগ নিতে পারেন।
উদ্যোগ নির্বাচনের প্রস্তুতি
সফল উদ্যোগের আগে স্থানীয় মাটি, পানি, আবহাওয়া, কাঁচামাল, শ্রম, যোগাযোগ ও বাজারের চাহিদা যাচাই করতে হয়। সম্ভাব্য ক্রেতা, প্রতিযোগী, উৎপাদন খরচ, বিক্রয়মূল্য ও লাভের হিসাবসহ বাস্তবসম্মত ব্যবসায় পরিকল্পনা তৈরি জরুরি। নিজের দক্ষতা ও পুঁজির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছোট পরিসরে শুরু করে ফলাফল বিশ্লেষণের পর ধীরে ধীরে সম্প্রসারণ করলে ঝুঁকি কমে।
উদ্যোক্তার গুণাবলি
কৃষি উদ্যোক্তাকে পরিশ্রমী, সৎ, ধৈর্যশীল, উদ্ভাবনী ও ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে হয়। দ্রুত সিদ্ধান্ত, হিসাব সংরক্ষণ, শ্রমিক পরিচালনা, দর-কষাকষি এবং ক্রেতার আস্থা অর্জনের দক্ষতা তাঁর দরকার। রোগবালাই, আবহাওয়া ও বাজারদরের পরিবর্তনে বিচলিত না হয়ে বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণের মানসিকতাও সফলতার শর্ত।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার
মানসম্মত বীজ, মাটি পরীক্ষা, সুষম সার, আধুনিক সেচ, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিযন্ত্র উৎপাদন ও খরচ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, মোবাইল পরামর্শ, ডিজিটাল হিসাব, অনলাইন বাজার এবং শীতল সংরক্ষণ প্রযুক্তি ঝুঁকি ও অপচয় কমায়। তবে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এমন অতিরিক্ত সার-কীটনাশক ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।
অর্থায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
নিজস্ব সঞ্চয়ের পাশাপাশি ব্যাংকঋণ, সমবায় বা সরকারি সহায়তা থেকে পুঁজি সংগ্রহ করা যায়। ঋণ নেওয়ার আগে পরিশোধক্ষমতা ও নগদ প্রবাহ হিসাব করা জরুরি। একই খামারে উপযোগী একাধিক পণ্য উৎপাদন, রোগ প্রতিরোধ, নিরাপদ অবকাঠামো, সঠিক নথি এবং সম্ভব হলে ফসল বা খামারবিমা ক্ষতির ঝুঁকি কমায়।
সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ
কৃষিপণ্য দ্রুত নষ্ট হওয়ায় পরিচ্ছন্ন সংগ্রহ, মানভিত্তিক বাছাই, উপযুক্ত প্যাকেজিং, গুদাম ও শীতল পরিবহনের ব্যবস্থা দরকার। দুধ থেকে দই, ফল থেকে জ্যাম বা আচার এবং শস্য থেকে প্যাকেটজাত খাদ্য তৈরি করলে মূল্য সংযোজন হয়। মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সমবায়, কৃষকের বাজার, চুক্তিভিত্তিক বিক্রি ও অনলাইন মাধ্যমে সরাসরি ক্রেতার কাছে পৌঁছানো ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে পারে।
বাংলাদেশে সম্ভাবনা
দেশের বিপুল জনসংখ্যা কৃষিপণ্যের বড় বাজার। বৈচিত্র্যময় মাটি ও জলবায়ুতে ধান, সবজি, ফল, ফুল, মাছ, দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিতেও সম্ভাবনা বাড়ছে। নারী ও তরুণেরা বাড়ির আঙিনা বা ক্ষুদ্র জমি থেকে নিরাপদ খাদ্য, নার্সারি, মাশরুম বা অনলাইন বিপণনের উদ্যোগ শুরু করতে পারেন।
চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
জমির স্বল্পতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগবালাই, পুঁজির অভাব, অস্থিতিশীল বাজারদর, সংরক্ষণঘাটতি ও মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব উদ্যোক্তাদের প্রধান বাধা। এসব মোকাবিলায় সহজ শর্তে ঋণ, মানসম্মত প্রশিক্ষণ, পরীক্ষিত উপকরণ, কৃষি সম্প্রসারণসেবা, কার্যকর শীতাগার, উন্নত পরিবহন এবং স্বচ্ছ বাজারতথ্য নিশ্চিত করা দরকার। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, ব্যাংক ও বেসরকারি সংস্থার সেবাকে উদ্যোক্তার কাছে সহজে পৌঁছে দিতে হবে।
নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ব
খাদ্য মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভুল ওজন বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে লাভ করা অনৈতিক। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ক্রেতার প্রতি জবাবদিহি একজন কৃষি উদ্যোক্তার মৌলিক দায়িত্ব।
উপসংহার
পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, সততা ও বাজারজ্ঞান একত্রিত হলে কৃষি লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ উদ্যোগে পরিণত হতে পারে। সফল কৃষি উদ্যোক্তা নিজের স্বাবলম্বিতা অর্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা ও জাতীয় সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
ভূমিকা
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত, শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক ও সাহিত্যিক। নারী যখন শিক্ষা, কর্ম ও সামাজিক অধিকার থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিল, তখন তিনি লেখনী, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং সংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের মুক্তি ও মর্যাদার পথ নির্মাণ করেন।
জন্ম ও পারিবারিক পরিবেশ
রোকেয়া ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জহির উদ্দিন মুহম্মদ আবু আলী সাবের এবং মাতা রাহাতুল্লোসা সাবেরা চৌধুরানী। রক্ষণশীল ও কঠোর পর্দাপ্রথার পরিবারে মেয়েদের বাংলা ও ইংরেজি শেখার সুযোগ ছিল না। কিন্তু জ্ঞানপিপাসু রোকেয়া বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের ও বোন করিমুল্লোসার সহযোগিতায় গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা লাভ করেন।
বিবাহ ও সাহিত্যচর্চার প্রেরণা
১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে বিহারের ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। উদারমনস্ক স্বামী রোকেয়াকে বাংলা ও ইংরেজি চর্চা এবং সমাজসেবায় উৎসাহ দেন। স্বামীর সহযোগিতায় তাঁর প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায়। ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে স্বামীর মৃত্যুর পরও রোকেয়া তাঁর আদর্শ ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি।
নারীশিক্ষা বিস্তারে অবদান
স্বামীর স্মৃতিতে ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে ভাগলপুরে মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে তিনি সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিকূলতার কারণে পরে কলকাতায় গিয়ে ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্যালয়টি পুনরায় চালু করেন। রক্ষণশীল পরিবারের অভিভাবকদের বোঝাতে তিনি ঘরে ঘরে গিয়েছেন এবং ছাত্রীদের যাতায়াতের জন্য আলাদা গাড়ির ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টি ক্রমে উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। নারীশিক্ষা যে কেবল অক্ষরজ্ঞান নয়, বরং আত্মমর্যাদা, অধিকারবোধ ও স্বনির্ভরতার পথ—এ বিশ্বাসই তাঁর কাজের ভিত্তি ছিল।
সাহিত্যিক জীবন
১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে ‘নবপ্রভা’ পত্রিকায় ‘পিপাসা’ প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে ‘মতিচুর’ প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, ইংরেজি রচনা Sultana’s Dream বা ‘সুলতানার স্বপ্ন’, উপন্যাস ‘পদ্মরাগ’ এবং ‘অবরোধবাসিনী’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্যঙ্গ, যুক্তি ও কল্পনার সাহায্যে তিনি নারীর অবরুদ্ধ জীবন, পুরুষতান্ত্রিক বৈষম্য, কুসংস্কার এবং মানসিক দাসত্বের সমালোচনা করেছেন। তাঁর সাহিত্য একই সঙ্গে শিল্পসফল ও সমাজজাগরণমূলক।
সংগঠন ও সমাজসংস্কার
নারীদের সংগঠিত ও সহায়তা করতে রোকেয়া ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে দরিদ্র নারীর শিক্ষা, কর্মদক্ষতা ও কল্যাণে কাজ করা হয়। তিনি বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, একতরফা তালাক, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং নারীর প্রতি সব ধরনের অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তাঁর লক্ষ্য পুরুষের বিরোধিতা নয়; নারী ও পুরুষের সমঅধিকার ও সম্মিলিত অগ্রগতির মাধ্যমে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা।
চিন্তাদর্শ ও প্রাসঙ্গিকতা
রোকেয়া উপলব্ধি করেছিলেন যে নারীকে পিছিয়ে রেখে কোনো জাতি এগোতে পারে না। শিক্ষা নারীর বিচারবুদ্ধি, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ায়। আজ নারীরা শিক্ষা, প্রশাসন, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, সাহিত্য ও রাজনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করছে; এর পেছনে রোকেয়ার সংগ্রাম এক গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা। তবে বাল্যবিবাহ, সহিংসতা, বৈষম্য ও শিক্ষাবঞ্চনা পুরোপুরি দূর হয়নি বলে তাঁর চিন্তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
মৃত্যু ও স্মৃতি
১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর কলকাতায় রোকেয়া মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিন ৯ই ডিসেম্বর বাংলাদেশে ‘রোকেয়া দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। তাঁর জীবন নারীমুক্তি, শিক্ষা ও মানবমর্যাদার সংগ্রামের উজ্জ্বল প্রতীক।
উপসংহার
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তাঁর সাহিত্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি নারীকে আত্মসচেতনতার পথে আহ্বান জানিয়েছেন। সাহস, যুক্তিবোধ ও মানবিকতার এই উত্তরাধিকার তাঁকে শুধু নারী জাগরণের অগ্রদূত নয়, সমগ্র বাঙালি সমাজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শকে পরিণত করেছে।
১৫ই জুন ২০২৩
খুলনা
প্রিয় মিলি,
আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা নিও। আশা করি ভালো আছ। গত সপ্তাহে একটি ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণের যে আনন্দময় অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা তোমাকে জানাতে আজ লিখছি।
বিদ্যালয়ের শিক্ষা সফরে আমরা কুমিল্লার ময়নামতি শালবন বিহার দেখতে গিয়েছিলাম। খুব ভোরে খুলনা থেকে বাসে রওনা হয়ে সকালে সেখানে পৌঁছাই। লালমাই-ময়নামতি অঞ্চলের সবুজ উঁচু ভূমির মধ্যে অবস্থিত এ প্রত্নস্থল একসময়ের প্রাচীন বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ। প্রবেশের পর চারদিকে সারিবদ্ধ ভিক্ষুকক্ষ, মাঝখানে কেন্দ্রীয় মন্দিরের ভিত্তি, ইটের অলংকরণ ও পুরোনো স্থাপনার বিন্যাস দেখে আমরা বিস্মিত হই। একজন পথপ্রদর্শক খননে পাওয়া পোড়ামাটির ফলক, মুদ্রা, শিলালিপি ও অন্যান্য নিদর্শনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝিয়ে দেন। পাশের ময়নামতি জাদুঘরে সংরক্ষিত মূর্তি, ধাতব সামগ্রী, মুদ্রা ও টেরাকোটা দেখে সে সময়ের ধর্ম, শিল্প ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাই। পাঠ্যবইয়ে পড়া ইতিহাসকে চোখের সামনে দেখতে পাওয়ার অনুভূতি ছিল অসাধারণ। পরিষ্কার পরিবেশ ও নীরব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও ভ্রমণকে আনন্দদায়ক করেছে। ফেরার পথে মনে হয়েছে, অতীতের পরিচয় বহনকারী এসব পুরাকীর্তি রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
সুযোগ পেলে তুমিও স্থানটি দেখে এসো। তোমার মা-বাবাকে আমার সালাম দেবে।
ইতি
তোমার বন্ধু
রাইসা
১৫ই জুন ২০২৩
চেয়ারম্যান
মোগলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদ
দক্ষিণ সুরমা, সিলেট
বিষয়: এলাকায় একটি পাঠাগার স্থাপনের আবেদন।
মহোদয়,
বিনীত নিবেদন এই যে, আমি দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার ইউনিয়নের একজন স্থায়ী বাসিন্দা। আমাদের এলাকায় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও আগ্রহী পাঠক থাকলেও সবার ব্যবহারের উপযোগী কোনো পাঠাগার নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বাইরের সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও তথ্যবিষয়ক বই পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষও পত্রিকা, সাময়িকী এবং প্রয়োজনীয় তথ্যসামগ্রী ব্যবহার করতে পারছেন না। একটি সুশৃঙ্খল পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস, জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতা বাড়বে এবং তরুণেরা অবসর সময়কে কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করতে পারবে। স্থানীয় বাসিন্দারা বই সংগ্রহ ও স্বেচ্ছাসেবায় সহযোগিতা করতেও আগ্রহী।
অতএব, আমাদের এলাকায় উপযুক্ত স্থানে একটি গণপাঠাগার স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় বই, আসবাব ও পাঠকক্ষের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আপনার সদয় মর্জি কামনা করছি।
বিনীত
হারুন
মোগলাবাজার, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।
শুধু প্রাণ ও দৈহিক অস্তিত্ব মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে শ্রেষ্ঠ করে না। বিবেক, অনুভূতি, মানবিকতা ও নৈতিকতায় সমৃদ্ধ মনই একজন প্রাণীকে প্রকৃত মানুষে পরিণত করে।
সব জীবই খাদ্য গ্রহণ করে, বেড়ে ওঠে, আত্মরক্ষা করে এবং বংশবিস্তার করে। মানুষও এসব জৈব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, কিন্তু তার বিশেষত্ব হলো চিন্তাশীল মন। মন মানুষকে ভালো-মন্দ বিচার, অন্যের দুঃখ অনুভব, সত্য ও সৌন্দর্য উপলব্ধি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষমতা দেয়। এই মনের শক্তিতেই মানুষ ভাষা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প, আইন ও সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে। শুধু বুদ্ধি থাকলেই অবশ্য মনুষ্যত্ব পূর্ণ হয় না; সেই বুদ্ধির সঙ্গে বিবেক, সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ ও সংযম যুক্ত হওয়া চাই। যে ব্যক্তি নিজের স্বার্থে অন্যকে শোষণ করে, দুর্বলের কষ্টে উদাসীন থাকে বা জ্ঞানকে ধ্বংসের কাজে ব্যবহার করে, সে দৈহিকভাবে মানুষ হলেও মানবিক অর্থে মানুষ নয়। বিপরীতে যে ব্যক্তি অন্যের বিপদে এগিয়ে আসে, সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, ভুল স্বীকার করে এবং সকল জীবের মর্যাদা রক্ষা করে, তার মধ্যেই প্রকৃত মানুষের পরিচয় প্রকাশ পায়। মনকে শিক্ষা, সৎ সঙ্গ, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সেবার মাধ্যমে পরিশীলিত করতে হয়; না হলে লোভ, হিংসা ও অহংকার তার মানবিক শক্তিকে নষ্ট করে।
অতএব, প্রাণ মানুষকে জীবিত রাখে, কিন্তু উদার ও বিবেকবান মন তাকে মনুষ্যত্ব দান করে। মানবিক গুণের চর্চায় মনকে বিকশিত করতে পারলেই মানুষ নামের সত্য মর্যাদা অর্জিত হয়।
মানুষের জীবনের সার্থকতা দীর্ঘ আয়ুতে নয়, মানবকল্যাণমূলক ও মহৎ কর্মে। যে ব্যক্তি নিজের কাজের দ্বারা দেশ, সমাজ ও মানুষের উপকার করেন, তিনি মৃত্যুর পরও মানুষের স্মৃতি ও ভালোবাসায় বেঁচে থাকেন।
মানুষ মরণশীল; তাই কেবল বহু বছর বেঁচে থাকলেই জীবন অর্থবহ হয় না। অনেকে দীর্ঘ জীবন লাভ করেও এমন কোনো কাজ করেন না, যার জন্য পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের স্মরণ করবে। বিপরীতে স্বল্পায়ু বহু মানুষ জ্ঞান, সাহিত্য, বিজ্ঞান, স্বাধীনতা ও মানবসেবায় অসামান্য অবদান রেখে চিরস্মরণীয় হয়েছেন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেও তাঁর সৃষ্টির জন্য আজও স্মরণীয়। ভাষাশহিদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং দেশের জন্য আত্মোৎসর্গকারী অসংখ্য তরুণ তাঁদের কর্ম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে অমর হয়েছেন। মানুষের দেহের জীবন সীমিত, কিন্তু একটি সৎ কাজ সমাজে নতুন কাজের অনুপ্রেরণা জাগায় এবং তার প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তৃত হয়। তাই অলস দীর্ঘায়ুর চেয়ে অল্প সময়ের কর্মময়, সৎ ও কল্যাণকর জীবন অনেক বেশি মূল্যবান।
অতএব, বয়সের সংখ্যা নয়, কর্মের গুণ ও কল্যাণকর প্রভাবই মানুষের প্রকৃত পরিচয়। মহৎ কর্মে জীবনকে পূর্ণ করতে পারলেই মানুষ মৃত্যুকে অতিক্রম করে স্মরণীয় ও চিরজীবী হয়ে থাকে।